পরমপদ সোপানম: সাপ-সিঁড়ির খেলায় লুকিয়ে থাকা ভারতীয় ঐতিহ্য ও জীবনদর্শন।

ছোটবেলায় সাপ-সিঁড়ি খেলেননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। একটি ছককাটা বোর্ড, কয়েকটি গুটি, পাশা, সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠার আনন্দ আর সাপের মুখে পড়ে নিচে নেমে যাওয়ার হতাশা—এই নিয়েই জমে উঠত খেলা। কিন্তু এই পরিচিত খেলাটির পেছনে যে ভারতীয় ঐতিহ্য, নৈতিক শিক্ষা এবং জীবনদর্শনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, তা অনেকেরই অজানা।

দক্ষিণ ভারতে এই খেলার একটি ঐতিহ্যবাহী রূপের নাম পরমপদ সোপানম। বিভিন্ন অঞ্চলে এটি পরমপদম, মোক্ষপটম বা বৈকুণ্ঠপালি নামেও পরিচিত। এর সঙ্গে আধুনিক সাপ-সিঁড়ি খেলার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতীয় বোর্ড গেমের ইতিহাসে এই খেলাকে শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে নয়, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা দেওয়ার একটি উপায় হিসেবেও দেখা হয়। তথ্যসূত্র: Sahapedia, MAP Academy

পরমপদ সোপানম নামের অর্থ কী?

‘পরমপদ সোপানম’ নামটির সঙ্গে উপরে ওঠার ধারণা জড়িয়ে রয়েছে। সহজভাবে বললে, এটি সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছানোর সিঁড়ি বা ধাপের প্রতীক। ঐতিহ্যবাহী বোর্ডের বিভিন্ন ঘর, সাপ ও সিঁড়ির বিন্যাসের মধ্য দিয়ে মানুষের জীবনযাত্রা, ভালো-মন্দ কাজ এবং তার ফলের ধারণা তুলে ধরা হতো।

এই পরিবারের বিভিন্ন খেলায় বোর্ডের আকার, ঘরের সংখ্যা এবং ছবির ধরন এক রকম নয়। কোথাও ১০০টি ঘর দেখা যায়, আবার দক্ষিণ ভারতের কিছু ঐতিহ্যবাহী বোর্ডে ১৩২টি ঘরও রয়েছে। তাই সব পুরোনো বোর্ডের নিয়ম বা নকশা এক ছিল বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। তথ্যসূত্র: Paramapadam-এর ঐতিহ্য ও বোর্ডের বিভিন্ন রূপ

খেলার ঐতিহাসিক পটভূমি

পরমপদ সোপানমের ইতিহাস বুঝতে গেলে ভারতের পুরোনো বোর্ড গেমের জগৎ সম্পর্কে জানতে হয়। উপমহাদেশে বহু শতাব্দী ধরে এমন নানা খেলা প্রচলিত ছিল, যেখানে গুটি চালানো, পাশা বা কড়ি ব্যবহার করা এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো ছিল মূল বিষয়।

সাপ-সিঁড়ির ঐতিহ্যবাহী পূর্বসূরিদের মধ্যে জ্ঞান চৌপর বা গ্যান চৌপর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ‘জ্ঞান চৌপর’ কথাটির অর্থ জ্ঞানের খেলা। এই ধরনের বোর্ডে শুধু সংখ্যা বা ঘর থাকত না; কিছু বোর্ডে ধর্মীয় চিত্র, নৈতিক গুণাবলি এবং মানুষের আচরণের প্রতীকও থাকত।

এই খেলার সুনির্দিষ্ট আবিষ্কারক কে, কিংবা ঠিক কোন বছরে এর সূচনা হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। জনপ্রিয় কিছু বিবরণে ত্রয়োদশ শতকের সাধক জ্ঞানদেবের নাম উল্লেখ করা হয়, আবার গবেষণায় জৈন ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক ঐতিহ্যের সঙ্গেও এর সম্পর্ক আলোচিত হয়েছে। তাই একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিশ্চিতভাবে আবিষ্কারক বলা ইতিহাসের দিক থেকে সতর্কতার দাবি রাখে। তথ্যসূত্র: Scroll.in, MAP Academy

কীভাবে খেলা হতো?

পরমপদ সোপানমের নিয়ম বোর্ডের ধরন ও স্থানীয় রীতির ওপর নির্ভর করে কিছুটা বদলাতে পারে। তবে সাপ-সিঁড়ির পরিচিত রূপের সঙ্গে এর মূল খেলার পদ্ধতির মিল রয়েছে।

১. বোর্ড সাজানো

খেলার জন্য প্রয়োজন একটি ছককাটা বোর্ড, খেলোয়াড়দের আলাদা গুটি এবং চাল নির্ধারণের জন্য পাশা বা ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহৃত অন্য কোনো উপকরণ। প্রত্যেক খেলোয়াড় একটি গুটি নিয়ে নির্দিষ্ট শুরুর ঘর থেকে যাত্রা শুরু করেন।

২. পালা করে চাল দেওয়া

খেলোয়াড়েরা পালা করে পাশা ফেলেন এবং প্রাপ্ত সংখ্যার ভিত্তিতে নিজের গুটি এগিয়ে নিয়ে যান। কারও গুটি কোন ঘরে পৌঁছবে, তা পাশার ফলের ওপর নির্ভর করে। এ কারণেই খেলায় পরিকল্পনার পাশাপাশি ভাগ্যেরও ভূমিকা থাকে।

৩. সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠা

গুটি যদি সিঁড়ির নিচের প্রান্তে এসে পৌঁছায়, তবে নিয়ম অনুযায়ী সেটিকে সিঁড়ি বেয়ে উপরের ঘরে নিয়ে যাওয়া যায়। ঐতিহ্যবাহী বোর্ডে সিঁড়ি অনেক সময় ভালো কাজ, জ্ঞান, বিশ্বাস, উদারতা বা আত্মসংযমের মতো গুণের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

৪. সাপের মুখে পড়লে নিচে নামা

গুটি সাপের মুখে পড়লে খেলোয়াড়কে সাপের লেজের ঘরে নেমে যেতে হয়। এই ঘটনাটি শুধু খেলায় পিছিয়ে পড়া নয়, ঐতিহ্যবাহী ব্যাখ্যায় ভুল কাজের কারণে উন্নতির পথে বাধা সৃষ্টি হওয়ার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়েছে।

৫. শেষ ঘরে পৌঁছনো

বোর্ডের শেষ ঘরে পৌঁছনোই খেলোয়াড়ের লক্ষ্য। তবে ঠিক কত নম্বর ঘরে পৌঁছতে হবে, অতিরিক্ত সংখ্যা পড়লে কী হবে, কিংবা সাপ ও সিঁড়ির কোন নিয়ম প্রযোজ্য হবে—এসব নির্দিষ্ট বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী ঠিক করতে হয়।

সাপ ও সিঁড়ির প্রতীকী তাৎপর্য

পরমপদ সোপানমের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর প্রতীকী ব্যাখ্যা। আধুনিক সাপ-সিঁড়ি খেলায় আমরা সাধারণত শুধু জেতা ও হারার কথা ভাবি। কিন্তু ঐতিহ্যবাহী কয়েকটি সংস্করণে সাপ ও সিঁড়িকে মানুষের চরিত্র এবং কাজের ফলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

সিঁড়ি—উন্নতি ও সৎকর্মের প্রতীক: ভালো আচরণ, জ্ঞান, সততা, দয়া ও আত্মসংযম মানুষের জীবনে উন্নতির পথ খুলে দিতে পারে—সিঁড়ির ধারণাটি এই বার্তাকে তুলে ধরে।

সাপ—ভুল সিদ্ধান্ত ও বাধার প্রতীক: অহংকার, লোভ, মিথ্যা কিংবা অন্যায় আচরণ মানুষের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সাপের মাধ্যমে এই ধরনের বিপত্তির প্রতীকী প্রকাশ ঘটানো হয়েছে কিছু ঐতিহ্যবাহী বোর্ডে।

অবশ্য সব বোর্ডে একই গুণ বা দোষের নাম, একই ঘর কিংবা একই প্রতীক ব্যবহার করা হয়নি। বিভিন্ন অঞ্চলের সংস্করণে ভিন্নতা রয়েছে। এই বৈচিত্র্যই খেলাটিকে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

শুধু বিনোদন নয়, শিক্ষার মাধ্যম

পুরোনো দিনের অনেক বোর্ড গেমের মতো পরমপদ সোপানমও আনন্দের পাশাপাশি শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের কাছে ভালো আচরণ, ধৈর্য এবং কাজের পরিণতি বোঝানোর জন্য খেলার সহজ ভাষা কার্যকর হতে পারে।

খেলার সময় একজন শিশু কখনও দ্রুত এগিয়ে যায়, আবার কখনও হঠাৎ অনেকটা পিছিয়ে পড়ে। এতে সে বুঝতে পারে, সব সময় নিজের ইচ্ছামতো ফল পাওয়া যায় না। জয়ের আনন্দ যেমন আছে, তেমনই পরাজয় মেনে নেওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে।

তবে খেলাটির ঐতিহ্যবাহী নৈতিক ব্যাখ্যাকে বাস্তব জীবনের সব ঘটনার সরল নিয়ম হিসেবে দেখা উচিত নয়। জীবনে সাফল্য বা ব্যর্থতা শুধু ভালো-মন্দ আচরণের ওপর নির্ভর করে না; পরিবেশ, সুযোগ, পরিশ্রম এবং অনেক অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতিও মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে। খেলাটির মূল্য হলো নৈতিক ভাবনাকে সহজ ও স্মরণীয়ভাবে উপস্থাপন করা।

আধুনিক সাপ-সিঁড়ির সঙ্গে সম্পর্ক

আজকের পরিচিত সাপ-সিঁড়ি খেলা অনেক সরল ও বিনোদনকেন্দ্রিক। সাধারণত একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার ঘর থাকে এবং সাপ ও সিঁড়ির মাধ্যমে গুটির অবস্থান বদলে যায়। পুরোনো ভারতীয় সংস্করণগুলির কিছুতে বোর্ডে আরও বিস্তারিত চিত্র, ধর্মীয় ধারণা এবং নৈতিক ব্যাখ্যা থাকত।

এই ঐতিহ্যবাহী খেলার বিভিন্ন রূপ ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে বৃহত্তর বিশ্বে পরিচিত হওয়ার পর সময়ের সঙ্গে নিয়ম ও উপস্থাপনায় পরিবর্তন এসেছে। আধুনিক সাপ-সিঁড়ির সঙ্গে ঐতিহাসিক বোর্ডগুলির সম্পর্ক থাকলেও সব সংস্করণকে একেবারে অভিন্ন বলা যায় না। তথ্যসূত্র: Sahapedia, Scroll.in

শিশুদের মানসিক বিকাশে কী ভূমিকা থাকতে পারে?

সঠিক পরিবেশে এবং আনন্দের সঙ্গে খেললে পরমপদ সোপানমের মতো বোর্ড গেম শিশুদের কয়েকটি দক্ষতা অনুশীলনের সুযোগ দিতে পারে।

সংখ্যা চেনা ও গণনা: পাশার সংখ্যা দেখে গুটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে শিশুরা গণনার অনুশীলন করতে পারে।

পালা মেনে চলা: অন্য খেলোয়াড়ের চালের জন্য অপেক্ষা করা এবং নিজের পালা এলে খেলা চালিয়ে যাওয়া ধৈর্য ও নিয়ম মানার অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে।

আবেগ নিয়ন্ত্রণ: সিঁড়ি পেয়ে আনন্দিত হওয়া কিংবা সাপের কারণে পিছিয়ে পড়ে হতাশ হওয়া—দুই পরিস্থিতিতেই নিজের আবেগ সামলানোর সুযোগ তৈরি হয়।

পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো: বড় ও ছোটরা একসঙ্গে খেললে পারিবারিক যোগাযোগ বাড়ে। প্রবীণরা খেলার ইতিহাস ও নিজেদের শৈশবের অভিজ্ঞতাও শিশুদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন।

এসব সম্ভাব্য উপকারিতা খেলার অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে; শুধু একটি বোর্ড গেম খেললেই সব দক্ষতা নিশ্চিতভাবে তৈরি হবে, এমন দাবি করা যায় না।

কীভাবে নতুন প্রজন্মের কাছে ফিরিয়ে আনা যায়?

পরমপদ সোপানমের মতো ঐতিহ্যবাহী খেলাকে পরিচিত করার জন্য খুব বড় আয়োজনের প্রয়োজন নেই। স্কুল, গ্রন্থাগার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা বাড়িতে ছোট পরিসরেই এর চর্চা করা সম্ভব।

প্রথমত, পুরোনো বোর্ডের ছবি ও ইতিহাস সংগ্রহ করে শিশুদের দেখানো যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় ভাষায় নিয়ম লেখা বোর্ড তৈরি করা যেতে পারে, যাতে শিশুরা সহজে বুঝতে পারে। তৃতীয়ত, খেলাটির সঙ্গে যুক্ত ঐতিহাসিক তথ্য ও নৈতিক প্রতীক সম্পর্কে আলোচনা করা যেতে পারে।

শিক্ষকেরা চাইলে শ্রেণিকক্ষে সংখ্যাগণনা, গল্প লেখা বা ইতিহাসের পাঠের সঙ্গে খেলাটিকে যুক্ত করতে পারেন। তবে ঐতিহ্যবাহী সংস্করণে কোন নিয়ম প্রচলিত ছিল, তা বোঝাতে হলে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও বোর্ডের উৎস উল্লেখ করা জরুরি।

উপসংহার

পরমপদ সোপানম প্রমাণ করে যে একটি সাধারণ বোর্ড গেমের মধ্যেও ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জীবন সম্পর্কে চিন্তার উপাদান লুকিয়ে থাকতে পারে। আধুনিক সাপ-সিঁড়ি খেলায় আমরা যেমন আনন্দ পাই, তেমনই এর ঐতিহ্যবাহী পূর্বসূরিদের মধ্যে মানুষের আচরণ, সৎকর্ম, ভুল সিদ্ধান্ত এবং জীবনের অনিশ্চয়তা নিয়ে ভাবনার সুযোগ রয়েছে।

আজকের ডিজিটাল বিনোদনের যুগে এই ধরনের পুরোনো খেলাকে নতুন করে পরিচিত করা মানে শুধু অতীতকে স্মরণ করা নয়; পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, শিশুদের খেলাধুলার বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং ভারতীয় বোর্ড গেমের ইতিহাসকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াও। একটি ছোট বোর্ড, কয়েকটি গুটি আর কিছু সিঁড়ি-সাপের মধ্য দিয়েও যে এত সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক গল্প বলা সম্ভব, পরমপদ সোপানম তারই এক সুন্দর উদাহরণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *