যে রাঁধুনি খাবারের স্বাদ বদলে দিয়েছিলেন।

কলকাতার একটি ব্যস্ত হাসপাতালের রান্নাঘরে কাজ করতেন শিবানী পাল। প্রতিদিন ভোর চারটের সময় তাঁর ঘুম ভাঙত। তারপর বাস ধরে হাসপাতালে পৌঁছে শুরু করতেন রান্নার কাজ। কখনও কয়েকশো মানুষের জন্য ভাত, ডাল ও তরকারি, কখনও রোগীদের জন্য বিশেষ খাবার—সবই সামলাতে হতো তাঁকে।

শিবানীর রান্নার হাত ছিল ভালো। কিন্তু হাসপাতালের রান্নাঘরে স্বাদের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেত নির্দিষ্ট পরিমাণ, সময় এবং খাদ্যতালিকা। ফলে তাঁর রান্না যত্ন করে তৈরি হলেও অনেক রোগী খাবার প্রায় ছুঁয়েই দেখতেন না।

কেউ বলতেন, “এত বিস্বাদ খাবার খেতে পারব না।”

কেউ আবার খাবারের ট্রে সরিয়ে রেখে দিতেন। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ভর্তি থাকা রোগীদের মধ্যে এই অনীহা বেশি দেখা যেত।

একদিন দুপুরে শিবানী একটি খাবারের ট্রে নিয়ে শিশু বিভাগে গেলেন। সেখানে আট বছরের অয়ন কয়েক দিন ধরে ভর্তি ছিল। তার মা জানালেন, অয়ন কিছুতেই দুপুরের খাবার খেতে চাইছে না।

শিবানী কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী রে, খাবার ভালো লাগছে না?”

অয়ন মুখ ঘুরিয়ে বলল, “বাড়িতে মা যে ডাল রান্না করে, তার গন্ধ অন্য রকম। এখানে সব খাবারের গন্ধ এক।”

কথাটা শুনে শিবানী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তিনি বুঝলেন, শিশুটি শুধু খাবারের স্বাদ নিয়ে অভিযোগ করছে না। হাসপাতালের অপরিচিত পরিবেশে সে বাড়ির পরিচিত গন্ধ আর স্বাদটুকু খুঁজছে।

সেদিন রান্নাঘরে ফিরে শিবানী নিজের মতো করে ভাবতে শুরু করলেন। হাসপাতালের খাবার তো ইচ্ছেমতো রান্না করা যায় না। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী লবণ, তেল, চিনি কিংবা অন্য উপাদানের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। কিন্তু নির্দিষ্ট খাদ্যতালিকার মধ্যেও কি খাবারকে একটু বেশি গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায় না?

তিনি হাসপাতালের পুষ্টিবিদ নন্দিতার সঙ্গে কথা বললেন। নন্দিতা জানালেন, রোগীদের খাবারের স্বাদ ও গন্ধ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তবে প্রত্যেকের শারীরিক অবস্থা আলাদা। কারও খাবারে লবণ কমাতে হয়, কারও চিনি, আবার কারও বিশেষ উপাদান এড়িয়ে চলতে হয়। তাই চিকিৎসকের নির্দেশ এবং নির্ধারিত খাদ্যতালিকা মেনে চলা অপরিহার্য।

শিবানী প্রস্তাব দিলেন, রান্নার পদ্ধতি ও পরিবেশনে ছোট কিছু পরিবর্তন পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। যেমন, অনুমোদিত খাবারে তাজা ধনেপাতার গন্ধ, উপযুক্ত মশলার হালকা ব্যবহার কিংবা খাবারের উপকরণ আলাদা করে পরিবেশন করা।

নন্দিতা সম্মতি দিলেন, তবে শর্ত রাখলেন—প্রতিটি পরিবর্তন আগে পুষ্টিবিদ ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের অনুমোদন পাবে।

এরপর শুরু হলো ছোট্ট পরীক্ষা।

প্রথমে শিশু বিভাগের কয়েকজন রোগীর জন্য অনুমোদিত খাদ্যতালিকা অনুযায়ী খাবার তৈরি করা হলো। কারও জন্য সবজি দিয়ে নরম খিচুড়ি, কারও জন্য উপযুক্ত ডাল, আবার কারও জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে তৈরি করা ভাত ও তরকারি। একই খাবারের ক্ষেত্রে রান্নার পরিচ্ছন্নতা, সঠিক তাপমাত্রা এবং নির্ধারিত উপাদানের পরিমাণ বজায় রাখা হলো।

খাবার পরিবেশনের ধরনেও কিছু পরিবর্তন এল। যেখানে সম্ভব, খাবার আলাদা বাটিতে দেওয়া হলো। শিশুদের জন্য ব্যবহার করা হলো রঙিন কিন্তু নিরাপদ প্লেট। খাবারের সঙ্গে ছোট একটি কার্ডে লেখা থাকত, আজকের খাবারে কী কী উপাদান রয়েছে।

প্রথম কয়েক দিন তেমন পরিবর্তন দেখা গেল না। কেউ আগের মতোই খাবার ফিরিয়ে দিল। আবার কেউ সামান্য বেশি খেল।

শিবানী হতাশ হলেন না। তিনি নার্সদের সঙ্গে কথা বলে জানলেন, কোন ধরনের খাবার রোগীরা সহজে খেতে পারছেন, আর কোথায় অসুবিধা হচ্ছে। তবে তিনি নিজে থেকে কোনও রোগীর খাদ্যতালিকা বদলাতেন না। প্রয়োজন হলে বিষয়টি পুষ্টিবিদের কাছে জানাতেন।

এক সপ্তাহ পরে অয়নের মা এসে বললেন, “আজ ও নিজের হাতে পুরো বাটিটা শেষ করেছে।”

শিবানী খুশি হলেন। কিন্তু তিনি জানতেন, শুধু একটি শিশুর অভিজ্ঞতা দিয়ে সব রোগীর ক্ষেত্রে একই ফল হবে বলা যায় না।

ধীরে ধীরে হাসপাতালের রান্নাঘরে একটি নতুন নিয়ম চালু হলো। রান্নার কর্মীরা সপ্তাহে একদিন পুষ্টিবিদের সঙ্গে বসে রোগীদের খাবার নিয়ে আলোচনা করতেন। কোন খাবার বেশি নষ্ট হচ্ছে, কোন পরিবেশন-পদ্ধতি সুবিধাজনক এবং কীভাবে পুষ্টিগুণ বজায় রেখে খাবার গ্রহণযোগ্য করা যায়—এসব বিষয় নথিভুক্ত করা হতো।

কয়েক মাস পরে হাসপাতালের প্রশাসন লক্ষ্য করল, কিছু বিভাগে খাবার নষ্ট হওয়ার পরিমাণ কমেছে। রোগীদের মতামতও আগের তুলনায় ইতিবাচক হয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করে জানালেন, খাবার খাওয়ার পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি পুষ্টিমান, চিকিৎসার প্রয়োজন এবং রোগীর নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে।

একদিন হাসপাতালের কর্মীদের সভায় শিবানীকে তাঁর উদ্যোগের জন্য সম্মান জানানো হলো।

তিনি মঞ্চে উঠে বললেন, “আমি নতুন কোনও ওষুধ আবিষ্কার করিনি। শুধু বুঝতে চেয়েছি, যে মানুষটি অসুস্থ অবস্থায় খাবারের সামনে বসছেন, তাঁর কাছে সেই খাবারটুকু কেমন লাগছে।”

সভা শেষে নন্দিতা বললেন, “আপনি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, চিকিৎসার সঙ্গে যত্নও জরুরি। তবে সেই যত্নকে সঠিক জ্ঞানের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হয়।”

শিবানী মাথা নাড়লেন।

পরদিন ভোরেও তিনি যথারীতি রান্নাঘরে এলেন। বড় হাঁড়িতে ভাত ফুটছিল, ডালের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছিল চারদিকে। কাজ একই ছিল, দায়িত্বও একই। কিন্তু এখন তিনি জানতেন, একটি খাবারের ট্রে শুধু পেট ভরানোর ব্যবস্থা নয়। সঠিকভাবে তৈরি ও পরিবেশন করা সেই খাবার অসুস্থ মানুষের দিনটাকে একটু সহজ করে দিতে পারে।

শিক্ষা: মানুষের প্রয়োজন বুঝে যত্ন নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভালো উদ্দেশ্যের সঙ্গে জ্ঞান, নিয়ম এবং দায়িত্বশীলতার সমন্বয় ঘটলেই সেই যত্ন সত্যিকার অর্থে উপকারী হয়ে ওঠে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *