শীতকালে কিডনির সুস্থতা বজায় রাখার উপায়: জল পান, খাদ্যাভ্যাস ও দৈনন্দিন যত্ন।।

শীতকাল এলেই অনেকের জল খাওয়ার পরিমাণ কমে যায়। গরমকালের মতো তৃষ্ণা অনুভূত না হওয়ায় অনেকে বুঝতেই পারেন না যে তাঁরা প্রয়োজনের তুলনায় কম জল পান করছেন। অথচ শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে কিডনি বা বৃক্কের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিডনি রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ছেঁকে বের করতে, শরীরের জল ও লবণের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করতে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শীতকালে কম জল পান করা, অতিরিক্ত নোনতা খাবার খাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কিছু ওষুধ গ্রহণের মতো অভ্যাস কিডনির স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের আগে থেকেই কিডনির সমস্যা, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, তাঁদের বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

তবে মনে রাখতে হবে, শীতকাল এলেই কিডনি খারাপ হয়ে যায় এমন নয়। সঠিক জীবনযাপন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষার মাধ্যমে কিডনির সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করা যায়।

১. শীতকালে পর্যাপ্ত জল পান করুন

কিডনির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল শরীরের বর্জ্য পদার্থ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেওয়া। শরীরে জলের ঘাটতি হলে প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যেতে পারে এবং কিছু মানুষের ক্ষেত্রে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

শীতকালে তৃষ্ণা কম পেলেও নিয়মিত জল পান করার অভ্যাস বজায় রাখুন। একবারে অনেকটা জল খাওয়ার পরিবর্তে সারাদিনে অল্প অল্প করে জল পান করতে পারেন। বাইরে কাজ করলে, হাঁটাহাঁটি করলে বা ঘাম হলে শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী তরল গ্রহণ করুন।

প্রস্রাবের রং গাঢ় হওয়া কখনও জল কম খাওয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে, যদিও ওষুধ ও কিছু খাবারেও প্রস্রাবের রং বদলাতে পারে।

তবে সবার জন্য একই পরিমাণ জল উপযুক্ত নয়। যাঁদের কিডনি বা হৃদ্‌যন্ত্রের গুরুতর সমস্যা রয়েছে কিংবা চিকিৎসক তরল গ্রহণে সীমা নির্ধারণ করেছেন, তাঁদের সেই নির্দেশ মেনেই জল পান করতে হবে। কিডনি সুস্থ রাখার জন্য জোর করে অতিরিক্ত জল পান করার প্রয়োজন নেই।

২. অতিরিক্ত নুন খাওয়ার অভ্যাস কমান

শীতকালে ভাজাভুজি, আচার, প্যাকেটজাত খাবার, চানাচুর, চিপস এবং নোনতা স্ন্যাকস খাওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। এসব খাবারে অনেক সময় অতিরিক্ত সোডিয়াম থাকে।

অতিরিক্ত নুন রক্তচাপ বাড়াতে পারে। দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ থাকলে কিডনির রক্তনালির ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। আবার কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে শরীর থেকে অতিরিক্ত নুন ও জল বের করতেও অসুবিধা হতে পারে।

তাই প্রতিদিনের খাবারে নুনের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করুন। রান্নায় অপ্রয়োজনীয় নুন যোগ করবেন না এবং খাবারের প্যাকেটে সোডিয়ামের পরিমাণ দেখে কেনার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

স্বাদের জন্য লেবু, আদা, ধনেপাতা এবং অন্যান্য উপযুক্ত মশলা ব্যবহার করতে পারেন। তবে কিডনির রোগ থাকলে পটাশিয়ামযুক্ত নুনের বিকল্প ব্যবহার করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

৩. সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখুন

কিডনির সুস্থতার জন্য কোনও একটি বিশেষ খাবারের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। বরং সুষম ও বৈচিত্র্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিদিনের খাবারে উপযুক্ত পরিমাণে শাকসবজি, ফল, ডাল, গোটা শস্য এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ডিম, মাছ বা অন্যান্য প্রোটিনের উৎস রাখতে পারেন। অতিরিক্ত চিনি, নুন এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া ভালো।

অতিরিক্ত প্রোটিনযুক্ত খাবার বা প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট নিজের ইচ্ছায় গ্রহণ করবেন না। বিশেষ করে কিডনির রোগ থাকলে প্রোটিনের পরিমাণ ব্যক্তির রোগের পর্যায়, পুষ্টির অবস্থা এবং চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে।

একইভাবে কিডনির সমস্যা রয়েছে বলে চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া ফল, শাকসবজি বা ডাল একেবারে বন্ধ করে দেওয়াও ঠিক নয়। কিছু কিডনি রোগীর ক্ষেত্রে পটাশিয়াম বা ফসফরাস নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু তা পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।

৪. ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন

ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ দীর্ঘমেয়াদে কিডনির ক্ষতির গুরুত্বপূর্ণ কারণ। অনেক সময় কিডনির কার্যক্ষমতা কমতে শুরু করলেও প্রথম দিকে কোনও স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না।

তাই যাঁদের ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, তাঁদের নিয়মিত রক্তে শর্করা ও রক্তচাপ পরীক্ষা করা জরুরি। চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ নিয়মিত গ্রহণ করুন এবং নিজে থেকে ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন করবেন না।

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তের ক্রিয়েটিনিন ও ইজিএফআর (eGFR), প্রস্রাবে অ্যালবুমিন বা প্রোটিনের পরীক্ষা করা হতে পারে। এই পরীক্ষাগুলি কিডনির কার্যক্ষমতা এবং ক্ষতির প্রাথমিক লক্ষণ বুঝতে সাহায্য করে।

৫. ব্যথার ওষুধ ব্যবহারে সতর্ক থাকুন

শীতকালে শরীর ব্যথা, গাঁটে ব্যথা বা মাথাব্যথার জন্য অনেকে বারবার ব্যথানাশক ওষুধ খান। কিন্তু কিছু ব্যথানাশক ওষুধ, বিশেষ করে আইবুপ্রোফেন ও ন্যাপ্রোক্সেনের মতো এনএসএআইডি শ্রেণির ওষুধ, কিছু পরিস্থিতিতে কিডনির ক্ষতি করতে পারে।

শরীরে জলের ঘাটতি থাকলে, আগে থেকেই কিডনির রোগ থাকলে কিংবা নির্দিষ্ট কিছু রক্তচাপের ওষুধ গ্রহণ করলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ব্যথানাশক ওষুধ ব্যবহার করবেন না। সর্দি-কাশির মিশ্র ওষুধেও একাধিক উপাদান থাকতে পারে, তাই ওষুধ কেনার আগে তার উপাদান সম্পর্কে জেনে নিন।

কোনও ভেষজ ওষুধ বা তথাকথিত কিডনি পরিষ্কার করার পণ্যও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার করা উচিত নয়।

৬. প্রস্রাবের পরিবর্তন উপেক্ষা করবেন না

প্রস্রাবের অভ্যাস বা চেহারায় পরিবর্তন কখনও শরীরের সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে। যেমন—

  • প্রস্রাবের পরিমাণ হঠাৎ অনেক কমে যাওয়া।
  • প্রস্রাবে বারবার রক্ত দেখা।
  • প্রস্রাবে অতিরিক্ত ফেনা হওয়া এবং তা নিয়মিত বজায় থাকা।
  • প্রস্রাবের সময় জ্বালা বা ব্যথা।
  • চোখের চারপাশে, পা বা গোড়ালিতে অস্বাভাবিক ফোলা।

তবে এসব লক্ষণের প্রত্যেকটিরই একাধিক কারণ থাকতে পারে। যেমন, প্রস্রাবে ফেনা হলেই কিডনির রোগ হয়েছে এমন নয়। আবার কিডনির দীর্ঘমেয়াদি রোগে অনেক সময় কোনও লক্ষণই থাকে না।

তাই সমস্যা বারবার দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। প্রস্রাব একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়া বা খুব কমে যাওয়ার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, তীব্র দুর্বলতা কিংবা দ্রুত ফোলা বাড়লে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।

৭. শীতকালেও নিয়মিত শরীরচর্চা করুন

শীতকালে ঠান্ডার কারণে অনেকেই ঘরে বসে থাকেন। কিন্তু নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ রক্তচাপ, রক্তে শর্করা এবং শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। এগুলি কিডনির স্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

সক্ষমতা অনুযায়ী প্রতিদিন হাঁটা, হালকা ব্যায়াম বা ঘরের মধ্যে সক্রিয় থাকার অভ্যাস গড়ে তুলুন। দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় বসে থাকলে মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটুন।

বাইরে হাঁটতে গেলে উপযুক্ত পোশাক ও জুতো ব্যবহার করুন। যাঁদের হৃদ্‌রোগ, কিডনির গুরুতর সমস্যা বা অন্য শারীরিক অসুবিধা রয়েছে, তাঁরা ব্যায়ামের ধরন ও পরিমাণ সম্পর্কে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

৮. শরীরের ওজন ও ধূমপানের দিকে নজর দিন

অতিরিক্ত ওজন ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, যা পরোক্ষভাবে কিডনির স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখতে সুষম খাবার ও নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ।

ধূমপান রক্তনালির ক্ষতি করতে পারে এবং কিডনির রোগের অগ্রগতির ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। ধূমপান ছাড়ার চেষ্টা করুন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের সাহায্য নিন।

পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।

৯. কিডনির রোগ থাকলে শীতকালে বিশেষ সতর্কতা

যাঁদের দীর্ঘমেয়াদি কিডনির রোগ রয়েছে, তাঁদের জন্য সবার উপযোগী একই ধরনের খাদ্যতালিকা বা জল পানের নিয়ম প্রযোজ্য নয়। রোগের পর্যায়, রক্তের পরীক্ষার ফল, প্রস্রাবের পরিমাণ এবং অন্য শারীরিক সমস্যার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসক খাদ্য ও তরল গ্রহণের নির্দেশ দেন।

এ ধরনের রোগীদের নিজের ইচ্ছায় বেশি জল পান করা, প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট নেওয়া বা নুনের বিকল্প ব্যবহার করা উচিত নয়। নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে যান এবং নির্ধারিত পরীক্ষা করান।

জ্বর, বমি বা ডায়রিয়া হলে শরীরে জলের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কিডনির রোগীদের চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওষুধ ও তরল গ্রহণের বিষয়ে পরামর্শ নেওয়া ভালো।

উপসংহার

শীতকালে কিডনির সুস্থতা বজায় রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, পর্যাপ্ত কিন্তু উপযুক্ত পরিমাণে জল পান, নুন নিয়ন্ত্রণ, সুষম খাদ্য এবং ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের সঠিক ব্যবস্থাপনা।

অপ্রয়োজনীয় ব্যথানাশক ওষুধ এড়িয়ে চলুন এবং প্রস্রাবের অস্বাভাবিক পরিবর্তন বা শরীরে অস্বাভাবিক ফোলা দেখা দিলে অবহেলা করবেন না। বিশেষ করে যাঁদের আগে থেকেই কিডনির সমস্যা রয়েছে, তাঁদের চিকিৎসকের নির্দেশ মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।

মনে রাখবেন, কিডনির রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনও লক্ষণ থাকে না। তাই ঝুঁকি থাকলে নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা করানোই সুস্থ থাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *