ব্রহ্মচারী থেকে বিপ্লবী, ভগিনী নিবেদিতা : সৌরভকুমার ভূঞ্যা।

0
490

“মরণ সাগর পারে তোমরা অমর, তোমাদের স্মরি
নিখিলে রচিয়া গেলে আপনারি ঘর, তোমাদের স্মরি।”

মরণশীল এই পৃথিবীতে চরম সত্য হল মৃত্যু। মৃত্যু মানে জীবনের যবনিকা, অস্তিত্বের অবলুপ্তি। কিছুদিন স্মৃতির পাতায়। ক্রমে সে স্মৃতিও হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অন্ধকারে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটে। আপন কীর্তিতে কিছু কিছু মানুষ এই মরণশীল জগতেও অমরত্বের জয়গান গেয়ে যান। মৃত্যু কখনওই তাদরে পরাজিত করেত পারে না। উল্টে মৃত্যুকে জয় করে মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে তাঁরা স্মরণীয় হয়ে থাকেন ইতিহাসের উজ্জ্বল পাতায়। ভারতবর্ষের নারী জাগরণের পথিকৃৎ তথা দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম বীর সেনানী ভগিনী নিবেদিতা সেই মৃত্যুঞ্জয়ীদের একজন।
ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলেনর ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা দেখতে পাই আসংখ্য ভারতমাতার বীর সন্তানের কথা। তবে এমন কিছু কিছু মানুষ ছিলেন যাঁরা এই দেশের সন্তান না হয়েও এই দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজেদের নিয়োজিত করেছিলেন। সেই সব মহান ব্যক্তিত্বদের মধ্যে অন্যতম হলেন ভগিনী নিবেদিতা, যিনি নিজের দেশ ছেড়ে শুধু এই দেশের জন্য কাজ করেননি, এই দেশের নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন। পাশাপাশি তিনিই সম্ভবত প্রথম খ্রিস্টান মহিলা যিনি হিন্দু ধর্ম গ্রহন করেছিলেন। ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দের ২৮ অক্টোবর আয়ারল্যান্ডের টাইরন প্রদেশের ডনগ্যানন শহরের এক বিপ্লবী পরিবারে মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল ওরফে ভগিনী নিবেদিতার জন্ম। ছোটোবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অন্য ধরনের। মানুষের কাজ করার জন্য তিনি মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন। তাঁর মধ্যেকার সম্ভাবনার কথা বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর বাবা স্যামুয়েল রিচমন্ড। মৃত্যর ঠিক আগে তিনি স্ত্রীকে ডেকে বলেছিলেন, “When the call come from Heaven, let Margaret go. The little one will reveal her talents and do great things.”
পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি শিশুদের শিক্ষাদানের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। বেশ কয়েক বছর এই পেশায় থাকেন তিনি। কিন্তু এই কাজে তিনি একসময় আনন্দ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। আসলে তাঁর মন সবসময় চাইত বড়ো কিছু কাজ করার জন্য। ঈশ্বর যেন তাঁর প্রার্থনা শুনতে পান। ঠিক এমন সময়, ১৮৯৫-এর নভেম্বরে লন্ডনে তাঁর সাক্ষাৎ হয় স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে। স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ তার জীবনধারাকে সম্পূর্নরূপে বদলে দেয়। স্বামীজীকে তিনি গুরু বলে মেনে নেন। স্বামীজীর মুখে ভারতবর্ষের মহিলাদের দুর্দশার কথা শুনে তিনি স্থির করেন ভারতে এসে কাজ করবেন। আসলে ভারতবর্ষ যে তাঁর কর্মভূমি হবে সেরকম ইঙ্গিত তিনি ছোটোবেলায় পেয়েছিলেন। একবার তাঁর বাবার এক যাজক বন্ধু ভারত থেকে ফিরে তাঁর বাড়িতে এসেছিলেন। ছোট্ট মার্গারেটকে দেখে তিনি বুঝতে পারেন এই মেয়ে বড়ো কাজের জন্য এই পৃথিবীতে এসেছে। বিদায় নেওয়ার সময় তিনি তাঁকে বলেন, “India, my little one, is seeking her destiny. She called me once and will perhaps call you too, someday. Always be ready for her call”। ভারতবর্ষে কাজ করার একটা সুপ্ত বাসনা সেদিন থেকেই বোধহয় তাঁর মনের মধ্যে তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বিবেকানন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ তাঁর সেই সুপ্ত বাসনায় যেন অগ্নিসংযোগ ঘটায়। তিনি ব্যাকুল হয়ে পড়েন ভারতবর্ষে আসার জন্য।
এদিকে বিবেকানন্দেরও মার্গারেটকে চিনতে ভুল হয়নি। তিনি বুঝেছিলেন মার্গারেটের মধ্যে যে শক্তি রয়েছে তাকে কাজে লাগিয়ে ভারতবর্ষের নারী প্রগতি সম্ভব। প্রাথমিক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাটিয়ে তিনি মার্গারেটকে আহ্বান জানালেন ভারতে। বহু প্রতীক্ষিত সেই ডাক পেয়ে নিজের সবকিছু ছেড়ে ১৮৯৮-এর ২৮ জানুয়ারি তিনি কলকাতায় এলেন। ওই বছরের ২৫ মার্চ বিবেকানন্দ তাঁকে ব্রহ্মচর্যে দীক্ষিত করলেন এবং তাঁ নাম দিলেন নিবেদিতা। এ-প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, বিবেকানন্দ নিবেদিতাকে সন্ন্যাসীনীর দীক্ষা দেননি। হয়তো তিনি বুঝতে পেরেছিলেন নিবেদিতার মধ্যে যে আগুন রয়েছে তাতে তাঁকে সন্ন্যাসীনীর মধ্যে আটকে রাখা সম্ভব নয়। তাই কেবল ব্রহ্মচর্যে দীক্ষিত করেছিলেন তাঁকে। যাই হোক, দীক্ষালাভের পর মহিলাদের শিক্ষাদানের জনো নিবেদিতা ১৮৯৮-এর ১৩ নভেম্বর কলকাতার ১৭ নং বোসপাড়া লেনে স্থাপন করেন ‘নিবেদিতা বালিকা বিদ্যালয়’। শিক্ষাদানের পাশাপাশি তিনি নানান সমাজসেবামূলক কাজেও জড়িয়ে পড়েন।
১৯০২ খ্রিস্টাব্দে স্বামীজীর মৃত্যুর পর নিবেদিতা পুরোপুরি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। এর আগেও ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে তিনি জড়িয়ে ছিলেন তবে খুব বেশি সক্রিয় ছিলেন না। এদিকে স্বাধীনতা আন্দোলেন সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়ার কারণে, রাজনীতির অজুহাত দিয়ে রামকৃষ্ণ মিশন তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। কোনো মতে, তাঁর জন্য যাতে রামকৃষ্ণ মিশনের গায়ে কোনো আঁচড় না লাগে তাই তিনি নিজে থেকে সেখান থেকে সরে এসিছিলেন।
নিবেদিতা ভারতবর্ষকেই মনে করতেন তাঁর নিজের দেশ। তিনি বুঝেছিলেন পরাধীনতা থেকে মুক্ত না হলে ভারতবর্ষের উন্নতি সম্ভব নয়। তাই স্বামীজির মৃত্যুর পর তিনি আধ্যাত্মিক ধারনা ছেড়ে বেরিয়ে এলেন বিদ্রোহিনী রূপে, ব্রহ্মচারী থেকে হয়ে উঠলেন বিপ্লবী। নিজেকে তিনি স্বামীজীর ‘মানস কন্যা’ বলে ভাবতেন। স্বামীজির আদর্শ ছিল তাঁর আদর্শ। নিবেদিতা বুঝেছিলেন স্বদেশপ্রেমী ও মানবপ্রেমী এই মানুষটি, যিনি তাঁর গুরুদেব, তিনি সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী নন। তাঁর গৈরিক বসনের অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে এক বিপ্লবী সত্ত্বা যার লক্ষ্য ছিল কর্মযোগ আর অখণ্ড ভারত। গুরুর সেই কাজে নিজেকে পুরোপুরি নিয়োজিত করলেন নিবেদিতা এবং নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন সেইভাবে। তাছাড়া তাঁর রক্তে ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজ। ছোটোবেলা থেকে তিনি বড়ো হয়ে উঠেছেন বিপ্লবী পরিমণ্ডলের মধ্যে। তাঁর দুই দাদু, বাবার বাবা, রেভারেন্ড নোবেল এবং মায়ের বাবা, হ্যামিলটন আইরিশ স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরাধীন ভারতবর্ষের দূর্দশা দেখার পর তাঁর মধ্যেকার সেই বিপ্লবী সত্ত্বা জাগরিত হয়ে ওঠে। ব্রহ্মচারী থেকে তিনি হয়ে উঠলেন বিপ্লবী।
ভারতবর্ষ ছিল তাঁর দেশ। ভারতের স্বাধীনতা ছিল তাঁর স্বপ্ন, ভারতবাসীর হিতসাধন ছিল তাঁর সাধনা। ‘ভারত আবার জগত সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে’ এই তিনি চাইতেন মনেপ্রাণে। ভারতবর্ষে যাদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল তাদের মধ্যে একজন ছিলেন বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বোস। তিনি দেখলেন পরাধীন ভারতে বিজ্ঞান সাধনায় আনেক বাধা। যে বাধার সম্মুক্ষীণ হতে হয় জগদীশচন্দ্রকেও। তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন নিবেদিতা। জগদীশচন্দ্রের বিজ্ঞান গবেষণাগার তৈরির জন্য মিসেস ওলিবুলকে ধরে টাকার ব্যবস্থা করে দেন। এছাড়াও তাঁর বিজ্ঞান সাধনায় তিনি তাঁকে আরও নানাভাবে সাহায্য করেছিলেন। জগদীশচন্দ্রের ওপর নিবেদিতার অবদানের প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, “In the day of his success, Jagadish gained an invaluable energizer and helper in Sister Nivedita and in any records of his life’s work her name must be given a place of honour.” ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে জগদীশচন্দ্র যখন বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তার দ্বারপ্রান্তে নিবেদিতার মূর্তি স্থাপন করেছিলেন। শুধু বিজ্ঞান নয়, ভারতের চিত্রকলার প্রসারেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, আনন্দকুমারস্বামী প্রমুখ চিত্রশিল্পীদের তিনি অনুপ্রাণিত করেছিলেন ভারতবর্ষের চিত্রকলার ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
তিনি তাঁর স্কুলের মেয়েদের বলতেন—‘‘ভারতের কন্যাগন, তোমরা সকলে জপ করবে, ‘ভারতবর্ষ আমার মা’।’’সেই মায়ের পরাধীনতার মুক্তির জন্য তিনি পুরোপুরি নিজেকে উত্সর্গ করেছিলেন। ১৯০২-এর অক্টোবরে তিনি বরোদায় অরবিন্দ ঘোষের সঙ্গে দেখা করেন। কেননা তিনি বুঝেছিলেন বাংলায় স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য তাঁর মতো মানুষের একান্ত প্রয়োজন। তাঁর সঙ্গে স্বাধীনতা আন্দোলেনর পন্থা ও পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি তাঁর কলকাতায় আসার প্রয়োজনীয়তা বোঝান। পরবর্তীকালে অরবিন্দ কলকাতায় এসে যখন পাঁচ সদস্যের বিপ্লবী কমিটি গঠন করেন, তার মধ্যে নিবেদিতা অন্যতম একজন সদস্যই শুধু ছিলেন না, ছিলেন এই কমিটির সম্পাদক।
তাঁর প্রতিষ্ঠিত বালিকা বিদ্যালয়টি ছিল জাতীয়তাবাদী প্রতিষ্ঠান। এই বিদ্যালয়ের তহবিল সংগ্রহের জন্য তিনি বিদেশে ঘুরেছেন কিন্তু ইংরেজদের সাহায্য নেননি। স্কুলের প্রার্থনায় তিনি বন্দেমাতরম গান চালু করেন। স্কুলে খাদির পোশাক প্রচলন করেন। এখানে তিনি চরকার ব্যবস্থা করেন। এই স্কুলে স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত মানুষরা আসতেন। এখানে নানান গুরুত্বপূর্ণ সভা, আলাপ-আলোচনা করতেন। শুধু স্কুল নয়, তাঁর বাড়িও ছিল বিপ্লবীদের মিলিত হওয়া ও আলাপ-আলোচনা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। তিনি তরুণ বিপ্লবীদের দেশের কাজে উৎসাহিত করতেন। তরুণ বিপ্লবীদের ওপর তাঁর প্রভাব ও অনুপ্রেরণার কথা বলতে গিয়ে ড. রাসবিহারী ঘোষ বলেছেন, “If the dry bones are beginning to stir, it is because Sister Nivedita breathed the breath of life into them”। তাঁর অনুপ্রেরণাদাত্রী রূপ ফুটে উঠেছে বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষের গলাতেও—“বাংলায় আমার রাজনৈতিক কর্মপ্রচেষ্টায় যিনি সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছেন এবং নানাভাবে উত্সাহ এবং প্রেরণা দিয়েছেন, তিনি স্বামী বিবেকানন্দের সুযোগ্য শিষ্যা-মহিয়সী নিবেদিতা।”
তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের মুখপত্র ছিল The Statesman পত্রিকা। ১৯০২-০৭ পর্যন্ত এর সম্পাদক ছিলেন স্যামুয়েল কে. রাটক্লিফ। নিবেদিতার সংস্পর্শে আসার পর ভারত সম্পর্কে তাঁর ধারনা পুরোপুরি বদলে গিয়েছিল এবং তিনি ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষক হয়ে পড়েন। The Statesman-এর সম্পাদক হয়েও তিনি ভারতীয়দের সমর্থনে কলম ধরেন। ইংরেজ সরকার তার এই মনোভাবকে ভালো চোখে দেখেনি এবং একটা সময় তার পদ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। ভারতীয়দের প্রতি রাটক্লিফের ধারনা সম্পর্কে বলতে গিয়ে ১৯০৬-এর ১৪ জুন নিবেদিতা তাঁর বন্ধু জোসেফাইন ম্যাকলিওকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, “Ratclife is like an angel for India. As the Statesman editor he helped us a lot to ahieve our goal.” এই চিঠি আর একটি দিক পরিস্কারভাবে তুলে ধরে। ‘our goal’ কথাটির মধ্য দিয়ে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে ভারতবর্ষই তাঁর স্বদেশ, ভারতের লক্ষ্যই তাঁর লক্ষ্য।
তাঁর মধ্যেকার ভারতপ্রেম অনেক ভারতীয়কেও লজ্জা দেওয়ার মতো। একটি ঘটনা এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়। ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে দশেরার ঠিক আগের দিন নাগপুরে মরিস কলেজে একটি খেলার পুরস্কার বিতরণী সভায় আমন্ত্রিত হন তিনি। খেলাটি ক্রিকেট জেনে, পুরস্কার দেওয়ার পর তিনি মরিস কলেজের ছাত্রদের তিরস্কারও করেন বিদেশি খেলার প্রতি গর্ববোধ দেখে। এমনও বলেন, আগে জানলে তিনি অনুষ্ঠানে আসতেন না।
১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষের জাতীয় পতাকা তৈরি করেছিলেন নিবেদিতা। এই পতাকাটি ‘ভগিনী নিবেদিতার পতাকা’ নামে পরিচিত ছিল। লাল-হলুদ রঙের পতাকার মাঝে বাংলায় লেখা ছিল ‘বন্দেমাতরম’। পতাকার মাঝে ছিল ইন্দ্রের অস্ত্র ‘বজ্র’-এর ছবি আর সাদা পদ্ম। লাল রং স্বাধীনতার লড়াই-এর প্রতীক আর হলুদ সাফল্যের। বজ্র শক্তির প্রতীক আর সাদা ছিল পবিত্রতার। এই পতাকার গঠন ভাবনা ভারত সম্পর্কে তাঁর মনোভাব স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করে।
নিবেদিতার মধ্যে বৈপ্লবিক সত্ত্বা আগে থেকে ছিল। অরবিন্দের সান্নিধ্যে আসার পর তিনি আরও বেশি করে জড়িয়ে পড়েছিলেন চরমপন্থী আন্দালেন। যোগ দিলেন গুপ্ত সমিতিতে। রাজনৈতিক কর্মী তৈরির কাজে যুবকদের শিক্ষার দায়িত্ব নিলেন। গান্ধিজির অহিংসনীতি নয়, তিনি বিশ্বাসী ছিলেন চরমপন্থায়। তিনি মনে করতেন ভিক্ষা করে স্বাধীনতা পাওয়া যায় না। তাকে ছিনিয়ে নিতে হবে। স্বামীজিও বলতেন, ‘দেশমাতা এক সহস্র যুবক বলি চান।’ ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কার্জন যখন বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা করেন, তখন সারা দেশে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। নিবেদিতা তখন অসুস্থ অবস্থায় দার্জিলিং-এ ছিলেন। বঙ্গভঙ্গের খবর পেয়েই তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন এবং ইংরেজদের এই বর্বর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। ভারতীয়দের বিদেশী দ্রব্য বর্জন এবং স্বদেশী দ্রব্য ব্যবহারের আর্জি জানিয়েও তিনি প্রচার করেন। এমনকি স্বদেশী দ্রব্য হাতে তিনি কলকাতার রাজপথে ফেরিও করেছেন। কীভাবে স্বদেশী শিল্পের উন্নতি করা যায় সে নিয়েও যেমন তিনি ভেবেছেন, তেমনি চরমপন্থী বিপ্লবীদের অস্ত্রশিক্ষা দেওয়া কিংবা বোমা তৈরির কাজেও তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সাহায্য করেছন। এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। উল্লাসকর দত্তের নেতৃত্বে এক দল বিপ্লবী তখন বোম্ব তৈরির চেষ্টায় রত। বোম্ব তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। কিন্তু কাজ শেষ করার জন্য একটা ভালো ল্যাবোরেটিরর দরকার। কোনো পথ না পেয়ে তারা গেলেন নিবেদিতার কাছে। নিবেদিতা জগদীশচন্দ্র ও পি.সি. ঘোষের সঙ্গে কথাবার্তা বলে প্রেসিডেন্সি কলেজের কেমিস্ট্রি ল্যাবোরেটারি তাদের জন্য ব্যবস্থা করে দেন এক রাতের জন্য। এইরকম নানাভাবে নানা সময় তিনি বিপ্লবীদের পাশে থেকেছেন। যুগান্তর পত্রিকার সাংবাদিক ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত গ্রেপ্তার হলে তিনি আদালেত হাজির হয়েছিলেন জামানতের টাকা নিয়ে। আবার এই ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের নাম যখন আলিপুর বোমের মামলায় উঠে আসে তিনি তাকে পালাতে সাহায্য করেছিলেন। বিপ্লবীদের পাশে তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণাদাত্রী ও স্নেময়ী জননীর মতো। যাই হোক, তার এইসব কার্যকলাপ ব্রিটিশ সরকারের নজর এড়ায়নি। ইংলিশম্যান পত্রিকায় তাঁকে দেশদ্রোহী বলে ঘোষণা করা হয়। ইংরেজ সরকারও তাকে কারাদণ্ড কিংবা নির্বাসনে পাঠানোর কথা ভাবতে শুরু করে। কিন্তু কোনোকিছুই দমন করে রাখতে পারেনি এই অকুতোভয় ‘সিংহী’ কে।
কাজের চাপে তাঁর শরীর খারাপ হতে শুরু করে। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন।জগদীশচন্দ্র ও তার স্ত্রী তাঁকে দার্জিলিং-এ নিয়ে আসেন। ১৯১১-এর ১৩ অক্টোবর তিনি এখানেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ কথা ছিল, “The boat is sinking. But I shall see the sun-rise.”। মৃত্যু হয়তো তাঁকে নিয়ে চলে গেছে পার্থিব জগত থেকে কিন্তু তাঁর তরী ডুবে যায়নি এখনও। মরণ সাগরের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পর আজও তিনি ভাসমান রয়েছেন জীবনের স্রোতধারায়। প্রতিটি সূর্যোদয় মনে করিয়ে দেয় মরণশীল জগতেও অমরত্বের গর্বিত পদচারণা। জন্ম-মৃত্যু এখানে এসেই হয়তো একাকার হয়ে যায় জীবনের স্বার্থকতায়।

সৌরভকুমার ভূঞ্যা, মহিষাদল, পূর্ব মেদিনীপুর (৯৪৭৬৩৩০৫৩৩, ৯৭৩২৫৮০৯৪৯)