শিক্ষা হচ্ছে মনুষ্যত্ব অর্জনের সোপান – একটি পর্যালোচনা : দিলীপ রায়।

শিক্ষার সাথে মনুষ্যত্বের সম্পর্ক নিবিড় । কেননা “জীবসত্তার ঘর থেকে মানবসত্তার (মনুষ্যত্ব) উঠবার মই হচ্ছে শিক্ষা ।“ মানুষকে মনুষ্যত্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়াই শিক্ষার কাজ । কেননা শিক্ষা মনুষ্যত্ব অর্জনের পথ দেখায়, মানুষের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করে । মানবিক মূল্যবোধ অর্থাৎ মনুষ্যত্ব ছাড়া মানুষ প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে পারে না । শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ মুক্ত চিন্তা করতে শেখে, বুদ্ধি স্বাধীনতা লাভ করে এবং আত্মপ্রকাশের স্বাধীনতা অর্জন করে । এর ফলে মনুষ্যত্ব অর্জনের  পথ সুগম ও সুন্দর হয় ।
শিক্ষা প্রত্যেক মানুষের মৌলিক অধিকার । শিক্ষা মানুষকে নিজেকে জানতে ও চিনতে শেখায় । প্রকৃত শিক্ষা মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্ববোধ জাগ্রত করে, তার ভেতরের সুপ্ত প্রতিভাকে জাগিয়ে তোলে । যে শিক্ষা শুধু খেয়ে-পরে জীবন কাটাতে বা বাঁচাতে শেখায় তা কখনো প্রকৃত শিক্ষা হতে পারে না । যে শিক্ষা মানুষকে কল্যাণমুখী কাজে লাগাতে শেখায় না সেটি প্রকৃত শিক্ষা  বলা যায় না । এ ধরনের শিক্ষা জীবনে সাফল্য ফলাতে পারে না । শিক্ষা মানুষকে শেখায়  “লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু ।“  অনেকের মতে,  “শিক্ষা মনের একটি চোখ ।“  তাই মানুষের মনুষ্যত্ব বিকাশ ঘটে শিক্ষার মাধ্যমে । শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ তার মানবিক গুণগুলি অর্জন করে । আত্মশক্তিতে বলীয়ান মানুষকেই দেখা যায় কর্তব্যপরায়ণ,  বিবেকবোধ-সম্পন্ন, সমব্যথী, সর্বোপরি সকল মানবিক গুণের অধিকারী । জ্ঞানশক্তি না থাকলে মানুষ শিক্ষিত হয়েও কখনো যথার্থ মানুষ হতে পারে না ! ডিগ্রির কোনো মূল্যই থাকে না যদি শিক্ষিত ব্যক্তি আত্মশক্তি ও জ্ঞানশক্তি অর্জন করতে না পারে । প্রতিটি মানুষের মধ্যে  অফুরন্ত সম্ভাবনার খনি, সে কী হতে পারে বা সমাজের জন্য কী করতে পারে তা সে নিজেও জানে না । শিক্ষা মানুষের ভেতরে প্রতিভার আলো জ্বালিয়ে তার অজ্ঞতাকে দূর করে এবং তাকে আত্মশক্তিতে বলীয়ান করে, সত্যিকার মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে । মানুষ জ্ঞান আহরণ করলে তার আত্মশক্তি অর্জন সম্ভব । আবার অন্যদিকে জ্ঞান নামক এই  শক্তি হৃদয়ের লুকানো সকল গুণকে শক্তিশালী করে ।
সাধারণ অর্থে, আমরা বুঝি,   জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জনই শিক্ষা । ব্যাপক অর্থে পদ্ধতিগতভাবে জ্ঞানলাভের প্রক্রিয়াকেই শিক্ষা বলে। তবে শিক্ষা হল সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটার ব্যাঘাতশূন্য  অনুশীলন । বাংলা শিক্ষা শব্দটি এসেছে ‍”শাস” ধাতু থেকে। যার অর্থ শাসন করা, নির্দেশ দেওয়া, শৃঙ্খলিত করা, তিরস্কার করা  বা উপদেশ দান করা । ব্যুৎপত্তিগত অর্থে শিক্ষা মানে জ্ঞানার্জনের কলাকৌশল । অন্যদিকে শিক্ষার ইংরেজি প্রতিশব্দ Education,  সেটা একটা ল্যাটিন শব্দ । ঐ ল্যাটিন শব্দটি এসেছে Educatum, Educare,  Educere,  থেকে। Educatum অর্থ শিক্ষাদানের কাজ, প্রশিক্ষণ দেওয়া ।   Educere অর্থ প্রতিপালন করা, পরিচর্যা করা, বিকাশ ঘটানো ।  অন্য কথায় ভেতরের সম্ভাবনাকে বাইরে বের করে নিয়ে আসা বা বিকশিত করা । দেখা যাক,  “শিক্ষা” মানে  এরিস্টটল কী বলেছিলেন । তাঁর মতে, “শিক্ষা হল দেহ ও মনের সুষম বিকাশ । দেহ  ও মনের পরিপূর্ণ বিকাশ সাধন করে মানুষকে পরম কল্যাণ, সৌন্দর্য ও সত্য উপলব্ধিতে সহায়তা করে ।” সুতরাং এতেই পরিষ্কার, মানুষের মনুষ্যত্ব বিকাশে শিক্ষা একটা গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার ।

এবার দেখা যাক, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ কী বলছে ? শিক্ষাপ্রণালীর চিরাচরিত শিক্ষক-কেন্দ্রিকতার অভিমুখটিকে পালটে শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক করে তোলার জন্য শিক্ষক-প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনার আমূল সংস্কার, শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতার ক্ষমতাকে উস্কে দিয়ে তাদের সর্বাঙ্গীন বিকাশের পথ উন্মুক্ত করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে শিক্ষানীতিতে । গুরুত্ব দিয়েছে বিদ্যালয়শিক্ষার সর্বোচ্চপর্যায়ের অন্তর্ভুক্তির ওপরে । বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে প্রারম্ভশৈশব পরিচর্যা ও শিক্ষায় । শিশুর বুনিয়াদি শিক্ষা বলতে বোঝায় পড়তে ও বুঝতে এবং বাস্তব জীবনে গণিতের জ্ঞানটুকু প্রয়োগে সমর্থ হওয়া । শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের সামর্থ্য বর্ধনে এই শিক্ষানীতিতে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে । শিক্ষানীতির আরও একটা দিক হচ্ছে, উচ্চমানের শিক্ষায় অগ্রাধিকার, শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি সুদৃঢ় করা, অবহেলিত মানুষের শিক্ষাগত চাহিদা মেটানো এবং ভারতকে বিশ্বের অন্যতম শিক্ষাকেন্দ্র করে তোলার লক্ষ্য ।
মনুষ্যত্ববোধ জাগ্রত করতে হলে, মুখস্থ করার বদলে পড়ুয়াদের ভাবনাচিন্তার বিকাশ ঘটানো, তাদের বিজ্ঞানমনস্ক উদ্ভাবনীশক্তি বৃদ্ধি এবং কাজের মাধ্যমে শেখার উৎসাহ দান খুব জরুরি । আমরা জানি, শিক্ষার প্রাথমিক উদ্দেশ্য জ্ঞান আহরণ এবং অর্জিত জ্ঞানের প্রয়োগে বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান  । সুতরাং একজন শিক্ষার্থীর পাঠ্যবস্তুর সঙ্গে নিজের দৈনন্দিন জীবনের সংযোগ খুঁজে পাওয়া খুব দরকার । তাহলে একজন পড়ুয়া তাদের পাঠ্যবিষয়, পাঠ্যবস্তু ও অর্জিত দক্ষতার মধ্যে একটা পারস্পরিক সমন্বয় খুঁজে পাবে । যাতে তাদের মধ্যে ইতিবাচক জ্ঞানের বিকাশ ঘটে এবং সেটা ঘটলে তার মধ্যে বিবেকবোধ জাগ্রত হবে যেটা মনুষ্যবোধ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ভীষণ সহায়ক । তবে এটাও ঠিক, শিক্ষার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনকে সার্বিক, সঙ্গত এবং আনন্দদায়ক করে তোলা উচিত ।  বিশেষ করে গভীর চিন্তভাবনা, সৃষ্টিশীলতা, বৈজ্ঞানিক দক্ষতা, সামাজিক দায়িত্ব, মুশকিল আসানের দক্ষতা আনয়নে পাঠক্রম, পাঠ্যবস্তু, শিক্ষাপ্রণালী এবং মূল্যায়নের রূপান্তর আনাটা এইমুহূর্তেব  সময়োপযোগী ।
মনুষ্যত্ববোধের নিরিখে একটা কথা খুব প্রনিধানযোগ্য । মনুষ্যত্ব আমাদের অন্তরের বিষয় । আর এই অভ্যন্তরীণ বিষয়কে জাগ্রত করতে আমাদের চাই আন্তরিক সদিচ্ছা । এই  মনুষ্যত্ব গড়ে তুলতে আমাদের চাই মানসিক শক্তি,  অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাস, যা আমাদের প্রগতির পথে এগিয়ে যেতে  ও  বিভিন্ন বিপদের বিরূদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করবে । এই ক্ষেত্রে স্বামী বিবেকানন্দের কথায় আসা যেতে পারে । তিনি মানুষকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, “নীতিপরায়ন ও সাহসী হও ।  কাপুরুষেরা পাপ  করিয়া থাকে, বীর কখনও পাপ করে না—এমনকি মনে পর্যন্ত পাপ আনতে দেয় না । সিংহ-গর্জনে আত্মার মহিমা ঘোষণা কর, জীবকে অভয় দিয়ে বল – “উত্তিষ্ঠিত জাগ্রত প্রাপ্য বরান্‌ নিবোধিত” —ওঠ, জাগো, লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত থামিও না ।  এস মানুষ হও  । …… নিজেদের সংকীর্ণ গর্ভ থেকে বেরিয়ে এসে বাইরে গিয়ে দেখ, সব জাতি কেমন উন্নতির পথে চলেছে । তোমরা কি মানুষকে ভালবাস ? তোমরা কি দেশকে ভালবাস ? তাহলে এসে, আমরা ভাল হবার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করি ।“
শিক্ষানীতির প্রেক্ষাপটে যে কথাটা উল্লেখ প্রয়োজন — বহু ভাষাবাদ, গবেষণা, উদ্ভাবনা, পাঠক্রম সংস্কার, উদ্ভাবনী শিক্ষণ প্রণালী, বৃত্তিমূলক দক্ষতা জোগানোর বন্দোবস্ত, ইত্যাদি নতুন নীতি চালু করা ।   শিক্ষার সার্বিক মান বাড়ানোয় আরও বেশী জোর দেওয়া ।  স্কুল শিক্ষায় রূপান্তর, এবং একেবারে নীচের তলার প্রতিটি শিশুর  শিক্ষার ব্যবস্থায় সরকারি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী আশুকর্তব্য  ।
আত্মশক্তি বা জ্ঞানশক্তি মানুষের একটি বিশেষ গুণ, যা তার অস্তিত্বের মাঝেই নিহিত থাকে। কিন্তু মানুষ জন্মগতভাবে এ শক্তির অধিকারী হয় না । মানুষের মধ্যে আত্মশক্তি বা জ্ঞানশক্তি তখনই জাগ্রত হয় যখন মানুষের মন প্রকৃত শিক্ষার আলোকে আলোকিত হয় । বস্তুত শিক্ষার মূল লক্ষ্য,  মানুষের আত্মশক্তি বা জ্ঞানশক্তির বিকাশের মাধ্যমে তার মনুষ্যত্ব ও বিবেককে জাগ্রত করা । সুতরাং উপরোক্ত আলোচনায় এটা পরিষ্কার, মনুষ্যত্ব অর্জনে শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার ! শিক্ষা হচ্ছে মনুষ্যত্ব অর্জনের সোপান । (তথ্যসূত্রঃ সংগৃহীত ও যোজনা-০২/২২) ।
—————-০————–

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *