অদৃশ্য প্রতিবেশী।


কলকাতা থেকে প্রায় একশো কিলোমিটার দূরে ছোট্ট শহর চন্দ্রপুর। শহরটি শান্ত, পরিচ্ছন্ন এবং সবুজে ঘেরা। দিনের বেলা মানুষের কোলাহলে মুখর থাকলেও রাত নামলেই চারদিক যেন অদ্ভুত নীরবতায় ঢেকে যেত।
এই শহরেই নতুন চাকরির সূত্রে এসে একটি পুরোনো বাড়ি ভাড়া নিলেন অভিজিৎ সেন। পেশায় তিনি একজন ব্যাংককর্মী। যুক্তিবাদী, শান্ত স্বভাবের মানুষ। ভূত-প্রেত, অলৌকিক ঘটনা—এসবকে তিনি নিছক কুসংস্কার বলেই মনে করতেন।
বাড়ির মালিক বাড়িটি বুঝিয়ে দেওয়ার সময় শুধু একটি কথাই বলেছিলেন—
— “পাশের বাড়িটা নিয়ে কৌতূহল দেখাবেন না।”
অভিজিৎ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
— “কেন?”
— “ওখানে কেউ থাকে না।”
— “তাহলে?”
বৃদ্ধ মালিক একটু হেসে বললেন,
— “তবু মাঝে মাঝে মনে হয়, কেউ যেন আছে।”
অভিজিৎ বিষয়টি গুরুত্ব দিলেন না।
প্রথম কয়েকদিন সবকিছু স্বাভাবিকই চলছিল। কিন্তু এক রাতে অফিস থেকে ফিরে তিনি লক্ষ্য করলেন, পাশের বাড়ির দ্বিতীয় তলার একটি জানালায় ক্ষীণ আলো জ্বলছে।
পরদিন সকালে দেখলেন, বাড়িটি তালাবন্ধ।
তিনি ভাবলেন, হয়তো কোনো ভুল দেখেছেন।
কিন্তু পরের রাতেও একই ঘটনা ঘটল।
শুধু তাই নয়, জানালার পাশে যেন একজন বৃদ্ধ মানুষ দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন।
অভিজিৎ ডাক দিলেন—
“হ্যালো!”
কোনো উত্তর এল না।
কয়েক সেকেন্ড পরে আলো নিভে গেল।
পরদিন চায়ের দোকানে তিনি বিষয়টি বলতেই সবাই চুপ হয়ে গেল।
দোকানদার ধীরে বললেন—
— “ওই বাড়িতে আগে থাকতেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অনন্ত মুখার্জি।”
— “এখন কোথায়?”
— “পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন।”
অভিজিৎ হেসে বললেন—
— “তাহলে আলো জ্বালায় কে?”
কেউ উত্তর দিল না।
কৌতূহল দিন দিন বাড়তে লাগল।
এক রবিবার তিনি পাশের বাড়ির চারপাশ ঘুরে দেখলেন।
দরজায় মরচে ধরা তালা।
জানালায় ধুলো।
উঠোনে আগাছা।
স্পষ্ট বোঝা যায়, বহুদিন কেউ এখানে থাকেনি।
কিন্তু ঠিক সেই সময় তাঁর চোখে পড়ল—
দরজার সামনে একটি তাজা ফুল।
কে রেখে গেল?
সেদিন রাত বারোটার দিকে আবার আলো জ্বলল।
অভিজিৎ সাহস করে বাড়িটির সামনে গেলেন।
আশ্চর্যের বিষয়, তালাটি খোলা।
ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকলেন।
পুরোনো আসবাবপত্র, ধুলো জমা ঘর, দেওয়ালে সাদা-কালো ছবি।
দ্বিতীয় তলায় উঠে তিনি একটি ঘরের দরজা আধখোলা দেখতে পেলেন।
ঘরের ভেতরে একটি টেবিল।
টেবিলের উপর খোলা অবস্থায় একটি ডায়েরি।
প্রথম পাতায় লেখা—
“যদি কেউ এই ডায়েরি পড়ো, তবে জেনে রেখো, আমি কারও অপেক্ষায় আছি।”
অভিজিৎ পড়তে শুরু করলেন।
ডায়েরিতে জানা গেল, অনন্তবাবুর একমাত্র ছেলে বিদেশে চলে গিয়েছিলেন। প্রথমে নিয়মিত চিঠি লিখতেন, পরে ধীরে ধীরে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
অনন্তবাবু প্রতিদিন সন্ধ্যায় জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছেলের অপেক্ষা করতেন।
শেষ দিন পর্যন্ত।
শেষ ডায়েরির পাতায় লেখা ছিল—
“হয়তো সে ফিরতে পারবে না। তবু আমি প্রতিদিন জানালার পাশে দাঁড়াব। কারণ একজন বাবার অপেক্ষা কখনও শেষ হয় না।”
ডায়েরির পাতায় শুকিয়ে যাওয়া অশ্রুর দাগ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।
অভিজিতের বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।
পরদিন তিনি অনেক খোঁজাখুঁজি করে অনন্তবাবুর ছেলের সন্ধান পেলেন।
তিনি তখন কানাডায় থাকেন।
অভিজিৎ সব কথা জানিয়ে একটি দীর্ঘ ই-মেইল পাঠালেন।
দুই সপ্তাহ পরে এক মধ্যবয়স্ক মানুষ বাড়িটির সামনে এসে দাঁড়ালেন।
তিনি অনন্তবাবুর ছেলে অরূপ।
বাড়ির ভেতরে ঢুকেই তিনি বাবার পুরোনো চশমা, ডায়েরি আর একটি কাঠের চেয়ার দেখে ভেঙে পড়লেন।
কাঁদতে কাঁদতে বললেন—
— “আমি ফিরতে খুব দেরি করে ফেললাম, বাবা।”
অরূপ বাবার স্মৃতিতে বাড়িটি বিক্রি করলেন না।
বরং সেটিকে একটি বিনামূল্যের পাঠাগার বানিয়ে দিলেন।
অনন্তবাবুর সব বই সেখানে সাজিয়ে রাখা হলো।
প্রতিদিন বিকেলে গ্রামের ছেলেমেয়েরা সেখানে এসে বই পড়তে শুরু করল।
প্রবেশদ্বারের সামনে একটি ফলকে লেখা হলো—
“অনন্ত মুখার্জি স্মৃতি পাঠাগার”
“যিনি সারাজীবন জ্ঞানের আলো জ্বালিয়েছেন এবং শেষ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে শিখিয়েছেন।”
কয়েক মাস পরে এক সন্ধ্যায় অভিজিৎ বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।
হঠাৎ তাঁর চোখ পড়ল পাশের বাড়ির দ্বিতীয় তলার জানালার দিকে।
মনে হলো, কেউ যেন একবার মৃদু হেসে পর্দা সরিয়ে দিল।
তারপর আলো নিভে গেল।
সেদিনের পর আর কোনোদিন সেই জানালায় রহস্যময় আলো জ্বলেনি।
গ্রামের বৃদ্ধরা বলতেন—
“হয়তো অনন্তবাবুর অপেক্ষা শেষ হয়েছে।”
আর অভিজিৎ বুঝলেন—
সব রহস্যের উত্তর অলৌকিক নয়।
কখনও কখনও একটি নিঃসঙ্গ হৃদয়ের অপেক্ষাই সবচেয়ে বড় রহস্য।
সমাপ্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *