
কলকাতার উত্তর অংশে একটি পুরোনো তিনতলা বাড়ি। সেই বাড়ির দ্বিতীয় তলায় একা থাকতেন অরিজিৎ বসু। পেশায় তিনি একজন সাংবাদিক। দিনের বেশিরভাগ সময় খবর সংগ্রহ আর রিপোর্ট লেখায় কেটে যেত।
স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে একাই থাকতেন। একমাত্র মেয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছিল। তাই বাড়িটা সারাদিন প্রায় নিঃশব্দ থাকত।
এক বর্ষার রাতে অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে প্রায় সাড়ে এগারোটা বেজে গেল। বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। বাড়িতে ঢুকে ভেজা জামাকাপড় বদলে এক কাপ চা বানিয়ে টেবিলে বসতেই পুরোনো ল্যান্ডফোনটা বেজে উঠল।
ঘড়ির কাঁটা ঠিক বারোটা ছুঁয়েছে।
অরিজিৎ রিসিভার তুললেন।
— “হ্যালো?”
ওপাশে কোনো উত্তর নেই।
শুধু কারও নিঃশ্বাসের শব্দ।
কয়েক সেকেন্ড পর একটি মেয়েলি কণ্ঠ শোনা গেল—
— “আপনি কি এখনও জেগে আছেন?”
অরিজিৎ অবাক।
— “আপনি কে?”
লাইন কেটে গেল।
পরদিন তিনি বিষয়টি ভুলেই গিয়েছিলেন।
কিন্তু পরের রাতেও ঠিক বারোটায় আবার ফোন এল।
— “হ্যালো?”
ওই একই কণ্ঠ।
— “আজও ঘুমোননি?”
— “আপনি কে? কেন ফোন করছেন?”
মেয়েটি শুধু বলল—
— “একটা মানুষকে বাঁচান।”
তারপর আবার লাইন কেটে গেল।
অরিজিৎ ভাবলেন, হয়তো কেউ মজা করছে।
তৃতীয় রাত।
আবার ঠিক বারোটায় ফোন।
এবার কণ্ঠটি বলল—
— “বেলঘরিয়ার পুরোনো গুদামে আগুন লাগবে। দ্রুত খবর দিন।”
অরিজিৎ প্রথমে বিশ্বাস করলেন না।
তবুও সাংবাদিকের কৌতূহল থেকে পরিচিত এক দমকলকর্মীকে ফোন করলেন।
পনেরো মিনিট পর সত্যিই গুদামে আগুন লাগে।
দমকল আগে থেকেই পৌঁছে যাওয়ায় বড় দুর্ঘটনা এড়ানো যায়।
অরিজিৎ স্তম্ভিত।
এরপর প্রায় প্রতিরাতেই ফোন আসতে লাগল।
কখনও বলা হতো—
— “স্টেশনে একটি বৃদ্ধ মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়বেন।”
কখনও—
— “পাঁচ নম্বর সেতুতে দুর্ঘটনা ঘটবে।”
প্রতিবারই ঘটনাগুলো সত্যি প্রমাণিত হতে লাগল।
অরিজিৎ খবর দিয়ে বহু মানুষের প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হলেন।
কিন্তু ফোনকারী কে?
তিনি টেলিফোন দপ্তরে খোঁজ করলেন।
তারা জানাল—
ফোনের নম্বরটি বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে।
যে নম্বর থেকে কল আসছে, সেটি এখন আর অস্তিত্বই নেই।
অরিজিৎ আরও অবাক হয়ে গেলেন।
এক রাতে তিনি সাহস করে বললেন—
— “আপনি কে?”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর উত্তর এল—
— “আমি নন্দিতা।”
— “আপনি কোথায় থাকেন?”
— “আগে এই বাড়িতেই থাকতাম।”
অরিজিৎ বাড়িওয়ালার কাছে জানতে চাইলেন।
বাড়িওয়ালা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—
— “প্রায় পনেরো বছর আগে নন্দিতা নামে এক তরুণী এখানে থাকত। সে সাংবাদিক হতে চেয়েছিল। এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়।”
অরিজিতের শরীর শিউরে উঠল।
পরদিন তিনি নন্দিতার পুরোনো কাগজপত্র খুঁজতে শুরু করলেন।
একটি কাঠের বাক্সে তিনি পেলেন নন্দিতার অসমাপ্ত ডায়েরি।
শেষ পাতায় লেখা ছিল—
“আমি যদি বেঁচে না থাকি, তবুও চাই মানুষ সত্য জানুক, মানুষ বাঁচুক। একজন সাংবাদিকের কাজ কখনও শেষ হয় না।”
অরিজিৎ ডায়েরি বন্ধ করে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন।
এরপরও কিছুদিন ফোন আসত।
তিনি প্রতিবারই সতর্কবার্তা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতেন।
এক রাতে ফোন বেজে উঠল।
ওপাশ থেকে মৃদু কণ্ঠ ভেসে এল—
— “ধন্যবাদ।”
অরিজিৎ বললেন—
— “তুমি কি এবার শান্তি পেয়েছ?”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর খুব আস্তে উত্তর এল—
— “এখন আর কেউ অপেক্ষা করছে না।”
লাইন কেটে গেল।
সেই রাতের পর আর কোনোদিন রাত বারোটায় ফোন বাজেনি।
ল্যান্ডফোনটি এখনও অরিজিতের টেবিলে রয়েছে।
মাঝে মাঝে তিনি সেটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলেন—
“কিছু ফোনকল খবরের জন্য আসে, আর কিছু ফোনকল মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার জন্য।”
নন্দিতার স্মৃতিতে তিনি প্রতিবছর তরুণ সাংবাদিকদের জন্য একটি বৃত্তি চালু করেন।
বৃত্তিটির নাম দেন—
“নন্দিতা স্মৃতি সাহসিকতা পুরস্কার”।
কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন—
একজন সত্যিকারের সাংবাদিকের কণ্ঠস্বর কখনও হারিয়ে যায় না।
সেটি কখনও খবরের পাতায়, কখনও মানুষের স্মৃতিতে, আবার কখনও হয়তো… রাত বারোটার একটি অদ্ভুত ফোনকলে ফিরে আসে।
সমাপ্ত
রাত বারোটার ফোনকল।












Leave a Reply