
পশ্চিমবঙ্গের এক ছোট্ট গ্রাম—সোনাঝুরি। গ্রামের মাঝখানে ছিল একটি পুরোনো ডাকঘর। ডাকঘরটি খুব বড় নয়, কিন্তু তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লাল রঙের ডাকবাক্সটি ছিল গ্রামের মানুষের কাছে অত্যন্ত পরিচিত।
প্রায় ত্রিশ বছর ধরে সেই ডাকবাক্সের সামনে প্রতিদিন আসতেন গ্রামের ডাকপিয়ন নিতাইবাবু।
বয়স তাঁর প্রায় পঁয়ষট্টি। সাইকেলের ঘণ্টি বাজিয়ে যখন তিনি গ্রামের রাস্তায় ঢুকতেন, ছোটরা দৌড়ে আসত।
— “নিতাইকাকু, আমার চিঠি এসেছে?”
কেউ অপেক্ষা করত ছেলের চিঠির জন্য, কেউ স্বামীর, কেউ দূরে থাকা ভাইয়ের।
নিতাইবাবু বলতেন,
— “চিঠি শুধু কাগজ নয় রে, চিঠি মানে অপেক্ষা।”
একটি মেয়ের অপেক্ষা
সেই গ্রামেই থাকত তিথি, ষোলো বছরের এক কিশোরী।
তার বাবা বহু বছর আগে কাজের সন্ধানে অন্য রাজ্যে চলে গিয়েছিলেন। প্রথমদিকে নিয়মিত চিঠি আসত।
তারপর ধীরে ধীরে চিঠি কমে গেল।
এক বছর ধরে কোনো চিঠি নেই।
তিথি প্রতিদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে ডাকঘরের সামনে দাঁড়াত।
নিতাইবাবুকে জিজ্ঞেস করত,
— “কাকু, বাবার কোনো চিঠি এসেছে?”
নিতাইবাবু মাথা নাড়তেন।
— “আজও নয় মা।”
তিথি মন খারাপ করে চলে যেত।
একটি পুরোনো চিঠি
একদিন ডাকঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে নিতাইবাবু একটি পুরোনো খাম পেলেন।
খামের ওপর লেখা—
“তিথির জন্য।”
চিঠিটির তারিখ প্রায় এক বছর আগের।
নিতাইবাবু অবাক হয়ে গেলেন।
চিঠিটি কোথা থেকে এসেছিল, কেন এতদিন ডাকঘরের একটি পুরোনো আলমারির পেছনে পড়ে ছিল—কেউ জানত না।
তিনি তিথিকে ডাকলেন।
তিথি কাঁপা হাতে চিঠিটি নিল।
খাম খুলে পড়তে শুরু করল।
“তিথি,
তুই যখন এই চিঠি পাবি, তখন হয়তো আমি অনেক দূরে থাকব। কিন্তু মনে রাখিস, দূরত্ব কখনও ভালোবাসাকে দূরে সরাতে পারে না।
তোর পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়। তুই একদিন নিজের পায়ে দাঁড়াবি—এই আমার স্বপ্ন।
আর যদি কোনোদিন মনে হয়, বাবা তোকে ভুলে গেছে, তখন আকাশের দিকে তাকাবি। আমিও একই আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকব।
—তোর বাবা।”
চিঠির নিচে আরেকটি লাইন ছিল—
“ফিরে আসার চেষ্টা করছি।”
তিথির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
বাবার খোঁজ
তিথি বাবাকে খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত নিল।
নিতাইবাবু পুরোনো খামের ঠিকানা দেখে জানতে পারলেন, চিঠিটি এসেছিল মহারাষ্ট্রের একটি ছোট শহর থেকে।
কয়েকজনের সাহায্যে খোঁজ শুরু হলো।
কিন্তু ঠিকানাটি আর কার্যকর নেই।
তিথি হতাশ হয়ে পড়ল।
তখন নিতাইবাবু বললেন,
— “চিঠি যদি মানুষকে খুঁজে পেতে পারে, তাহলে মানুষও চিঠির পথ ধরে মানুষকে খুঁজে পেতে পারে।”
তিনি পুরোনো ডাকঘরের রেকর্ড ঘাঁটতে শুরু করলেন।
কয়েকদিন পরে একটি সূত্র পাওয়া গেল।
তিথির বাবা একসময় যে কারখানায় কাজ করতেন, সেই কারখানাটি বন্ধ হয়ে গেছে। পরে তিনি নাকি অন্য শহরে চলে গিয়েছিলেন।
খোঁজ চলতেই থাকল।
অপ্রত্যাশিত ফোন
একদিন সন্ধ্যায় তিথির বাড়িতে ফোন এল।
অপর প্রান্তে একজন অপরিচিত মানুষ বললেন,
— “আপনি কি তিথির বাড়ি থেকে বলছেন?”
— “হ্যাঁ।”
— “আপনার বাবার নাম কি…”
তিথি ছুটে এল।
লোকটি জানালেন, তিনি তিথির বাবার পুরোনো সহকর্মী।
তিনি জানতেন না যে এতদিন ধরে তিথি বাবার অপেক্ষায় আছে।
তাঁর কাছে বাবার নতুন ঠিকানা ছিল।
বছরের পর বছর পরে
তিন মাস পর এক বিকেলে সোনাঝুরি গ্রামের বাসস্ট্যান্ডে একটি বাস এসে থামল।
বাস থেকে একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ নামলেন।
চোখে ক্লান্তি, হাতে পুরোনো ব্যাগ।
তিনি কিছুক্ষণ চারদিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে ডাকঘরের দিকে এগোলেন।
নিতাইবাবু তাঁকে দেখেই চিনতে পারলেন।
— “আপনি… তিথির বাবা?”
লোকটির চোখ ভিজে উঠল।
— “হ্যাঁ।”
নিতাইবাবু তাঁর কাঁধে হাত রেখে বললেন,
— “আপনার মেয়ে প্রতিদিন আপনার চিঠির অপেক্ষা করেছে।”
লোকটি মাথা নিচু করে বললেন,
— “আমি অনেকবার চিঠি লিখেছিলাম। সব পৌঁছায়নি।”
তিথি ছুটে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
কেউ কোনো কথা বলতে পারল না।
বহু বছরের অভিমান, অপেক্ষা, কষ্ট—সব যেন এক মুহূর্তে চোখের জলে মিশে গেল।
কিছুক্ষণ পরে তিথি বলল,
— “বাবা, তুমি এত দেরি করলে কেন?”
বাবা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
— “পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম মা।”
তিথি বলল,
— “আমি তো তোমার জন্য আলো জ্বেলে রেখেছিলাম।”
একটি নতুন ডাকবাক্স
কয়েক বছর পর তিথি বড় হয়ে ডাকবিভাগে চাকরি পেল।
তার প্রথম পোস্টিং হলো নিজের গ্রামের কাছাকাছি।
একদিন সে নিতাইবাবুর পুরোনো ডাকবাক্সটির সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
নিতাইবাবু তখন অবসর নিয়েছেন।
তিথি তাঁকে বলল,
— “কাকু, আপনি আমাকে একটা জিনিস শিখিয়েছিলেন।”
— “কী?”
— “মানুষের চিঠি পৌঁছে দেওয়া শুধু চাকরি নয়। এটা মানুষের আশা পৌঁছে দেওয়া।”
নিতাইবাবু মৃদু হেসে বললেন,
— “তুই সেটা মনে রেখেছিস, এটাই আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।”
বছর কেটে গেল।
চিঠির যুগ অনেকটাই বদলে গেল।
মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, ভিডিও কল—সবকিছু মানুষের যোগাযোগকে সহজ করে দিল।
তবুও সোনাঝুরি গ্রামের পুরোনো ডাকবাক্সটি রয়ে গেল।
তার পাশে একটি ফলক বসানো হলো—
“কিছু কথা ফোনে বলা যায়, কিন্তু কিছু অনুভূতি কাগজেই থেকে যায়।”
তিথি মাঝে মাঝে সেখানে এসে দাঁড়ায়।
লাল ডাকবাক্সটির গায়ে হাত রাখে।
তার মনে পড়ে যায় সেই ষোলো বছরের মেয়েটির কথা, যে প্রতিদিন অপেক্ষা করত একটি চিঠির জন্য।
আর সে বুঝতে পারে—
অপেক্ষা যত দীর্ঘই হোক, ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তবে একদিন না একদিন তার উত্তর আসে।
হয়তো চিঠির খামে।
হয়তো একটি ফোনে।
হয়তো হঠাৎ দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রিয় মানুষের রূপে।
কিন্তু আসে।
সমাপ্ত। ✉️❤️












Leave a Reply