নদীর ওপারের আলো।।


পশ্চিমবঙ্গের এক প্রত্যন্ত গ্রাম—চরনদী। গ্রামের একদিকে বিস্তীর্ণ নদী, অন্যদিকে ধানক্ষেত। বর্ষাকালে নদী ফুলে-ফেঁপে উঠলে গ্রামের সঙ্গে পাশের শহরের যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।
নদীর ওপারে ছিল একটি ছোট হাসপাতাল। তাই গ্রামের মানুষের কাছে নদী শুধু জলধারা নয়—জীবন-মরণের সীমানা।
সেই নদীতে নৌকা চালাতেন গদাধর মাঝি। বয়স ষাটের বেশি। তাঁর ছোট্ট কাঠের নৌকার নাম ছিল “আলো”।
নৌকার সামনের দিকে তিনি প্রতিদিন সন্ধ্যায় একটি কেরোসিনের বাতি জ্বালিয়ে রাখতেন।
গ্রামের সবাই জানত—
নদীর ওপারে যদি রাতের অন্ধকারে সেই আলো দেখা যায়, তাহলে বুঝতে হবে গদাধর মাঝি এখনও নদীতে আছেন।
আলোর গল্প
একদিন গ্রামের স্কুলছাত্র অভি গদাধর মাঝিকে জিজ্ঞেস করল,
— “মাঝিকাকু, আপনার নৌকার নাম ‘আলো’ কেন?”
গদাধর কিছুক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
— “অনেক বছর আগে এক রাতে আমার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তখন এই নদীতে কোনো নৌকা ছিল না। অনেক দেরিতে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পেরেছিলাম। কিন্তু তাকে আর বাঁচানো যায়নি।”
অভি চুপ করে গেল।
গদাধর আবার বললেন,
— “সেই রাত থেকে ঠিক করেছি, আমার নৌকা যতদিন চলবে, কোনো অসুস্থ মানুষ যেন শুধু নদীর কারণে হাসপাতালে পৌঁছতে দেরি না করে।”
অভি বলল,
— “তাই নৌকার নাম ‘আলো’?”
— “হ্যাঁ। কারণ সেদিন যদি নদীর ওপারে একটা আলো থাকত, হয়তো আমার জীবনটাও অন্যরকম হতো।”
ঝড়ের রাত
এক বর্ষার রাতে হঠাৎ প্রচণ্ড ঝড় শুরু হলো।
বৃষ্টি, বজ্রপাত আর তীব্র বাতাসে নদী উত্তাল হয়ে উঠল।
সব নৌকা ঘাটে তুলে রাখা হলো।
গদাধর মাঝিও নৌকা বেঁধে বাড়ি ফিরছিলেন।
ঠিক তখনই গ্রামের এক যুবক ছুটে এসে বলল,
— “কাকা! রমেনদার বউয়ের প্রসববেদনা উঠেছে। অবস্থা খুব খারাপ। হাসপাতালে নিতে হবে।”
সবাই নদীর দিকে তাকাল।
এমন নদীতে নৌকা চালানো প্রায় অসম্ভব।
কেউ বলল,
— “আজ আর যাওয়া যাবে না।”
গদাধর কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর নিজের নৌকার দিকে এগিয়ে গেলেন।
— “আলোটা জ্বেলে দাও।”
একজন বলল,
— “কাকা, নদী আজ খুব খারাপ।”
গদাধর উত্তর দিলেন,
— “আমি জানি। কিন্তু ওই মেয়েটার জন্য নদী আজ একটু কম খারাপ হতে হবে।”
অন্ধকার নদী
নৌকায় উঠলেন গদাধর, রমেন এবং তাঁর স্ত্রী।
বাতাসে নৌকা বারবার দুলছিল।
রমেন ভয়ে কাঁপছিল।
— “কাকা, যদি কিছু হয়?”
গদাধর বললেন,
— “আমার দিকে তাকিও না। ওই আলোটার দিকে তাকিয়ে থাকো।”
নৌকার সামনে ছোট্ট কেরোসিনের বাতিটি ঝড়ের মধ্যে দুলছিল।
কখনও মনে হচ্ছিল নিভে যাবে।
আবার মুহূর্ত পরে জ্বলে উঠছিল।
গদাধর দাঁড় শক্ত করে ধরে নদীর স্রোতের সঙ্গে লড়াই করতে লাগলেন।
হঠাৎ বিশাল একটি ঢেউ নৌকার ওপর আছড়ে পড়ল।
রমেনের স্ত্রী চিৎকার করে উঠলেন।
নৌকা প্রায় উল্টে যাচ্ছিল।
গদাধর সমস্ত শক্তি দিয়ে দাঁড় সামলে নিলেন।
তিনি বললেন,
— “ভয় পেও না। আলো এখনও জ্বলছে।”
হাসপাতালে পৌঁছনো
প্রায় এক ঘণ্টার সংগ্রামের পর নৌকা নদীর ওপারে পৌঁছাল।
হাসপাতালের কর্মীরা দ্রুত মহিলাটিকে ভেতরে নিয়ে গেলেন।
গদাধর বাইরে বসে ভিজতে ভিজতে অপেক্ষা করতে লাগলেন।
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার বেরিয়ে এসে হাসলেন।
— “মা ও সন্তান দুজনেই ভালো আছে।”
রমেন গদাধরের পা জড়িয়ে ধরল।
— “কাকা, আপনি না থাকলে…”
গদাধর তাকে থামিয়ে দিলেন।
— “আমার কিছু করিনি। নৌকাটা করেছে।”
তারপর নৌকার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “আর ওই আলোটা।”
আলোর উত্তরাধিকার
বছর কেটে গেল।
অভি বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হলো। শহরে চাকরি পেল।
কিন্তু গ্রামের সঙ্গে তার সম্পর্ক কখনও ছিন্ন হয়নি।
একদিন সে জানতে পারল, গদাধর মাঝি আর নৌকা চালাতে পারছেন না।
বয়স হয়েছে।
নৌকাটিও পুরোনো হয়ে গেছে।
অভি শহর থেকে গ্রামে ফিরে এল।
সে গ্রামের কয়েকজন যুবককে নিয়ে একটি নতুন নৌকা তৈরি করল।
নৌকাটির নাম রাখা হলো—
“নতুন আলো”।
এটি শুধু যাত্রী পারাপারের জন্য নয়, জরুরি রোগী পরিবহনের জন্যও ব্যবহার করা হবে।
নৌকায় রাখা হলো—
প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্স, অক্সিজেন সিলিন্ডার, জরুরি ওষুধ এবং একটি শক্তিশালী আলো।
উদ্বোধনের দিন অভি গদাধর মাঝির হাতে নৌকার প্রথম দাঁড়টি তুলে দিল।
গদাধরের চোখে জল এসে গেল।
— “আমি তো ভাবিনি আমার ছোট্ট নৌকার আলো এত দূর যাবে।”
অভি বলল,
— “আলো কখনও এক জায়গায় থাকে না কাকা। একজন জ্বালালে অন্যজন তা নিয়ে এগিয়ে যায়।”
শেষ রাত
কয়েক বছর পর গদাধর মাঝি অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
এক শীতের রাতে তিনি বিছানায় শুয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন।
দূরে নদীর ওপারে একটি আলো দেখা যাচ্ছিল।
তিনি ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন,
— “ওটা কী?”
ছেলে বলল,
— “নতুন আলোর নৌকা। আজও একজন রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে।”
গদাধর মৃদু হাসলেন।
চোখ বন্ধ করে বললেন,
— “তাহলে আলোটা এখনও জ্বলছে।”
সেটাই ছিল তাঁর শেষ কথা।
আজ চরনদীর নদীতে রাত নামলে একসঙ্গে অনেক আলো দেখা যায়।
একটি নৌকা এপারে আসে।
আরেকটি ওপারে যায়।
কেউ বাজার থেকে ফেরে।
কেউ হাসপাতালে যায়।
কেউ বাড়ি ফিরছে।
কিন্তু গ্রামের মানুষ জানে—
এই সব আলোর শুরু হয়েছিল একটি ছোট্ট কেরোসিনের বাতি থেকে।
একজন মানুষ নিজের হারানো জীবনের কষ্টকে অন্য মানুষের বাঁচার আশায় পরিণত করেছিলেন।
নদীর ওপারে আজও সন্ধ্যার পর আলো জ্বলে।
আর সেই আলো যেন দূর থেকে বলে—
“অন্ধকার যত গভীরই হোক, একজন মানুষের ছোট্ট সাহসও অন্য কারও কাছে পথের দিশা হয়ে উঠতে পারে।”
নদী বয়ে চলে।
সময়ও বয়ে চলে।
মানুষ আসে, মানুষ চলে যায়।
কিন্তু কিছু আলো—
নদীর ওপারেও পৌঁছে যায়।
সমাপ্ত। ❤️

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *