
বীরভূমের এক ছোট্ট গ্রাম কুসুমপুর। গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে একটি মাটির বাড়িতে থাকত সুমন। বয়স মাত্র চৌদ্দ। বাবা ছিলেন দিনমজুর, মা অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন।
সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী।
কখনও চাল শেষ হয়ে যেত, কখনও রান্নার তেল। তবুও সুমনের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ছিল অসীম।
তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল—
একদিন সে ডাক্তার হবে।
কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে ছোট ছোট অনেক বাধা ছিল।
তার মধ্যে সবচেয়ে বড় ছিল একটি জোড়া জুতো।
ছেঁড়া জুতো
সুমনের স্কুল বাড়ি থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে।
প্রতিদিন সে সেই রাস্তা হেঁটে স্কুলে যেত।
তার পায়ে ছিল বাবার পুরোনো জুতো।
জুতোর সামনের অংশ ছিঁড়ে গিয়েছিল।
বর্ষায় তার ভেতরে জল ঢুকত।
শীতে ঠান্ডা মাটি পায়ে লাগত।
একদিন স্কুলের কয়েকজন ছাত্র তাকে দেখে হাসতে লাগল।
— “এই সুমন, তোর জুতোটা তো কথা বলছে!”
আরেকজন বলল,
— “এটা জুতো নয়, জালের মতো!”
সুমন কিছু বলল না।
সে শুধু মাথা নিচু করে শ্রেণিকক্ষে ঢুকে গেল।
শিক্ষকের নজরে
তাদের বিজ্ঞান শিক্ষক ছিলেন অরিন্দম স্যার।
তিনি লক্ষ্য করলেন, সুমন সবসময় ক্লাসে প্রথম বেঞ্চে বসে, কিন্তু পা দুটো বেঞ্চের নিচে লুকিয়ে রাখে।
একদিন স্কুল ছুটির পর স্যার তাকে ডাকলেন।
— “সুমন, তোমার জুতোর কী হয়েছে?”
সুমন চুপ।
— “বলতে লজ্জা করছে?”
সে আস্তে বলল,
— “বাবার পুরোনো জুতো স্যার। নতুন জুতো কেনার টাকা নেই।”
অরিন্দম স্যার কিছু বললেন না।
পরদিন তিনি সুমনকে একটি নতুন জোড়া জুতো দিলেন।
সুমন অবাক হয়ে বলল,
— “স্যার, আমি এটা নিতে পারব না।”
— “কেন?”
— “আমি দয়া নিতে চাই না।”
স্যার মৃদু হেসে বললেন,
— “এটা দয়া নয়। এটা তোমার স্বপ্নের পথে একটু সাহায্য।”
সুমনের চোখে জল এসে গেল।
আরেকটি শিক্ষা
নতুন জুতো পরে প্রথম দিন স্কুলে যাওয়ার সময় সুমন খুব আনন্দ পেল।
কিন্তু স্কুলের গেটের কাছে সে দেখল, আরেকজন ছাত্র—রাকেশ—খালি পায়ে দাঁড়িয়ে আছে।
রাকেশের জুতো হারিয়ে গেছে।
সুমন নিজের জুতোর দিকে তাকাল।
তারপর রাকেশের দিকে।
সে নিজের জুতোর ফিতে খুলতে শুরু করল।
রাকেশ অবাক।
— “কী করছিস?”
সুমন বলল,
— “তুই এটা পর।”
— “আর তুই?”
সুমন হেসে বলল,
— “আমি তো চার কিলোমিটার খালি পায়ে হেঁটেও স্কুলে আসতে পারি।”
রাকেশ জুতো নিতে চাইছিল না।
ঠিক তখন অরিন্দম স্যার দূর থেকে সব দেখছিলেন।
তিনি এগিয়ে এসে বললেন,
— “আজ তোমরা দুজনেই আমার কাছে পাশ করেছ।”
স্বপ্নের পরীক্ষা
মাধ্যমিক পরীক্ষা সামনে।
সুমন দিনরাত পড়াশোনা করতে লাগল।
রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে সে কেরোসিনের আলোয় পড়ত।
মা বলতেন,
— “এত পড়িস না বাবা, চোখ নষ্ট হয়ে যাবে।”
সুমন বলত,
— “মা, আমার চোখে তো একটা স্বপ্ন আছে।”
পরীক্ষার দিনও তার পুরোনো ব্যাগ, সাধারণ জামা আর সেই জোড়া জুতো।
কিন্তু আত্মবিশ্বাস ছিল পাহাড়ের মতো।
ফল প্রকাশ
ফল বেরোনোর দিন স্কুলের সামনে ভিড়।
সুমন শুধু নিজের ফল দেখেনি।
সে পুরো জেলার ফলের তালিকায় নিজের নাম দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল।
সুমন — প্রথম।
অরিন্দম স্যার তাকে জড়িয়ে ধরলেন।
সুমন কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— “স্যার, আমি পেরেছি!”
স্যার বললেন,
— “আমি তো জানতাম।”
বড় শহরে
সুমন শহরের মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলো।
সেখানে পড়াশোনা সহজ ছিল না।
অনেক বড় বড় বাড়ির ছেলে-মেয়ের সঙ্গে পড়তে হতো।
কিন্তু সুমন কখনও নিজের গ্রামের দিনগুলো ভুলে যায়নি।
সে প্রতিদিন ভোরে উঠে পড়ত।
একদিন তার সহপাঠী জিজ্ঞেস করল,
— “তুই এত পরিশ্রম করিস কেন?”
সুমন বলল,
— “কারণ আমার কাছে সময় নষ্ট করার বিলাসিতা নেই।”
ডাক্তার সুমন
বহু বছর পরে সুমন ডাক্তার হলো।
শহরে ভালো চাকরির সুযোগ ছিল।
কিন্তু সে নিজের গ্রামে ফিরে গেল।
গ্রামের মানুষের চিকিৎসার জন্য একটি ছোট ক্লিনিক খুলল।
দরিদ্র রোগীদের কাছ থেকে টাকা নিত না।
ক্লিনিকের দরজার সামনে একটি জোড়া পুরোনো ছেঁড়া জুতো রাখা ছিল।
লোকেরা জিজ্ঞেস করত,
— “এগুলো কেন?”
সুমন হাসত।
— “ওগুলো আমার সবচেয়ে বড় শিক্ষক।”
একদিন অরিন্দম স্যার বৃদ্ধ হয়ে সেই ক্লিনিকে এলেন।
সুমন তাঁকে দেখে দৌড়ে এসে প্রণাম করল।
স্যার জুতোগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “এগুলো এখনও রেখেছিস?”
সুমন বলল,
— “স্যার, আমি যদি এগুলো ভুলে যাই, তাহলে হয়তো ভুলে যাব আমি কোথা থেকে এসেছি।”
স্যার বললেন,
— “তুই শুধু ডাক্তার হোসনি। মানুষও হয়েছিস।”
সুমন পরে গ্রামের দরিদ্র ছাত্রদের জন্য একটি বৃত্তি চালু করল।
বৃত্তির নাম দিল—
“ছেঁড়া জুতোর স্বপ্ন”।
প্রতি বছর গ্রামের এমন ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার খরচ দেওয়া হতো, যারা অভাবের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার অবস্থায় ছিল।
প্রথম দিন বৃত্তি দেওয়ার সময় সুমন একটি শিশুর হাতে নতুন জুতো তুলে দিল।
শিশুটি আনন্দে বলল,
— “ডাক্তারদা, আমি বড় হয়ে কী হব জানো?”
সুমন হাসল।
— “কী?”
— “আমি তোমার মতো ডাক্তার হব।”
সুমন শিশুটির মাথায় হাত রেখে বলল,
— “তাহলে আজ থেকেই স্বপ্ন দেখা শুরু কর।”
সন্ধ্যায় ক্লিনিক বন্ধ করার আগে সুমন প্রতিদিন সেই পুরোনো ছেঁড়া জুতোর দিকে তাকায়।
তার মনে পড়ে যায়—
চার কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা,
বর্ষার কাদা,
সহপাঠীদের হাসি,
অরিন্দম স্যারের দেওয়া নতুন জুতো,
আর সেই দিনের কথা, যখন সে নিজের জুতো খুলে অন্য বন্ধুকে দিয়েছিল।
সে বুঝেছে—
জীবনে বড় হওয়া মানে শুধু নিজের পায়ে নতুন জুতো পরা নয়।
বরং এমনভাবে এগিয়ে যাওয়া,
যাতে পথের পিছনে থাকা আরেকজনের পায়েও জুতো ওঠে।
সমাপ্ত। ❤️
গল্প : ছেঁড়া জুতোর স্বপ্ন।।












Leave a Reply