গল্প : মায়ের পুরোনো ছাতা।।

পুরুলিয়ার এক ছোট্ট গ্রাম কাঁকড়াডাঙা। বর্ষাকালে এই গ্রামের মাটির রাস্তা কাদায় ভরে যেত। দূরের স্কুলে যেতে হলে গ্রামের ছেলেমেয়েদের প্রায় দুই কিলোমিটার পথ হাঁটতে হতো।
সেই গ্রামেরই এক দরিদ্র পরিবারে থাকত অর্ক।
অর্কের বাবা ছিলেন রাজমিস্ত্রির জোগাড়ে। মা মালতী সেলাই করে সংসারে সাহায্য করতেন।
তাদের বাড়িতে দামি কোনো জিনিস ছিল না।
তবে একটি জিনিস মালতী খুব যত্ন করে রাখতেন—
একটি পুরোনো কালো ছাতা।
ছাতাটির কাপড় বহু জায়গায় জোড়া লাগানো।
হাতলটিও একবার ভেঙে গিয়েছিল।
তবু মালতী ছাতাটিকে ফেলে দেননি।
ছাতার গল্প
একদিন অর্ক জিজ্ঞেস করল,
— “মা, এই ছাতাটা ফেলে দাও না। এত পুরোনো!”
মালতী হেসে বললেন,
— “এটা শুধু ছাতা নয় রে।”
— “তাহলে?”
— “তোর বাবার দেওয়া প্রথম জিনিস।”
অর্ক অবাক হয়ে তাকাল।
মালতী বললেন,
— “তুই যখন খুব ছোট, একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টিতে তোর বাবা এই ছাতাটা কিনে এনেছিল। বলেছিল, ‘তুমি আর ছেলেকে নিয়ে যেন ভিজতে না হয়।'”
তারপর থেকে ছাতাটি তাদের পরিবারের অংশ হয়ে গেছে।
অর্কের স্বপ্ন
অর্ক পড়াশোনায় ভালো ছিল।
তার স্বপ্ন ছিল শিক্ষক হওয়া।
কিন্তু বাড়ির অবস্থা খুব খারাপ।
একদিন বাবা বললেন,
— “অর্ক, পড়াশোনার পাশাপাশি একটু কাজ করবি? সংসারে হাত লাগবে।”
অর্ক চুপ করে রইল।
মালতী বললেন,
— “ওকে পড়তে দাও। ওর স্বপ্নটা নষ্ট কোরো না।”
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— “আমি স্বপ্নের বিরুদ্ধে নই। কিন্তু পেটের কথাও তো ভাবতে হয়।”
সেই বৃষ্টির দিন
একদিন অর্ক স্কুল থেকে ফিরছিল।
আকাশ কালো।
হঠাৎ প্রবল বৃষ্টি শুরু হলো।
তার হাতে কোনো ছাতা ছিল না।
রাস্তার পাশে একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে সে দেখল—
একজন বৃদ্ধা মহিলা ভিজতে ভিজতে হাঁটছেন।
অর্ক দৌড়ে গেল।
তার ব্যাগ থেকে মায়ের পুরোনো ছাতাটি বের করল।
সে সেদিন সকালে ছাতাটি নিয়ে বেরিয়েছিল।
বৃদ্ধাকে ছাতার নিচে নিয়ে বলল,
— “ঠাকুমা, আপনি এটা নিন।”
বৃদ্ধা বললেন,
— “তুমি?”
— “আমি দৌড়ে বাড়ি চলে যাব।”
বৃদ্ধা ছাতা নিতে চাইছিলেন না।
অর্ক বলল,
— “মা বলেছে, বৃষ্টিতে কাউকে একা ভিজতে দিতে নেই।”
বৃদ্ধার চোখে জল এসে গেল।
বাড়ি ফিরে
অর্ক ভিজে বাড়ি ফিরল।
মালতী ছেলেকে দেখে বুঝলেন ছাতা নেই।
— “ছাতাটা কোথায়?”
অর্ক সব কথা বলল।
মালতী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
— “আজ তুই ছাতাটা হারাসনি। তুই ছাতাটার আসল কাজটা করেছিস।”
অপ্রত্যাশিত মানুষ
পরদিন সকালে তাদের বাড়িতে একজন অপরিচিত ভদ্রলোক এলেন।
তিনি সেই বৃদ্ধার ছেলে।
তিনি অর্ককে ধন্যবাদ জানালেন।
তারপর বললেন,
— “আপনার ছেলে আমার মাকে বাঁচিয়েছে।”
অর্ক বলল,
— “আমি তো শুধু ছাতা দিয়েছিলাম।”
ভদ্রলোক বললেন,
— “কখনও কখনও একটি ছাতাও মানুষের কাছে অনেক বড় সাহায্য হয়ে ওঠে।”
তিনি জানতে পারলেন অর্কের পড়াশোনার কথা।
তিনি একটি শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করে দিলেন।
নতুন পথ
অর্ক উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেল।
বছরের পর বছর পরিশ্রম করে সে শিক্ষক হলো।
তার প্রথম চাকরি পেল নিজের গ্রামের কাছের একটি স্কুলে।
প্রথম দিন ক্লাসে ঢুকে সে ছাত্রদের বলল,
— “তোমরা যদি কখনও ভাবো, তোমাদের কাছে কিছু নেই, তাহলে ভুল ভাববে।”
একজন ছাত্র জিজ্ঞেস করল,
— “স্যার, কিছু না থাকলে কী করে বড় হওয়া যায়?”
অর্ক জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— “স্বপ্ন থাকলে পথ তৈরি হয়। আর মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মন থাকলে সেই পথ কখনও একা হতে হয় না।”
মায়ের ছাতা ফিরে এল
বহু বছর পর অর্ক সেই বৃদ্ধার বাড়িতে গেল।
তিনি তখন খুব বৃদ্ধ।
অর্ককে দেখে চিনতে পারলেন।
বৃদ্ধা বললেন,
— “তুই সেই ছেলেটা?”
অর্ক হেসে বলল,
— “হ্যাঁ ঠাকুমা।”
তিনি ঘরের ভেতর থেকে একটি কাপড়ে মোড়া জিনিস নিয়ে এলেন।
খুলতেই অর্ক অবাক।
মায়ের সেই পুরোনো ছাতা।
বৃদ্ধা বললেন,
— “তুমি সেদিন আমাকে দিয়েছিলে। আমি যত্ন করে রেখেছিলাম। আজ এটা তোমার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দাও।”
অর্ক ছাতাটি নিয়ে বাড়ি ফিরল।
মালতী ছাতাটি দেখে অনেকক্ষণ কিছু বললেন না।
তারপর চোখের জল মুছে বললেন,
— “দেখলি? ভালোবাসা কখনও হারিয়ে যায় না।”
কয়েক বছর পরে অর্ক নিজের স্কুলে একটি নিয়ম চালু করল।
বর্ষাকালে স্কুলের সামনে একটি বড় বাক্স রাখা থাকত।
যে ছাত্রের ছাতা নেই, সে সেখান থেকে ছাতা নিতে পারত।
ছাত্ররা নিজেদের পুরোনো কিন্তু ভালো ছাতা সেখানে দিয়ে যেত।
বাক্সটির ওপর লেখা ছিল—
“একটি ছাতা রেখে যান, কারও ভেজা পথ শুকিয়ে দিন।”
প্রতি বর্ষায় বাক্সটি ভরে উঠত।
কেউ ছাতা দিত।
কেউ রেইনকোট।
কেউ জুতো।
কেউ শুধু একটি শুকনো তোয়ালে।
অর্ক দূর থেকে দাঁড়িয়ে সব দেখত।
তার মনে পড়ত মায়ের পুরোনো ছাতাটির কথা।
সে বুঝেছিল—
একটি পুরোনো ছাতা শুধু বৃষ্টি আটকায় না।
কখনও কখনও তা একজন মানুষের জীবনের পথও বদলে দিতে পারে।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে অর্ক ছাতাটি আলমারি থেকে বের করল।
মা তখন বার্ধক্যে পৌঁছেছেন।
অর্ক বলল,
— “মা, এটা এখনও রেখে দিয়েছ?”
মালতী হাসলেন।
— “তুই তো রেখে দিয়েছিস।”
— “কোথায়?”
মা জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,
— “মানুষের মনে।”
বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছিল।
অর্ক ছাতাটি হাতে নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়াল।
দূরে কয়েকজন স্কুলছাত্র বৃষ্টিতে ছুটছে।
সে ছাতাটি খুলে তাদের দিকে এগিয়ে গেল।
কারণ সে জানত—
কোনো একদিন তার মাও ঠিক এইভাবেই একটি ছাতা খুলে তাকে বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন।
আর সেই ভালোবাসার ছায়া—
আজও শেষ হয়নি।
সমাপ্ত। ☔❤️️

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *