গল্প : বৃষ্টিভেজা স্টেশনের ছেলেটি।।

বর্ধমানের কাছাকাছি একটি ছোট্ট স্টেশন—কৃষ্ণনগর রোড। স্টেশনটি বড় নয়। দিনে কয়েকটি লোকাল ট্রেন আর রাতে দু-একটি দূরপাল্লার ট্রেন সেখানে থামত।
স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে একটি পুরোনো বেঞ্চ ছিল। সেই বেঞ্চটির পাশে প্রায়ই দেখা যেত একটি কিশোরকে।
তার নাম রবি।
বয়স তেরো-চৌদ্দ।
পরনে মলিন জামা, হাতে একটি পুরোনো কাপড়ের ব্যাগ।
স্টেশনের লোকেরা জানত না, সে কোথা থেকে এসেছে।
শুধু জানত—
প্রতিদিন সন্ধ্যায় সে একটি নির্দিষ্ট ট্রেনের অপেক্ষা করে।
অপেক্ষার শুরু
স্টেশনের চা-দোকানি হরিপদ কাকা একদিন রবিকে জিজ্ঞেস করলেন,
— “কাকে অপেক্ষা করিস?”
রবি বলল,
— “বাবাকে।”
— “তোর বাবা কোথায়?”
— “ট্রেনে কাজ করত।”
— “কোন ট্রেনে?”
রবি দূরে তাকিয়ে বলল,
— “জানি না।”
তারপর আর কিছু বলল না।
হরিপদ কাকা তাকে চা-বিস্কুট খেতে দিলেন।
বৃষ্টির রাত
একদিন বর্ষার সন্ধ্যায় প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হলো।
স্টেশনের ছাদ থেকেও জল পড়ছে।
সবাই আশ্রয় নিয়েছে।
রবি সেই বেঞ্চেই বসে আছে।
হরিপদ কাকা বললেন,
— “আজ বাড়ি যা।”
রবি মাথা নাড়ল।
— “আজ বাবা আসবে।”
— “কী করে জানিস?”
রবি পকেট থেকে একটি পুরোনো কাগজ বের করল।
তাতে লেখা—
“শুক্রবার রাতের ট্রেনে ফিরব। অপেক্ষা করিস।”
তারিখ বহু পুরোনো।
হরিপদ কাকা কাগজটির দিকে তাকিয়ে বুঝলেন, ছেলেটি হয়তো বহুদিন ধরে অপেক্ষা করছে।
রহস্য
সেদিন রাতের শেষ ট্রেন চলে যাওয়ার পরও রবি প্ল্যাটফর্মে বসে রইল।
হরিপদ কাকা তাকে নিজের দোকানের ভেতর নিয়ে গেলেন।
— “সব কথা আমাকে বল।”
রবি ধীরে ধীরে বলল,
তার বাবা আগে একটি রেলওয়ে ক্যাটারিং কোম্পানিতে কাজ করতেন।
একদিন কাজে বেরিয়ে আর বাড়ি ফেরেননি।
কেউ বলেছিল, অন্য শহরে চলে গেছেন।
কেউ বলেছিল, দুর্ঘটনা হয়েছে।
কোনোটাই নিশ্চিত ছিল না।
বাবা যাওয়ার আগে শুধু বলেছিলেন—
— “আমি ফিরে আসব।”
সেই কথাটাই রবি বিশ্বাস করে বসে আছে।
একটি সূত্র
পরদিন হরিপদ কাকা সিদ্ধান্ত নিলেন, রবির বাবাকে খুঁজে বের করবেন।
তিনি রেলস্টেশনের পুরোনো কর্মীদের সঙ্গে কথা বললেন।
একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মী বললেন,
— “কয়েক বছর আগে এমন একজন কর্মী ছিল। নাম ছিল রমেশ।”
তিনি আরও জানালেন, রমেশ এক দুর্ঘটনার পর কাজ ছেড়ে দিয়েছিলেন।
তারপর নাকি একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে ছিলেন।
কিন্তু কোথায়, কেউ জানত না।
খোঁজ শুরু
হরিপদ কাকা ও স্টেশনের স্টেশনমাস্টার মিলে খোঁজ শুরু করলেন।
পুরোনো নথি ঘাঁটলেন।
অবশেষে একটি ঠিকানা পাওয়া গেল।
একটি ছোট শহরের একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে বহু বছর আগে রমেশ দাস নামে একজন মানুষ ছিলেন।
রবি শুনে বলল,
— “ওটাই আমার বাবা!”
যাত্রা
হরিপদ কাকা রবিকে সঙ্গে নিয়ে সেই শহরে গেলেন।
পুনর্বাসন কেন্দ্রে গিয়ে তাঁরা জানতে পারলেন, রমেশ কয়েক বছর আগে সেখান থেকে চলে গেছেন।
তবে তিনি কোথায় গেছেন, তার একটি সূত্র পাওয়া গেল।
একজন কর্মী বললেন,
— “তিনি একটি মন্দিরের আশ্রমে কাজ করতেন।”
আবার শুরু হলো খোঁজ।
দুদিন পর তাঁরা একটি ছোট্ট আশ্রমে পৌঁছালেন।
সেখানে এক বৃদ্ধ মানুষ রান্নাঘরে কাজ করছিলেন।
রবি দূর থেকে তাঁকে দেখেই থেমে গেল।
— “বাবা…”
মানুষটি ঘুরে তাকালেন।
কয়েক সেকেন্ড দুজনের চোখে চোখ।
তারপর বৃদ্ধ মানুষটি দৌড়ে এসে রবিকে জড়িয়ে ধরলেন।
বাবার গল্প
রমেশ কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
— “আমি তোকে অনেক খুঁজেছি।”
রবি বলল,
— “তাহলে বাড়ি ফিরলে না কেন?”
রমেশ মাথা নিচু করে বললেন,
— “আমি ভেবেছিলাম, তোরা আমাকে মৃত মনে করিস।”
দুর্ঘটনার পর তাঁর স্মৃতির অনেকটা অংশ হারিয়ে গিয়েছিল।
পরিবারের ঠিকানা মনে ছিল না।
পরে কিছু স্মৃতি ফিরলেও তিনি নিশ্চিত ছিলেন না, কীভাবে বাড়ি ফিরবেন।
তাই একটি আশ্রমে থেকে কাজ করতে শুরু করেছিলেন।
রবি কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— “আমি তো প্রতিদিন তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি।”
রমেশ তার মাথায় হাত রেখে বললেন,
— “আজ থেকে আর অপেক্ষা করতে হবে না।”
স্টেশনে ফিরে আসা
কয়েকদিন পর বাবা-ছেলে আবার সেই ছোট্ট স্টেশনে এল।
হরিপদ কাকা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
রবিকে দেখে তিনি হাসলেন।
— “পেয়ে গেলি?”
রবি বাবার হাত ধরে বলল,
— “হ্যাঁ কাকা।”
হরিপদ কাকার চোখে জল এসে গেল।
তিনি রমেশকে বললেন,
— “আপনার ছেলে অনেক সাহসী। এতদিন আপনাকে বিশ্বাস করে অপেক্ষা করেছে।”
রমেশ বললেন,
— “ও আমার ছেলে নয়, ও আমার শিক্ষক।”
শেষ ট্রেন
সেদিন রাতে বাবা-ছেলে বাড়ি ফেরার ট্রেনে উঠল।
রবি জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে ছিল।
স্টেশন ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে।
হরিপদ কাকা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছেন।
রবি জানালার কাঁচে হাত রাখল।
তার চোখে জল।
কিন্তু এবার সেই জল অপেক্ষার নয়—
ফিরে পাওয়ার আনন্দের।
ট্রেন অন্ধকারের মধ্যে এগিয়ে চলল।
রমেশ ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন,
— “তুই এতদিন আমার জন্য অপেক্ষা করেছিস?”
রবি মৃদু হেসে বলল,
— “তুমি বলেছিলে ফিরে আসবে। আমি তোমার কথায় বিশ্বাস করেছিলাম।”
রমেশ চোখ মুছে বললেন,
— “মানুষের জীবনে সবকিছু হারিয়ে গেলেও যদি বিশ্বাসটা থেকে যায়, তাহলে একদিন না একদিন পথ খুলে যায়।”
বহু বছর পর সেই স্টেশনে রবি আবার ফিরে এসেছিল।
ততদিনে সে বড় হয়েছে।
নিজের বাবার মতো রেলওয়েতে চাকরি নিয়েছে।
হরিপদ কাকা তখন বৃদ্ধ।
রবি তাঁর দোকানে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
— “কাকা, চিনতে পারছেন?”
হরিপদ কাকা চোখ কুঁচকে তাকিয়ে হেসে ফেললেন।
— “এই চোখ কি তোকে ভুলতে পারে?”
রবি বলল,
— “আমি আজ রেলওয়ের কর্মী।”
হরিপদ কাকা বললেন,
— “তাহলে তোর অপেক্ষার শেষ হয়েছে।”
রবি প্ল্যাটফর্মের সেই পুরোনো বেঞ্চটির দিকে তাকাল।
বেঞ্চটি এখনও আছে।
সে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর স্টেশনের দেওয়ালে একটি ছোট ফলক লাগিয়ে দিল—
“যে মানুষ অপেক্ষা করতে জানে, সে ফিরে আসার পথও বিশ্বাস করতে জানে।”
সন্ধ্যার আকাশে তখন বৃষ্টি নামছিল।
প্ল্যাটফর্মের আলো জ্বলছিল।
একটি ট্রেন ধীরে ধীরে স্টেশনে ঢুকল।
রবি হেসে তাকিয়ে রইল।
একসময় এই ট্রেনগুলোর দিকে সে তাকিয়ে থাকত বাবাকে খুঁজতে।
আজ সে জানে—
সব ট্রেন কাউকে নিয়ে যায় না।
কিছু ট্রেন—
কাউকে বাড়িও ফিরিয়ে আনে।
সমাপ্ত। ️❤️

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *