
Oplus_131072
ডিমের মুঘলাই পরোটা কলকাতার অন্যতম পরিচিত ও জনপ্রিয় খাবার। বাইরে মুচমুচে পরোটার স্তর, ভিতরে ডিম, পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা, ধনেপাতা ও মশলার সুস্বাদু পুর—সব মিলিয়ে এটি যেমন পেট ভরানো খাবার, তেমনই স্বাদেও অসাধারণ।
অনেকে মনে করেন মুঘলাই পরোটা তৈরি করা বেশ কঠিন। আসলে কয়েকটি বিষয় ঠিকভাবে মেনে চললে বাড়িতেই খুব সহজে রেস্তোরাঁ বা দোকানের মতো মুঘলাই পরোটা তৈরি করা যায়।
উপকরণ
পরোটার জন্য
- ময়দা — ২ কাপ
- লবণ — ½ চা চামচ
- চিনি — ½ চা চামচ
- সাদা তেল — ২ টেবিল চামচ
- জল — প্রয়োজনমতো
- অতিরিক্ত ময়দা — বেলার জন্য
ডিমের পুরের জন্য
- ডিম — ৪টি
- পেঁয়াজ — ২টি মাঝারি, খুব কুচি করা
- কাঁচালঙ্কা — ৩–৪টি, কুচি করা
- ধনেপাতা — ৩ টেবিল চামচ, কুচি করা
- আদা — ১ চা চামচ, কুচি করা
- লাল লঙ্কার গুঁড়ো — ½ চা চামচ
- গোলমরিচের গুঁড়ো — ¼ চা চামচ
- গরম মশলার গুঁড়ো — ¼ চা চামচ
- লবণ — স্বাদ অনুযায়ী
- চাট মশলা — ½ চা চামচ
- কাঁচা লঙ্কার সস — ১ চা চামচ, ইচ্ছেমতো
- কুচি করা কাঁচা পেঁয়াজ — সামান্য
ভাজার জন্য
- সাদা তেল বা সাদা তেল ও সামান্য ঘি — প্রয়োজনমতো
ধাপ ১: ময়দার মণ্ড তৈরি
একটি বড় পাত্রে ময়দা নিন।
এর সঙ্গে লবণ, চিনি ও দুই টেবিল চামচ সাদা তেল দিন।
হাত দিয়ে ময়দার সঙ্গে তেল ভালোভাবে মিশিয়ে নিন।
এরপর অল্প অল্প করে জল দিয়ে নরম মণ্ড তৈরি করুন।
মণ্ডটি খুব শক্ত করবেন না। মুঘলাই পরোটার জন্য নরম ও মসৃণ মণ্ড দরকার।
প্রায় ৭–৮ মিনিট ভালোভাবে মেখে নিন।
মণ্ডের উপর সামান্য তেল মাখিয়ে ঢেকে অন্তত ২০–৩০ মিনিট রেখে দিন।
এতে ময়দা নরম হবে এবং পরোটা সহজে পাতলা করে বেলা যাবে।
ধাপ ২: ডিমের মিশ্রণ তৈরি
একটি বড় বাটিতে চারটি ডিম ভেঙে নিন।
ডিম ভালোভাবে ফেটিয়ে নিন।
এর মধ্যে কুচি করা পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা, ধনেপাতা ও আদা দিয়ে দিন।
এবার লবণ, লাল লঙ্কার গুঁড়ো, গোলমরিচের গুঁড়ো, গরম মশলার গুঁড়ো এবং চাট মশলা যোগ করুন।
চাইলে সামান্য কাঁচা লঙ্কার সস দিতে পারেন।
সব উপকরণ ডিমের সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে রাখুন।
মনে রাখবেন, ডিমের মিশ্রণটি আগে থেকে অনেকক্ষণ রেখে না দিয়ে পরোটা ভাজার ঠিক আগে তৈরি করাই ভালো।
ধাপ ৩: পরোটা বেলা
মণ্ড থেকে একটি মাঝারি আকারের লেচি কেটে নিন।
হাতে সামান্য তেল মেখে লেচিটি গোল করুন।
এরপর অল্প ময়দা ছড়িয়ে খুব পাতলা করে বেলুন।
মুঘলাই পরোটার বিশেষত্ব হলো এর বাইরের অংশ যতটা সম্ভব পাতলা ও বড় হওয়া।
তবে একেবারে কাগজের মতো পাতলা করার দরকার নেই। পাতলা কিন্তু ছিঁড়ে না যাওয়ার মতো রাখতে হবে।
ধাপ ৪: ডিমের মিশ্রণ দেওয়া
বেলা পরোটা একটি সমতল জায়গায় রাখুন।
পরোটার মাঝখানে ডিমের মিশ্রণের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ঢেলে দিন।
চামচ দিয়ে সামান্য ছড়িয়ে দিন।
খুব বেশি ডিমের মিশ্রণ দেবেন না। বেশি দিলে ভাঁজ করার সময় ডিম বাইরে বেরিয়ে যেতে পারে।
ধাপ ৫: পরোটা ভাঁজ করা
এবার পরোটার চারটি দিক মাঝখানের দিকে ভাঁজ করে দিন।
প্রথমে নিচের দিকটি ভাঁজ করুন।
তারপর উপরের দিকটি ভাঁজ করুন।
এরপর ডান ও বাঁ দিক ভাঁজ করে একটি চৌকো প্যাকেটের মতো তৈরি করুন।
ভাঁজ করার সময় আলতো হাতে কাজ করবেন, যাতে ডিমের মিশ্রণ বাইরে বেরিয়ে না আসে।
ধাপ ৬: মুঘলাই পরোটা ভাজা
চুলায় একটি সমতল তাওয়া বা ভারী কড়াই বসিয়ে মাঝারি আঁচে গরম করুন।
তাতে সামান্য তেল দিন।
ভাঁজ করা পরোটাটি সাবধানে তাওয়ার উপর রাখুন।
প্রথমে এক পাশ ভাজুন।
নিচের অংশ কিছুটা শক্ত হয়ে গেলে সাবধানে উল্টে দিন।
এবার চারপাশে অল্প অল্প করে তেল দিন।
মাঝারি আঁচে ধীরে ধীরে ভাজুন।
পরোটার বাইরের অংশ যখন সোনালি ও খাস্তা হতে শুরু করবে, তখন আবার উল্টে দিন।
দুই পাশ সমানভাবে সোনালি হয়ে গেলে বুঝবেন পরোটা তৈরি হয়ে গেছে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল
দোকানের মতো মুঘলাই পরোটা বানাতে চাইলে আঁচ খুব বেশি রাখবেন না।
খুব বেশি আঁচে বাইরের ময়দা দ্রুত বাদামি হয়ে যাবে, কিন্তু ভিতরের ডিম পুরোপুরি রান্না নাও হতে পারে।
মাঝারি আঁচে ধীরে রান্না করলে ডিম ভালোভাবে জমবে এবং পরোটার বাইরের অংশও সুন্দর খাস্তা হবে।
ধাপ ৭: কেটে পরিবেশন
গরম মুঘলাই পরোটা তাওয়া থেকে নামিয়ে ১–২ মিনিট রেখে দিন।
এরপর ছুরি দিয়ে চৌকো বা ত্রিভুজ আকারে কেটে নিন।
একটি প্লেটে পরোটার টুকরোগুলো সাজিয়ে পরিবেশন করুন।
কীসের সঙ্গে পরিবেশন করবেন?
মুঘলাই পরোটা সাধারণত বিভিন্ন ধরনের সাইড ডিশের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়।
আপনি পরিবেশন করতে পারেন—
- কাসুন্দি
- টমেটো সস
- কাঁচা পেঁয়াজ
- শসা
- কাঁচালঙ্কা
- শসা-পেঁয়াজের সালাদ
- মশলাদার আলুর তরকারি
এক কাপ গরম চা বা কফির সঙ্গে বিকেলের জলখাবার হিসেবেও এটি দারুণ।
মুঘলাই পরোটা মুচমুচে করার টিপস
১. মণ্ড নরম রাখুন
শক্ত মণ্ড হলে পরোটা ভালোভাবে পাতলা করা যাবে না।
২. ময়দা মেখে বিশ্রাম দিন
কমপক্ষে ২০–৩০ মিনিট মণ্ড ঢেকে রাখলে পরোটা বেশি নরম ও সহজে বেলতে পারবেন।
৩. পেঁয়াজ খুব কুচি করুন
বড় টুকরো পেঁয়াজ দিলে ভাঁজ করার সময় সমস্যা হতে পারে।
৪. ডিমের মিশ্রণ বেশি দেবেন না
অতিরিক্ত ডিম দিলে পরোটার প্যাকেট ছিঁড়ে যেতে পারে।
৫. মাঝারি আঁচে ভাজুন
এতে ভিতরের ডিম ভালোভাবে রান্না হবে এবং বাইরের পরোটা পুড়ে যাবে না।
৬. সামান্য ঘি ব্যবহার করুন
শেষ দিকে তেলের সঙ্গে অল্প ঘি ব্যবহার করলে পরোটায় সুন্দর সুগন্ধ আসে।
আরও সুস্বাদু করার কিছু উপায়
মুঘলাই পরোটার ডিমের মিশ্রণে চাইলে অল্প কুচি করা ক্যাপসিকাম যোগ করতে পারেন।
আরও মাংসল স্বাদ চাইলে সামান্য রান্না করা কিমা ব্যবহার করা যায়।
নিরামিষ স্বাদের কাছাকাছি রাখতে চাইলে ডিমের সঙ্গে বেশি ধনেপাতা, পেঁয়াজ ও কাঁচালঙ্কা ব্যবহার করতে পারেন।
চাইলে সামান্য ভাজা চিনাবাদাম কুচি যোগ করেও ভিন্ন ধরনের টেক্সচার তৈরি করা যায়।
সংরক্ষণ
মুঘলাই পরোটা সদ্য তৈরি অবস্থায় খাওয়াই সবচেয়ে ভালো।
আগে থেকে তৈরি করতে হলে সম্পূর্ণ ঠান্ডা করে বায়ুরোধী পাত্রে রাখতে পারেন। তবে দীর্ঘক্ষণ রেখে দিলে বাইরের মুচমুচে ভাব কমে যেতে পারে।
পরিবেশনের আগে তাওয়ায় অল্প আঁচে আবার গরম করলে স্বাদ অনেকটাই ফিরে আসে।
রান্নার সময়
- মণ্ড তৈরি — ১০ মিনিট
- মণ্ড বিশ্রাম — ২০–৩০ মিনিট
- ডিমের মিশ্রণ — ৫ মিনিট
- পরোটা তৈরি ও ভাজা — ২০ মিনিট
- মোট সময় — প্রায় ৫০–৬৫ মিনিট
কতজনের জন্য
এই উপকরণে সাধারণত ৪টি মাঝারি আকারের মুঘলাই পরোটা তৈরি হবে, যা ৩–৪ জনের জন্য যথেষ্ট।
পুষ্টির দিক
ডিম থেকে প্রোটিনসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। তবে মুঘলাই পরোটা তেল বা ঘি দিয়ে ভাজা হয় এবং ময়দা ব্যবহার করা হয়, তাই এটি তুলনামূলকভাবে ভারী খাবার। পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই ভালো।
শেষ কথা
ডিমের মুঘলাই পরোটা শুধুমাত্র একটি পরোটা নয়—এটি ডিম, মশলা, পেঁয়াজ এবং ময়দার এক অসাধারণ সমন্বয়। বাইরে খাস্তা পরোটা ভাঙতেই ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে নরম, মশলাদার ডিমের পুর।
বাড়িতে তৈরি করে সন্ধ্যার জলখাবার, রবিবারের বিশেষ নাশতা অথবা অতিথি আপ্যায়নে পরিবেশন করলে এটি সহজেই সবার পছন্দের হয়ে উঠতে পারে।












Leave a Reply