AI কি মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে? ভবিষ্যতের কর্মজগৎ নিয়ে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ অরিন্দম সেনের সঙ্গে মুখোমুখি।

কাল্পনিক বিশেষ সাক্ষাৎকার

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: বিশেষ প্রতিনিধি
স্থান: কলকাতা
ধরন: কাল্পনিক সাক্ষাৎকার

ভূমিকা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা Artificial Intelligence—সংক্ষেপে AI—বর্তমান বিশ্বের অন্যতম আলোচিত প্রযুক্তি। কয়েক বছর আগেও যে প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের কাছে অনেকটা কল্পবিজ্ঞানের বিষয় ছিল, আজ সেটিই ধীরে ধীরে ঢুকে পড়েছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে। মোবাইল ফোনের ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট থেকে শুরু করে অনলাইন অনুবাদ, চিকিৎসা-সহায়তা, ছবি তৈরি, ভিডিও সম্পাদনা, শিক্ষাক্ষেত্র, কৃষি, ব্যবসা, সংবাদমাধ্যম—সবখানেই AI-এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।

কিন্তু AI-এর অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে একটি প্রশ্নও ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে—এই প্রযুক্তি কি একদিন মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে?

কেউ মনে করেন AI মানুষের কাজকে সহজ করবে, নতুন কর্মসংস্থানের দরজা খুলবে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াবে। আবার অন্য একটি মহল আশঙ্কা করছে, বহু প্রচলিত কাজ ভবিষ্যতে মেশিন ও সফটওয়্যারের হাতে চলে যেতে পারে।

এই পরিবর্তন আসলে কোথায় নিয়ে যাবে সমাজকে? কোন পেশাগুলি বেশি পরিবর্তিত হবে? মানুষ কি AI-এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে, নাকি AI-কে সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করবে? আগামী প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীদের কী শেখা উচিত?

এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর জানতে আমরা কথা বলেছি কাল্পনিক প্রযুক্তি গবেষক ও ভবিষ্যৎ কর্মজগৎ বিশ্লেষক অরিন্দম সেনের সঙ্গে। দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারে তিনি AI-এর সম্ভাবনা, সীমাবদ্ধতা, চাকরির বাজার, শিক্ষা, সংবাদমাধ্যম, ব্যবসা এবং মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।


প্রশ্ন: প্রথমেই জানতে চাই, সাধারণ মানুষের জন্য AI আসলে কী?

অরিন্দম সেন: খুব সহজ ভাষায় বললে, AI এমন এক ধরনের প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে কম্পিউটার বা মেশিনকে মানুষের মতো কিছু কাজ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়। যেমন—তথ্য বিশ্লেষণ করা, ভাষা বোঝা, ছবি শনাক্ত করা, প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, বিভিন্ন তথ্য থেকে সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য পথ বের করা ইত্যাদি।

তবে AI-কে সরাসরি মানুষের মতো একটি “মস্তিষ্ক” ভাবলে ভুল হবে। AI মানুষের মতো অনুভূতি, অভিজ্ঞতা বা জীবনজ্ঞান নিয়ে জন্মায় না। এটি বিপুল পরিমাণ তথ্য থেকে নির্দিষ্ট প্যাটার্ন বা ধরণ শিখে কাজ করতে পারে।

আজ আমরা যে AI ব্যবহার করছি, তার একটি বড় অংশ মানুষের কাজকে দ্রুততর এবং সহজ করার জন্য তৈরি হয়েছে।


প্রশ্ন: AI নিয়ে মানুষের সবচেয়ে বড় ভয়—চাকরি চলে যাবে। এই আশঙ্কা কতটা যুক্তিযুক্ত?

অরিন্দম সেন: আশঙ্কাটিকে পুরোপুরি অমূলক বলা যাবে না। কারণ প্রযুক্তির ইতিহাস দেখলে আমরা দেখতে পাই, নতুন প্রযুক্তি আসার সঙ্গে সঙ্গে কিছু পুরনো কাজের ধরন পরিবর্তিত হয়েছে।

একসময় কারখানায় যে কাজ করতে অনেক শ্রমিক লাগত, পরে মেশিন এসে সেই কাজের একটি বড় অংশ করতে শুরু করেছে। কম্পিউটার আসার পর অফিসের বহু কাজের পদ্ধতি বদলে গেছে। ইন্টারনেট আসার পর ব্যবসা ও যোগাযোগের ধরন পাল্টেছে।

AI-ও একইভাবে কাজের জগতে পরিবর্তন আনবে।

কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে “AI আসবে এবং সব মানুষ বেকার হয়ে যাবে”। বাস্তবতা আরও জটিল।

আমার মতে, ভবিষ্যতে অনেক ক্ষেত্রে চাকরি পুরোপুরি বিলুপ্ত হওয়ার চেয়ে চাকরির ধরন পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

একজন কর্মী হয়তো আগে যে কাজ আট ঘণ্টায় করতেন, AI-এর সাহায্যে সেটি দুই বা তিন ঘণ্টায় করতে পারবেন। তখন বাকি সময়ে তাকে অন্য ধরনের কাজ করতে হতে পারে।


প্রশ্ন: কোন ধরনের কাজ AI-এর কারণে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তিত হতে পারে?

অরিন্দম সেন: যে কাজগুলো অত্যন্ত নিয়মিত, পুনরাবৃত্তিমূলক এবং নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে করা যায়, সেগুলিতে AI-এর প্রভাব বেশি পড়তে পারে।

যেমন—প্রাথমিক তথ্য সাজানো, নির্দিষ্ট ধরনের রিপোর্ট তৈরি, সাধারণ অনুবাদ, ডেটা শ্রেণিবিন্যাস, কিছু ধরনের গ্রাহক পরিষেবা ইত্যাদি।

তবে এর অর্থ এই নয় যে এই পেশার মানুষদের আর প্রয়োজন হবে না। বরং তাদের কাজের প্রকৃতি বদলাতে পারে।

একজন কর্মী যদি আগে তথ্য সংগ্রহ ও সাজাতেন, ভবিষ্যতে তিনি AI দিয়ে সেই কাজ করিয়ে ফলাফল যাচাই করতে পারেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাজে বেশি সময় দিতে পারেন।

অর্থাৎ “কাজ হারানো” এবং “কাজের ধরন বদলে যাওয়া”—এই দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখতে হবে।


প্রশ্ন: তাহলে কি AI মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়?

অরিন্দম সেন: কিছু ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে, কিন্তু বৃহত্তর অর্থে AI-কে সহযোগী হিসেবে দেখাই বেশি বাস্তবসম্মত।

ধরুন একজন সাংবাদিককে একটি বড় বিষয় নিয়ে গবেষণা করতে হবে। AI তাকে তথ্যের কাঠামো তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু কোন তথ্য সত্য, কোনটি ভুল, কোন বক্তব্য প্রকাশযোগ্য, কোন তথ্যের সামাজিক প্রভাব কী—এসব বিচার করার ক্ষেত্রে মানুষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একইভাবে একজন চিকিৎসককে AI বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু রোগীর সঙ্গে কথা বলা, তার উদ্বেগ বোঝা এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মানবিক দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ।

তাই আমি বলব—AI বনাম মানুষ নয়, বরং AI এবং মানুষ—এই সহযোগিতাই ভবিষ্যতের বড় বাস্তবতা।


প্রশ্ন: ভবিষ্যতে কোন দক্ষতাগুলির চাহিদা সবচেয়ে বেশি হতে পারে?

অরিন্দম সেন: ভবিষ্যতে শুধু একটি ডিগ্রি থাকলেই হবে—এমন ধারণা বদলাতে পারে।

সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, সৃজনশীল চিন্তাভাবনা, যোগাযোগ দক্ষতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, নেতৃত্ব, দল পরিচালনা, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি এবং নতুন প্রযুক্তি শেখার ক্ষমতা খুব গুরুত্বপূর্ণ হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শেখার ক্ষমতা

কারণ প্রযুক্তি দ্রুত বদলাচ্ছে। আজ যে সফটওয়্যার জনপ্রিয়, কয়েক বছর পর তার জায়গায় অন্য প্রযুক্তি আসতে পারে। তাই একটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তি জানার চেয়ে নতুন প্রযুক্তি দ্রুত শেখার সক্ষমতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।


প্রশ্ন: বর্তমান ছাত্রছাত্রীদের কীভাবে প্রস্তুতি নেওয়া উচিত?

অরিন্দম সেন: প্রথমত, শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়াকে শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য করা উচিত নয়।

ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্ন করতে শেখাতে হবে। “কেন?” এবং “কীভাবে?”—এই দুটি প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি সম্পর্কে মৌলিক ধারণা থাকা দরকার। প্রত্যেককে প্রোগ্রামার হতে হবে না। কিন্তু AI কীভাবে কাজ করে, তথ্য কী, ভুল তথ্য কীভাবে শনাক্ত করতে হয়, ডিজিটাল নিরাপত্তা কী—এসব জানা জরুরি।

তৃতীয়ত, বই পড়ার অভ্যাস কমানো যাবে না।

কারণ AI তথ্য দিতে পারে, কিন্তু গভীর চিন্তাশক্তি গড়ে ওঠে পড়াশোনা, অভিজ্ঞতা, আলোচনা এবং বাস্তব জীবনের সমস্যার মধ্য দিয়ে।


প্রশ্ন: AI কি শিক্ষকদের গুরুত্ব কমিয়ে দেবে?

অরিন্দম সেন: আমার মনে হয় উল্টোটা হতে পারে।

AI একজন ছাত্রকে একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। কিন্তু একজন ভালো শিক্ষক ছাত্রটির কোথায় সমস্যা হচ্ছে তা বুঝতে পারেন। তার আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারেন। ভুল করার পর তাকে আবার চেষ্টা করতে উৎসাহিত করতে পারেন।

শিক্ষক শুধু তথ্য দেন না; তিনি একজন শিক্ষার্থীর চিন্তাভাবনা ও ব্যক্তিত্ব গঠনে ভূমিকা রাখেন।

তাই AI শিক্ষকের বিকল্প হওয়ার চেয়ে শিক্ষকের একটি শক্তিশালী সহায়ক হাতিয়ার হতে পারে।

একজন শিক্ষক যদি AI ব্যবহার করে পাঠ পরিকল্পনা তৈরি করেন, বিভিন্ন স্তরের ছাত্রদের জন্য আলাদা অনুশীলনী তৈরি করেন কিংবা জটিল বিষয়ের বিভিন্ন ব্যাখ্যা খুঁজে নেন, তাহলে শিক্ষাদান আরও কার্যকর হতে পারে।


প্রশ্ন: সংবাদমাধ্যমে AI-এর প্রভাব কী হতে পারে?

অরিন্দম সেন: সংবাদমাধ্যমে AI-এর প্রভাব খুব বড় হবে।

সংবাদ সংগ্রহের প্রাথমিক পর্যায়, তথ্য সাজানো, ডেটা বিশ্লেষণ, অনুবাদ, শিরোনামের সম্ভাব্য খসড়া তৈরি, ভিডিওর সাবটাইটেল তৈরি—এসব কাজে AI সহায়তা করতে পারে।

কিন্তু সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিশ্বাসযোগ্যতা

AI কোনো তথ্য তৈরি করে দিলেই সেটি সত্য হয়ে যায় না। সাংবাদিককে তথ্য যাচাই করতে হবে, উৎস পরীক্ষা করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নিতে হবে।

বিশেষ করে AI-generated ছবি, অডিও এবং ভিডিওর যুগে সাংবাদিকদের তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।


প্রশ্ন: AI-এর মাধ্যমে ভুয়ো খবর আরও বাড়তে পারে?

অরিন্দম সেন: অবশ্যই সেই সম্ভাবনা রয়েছে।

আজ খুব সহজেই এমন ছবি বা ভিডিও তৈরি করা সম্ভব, যা দেখে সাধারণ মানুষের কাছে বাস্তব বলে মনে হতে পারে। কারও মুখ অন্য ভিডিওতে বসিয়ে দেওয়া, কৃত্রিম কণ্ঠস্বর তৈরি করা বা সম্পূর্ণ কাল্পনিক ছবি বানানো—এসব প্রযুক্তি আরও উন্নত হচ্ছে।

তাই ভবিষ্যতে শুধু “ছবিতে দেখেছি” বা “ভিডিওতে দেখেছি”—এটিকে সত্যের প্রমাণ হিসেবে ধরা বিপজ্জনক হবে।

সংবাদমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষ—দুই পক্ষকেই উৎস যাচাইয়ের অভ্যাস করতে হবে।


প্রশ্ন: AI কি মানুষের সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করবে?

অরিন্দম সেন: আমি তা মনে করি না।

তবে মানুষ যদি AI-এর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে যায়, তখন সমস্যা হতে পারে।

ধরুন একজন লেখক নিজে চিন্তা না করে সবকিছু AI দিয়ে লিখিয়ে নিলেন। তাহলে তার নিজের চিন্তাশক্তি ও লেখার দক্ষতা ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে।

আবার অন্য একজন লেখক AI-কে সহকারী হিসেবে ব্যবহার করলেন—গবেষণার বিষয় খুঁজলেন, ধারণা সাজালেন, কিন্তু চূড়ান্ত চিন্তা ও লেখাটি নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে তৈরি করলেন।

দুই পরিস্থিতির মধ্যে বিশাল পার্থক্য আছে।

প্রযুক্তি আমাদের সৃজনশীলতা বাড়াতে পারে, যদি আমরা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করি—প্রযুক্তি যেন আমাদের ব্যবহার না করে।


প্রশ্ন: AI ব্যবহারের সবচেয়ে বড় বিপদ কী?

অরিন্দম সেন: আমার মতে তিনটি বড় বিপদ আছে।

প্রথমত, ভুল তথ্যের ওপর অতিরিক্ত বিশ্বাস

দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা

তৃতীয়ত, মানুষের নিজস্ব চিন্তাশক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা

AI খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল উত্তরও দিতে পারে। তাই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তথ্য যাচাই করা দরকার।

ব্যক্তিগত নথি, গোপন তথ্য, আর্থিক তথ্য বা সংবেদনশীল তথ্য কোনো AI সিস্টেমে দেওয়ার আগে ব্যবহারকারীকে সতর্ক থাকতে হবে।


প্রশ্ন: AI কি সমাজে ধনী-গরিবের ব্যবধান বাড়িয়ে দিতে পারে?

অরিন্দম সেন: সম্ভাবনা রয়েছে।

যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান উন্নত প্রযুক্তি দ্রুত গ্রহণ করতে পারবে, তারা উৎপাদনশীলতার দিক থেকে এগিয়ে যেতে পারে।

কিন্তু এটিই আবার বড় সুযোগও তৈরি করতে পারে।

যদি AI-এর সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য হয়, তাহলে একজন ছোট ব্যবসায়ীও বড় প্রতিষ্ঠানের মতো কিছু প্রযুক্তিগত সুবিধা পেতে পারেন। একজন প্রত্যন্ত এলাকার ছাত্রও উন্নত শিক্ষাসহায়ক ব্যবহার করতে পারেন।

তাই প্রযুক্তি নিজে বৈষম্য তৈরি করে না; প্রযুক্তির সুযোগ কারা পাচ্ছে এবং কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


প্রশ্ন: গ্রামের মানুষের জীবনেও কি AI-এর প্রভাব পড়বে?

অরিন্দম সেন: অবশ্যই।

কৃষিতে আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ, রোগাক্রান্ত গাছ শনাক্ত করা, বাজারদরের প্রবণতা বোঝা, সেচ ব্যবস্থাপনা—এসব ক্ষেত্রে AI ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

স্থানীয় ভাষায় প্রযুক্তি সহজলভ্য হলে এর প্রভাব আরও বড় হবে।

তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের বাস্তব জ্ঞানও জরুরি। কৃষকের বহু বছরের অভিজ্ঞতাকে কোনো মেশিন দিয়ে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা যায় না।


প্রশ্ন: ছোট ব্যবসায়ীরা AI থেকে কীভাবে লাভবান হতে পারেন?

অরিন্দম সেন: ছোট ব্যবসার জন্য AI বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে।

একজন দোকানদার নিজের পণ্যের তালিকা সাজানো, বিক্রির হিসাব বিশ্লেষণ, গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, প্রচারের লেখা তৈরি করা ইত্যাদি কাজে AI ব্যবহার করতে পারেন।

একজন ছোট উদ্যোক্তা আগে যে কাজের জন্য আলাদা কর্মী বা সংস্থার সাহায্য নিতেন, তার কিছু অংশ এখন প্রযুক্তির মাধ্যমে নিজেই করতে পারেন।

তবে AI ব্যবহার করলেই ব্যবসা সফল হবে না। ভালো পণ্য, সঠিক মূল্য, গ্রাহকের বিশ্বাস এবং পরিষেবার মান এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


প্রশ্ন: আগামী দশ বছরে কর্মজগৎ কেমন হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

অরিন্দম সেন: আগামী দশকে কর্মজগতে একটি বড় পরিবর্তন আসতে পারে—মানুষ এবং মেশিনের মধ্যে কাজের নতুন বিভাজন তৈরি হবে।

যে কাজগুলো দ্রুত গণনা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং পুনরাবৃত্তিমূলক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত, সেগুলির বড় অংশ AI সামলাতে পারে।

আর মানুষের গুরুত্ব বাড়তে পারে এমন কাজে যেখানে বিচারবুদ্ধি, নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা, সামাজিক বোঝাপড়া এবং মানবিক যোগাযোগ প্রয়োজন।

অফিসে হয়তো প্রত্যেক কর্মীর সঙ্গে কোনো না কোনো AI সহকারী থাকবে। একজন কর্মী একা যে পরিমাণ কাজ করতে পারেন, AI-এর সাহায্যে তার ক্ষমতা বহুগুণ বাড়তে পারে।


প্রশ্ন: তাহলে কি ভবিষ্যতের চাকরির জন্য “AI জানা” বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে?

অরিন্দম সেন: অনেক পেশায় AI সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

যেমন আজ কম্পিউটার জানা অনেক চাকরিতে প্রায় অপরিহার্য, ভবিষ্যতে AI ব্যবহারের মৌলিক দক্ষতাও তেমন হয়ে উঠতে পারে।

তবে শুধু AI ব্যবহার জানলেই হবে না। যে পেশায় কাজ করছেন সেই পেশার মূল জ্ঞানও শক্ত হতে হবে।

একজন চিকিৎসককে চিকিৎসাবিজ্ঞান জানতে হবে, সাংবাদিককে সাংবাদিকতা জানতে হবে, শিক্ষককে শিক্ষাবিজ্ঞান জানতে হবে, প্রকৌশলীকে প্রকৌশল জানতে হবে।

AI হবে সেই জ্ঞানের ওপর কাজ করার একটি নতুন হাতিয়ার।


প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন মানুষ একদিন AI-এর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়বে?

অরিন্দম সেন: সেটা মানুষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

আমরা যদি প্রতিটি ছোট সিদ্ধান্তের জন্য AI-এর কাছে উত্তর চাইতে শুরু করি, তাহলে নির্ভরতা বাড়বে।

কিন্তু যদি AI-কে একটি সহকারী হিসেবে ব্যবহার করি এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিজের কাছে রাখি, তাহলে প্রযুক্তি আমাদের ক্ষমতাকে বাড়াবে।

প্রযুক্তির সবচেয়ে ভালো ব্যবহার হলো—যেখানে মানুষ একা দুর্বল, সেখানে প্রযুক্তির শক্তি যোগ করা।


প্রশ্ন: শেষ প্রশ্ন। AI-এর যুগে মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনি আশাবাদী?

অরিন্দম সেন: আমি যথেষ্ট আশাবাদী।

কারণ মানুষের ইতিহাস আসলে পরিবর্তনের ইতিহাস। আগুন, চাকা, মুদ্রণযন্ত্র, বিদ্যুৎ, কম্পিউটার, ইন্টারনেট—প্রতিটি প্রযুক্তি মানুষের জীবন বদলেছে।

AI-ও বদলাবে।

কিন্তু ভবিষ্যৎ কেমন হবে তা শুধু AI ঠিক করবে না। মানুষ কীভাবে AI তৈরি করবে, কীভাবে ব্যবহার করবে, কী ধরনের আইন তৈরি করবে এবং প্রযুক্তির সুবিধা কতটা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারবে—এসব বিষয় ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

আমার কাছে AI-কে ভয়ের বিষয় হিসেবে দেখার চেয়ে বোঝার বিষয় হিসেবে দেখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

যে মানুষ প্রযুক্তিকে বুঝবে, সে পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে।

আর যে মানুষ প্রযুক্তিকে পুরোপুরি অস্বীকার করবে, তার জন্য পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানো কঠিন হতে পারে।

সবশেষে আমি একটি কথা বলব—AI হয়তো অনেক কাজ করতে পারবে, কিন্তু মানুষের মতো জীবনযাপন, সম্পর্ক তৈরি, অনুভূতি বোঝা এবং নৈতিক সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নেওয়ার প্রশ্নে মানুষের ভূমিকা এখনও অনন্য।

তাই ভবিষ্যতের প্রশ্ন হওয়া উচিত শুধু “AI কী করতে পারবে?” নয়।

প্রশ্ন হওয়া উচিত—“AI-এর সাহায্যে মানুষ কী করতে পারবে?”


সাক্ষাৎকারের শেষ কথা

AI নিয়ে বিতর্ক আগামী দিনেও চলবে। কেউ এটিকে বিপ্লব হিসেবে দেখবেন, কেউ দেখবেন ঝুঁকি হিসেবে। বাস্তবতা সম্ভবত এই দুইয়ের মাঝামাঝি কোথাও।

নতুন প্রযুক্তি যেমন কিছু কাজের ধরন বদলাবে, তেমনই নতুন কাজের সুযোগও তৈরি করবে। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষা, দক্ষতা এবং কর্মসংস্থানের ধারণাকেও পরিবর্তিত হতে হবে।

একটি বিষয় অবশ্য পরিষ্কার—AI-এর যুগে সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু প্রযুক্তি নয়, মানুষের শেখার ক্ষমতা, বিচারবুদ্ধি এবং সৃজনশীলতা।

সম্ভবত আগামী দিনের সফল মানুষ সেই ব্যক্তি হবেন না, যিনি AI-কে ভয় পান কিংবা AI-এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেন। বরং সফল হবেন তিনি, যিনি জানেন—কখন AI ব্যবহার করতে হবে, কোথায় তার সীমাবদ্ধতা এবং কোন সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত মানুষের নিজের নেওয়া উচিত।

নোট: এই সাক্ষাৎকারটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এখানে ব্যবহৃত সাক্ষাৎকারদাতা, বক্তব্য ও পরিস্থিতি একটি নিউজ পোর্টালের ফিচার/ইন্টারভিউ বিভাগে প্রকাশের উপযোগী কাল্পনিক কনটেন্ট হিসেবে তৈরি করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *