সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ কি শুধু বন, নাকি আমাদের প্রাকৃতিক ঢাল?

উপকূল, মানুষ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবেশ গবেষক ড. মৈত্রেয়ী সেনের মুখোমুখি

বিশেষ সাক্ষাৎকার | কাল্পনিক

সাক্ষাৎকারগ্রহীতা:
সুন্দরবন নামটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে নদী, খাঁড়ি, কেওড়া-গরান-গেঁওয়া গাছ, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, নৌকা এবং বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ অরণ্য। কিন্তু সুন্দরবন শুধু একটি বনভূমি নয়। এই অঞ্চলের মানুষের জীবন, জীবিকা, নদী, মাছ, কৃষি এবং উপকূলের নিরাপত্তার সঙ্গে এই ম্যানগ্রোভ অরণ্য গভীরভাবে যুক্ত।

জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন এবং লবণাক্ততার মতো নানা পরিবর্তনের মধ্যে সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ম্যানগ্রোভ বন কতটা গুরুত্বপূর্ণ, কীভাবে তা রক্ষা করা সম্ভব এবং সুন্দরবনের মানুষের ভবিষ্যৎ কী—এসব নিয়ে কথা বলতেই আমাদের সঙ্গে রয়েছেন কাল্পনিক পরিবেশ গবেষক ড. মৈত্রেয়ী সেন

নোট: এই সাক্ষাৎকারটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এখানে ব্যবহৃত ব্যক্তি ও বক্তব্য কোনো বাস্তব ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।

প্রশ্ন: প্রথমেই জানতে চাই, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনকে এত গুরুত্বপূর্ণ বলা হয় কেন?

ড. মৈত্রেয়ী সেন:
সুন্দরবনের গুরুত্ব একাধিক স্তরে।

প্রথমত, এটি একটি অসাধারণ জীববৈচিত্র্যের অঞ্চল। এখানে বিভিন্ন ধরনের গাছপালা, মাছ, কাঁকড়া, পাখি, সরীসৃপ এবং অন্যান্য প্রাণীর বাসস্থান রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, ম্যানগ্রোভ উপকূলীয় অঞ্চলের একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। ঘূর্ণিঝড় বা প্রবল জলোচ্ছ্বাসের সময় গাছপালা ও তাদের শিকড় জলপ্রবাহের শক্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

তৃতীয়ত, এই বন বহু মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। মাছ ধরা, কাঁকড়া সংগ্রহ, মধু সংগ্রহ, পর্যটনসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সুন্দরবনের সম্পর্ক রয়েছে।

আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ম্যানগ্রোভ বন কার্বন ধরে রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অর্থাৎ সুন্দরবনকে শুধু ‘একটি জঙ্গল’ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে না।

প্রশ্ন: ম্যানগ্রোভ গাছের বিশেষত্ব কোথায়?

ড. মৈত্রেয়ী সেন:
ম্যানগ্রোভ গাছ এমন পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য বিশেষভাবে অভিযোজিত, যেখানে অন্য অনেক গাছ টিকে থাকতে পারে না।

সুন্দরবনের মাটিতে লবণাক্ততার প্রভাব রয়েছে। জোয়ার-ভাটার কারণে জমি নিয়মিত জলমগ্ন হয়। অনেক জায়গায় মাটিতে অক্সিজেনের পরিমাণও কম থাকে।

ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ এই কঠিন পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। কিছু প্রজাতির শিকড় এমনভাবে গঠিত যে তারা জলমগ্ন মাটির মধ্যেও গ্যাস বিনিময়ে সাহায্য করে।

এখানেই ম্যানগ্রোভের অসাধারণত্ব।

একটি গাছ শুধু গাছ হিসেবে দাঁড়িয়ে নেই—তার চারপাশে একটি সম্পূর্ণ পরিবেশগত ব্যবস্থা তৈরি হয়।

প্রশ্ন: ঘূর্ণিঝড়ের সময় সুন্দরবনের বন কীভাবে মানুষকে সাহায্য করতে পারে?

ড. মৈত্রেয়ী সেন:
ম্যানগ্রোভ বনকে আমরা অনেকটা প্রাকৃতিক বাফার বা ঢাল হিসেবে ভাবতে পারি।

প্রবল ঝড়ের সময় সমুদ্রের জল ও বাতাসের শক্তি যখন স্থলভাগের দিকে এগিয়ে আসে, তখন উপকূলের উদ্ভিদবেষ্টনী সেই শক্তির একটি অংশ শোষণ ও ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করতে পারে।

অবশ্যই ম্যানগ্রোভ কোনো অদৃশ্য দেওয়াল নয়। খুব শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়কে এটি সম্পূর্ণ থামিয়ে দিতে পারে না।

কিন্তু বনভূমি যত সুস্থ ও ঘন হবে, উপকূলীয় এলাকার প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ক্ষমতা তত বাড়তে পারে।

তাই ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণকে দুর্যোগ মোকাবিলার একটি অংশ হিসেবেও দেখা উচিত।

প্রশ্ন: তাহলে বাঁধ থাকলে কি ম্যানগ্রোভের প্রয়োজন কমে যায়?

ড. মৈত্রেয়ী সেন:
একেবারেই নয়।

বাঁধ এবং ম্যানগ্রোভের কাজ এক নয়।

বাঁধ মানুষের তৈরি অবকাঠামো। ম্যানগ্রোভ হলো প্রাকৃতিক ব্যবস্থা।

একটি বাঁধ ভেঙে গেলে বড় ক্ষতি হতে পারে। আবার বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণেরও প্রয়োজন রয়েছে।

অন্যদিকে একটি সুস্থ ম্যানগ্রোভ অঞ্চল জীববৈচিত্র্য রক্ষা, মাটির স্থিতিশীলতা, উপকূলীয় পরিবেশ এবং জলজ প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে একসঙ্গে অনেক কাজ করে।

তাই ভবিষ্যতের উপকূল ব্যবস্থাপনায় শুধু বাঁধ তৈরি করলেই হবে না; প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করতে হবে।

প্রশ্ন: সুন্দরবনের মানুষের জীবন কি এই বনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত?

ড. মৈত্রেয়ী সেন:
অত্যন্ত গভীরভাবে যুক্ত।

অনেক মানুষ নদী ও জলাভূমির উপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করেন। মাছ, কাঁকড়া বা অন্যান্য জলজ সম্পদ সংগ্রহ করেন। কেউ মধু সংগ্রহ করেন। কেউ পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত।

আবার অনেক পরিবারের কৃষিও লবণাক্ততা এবং নদীর অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত।

ফলে সুন্দরবনের পরিবেশে বড় পরিবর্তন হলে তার প্রভাব মানুষের জীবনেও পড়ে।

এই কারণে সংরক্ষণ করতে গেলে শুধু গাছের কথা ভাবলে চলবে না। মানুষের জীবিকা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎকেও একই আলোচনার মধ্যে রাখতে হবে।

প্রশ্ন: সুন্দরবনের মানুষের জীবিকার সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের সংঘাত কি তৈরি হয়?

ড. মৈত্রেয়ী সেন:
কখনও কখনও হতে পারে। কিন্তু এটিকে শুধু মানুষের দোষ হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না।

একজন মানুষ যদি জীবিকা নির্বাহের জন্য নদীতে যান, বনাঞ্চলের কাছাকাছি যান বা প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভর করেন, তার পেছনে অর্থনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে।

তাই বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

যদি মানুষ পরিবেশ রক্ষা করে আরও স্থায়ী আয় করতে পারেন, তাহলে সংরক্ষণে তাদের অংশগ্রহণও বাড়বে।

প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং মানুষের উন্নয়নকে পরস্পরের শত্রু না বানিয়ে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।

প্রশ্ন: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সুন্দরবনে কীভাবে দেখা যেতে পারে?

ড. মৈত্রেয়ী সেন:
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব উপকূলীয় অঞ্চলে বিভিন্নভাবে অনুভূত হতে পারে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়ার ঘটনা, ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি, লবণাক্ততার পরিবর্তন এবং নদীভাঙনের মতো বিষয়গুলো মানুষের জীবন ও পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে।

তবে সুন্দরবনের প্রতিটি পরিবর্তনের জন্য শুধুমাত্র জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করা ঠিক নয়। নদীর প্রবাহ, পলি জমা, ভূমির পরিবর্তন, মানুষের কর্মকাণ্ড এবং স্থানীয় পরিবেশগত কারণও গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের তাই বৈজ্ঞানিকভাবে দীর্ঘমেয়াদি তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।

প্রশ্ন: নদীভাঙন কি সুন্দরবনের জন্য বড় সমস্যা?

ড. মৈত্রেয়ী সেন:
অবশ্যই।

নদীভাঙন একটি অত্যন্ত জটিল প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। কোথাও নদীর পাড় ভাঙছে, আবার অন্য কোথাও পলি জমে নতুন ভূমি তৈরি হতে পারে।

কিন্তু মানুষের বসতি বা কৃষিজমি যদি নদীর পাড়ে থাকে, তাহলে ভাঙন সরাসরি জীবনে আঘাত করে।

একটি পরিবার হয়তো বহু বছর ধরে যে বাড়িতে বাস করেছে, হঠাৎ সেটি নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। জমি হারাতে পারে। স্কুল, রাস্তা, বাজার—সবকিছু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তাই নদীভাঙনকে শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবেও দেখতে হবে।

প্রশ্ন: লবণাক্ততা কি কৃষির উপর বড় প্রভাব ফেলে?

ড. মৈত্রেয়ী সেন:
হ্যাঁ, বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিতে লবণাক্ততা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

মাটিতে অতিরিক্ত লবণ থাকলে সব ধরনের ফসল ভালোভাবে বৃদ্ধি পায় না। ফলে কৃষকদের ফসলের ধরন পরিবর্তন করতে হতে পারে।

এখানে স্থানীয়ভাবে উপযোগী লবণসহিষ্ণু ফসল, উন্নত কৃষি পদ্ধতি, জল ব্যবস্থাপনা এবং মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার কৌশল গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

কৃষকদের শুধু নতুন বীজ দিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কোন জমিতে কোন ফসল, কতটা জল, কী ধরনের মাটি ব্যবস্থাপনা—সবকিছু বিবেচনা করতে হবে।

প্রশ্ন: সুন্দরবনে মিষ্টি জলের গুরুত্ব কতটা?

ড. মৈত্রেয়ী সেন:
অত্যন্ত বেশি।

উপকূলীয় অঞ্চলে মিষ্টি জলের উৎস সীমিত হলে মানুষের জীবন কঠিন হয়ে পড়ে। পানীয় জল, কৃষি, গৃহস্থালির কাজ—সবকিছুর জন্য নিরাপদ মিষ্টি জল প্রয়োজন।

লবণাক্ততার চাপ বাড়লে মিষ্টি জলের উৎস রক্ষা করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তাই সুন্দরবনের পরিবেশ সংরক্ষণে জলসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে আলাদা করে গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রশ্ন: সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ ধ্বংস হলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি কী হতে পারে?

ড. মৈত্রেয়ী সেন:
সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে একটি সম্পূর্ণ পরিবেশগত ব্যবস্থার দুর্বল হয়ে পড়া।

ম্যানগ্রোভ শুধু কাঠ বা পাতার সমষ্টি নয়। এর শিকড়ের আশেপাশে নানা ধরনের জলজ প্রাণী বাস করে। ছোট মাছের প্রজনন ও আশ্রয়ের সঙ্গে ম্যানগ্রোভ অঞ্চল সম্পর্কিত হতে পারে।

গাছ কমে গেলে মাটির স্থিতিশীলতা, জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় প্রতিরোধ ক্ষমতাও প্রভাবিত হতে পারে।

আর বন ধ্বংস হলে তার প্রভাব শুধু বনেই আটকে থাকবে না—নদী, মাছ, কৃষি এবং মানুষের জীবিকাতেও পৌঁছতে পারে।

প্রশ্ন: সাধারণ মানুষ সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষায় কী করতে পারেন?

ড. মৈত্রেয়ী সেন:
প্রথম কাজ হলো সচেতন হওয়া।

সুন্দরবনে বেড়াতে গেলে সেখানে আবর্জনা ফেলা যাবে না। বন্যপ্রাণীকে বিরক্ত করা যাবে না। নিষিদ্ধ বা ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডকে উৎসাহ দেওয়া উচিত নয়।

আর যারা সুন্দরবনের বাইরে থাকেন, তারাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, জল ও বিদ্যুৎ অপচয় কমানো—এসব বৃহত্তর পরিবেশের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সুন্দরবনকে শুধু পর্যটনের জায়গা হিসেবে না দেখে একটি জীবন্ত পরিবেশব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে।

প্রশ্ন: পর্যটন কি সুন্দরবনের জন্য আশীর্বাদ, নাকি বিপদ?

ড. মৈত্রেয়ী সেন:
দুটোই হতে পারে।

সঠিকভাবে পরিচালিত পর্যটন স্থানীয় মানুষের আয় বাড়াতে পারে। গাইড, নৌকা চালক, হোটেল, খাবারের দোকান, হস্তশিল্প—অনেক ক্ষেত্রেই কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।

কিন্তু অতিরিক্ত বা অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন পরিবেশের উপর চাপ তৈরি করতে পারে।

তাই পর্যটকের সংখ্যা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শব্দদূষণ, নৌযান পরিচালনা এবং বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা—সবকিছুর উপর নজর রাখতে হবে।

পর্যটন এমন হওয়া উচিত যাতে মানুষ সুন্দরবন দেখে ফিরে যান, কিন্তু সুন্দরবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না যান।

প্রশ্ন: সুন্দরবনের শিশুদের পরিবেশ শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত কি?

ড. মৈত্রেয়ী সেন:
অবশ্যই।

যে শিশু সুন্দরবনের নদী, গাছ, মাছ ও প্রাণীদের কাছ থেকে বড় হচ্ছে, সে যদি নিজের পরিবেশের গুরুত্ব বুঝতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে সে একজন বড় পরিবেশরক্ষক হয়ে উঠতে পারে।

পরিবেশ শিক্ষা শুধু বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়।

স্থানীয় স্কুলে নদী পর্যবেক্ষণ, গাছ চেনা, পাখি দেখা, জলাশয় সম্পর্কে জানা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শেখানো—এসব বাস্তবভিত্তিক কর্মসূচি করা যেতে পারে।

শিশুদের বোঝাতে হবে—প্রকৃতি কোনো দূরের বিষয় নয়। তাদের নিজেদের জীবনই প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত।

প্রশ্ন: ম্যানগ্রোভ লাগানো হলেই কি সুন্দরবনের সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে?

ড. মৈত্রেয়ী সেন:
না। এটি একটি ভুল ধারণা।

গাছ লাগানো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কোথায়, কীভাবে এবং কোন প্রজাতি লাগানো হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাকৃতিকভাবে তৈরি একটি ম্যানগ্রোভ পরিবেশকে কেবল নির্দিষ্ট কিছু গাছ লাগিয়ে হুবহু তৈরি করা যায় না।

এখানে জোয়ার-ভাটা, নদীর প্রবাহ, মাটির ধরন, লবণাক্ততা এবং স্থানীয় পরিবেশ বুঝতে হবে।

তাই ‘গাছ লাগালাম, কাজ শেষ’—এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

প্রশ্ন: স্থানীয় মানুষকে সংরক্ষণ কাজে যুক্ত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

ড. মৈত্রেয়ী সেন:
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই অঞ্চলে বসবাস করছেন, তারা পরিবেশের অনেক সূক্ষ্ম পরিবর্তন নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারেন।

কোন নদীতে কখন জল বাড়ে, কোথায় ভাঙন হচ্ছে, কোন মৌসুমে কোন মাছ বেশি দেখা যায়—এই স্থানীয় জ্ঞান অত্যন্ত মূল্যবান।

বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতাকে একসঙ্গে কাজে লাগানো গেলে সংরক্ষণ আরও কার্যকর হতে পারে।

প্রশ্ন: প্রযুক্তি কি সুন্দরবন রক্ষায় সাহায্য করতে পারে?

ড. মৈত্রেয়ী সেন:
অবশ্যই।

স্যাটেলাইট ছবি ব্যবহার করে ভূমির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা যায়। নির্দিষ্ট এলাকায় বনভূমির পরিবর্তন, নদীর গতিপথ, উপকূলীয় পরিবর্তন ইত্যাদি দীর্ঘমেয়াদে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রযুক্তির ভূমিকা রয়েছে।

মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দুর্যোগের সতর্কতা, নিরাপদ আশ্রয়ের তথ্য বা জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা যেতে পারে।

তবে প্রযুক্তি যেন মানুষের নাগালের বাইরে না থাকে। প্রযুক্তির সুবিধা তখনই কার্যকর হবে, যখন সাধারণ মানুষ সেটি বুঝতে এবং ব্যবহার করতে পারবেন।

প্রশ্ন: ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কতা কি মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে?

ড. মৈত্রেয়ী সেন:
অবশ্যই পারে।

দুর্যোগের ক্ষেত্রে শুধু ঝড়ের শক্তি নয়, মানুষের প্রস্তুতিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যদি মানুষ আগে থেকে জানতে পারেন যে বড় ঝড় আসছে, তাহলে তাঁরা নিরাপদ স্থানে যেতে পারেন, নৌকা সরিয়ে নিতে পারেন, গুরুত্বপূর্ণ নথি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিরাপদে রাখতে পারেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।

তাই দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

প্রশ্ন: সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনি আশাবাদী?

ড. মৈত্রেয়ী সেন:
আমি আশাবাদী, তবে বাস্তববাদী আশাবাদী।

সুন্দরবনকে রক্ষা করা সহজ নয়। এখানে পরিবেশ, অর্থনীতি, মানুষের জীবন, নদী এবং জলবায়ু—সবকিছু একে অপরের সঙ্গে যুক্ত।

কিন্তু মানুষের হাতে অনেক সুযোগ রয়েছে।

আমরা যদি এখন থেকেই ম্যানগ্রোভ রক্ষা করি, নদী ও জলাভূমির গুরুত্ব বুঝি, মানুষের বিকল্প জীবিকার সুযোগ বাড়াই, দুর্যোগ প্রস্তুতি শক্তিশালী করি এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে গুরুত্ব দিই, তাহলে ভবিষ্যৎ অনেক ভালো হতে পারে।

প্রশ্ন: আপনার মতে সবচেয়ে বড় ভুল কোনটি, যা সুন্দরবন সম্পর্কে আমরা করে থাকি?

ড. মৈত্রেয়ী সেন:
আমরা অনেক সময় সুন্দরবনকে শুধুমাত্র বাঘ দেখার জায়গা হিসেবে দেখি।

বাঘ অবশ্যই সুন্দরবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। কিন্তু সুন্দরবন শুধু বাঘ নয়।

সুন্দরবন মানে নদী, ম্যানগ্রোভ, মাছ, কাঁকড়া, পাখি, মাটি, জোয়ার-ভাটা, মানুষ এবং একটি সম্পূর্ণ জীবন্ত পরিবেশব্যবস্থা।

বাঘকে রক্ষা করতে হলে তার আবাসস্থল রক্ষা করতে হবে। আবাসস্থল রক্ষা করতে হলে বন রক্ষা করতে হবে। বন রক্ষা করতে হলে নদী ও জলাভূমিকে বুঝতে হবে। আর এই পুরো ব্যবস্থার সঙ্গে মানুষও যুক্ত।

তাই সুন্দরবন রক্ষার অর্থ একটি সম্পূর্ণ ব্যবস্থাকে রক্ষা করা।

প্রশ্ন: শেষ প্রশ্ন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আপনার সবচেয়ে বড় বার্তা কী?

ড. মৈত্রেয়ী সেন:
আমরা প্রকৃতির মালিক নই—আমরা প্রকৃতির অংশ।

এই কথাটা মনে রাখা দরকার।

সুন্দরবনের একটি গাছ হয়তো আমাদের চোখে সাধারণ একটি গাছ। কিন্তু সেই গাছের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে পাখি, কীটপতঙ্গ, মাছ, মাটি, নদী এবং মানুষের জীবিকা।

একটি ম্যানগ্রোভ অঞ্চল হয়তো শহরের মানুষের কাছে অনেক দূরের একটি বন। কিন্তু উপকূলের পরিবেশে তার ভূমিকা অনেক বড়।

তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শুধু বলতে হবে না—‘সুন্দরবনকে ভালোবাসো।’ তাদের বুঝতে হবে কেন সুন্দরবন গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা যদি প্রকৃতিকে শুধু ব্যবহার করার জায়গা হিসেবে দেখি, তাহলে একদিন প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হবে। কিন্তু আমরা যদি প্রকৃতিকে সহযোগী হিসেবে দেখি, তাহলে মানুষ এবং পরিবেশ দুজনেই দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে।

সুন্দরবন আমাদের সেই শিক্ষা দেয়।


সাক্ষাৎকারগ্রহীতার শেষ কথা

সুন্দরবনকে ঘিরে আমাদের কৌতূহল বহু পুরনো। কিন্তু এই অরণ্যের প্রকৃত গুরুত্ব শুধু তার সৌন্দর্য বা রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ম্যানগ্রোভ বন উপকূলীয় পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নদী, জোয়ার-ভাটা, জীববৈচিত্র্য, মানুষের জীবিকা এবং দুর্যোগ মোকাবিলা—সবকিছুর সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।

পরিবেশ পরিবর্তনের এই সময়ে সুন্দরবনকে রক্ষা করার প্রশ্নটি তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের প্রশ্ন নয়। এটি উপকূলীয় পরিবেশ, মানুষের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রশ্ন।

প্রকৃতিকে রক্ষা করার অর্থ প্রকৃতির কাছ থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়। বরং মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে এমন একটি ভারসাম্য তৈরি করা, যেখানে দুজনেই টিকে থাকতে পারে।

সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ আমাদের সেই ভারসাম্যের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

— সমাপ্ত —

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *