ভূমিকা
কেউ গান দিয়ে মানুষকে মুগ্ধ করেন, কেউ সাহিত্য দিয়ে, কেউ বিজ্ঞান বা সমাজসেবার মাধ্যমে। কিন্তু সংখ্যার মতো কঠিন ও বিমূর্ত একটি বিষয়কে নিজের অসাধারণ প্রতিভার শক্তিতে সারা বিশ্বের মানুষের কাছে বিস্ময়ের বিষয় করে তুলেছিলেন এক ভারতীয় নারী—শকুন্তলা দেবী। তাঁর নাম উচ্চারিত হলেই মনে পড়ে যায় অবিশ্বাস্য দ্রুততায় বড় বড় সংখ্যার হিসাব করে ফেলার দৃশ্য।
শকুন্তলা দেবীকে সারা বিশ্বে “Human Computer” বা “মানব কম্পিউটার” নামে পরিচিত করা হয়েছিল। তবে তাঁর জীবন শুধু গণনাশক্তির বিস্ময়কর গল্প নয়। এটি দারিদ্র্য, প্রতিকূলতা, আত্মবিশ্বাস, স্বাধীনচেতা মানসিকতা এবং নিজের প্রতিভাকে নিজের পথ তৈরি করার এক অসাধারণ কাহিনি।
শৈশবেই প্রতিভার প্রকাশ
শকুন্তলা দেবীর জন্ম ১৯২৯ সালের ৪ নভেম্বর বেঙ্গালুরুতে। তাঁর পরিবার আর্থিকভাবে খুব স্বচ্ছল ছিল না। তাঁর বাবা একটি সার্কাসে কাজ করতেন এবং সেখানে বিভিন্ন ধরনের খেলা ও প্রদর্শনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
মাত্র কয়েক বছর বয়সেই শকুন্তলার অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ও গণনাশক্তি পরিবারের নজরে আসে। প্রচলিত অর্থে তাঁর নিয়মিত শিক্ষাজীবন দীর্ঘ হয়নি। কিন্তু সংখ্যা যেন তাঁর কাছে আলাদা কোনো জগত ছিল না—বরং অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি ভাষার মতো ছিল।
একবার কার্ডের খেলা দেখানোর সময় তাঁর বাবা লক্ষ্য করেন, ছোট্ট শকুন্তলা অন্যদের তুলনায় অনেক দ্রুত সংখ্যা মনে রাখতে পারছেন। এরপর তাঁর প্রতিভাকে মানুষের সামনে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
স্কুলের গণ্ডির বাইরে এক অন্যরকম শিক্ষা
শকুন্তলা দেবীর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—তিনি প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে থেকেও জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করেছিলেন।
ছোটবেলায় বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে তিনি নিজের গণনাশক্তির প্রদর্শন করতেন। প্রথমে ভারতের বিভিন্ন শহরে এবং পরে দেশের বাইরেও তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।
তিনি শুধু অঙ্কের উত্তর দিতেন না, মানুষের সামনে দেখিয়ে দিতেন কীভাবে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে বিশাল সংখ্যার হিসাব করা সম্ভব। তাঁর প্রদর্শনীতে সাধারণ মানুষ যেমন বিস্মিত হতেন, তেমনই গণিতবিদ ও শিক্ষাবিদদের কাছেও তাঁর ক্ষমতা আকর্ষণের বিষয় হয়ে উঠেছিল।
‘মানব কম্পিউটার’ হয়ে ওঠা
কম্পিউটার যখন আজকের মতো মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠেনি, তখন শকুন্তলা দেবী মনের মধ্যে এমন সব গণনা করে ফেলতেন, যা করতে অন্যদের কাগজ-কলমও লাগত।
বড় সংখ্যার গুণ, ভাগ, বর্গমূল বা অন্যান্য জটিল হিসাব তিনি অত্যন্ত দ্রুত করতে পারতেন। তাঁর প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ ছিল দর্শকদের দেওয়া কঠিন সংখ্যার তাৎক্ষণিক হিসাব।
এভাবেই ধীরে ধীরে তাঁর পরিচয় হয়ে ওঠে—“Human Computer”।
তাঁর প্রতিভা শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও তিনি গণিতের প্রদর্শনী করেছেন। তাঁর অসাধারণ দক্ষতা তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয়।
গিনেস বিশ্বরেকর্ডের সঙ্গে নাম
শকুন্তলা দেবীর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলির একটি ছিল তাঁর দ্রুত গণনার ক্ষমতা প্রদর্শন।
১৯৮০ সালে লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজে দুটি তেরো অঙ্কের সংখ্যা গুণ করার একটি প্রদর্শনীতে তিনি অংশ নেন। তিনি খুব অল্প সময়ের মধ্যে সেই বিশাল গুণের ফলাফল বলে দেন।
এই ঘটনাটি পরবর্তীকালে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের সঙ্গে তাঁর নামকে যুক্ত করে এবং তাঁর আন্তর্জাতিক খ্যাতি আরও বৃদ্ধি পায়।
তবে তাঁর কাছে গণিত কখনও শুধু রেকর্ড করার বিষয় ছিল না। তিনি মনে করতেন, সংখ্যাকে ভয় না পেয়ে আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে।
গণিতকে আনন্দের বিষয় করার চেষ্টা
শকুন্তলা দেবীর অন্যতম বড় অবদান ছিল গণিতকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ও আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা।
অনেক শিশুই অঙ্কের নাম শুনলেই ভয় পায়। শকুন্তলা দেবী সেই ভয় দূর করতে চেয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, গণিতকে যদি শুধু কঠিন নিয়মের বিষয় হিসেবে না দেখে একটি খেলা বা আনন্দের বিষয় হিসেবে দেখা যায়, তাহলে মানুষের আগ্রহ অনেক বাড়বে।
এই ভাবনা থেকেই তিনি গণিত নিয়ে বই লিখেছেন। তাঁর লেখায় জটিল বিষয়কে সহজভাবে বোঝানোর চেষ্টা দেখা যায়।
লেখিকা হিসেবেও সাফল্য
শকুন্তলা দেবী শুধু গণিতের প্রতিভা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন লেখিকাও।
তিনি গণিতের বইয়ের পাশাপাশি জ্যোতিষ, ধাঁধা, কল্পকাহিনি এবং সমাজ-সংক্রান্ত বিষয় নিয়েও লিখেছেন। তাঁর লেখালেখির পরিধি দেখে বোঝা যায়, তাঁর কৌতূহল শুধু সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
তিনি মানুষের চিন্তাভাবনা, সম্পর্ক, সমাজ এবং জীবনের নানা দিক নিয়েও আগ্রহী ছিলেন।
১৯৭৭ সালে তাঁর লেখা “The World of Homosexuals” প্রকাশিত হয়। ভারতীয় সমাজে সমকামিতা নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা যখন অত্যন্ত সীমিত ছিল, সেই সময়ে তিনি এই বিষয় নিয়ে লেখেন। ফলে তাঁর চিন্তার স্বাধীনতা ও সামাজিক বিষয় নিয়ে সাহসী অবস্থানও সামনে আসে।
নারী হিসেবে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা
শকুন্তলা দেবীর সময়ে একজন নারীর আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দেওয়া সহজ ছিল না।
বিশেষ করে গণিত ও যুক্তিবিদ্যার মতো ক্ষেত্রকে দীর্ঘদিন ধরে পুরুষ-প্রধান বলে মনে করা হতো। সেই পরিবেশে একজন ভারতীয় নারী হিসেবে তিনি বিশ্বের সামনে নিজের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেন।
তাঁর জীবন প্রমাণ করে, প্রতিভার কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গ নেই। সুযোগ, আত্মবিশ্বাস এবং পরিশ্রম থাকলে একজন নারীও এমন ক্ষেত্রকে নিজের করে নিতে পারেন, যেখানে সমাজ তার জন্য খুব বেশি জায়গা রেখে দেয়নি।
ব্যক্তিজীবনের ওঠাপড়া
শকুন্তলা দেবীর জীবন সবসময় সাফল্যে ভরা ছিল না। তাঁর ব্যক্তিজীবনেও নানা ওঠাপড়া ছিল।
তিনি বিয়ে করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে তাঁর দাম্পত্যজীবনের অবসান ঘটে। তাঁর একমাত্র সন্তান অনুপমা বন্দ্যোপাধ্যায় পরবর্তীকালে তাঁর জীবন ও কাজকে মানুষের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
খ্যাতি, সাফল্য ও আন্তর্জাতিক পরিচিতির পাশাপাশি শকুন্তলা দেবী নিজের ব্যক্তিগত জীবনেও নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এগিয়েছেন।
শুধু ‘অঙ্কের মানুষ’ ছিলেন না
শকুন্তলা দেবীকে শুধু “Human Computer” বলে দেখলে তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়।
তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্বাধীনচেতা, কৌতূহলী এবং বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। গণিতের পাশাপাশি তিনি সমাজ, সাহিত্য, জ্যোতিষ এবং মানুষের জীবন নিয়ে ভাবতেন।
তাঁর ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল—তিনি কোনো একটি পরিচয়ের মধ্যে নিজেকে আটকে রাখেননি।
একদিকে তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে গণিতের বিস্ময় দেখিয়েছেন, অন্যদিকে লেখালেখির মাধ্যমে নিজের চিন্তাকে প্রকাশ করেছেন।
নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষা
শকুন্তলা দেবীর জীবন থেকে নতুন প্রজন্মের জন্য বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়।
প্রথমত, প্রতিভাকে চিনতে হবে। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে কোনো না কোনো বিশেষ ক্ষমতা থাকে। সেটিকে খুঁজে বের করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, প্রচলিত পথই একমাত্র পথ নয়। শকুন্তলা দেবীর শিক্ষাজীবন প্রচলিত ধারায় এগোয়নি। তবুও তিনি নিজের প্রতিভার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি অর্জন করেন।
তৃতীয়ত, কঠিন বিষয়কে ভয় পাওয়া উচিত নয়। তিনি গণিতকে ভয়ের বিষয় না বানিয়ে আনন্দের বিষয় হিসেবে দেখার শিক্ষা দিয়েছেন।
চতুর্থত, নারীর ক্ষমতার কোনো সীমা নেই। সুযোগ পেলে নারীও বিশ্বমঞ্চে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে পারেন।
শেষ অধ্যায়
শকুন্তলা দেবী ২০১৩ সালের ২১ এপ্রিল বেঙ্গালুরুতে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর নাম আজও ভারতীয় গণিত-প্রতিভার ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়।
তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অসাধারণ হওয়ার জন্য সবসময় বড় প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হয় না। কখনও কখনও মানুষের নিজের মনের মধ্যেই এমন এক শক্তি থাকে, যা তাকে পৃথিবীর সামনে আলাদা করে তুলতে পারে।
শকুন্তলা দেবী সংখ্যাকে শুধু হিসাবের বিষয় হিসেবে দেখেননি; তিনি সংখ্যার মধ্যে আনন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন। সেই আনন্দই তাঁকে সাধারণ মানুষের ভিড় থেকে আলাদা করে দিয়েছিল।
উপসংহার
শকুন্তলা দেবী ছিলেন এমন এক নারী, যিনি প্রমাণ করেছিলেন যে প্রতিভা কোনো সীমারেখা মানে না। অর্থনৈতিক প্রতিকূলতা, প্রচলিত শিক্ষার সীমাবদ্ধতা কিংবা সমাজের প্রচলিত ধারণা—কোনোটিই তাঁর প্রতিভার পথ আটকাতে পারেনি।
আজকের ডিজিটাল যুগে যখন কম্পিউটার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মুহূর্তের মধ্যে কোটি কোটি হিসাব করে ফেলতে পারে, তখনও শকুন্তলা দেবীর কাহিনি বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। কারণ তাঁর হাতে কোনো আধুনিক যন্ত্র ছিল না; তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর মস্তিষ্ক, স্মৃতি, যুক্তিবোধ এবং আত্মবিশ্বাস।
তিনি আমাদের শিখিয়েছেন—নিজের ক্ষমতাকে বিশ্বাস করে এগিয়ে গেলে অসম্ভব বলে মনে হওয়া কাজও একদিন সম্ভব হয়ে উঠতে পারে।
শকুন্তলা দেবী তাই শুধু একজন অসাধারণ গণনাবিদ নন; তিনি ভারতীয় নারীর আত্মবিশ্বাস, স্বাধীন চিন্তা এবং প্রতিভার এক উজ্জ্বল প্রতীক।












Leave a Reply