গল্প : নদীর ওপারে শেষ নৌকাটি।

ভোরের আলো তখনও নদীর ওপরে পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। কুয়াশার মধ্যে ধীরে ধীরে ভেসে চলেছিল একটি ছোট কাঠের নৌকা।

নৌকার মাঝি হরেনের বয়স প্রায় পঁয়ষট্টি। গত চল্লিশ বছর ধরে সে এই নদী পারাপার করায়।

সেদিন সকালে নদীর ঘাটে এসে দাঁড়াল এক তরুণী। কাঁধে ব্যাগ, হাতে একটি পুরোনো কাপড়ের পুঁটলি।

“কাকু, ওপারের চরনগর যাব।”

হরেন নৌকা ছাড়তে ছাড়তে বলল, “আজ নদী ভালো নেই। ঝড় আসতে পারে।”

মেয়েটি শান্ত গলায় বলল, “আমাকে আজই পৌঁছতে হবে।”

“এত তাড়া কেন?”

“একজনকে খুঁজতে।”

হরেন আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।

নৌকা মাঝনদীতে পৌঁছতেই বাতাস জোরে বইতে শুরু করল। আকাশ কালো হয়ে এল।

হরেন বলল, “আপনি নিচে বসুন।”

মেয়েটি পুঁটলিটা শক্ত করে ধরে বসে পড়ল।

কিছুক্ষণ পর প্রবল বৃষ্টি শুরু হল।

নদীর ঢেউ নৌকায় আছড়ে পড়তে লাগল।

হরেন প্রাণপণে দাঁড় টানছিল।

হঠাৎ নৌকার এক পাশের কাঠ ভেঙে গেল।

জল ঢুকতে শুরু করল।

মেয়েটি ভয়ে চিৎকার করে উঠল।

হরেন বলল, “ভয় পাবেন না! নৌকা এখনও ভাসছে।”

কিন্তু স্রোত এতটাই তীব্র ছিল যে নৌকা ধীরে ধীরে মূল পথ থেকে সরে যাচ্ছিল।

মেয়েটি তখন পুঁটলিটি খুলে একটি পুরোনো ছবি বের করল।

ছবিতে একজন যুবক দাঁড়িয়ে আছে নদীর ঘাটে।

হরেন ছবিটি দেখে থমকে গেল।

“এই ছবিটা কোথায় পেলেন?”

“আমার বাবার জিনিসের মধ্যে।”

“আপনার বাবা কে?”

মেয়েটি নাম বলল।

হরেনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“আপনার বাবা কি বিশ বছর আগে এই নদীতে নিখোঁজ হয়েছিলেন?”

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ।”

হরেন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“আপনার বাবা আমার খুব ভালো বন্ধু ছিলেন।”

মেয়েটি অবাক হয়ে তাকাল।

হরেন বলল, “সেদিনও এমনই ঝড় হয়েছিল। আমরা দুজন নৌকায় ছিলাম। নৌকা উল্টে যায়। আমি কোনোমতে বেঁচে ফিরেছিলাম। কিন্তু তোমার বাবা আর ফিরতে পারেননি।”

মেয়েটির চোখে জল এসে গেল।

“তাহলে এত বছর পর আপনি আমাকে চিনলেন না কেন?”

হরেন মৃদু হেসে বলল,

“তখন তুমি ছোট ছিলে। তোমাকে একবারই দেখেছিলাম।”

ঝড় আরও তীব্র হল।

হরেন বুঝতে পারল, নৌকাটি আর নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়।

সে বলল, “সামনে একটা ছোট চর আছে। নৌকা ওদিকে নিয়ে যেতে পারলে আমরা বাঁচব।”

কিন্তু ঢেউ নৌকাটিকে ঘুরিয়ে দিল।

মেয়েটি হঠাৎ দেখতে পেল পুঁটলির মধ্যে একটি ছোট ধাতব বাক্স।

“এটা কী?”

হরেন বলল, “খুলে দেখুন।”

বাক্সের ভেতরে ছিল একটি পুরোনো কম্পাস।

হরেন সেটি হাতে নিয়ে বলল, “তোমার বাবা এটা সবসময় সঙ্গে রাখতেন।”

কম্পাসের কাঁটা একদিকে স্থির হয়ে আছে।

হরেন বুঝতে পারল, নদীর স্রোত তাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে।

সে বলল, “আমরা ভুল দিকে যাচ্ছি। ওই দিকেই চরনগরের পুরোনো ঘাট।”

সে দাঁড় ঘুরিয়ে নৌকাকে স্রোতের বিপরীতে নিতে চেষ্টা করল।

অনেক কষ্টের পর নৌকাটি একটি কাদাময় চরের কাছে আটকে গেল।

দুজনেই নেমে পড়ল।

ঝড় তখনও চলছে।

মেয়েটি চারদিকে তাকিয়ে বলল, “এটাই কি চরনগর?”

হরেন মাথা নাড়ল।

কিন্তু সেখানে কোনো বসতি নেই।

শুধু একটি ভাঙা ঘর।

ঘরের ভেতরে ঢুকে তারা দেখল, দেওয়ালে পুরোনো কিছু ছবি ঝোলানো।

একটি ছবিতে মেয়েটির বাবা।

তার নিচে লেখা—

“নদীর মানুষদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র।”

হরেন অবাক হয়ে গেল।

“তোমার বাবা এখানে কাজ করতেন?”

মেয়েটি পুরোনো কাগজগুলো পড়তে লাগল।

তখন জানা গেল, নিখোঁজ হওয়ার আগে তার বাবা নদীর মাঝিদের জন্য একটি আশ্রয়কেন্দ্র বানানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু দুর্ঘটনার পর কাজটি আর শেষ হয়নি।

মেয়েটি ধীরে বলল,

“আমি বাবাকে খুঁজতে এসেছিলাম। কিন্তু বাবার স্বপ্নটাই খুঁজে পেলাম।”

হরেন তার দিকে তাকিয়ে বলল,

“তাহলে এবার সেটা শেষ করবে?”

মেয়েটি চোখ মুছে বলল,

“হ্যাঁ।”

কয়েক মাস পরে চরনগরে একটি নতুন আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি হল।

নদীতে ঝড় উঠলে মাঝিরা সেখানে আশ্রয় নিতে পারত।

উদ্বোধনের দিন হরেনকে বিশেষভাবে ডাকা হয়েছিল।

মেয়েটি তার হাতে একটি নতুন নৌকার চাবি দিয়ে বলল,

“এটা আপনার।”

হরেন অবাক হয়ে বলল, “আমার?”

“বাবার পুরোনো নৌকার মতো নয়। এটা নতুন। তবে নামটা আপনার ঠিক করতে হবে।”

হরেন নৌকার গায়ে হাত বুলিয়ে বলল,

“নাম হবে—‘ফিরে আসা’।”

মেয়েটি হাসল।

দূরে তখন নদী শান্ত।

হরেন নদীর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বন্ধুকে বলল,

“তোর মেয়েকে ফিরিয়ে দিয়েছি। আর তোর স্বপ্নটাও।”

সেদিন সন্ধ্যায় নতুন নৌকাটি নদীর জলে নামল।

নদীর ওপারে সূর্য ডুবে যাচ্ছিল।

কিন্তু সেই দিনের মতো আর কোনো নৌকা হারিয়ে গেল না।

কারণ কখনও কখনও একটি অসমাপ্ত স্বপ্নই মানুষের জীবনে সবচেয়ে শক্তিশালী পথের দিশারি হয়ে ওঠে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *