
মা মারা যাওয়ার পর প্রায় এক বছর হয়ে গিয়েছিল।
তবু নীলয় যখনই গ্রামের বাড়িতে আসত, রান্নাঘরের দরজার সামনে এসে থেমে যেত। মনে হত, মা হয়তো একটু পরেই বলবেন—
“এত দেরি করলি কেন? ভাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”
কিন্তু বাড়িটা এখন নিঃশব্দ।
একদিন বাড়ি বিক্রি করার জন্য জিনিসপত্র গোছাতে গিয়ে নীলয়ের চোখ পড়ল রান্নাঘরের পুরোনো কাঠের আলমারিতে।
আলমারির নিচের তাকে একটি ছোট লোহার বাক্স।
চাবি নেই।
বাক্সের গায়ে মায়ের হাতের লেখায় মাত্র তিনটি শব্দ—
“নীলয়ের জন্য।”
নীলয়ের বুক কেঁপে উঠল।
অনেক চেষ্টা করে বাক্সটি খুলতেই বেরিয়ে এল কিছু পুরোনো রসিদ, একটি কাপড়ে মোড়ানো ছোট্ট পুঁটলি এবং কয়েকটি ছবি।
সবচেয়ে ওপরে ছিল একটি কাগজ।
“তুই যখন এই বাক্স খুলবি, তখন হয়তো আমি থাকব না।”
নীলয় পড়তে পড়তে থেমে গেল।
চিঠিতে লেখা ছিল—
“তুই ছোটবেলায় যখন স্কুলে যেতে চাইতিস না, তখন তোকে ভয় দেখিয়ে বলতাম, পড়াশোনা না করলে মানুষ হবি না। আসলে আমি ভয় পেতাম—তুই যেন আমার মতো কষ্টের জীবন না কাটাস।”
নীলয়ের চোখ ভিজে উঠল।
তারপর লেখা ছিল—
“তুই শহরে চলে যাওয়ার পর প্রতি মাসে যে টাকা পাঠাতিস, তার কিছুটা আমি খরচ করিনি।”
নীলয় অবাক হল।
মা তো সবসময় বলতেন, “টাকা পাঠাস না, নিজের সংসার দেখ।”
চিঠির পরের পাতায় লেখা—
“তোর পাঠানো টাকা দিয়ে আমি গ্রামের কয়েকজন গরিব মেয়ের পড়াশোনার খরচ দিয়েছি।”
নীলয় স্তব্ধ হয়ে গেল।
পুঁটলির মধ্যে ছিল স্কুলের ফি জমার রসিদ।
একটির পর একটি নাম।
মেয়েদের নাম।
কারও বাবা দিনমজুর, কারও বাবা ভ্যানচালক, কারও বাবা নেই।
সব রসিদের টাকা দিয়েছেন নীলয়ের মা।
শেষ পাতায় লেখা—
“তুই ভাবিস, আমি তোকে টাকা জমিয়ে দিইনি। ঠিকই ভাবিস। কারণ টাকা জমালে শুধু তোর জীবন একটু ভালো হত। কিন্তু কয়েকজন মেয়েকে পড়তে সাহায্য করলে তাদের পুরো জীবন বদলে যেতে পারে।”
নীলয় বাক্সটি বুকে চেপে ধরে বসে রইল।
তার মনে পড়ল, ছোটবেলায় মা কতবার নিজের নতুন শাড়ি না কিনে তার বই কিনেছিলেন।
কতবার নিজের অসুখ লুকিয়ে বলেছিলেন,
“আমার কিছু হয়নি।”
চিঠির শেষে আরেকটি কথা ছিল—
“একটা অনুরোধ আছে। বাড়িটা যদি বিক্রি করিস, কর। কিন্তু রান্নাঘরটা যেন ভেঙে ফেলিস না।”
নীলয় অবাক হল।
“কেন?”
চিঠির পরের লাইনে লেখা—
“এই রান্নাঘরেই আমি প্রথম বুঝেছিলাম, মানুষের পেট ভরানোর চেয়েও বড় কাজ হলো তাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করা।”
নীলয় অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
পরদিন বাড়ি বিক্রির কথা ছিল।
কিন্তু সে সিদ্ধান্ত বদলে দিল।
বাড়িটা বিক্রি হল না।
বরং নীলয় শহর থেকে ফিরে এসে গ্রামের বাড়ির একটি অংশ সংস্কার করল।
সামনের ঘরটি হল পড়ার ঘর।
পুরোনো রান্নাঘরটি আগের মতোই রাখা হল।
গ্রামের মেয়েরা সেখানে এসে পড়াশোনা করতে শুরু করল।
কেউ স্কুলের বই পড়ে, কেউ কম্পিউটার শেখে, কেউ চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়।
দরজার ওপরে নীলয় একটি ফলক লাগাল—
“মায়ের রান্নাঘর পাঠশালা”
উদ্বোধনের দিন গ্রামের এক বৃদ্ধা এসে বললেন,
“তোমার মা থাকলে খুব খুশি হতেন।”
নীলয় হাসল।
“আমি জানি।”
একটি ছোট মেয়ে তখন রান্নাঘরের পুরোনো চুলার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কাকু, এখানে সত্যিই রান্না হত?”
নীলয় বলল,
“হত।”
“তাহলে নামটা রান্নাঘর কেন?”
নীলয় একটু হেসে বলল,
“কারণ এখানেই তোমাদের স্বপ্নগুলো রান্না হবে।”
মেয়েটি কিছুই বুঝল না।
কিন্তু হাসল।
সন্ধ্যায় সবাই চলে যাওয়ার পর নীলয় একা রান্নাঘরে বসে রইল।
চুলার পাশে মায়ের পুরোনো হাতা এখনও ঝুলছে।
সে আস্তে বলল,
“মা, তুমি যে টাকা জমাওনি, আজ বুঝলাম তুমি আসলে তার থেকেও বড় কিছু রেখে গেছ।”
জানালা দিয়ে সন্ধ্যার বাতাস ঢুকছিল।
পুরোনো রান্নাঘরের চুলা নিভে গেছে অনেকদিন।
কিন্তু সেই ঘর থেকেই একের পর এক নতুন জীবনের আলো জ্বলতে শুরু করল।
আর নীলয় বুঝল—
মায়েরা কখনও কখনও সন্তানকে সম্পত্তি দিয়ে যান না। তাঁরা দিয়ে যান এমন একটি শিক্ষা, যা সম্পত্তির থেকেও বহু গুণ বেশি মূল্যবান।












Leave a Reply