
রাত তখন সাড়ে এগারোটা। শহরের ব্যস্ত রাস্তা অনেক আগেই ফাঁকা হয়ে গেছে। নিজের ছোট্ট ফ্ল্যাটে বসে রুদ্র ল্যাপটপে কাজ করছিল। বাইরে হালকা বৃষ্টি পড়ছিল, জানলার কাঁচে টুপটাপ শব্দ হচ্ছিল।
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি অচেনা নম্বর।
রুদ্র ফোন ধরল।
— হ্যালো?
ওপাশ থেকে কয়েক সেকেন্ড কোনো শব্দ এল না।
তারপর খুব নিচু গলায় একজন বলল,
— আপনি কি রুদ্র সেন?
— হ্যাঁ। কিন্তু আপনি কে?
— আজ রাত বারোটার আগে একটা কাজ করবেন?
রুদ্র বিরক্ত হয়ে বলল,
— কী কাজ?
ওপাশের মানুষটি বলল,
— আপনার বাড়ির নিচে যে পুরোনো সিঁড়িটা আছে, সেখানে যাবেন। সিঁড়ির শেষ ধাপে একটা কালো বাক্স পাবেন। সেটা খুলবেন না।
রুদ্র হেসে ফেলল।
— আপনি কি মজা করছেন?
— না। আর একটা কথা… বারোটার পর যদি আপনার ফোন আবার বাজে, কোনোভাবেই ধরবেন না।
কলটা কেটে গেল।
রুদ্র কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজেই বলল,
— আজকাল মানুষজনও অদ্ভুত!
সে আবার কাজে মন দিল।
ঠিক তখনই ঘড়িতে বারোটা বাজল।
ট্রিং… ট্রিং…
ফোনটা আবার বেজে উঠল।
স্ক্রিনে সেই একই অচেনা নম্বর।
রুদ্রের বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল।
সে ফোন ধরল না।
দশ সেকেন্ড পর কল বন্ধ হয়ে গেল।
তারপর আবার।
এবারও সে ধরল না।
তৃতীয়বার ফোন বেজে উঠতেই রুদ্রের কৌতূহল ভয়কে ছাপিয়ে গেল। সে কলটি রিসিভ করল।
— হ্যালো?
ওপাশ থেকে এবার কোনো কণ্ঠস্বর নেই।
শুধু শোনা গেল একটা শিশুর কান্না।
রুদ্র চমকে উঠল।
— কে? কে কথা বলছেন?
কান্নাটা ধীরে ধীরে থেমে গেল।
তারপর একটি শিশুকণ্ঠ বলল,
— কাকু… আমাকে বের করে দিন।
রুদ্র উঠে দাঁড়াল।
— তুমি কোথায়?
— নিচে।
কল কেটে গেল।
রুদ্র আর বসে থাকতে পারল না। টর্চ হাতে নিয়ে সে নিচে নেমে গেল।
বাড়ির পেছনে সত্যিই একটা পুরোনো সিঁড়ি ছিল। বহু বছর ধরে সেটি ব্যবহার করা হয় না। সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছতেই রুদ্র দেখতে পেল একটি ছোট কালো বাক্স।
তার গায়ে ধুলো জমে আছে।
রুদ্রের মনে পড়ল ফোনের কথা—“বাক্সটা খুলবেন না।”
কিন্তু ভেতর থেকে যেন খুব ক্ষীণ শব্দ আসছিল।
ঠক… ঠক…
রুদ্রের হাত কেঁপে উঠল।
সে বাক্সটা খুলে ফেলল।
ভেতরে ছিল একটি পুরোনো মোবাইল ফোন এবং কয়েকটি ছবি।
ছবিগুলো দেখে রুদ্র স্তব্ধ হয়ে গেল।
ছবিতে তাদের এই বাড়িটাই দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু ছবিগুলো তোলা হয়েছিল প্রায় পনেরো বছর আগে।
একটি ছবিতে দেখা গেল বাড়ির তৎকালীন মালিকের ছোট ছেলে অর্ণবকে। ছেলেটি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়েছিল—এই ঘটনা রুদ্র বাড়ির পুরোনো বাসিন্দাদের কাছে শুনেছিল।
হঠাৎ বাক্সের ভেতরের মোবাইলটি জ্বলে উঠল।
স্ক্রিনে একটি ভিডিও নিজে থেকেই চালু হয়ে গেল।
ভিডিওতে দেখা গেল অর্ণবকে।
ছেলেটি কাঁদতে কাঁদতে বলছে,
— যদি কেউ এই ভিডিও দেখে, আমাকে খুঁজে বের করবেন। আমাকে এই ঘরের নিচে আটকে রাখা হয়েছে।
রুদ্র চারদিকে তাকাল।
“ঘরের নিচে?”
তার মনে পড়ল—বাড়ির পুরোনো স্টোররুমের মেঝের একটা অংশ অন্য অংশের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে উঁচু।
সে দৌড়ে সেখানে গেল।
মেঝেতে টোকা দিতেই ফাঁপা শব্দ হলো।
রুদ্র প্রতিবেশীদের ডেকে আনল। সবাই মিলে মেঝের অংশটা সরাতেই নিচে একটি ছোট গোপন ঘর দেখা গেল।
ঘরের ভেতরে বহু পুরোনো জিনিসপত্রের সঙ্গে একটি শিশুর খেলনা পড়ে ছিল।
আর দেওয়ালে আঁচড়ের দাগ।
পুলিশকে খবর দেওয়া হলো।
তদন্তে জানা গেল, পনেরো বছর আগে বাড়ির এক কর্মচারী টাকা-পয়সার লোভে অর্ণবকে অপহরণ করেছিল। কিন্তু পালানোর সময় দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়। সত্য গোপন রাখতে শিশুটিকে ওই গোপন ঘরে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।
রুদ্রের গা শিউরে উঠল।
কিন্তু রহস্য তখনও শেষ হয়নি।
পুলিশ চলে যাওয়ার পর রাতে আবার রুদ্রের ফোন বেজে উঠল।
একই নম্বর।
এবার সে ভয় পেলেও ফোন ধরল।
ওপাশ থেকে শিশুকণ্ঠ বলল,
— কাকু… এবার আমি বাড়ি যেতে পারব?
রুদ্রের চোখে জল এসে গেল।
সে ধীরে বলল,
— হ্যাঁ অর্ণব। এবার তুমি বাড়ি যেতে পারবে।
কলটা কেটে গেল।
পরদিন সকালে রুদ্র দেখল, তার ফোনে কোনো অচেনা নম্বরের কল ইতিহাস নেই।
শুধু গ্যালারিতে একটি নতুন ছবি।
ছবিতে ছোট্ট অর্ণব হাসছে।
তার নিচে লেখা—
“ধন্যবাদ, কাকু।”
রুদ্র জানত না ছবিটি কে তুলেছে।
তবে সেদিনের পর আর কখনো সেই ফোন আসেনি।












Leave a Reply