
সমুদ্রের ধারে ছোট্ট জেলেপাড়া মাধবপুরে একটা অদ্ভুত গল্প প্রচলিত ছিল।
জোয়ার নামার পর সমুদ্রের অনেকটা অংশ যখন বালুচরে পরিণত হয়, তখন মাঝরাতে নাকি সমুদ্রের নিচ থেকে ঘণ্টার শব্দ শোনা যায়।
ঢং… ঢং… ঢং…
গ্রামের বৃদ্ধরা বলতেন, বহু বছর আগে একটি পুরোনো জাহাজ ডুবে গিয়েছিল। সেই জাহাজে থাকা একটি বড় ব্রোঞ্জের ঘণ্টা আজও সমুদ্রের তলায় রয়েছে।
কিন্তু কেউ কখনো সেটি দেখেনি।
কলকাতা থেকে সমুদ্রবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করতে মাধবপুরে এসেছিল তরুণী ইরা। গ্রামের গল্প শুনে সে হাসল।
— সমুদ্রের ঢেউ আর পাথরের ধাক্কাতেও অনেক সময় ঘণ্টার মতো শব্দ হতে পারে।
কিন্তু সেই রাতেই ঘটনাটা ঘটল।
রাত প্রায় দুটো।
হঠাৎ—
ঢং…
ঢং…
ঢং…
ইরা ঘুম থেকে উঠে বাইরে এল।
শব্দটা স্পষ্ট।
সে টর্চ জ্বালিয়ে সমুদ্রের দিকে তাকাল। আশ্চর্যভাবে সেদিন জোয়ার অনেকটা নেমে গিয়েছিল।
পরদিন সকালে সে গ্রামের বৃদ্ধ জেলে হরিপদর সঙ্গে কথা বলল।
হরিপদ বললেন,
— আমার দাদু বলতেন, ঘণ্টাটা সাধারণ কোনো জাহাজের ছিল না। সেটার গায়ে একটা চিহ্ন ছিল।
— কী চিহ্ন?
— একটা পাখি। ডানা মেলা পাখি।
ইরার কৌতূহল বেড়ে গেল।
সে পুরোনো মানচিত্র সংগ্রহ করল। স্থানীয় নথি ঘেঁটে জানতে পারল, প্রায় একশো বছর আগে ওই উপকূলের কাছে একটি গবেষণাজাহাজ ডুবে গিয়েছিল। জাহাজটির নাম ছিল সমুদ্রদীপ।
নথিতে আরও লেখা ছিল—জাহাজটিতে একটি বিশেষ সামুদ্রিক ঘণ্টা ছিল, যা বিপদের সময় সংকেত দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হতো।
ইরা সিদ্ধান্ত নিল, জোয়ার ভাটার হিসাব করে জায়গাটি খুঁজে দেখা হবে।
পরদিন ভোরে সে হরিপদর নৌকায় সমুদ্রে বেরোল।
প্রায় এক ঘণ্টা পর যন্ত্রে অস্বাভাবিক ধাতব সংকেত পাওয়া গেল।
ইরা উত্তেজিত হয়ে বলল,
— এখানেই কিছু আছে!
ডুবুরি দলের সাহায্যে তারা নিচে নামল।
সমুদ্রের তলায় পাথর আর প্রবালের মধ্যে ধীরে ধীরে একটি পুরোনো কাঠামো দেখা গেল।
জাহাজের ধ্বংসাবশেষ!
আর তার পাশে পড়ে আছে বিশাল একটি ব্রোঞ্জের ঘণ্টা।
ঘণ্টার গায়ে সত্যিই ডানা মেলা পাখির চিহ্ন।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ঘণ্টাটির পাশে একটি লোহার বাক্সও ছিল।
বাক্সটি ওপরে তুলে আনা হলো।
ভেতরে পাওয়া গেল কয়েকটি পুরোনো ধাতব প্লেট এবং জল-রোধী কাগজে লেখা কিছু নথি।
নথিগুলো পড়ে ইরা হতবাক হয়ে গেল।
সমুদ্রদীপ শুধু গবেষণাজাহাজ ছিল না। জাহাজের বিজ্ঞানীরা সমুদ্রের তলায় একটি বিরল প্রবালপ্রাচীর আবিষ্কার করেছিলেন। সেটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সম্পদ।
কিন্তু জাহাজটি ডুবে যাওয়ার পর সেই আবিষ্কারের খবর আর প্রকাশিত হয়নি।
ইরা নথিগুলো নিয়ে গবেষণাগারে ফিরল।
পরীক্ষা করে দেখা গেল, প্রবালপ্রাচীরটির একটি বড় অংশ এখনও জীবিত।
কিন্তু কয়েক বছর ধরে কাছাকাছি অবৈধ মাছ ধরার কারণে সেটি ধ্বংসের মুখে।
ইরা বিষয়টি প্রশাসন ও পরিবেশ দপ্তরকে জানাল।
অবশেষে ওই সমুদ্রাঞ্চলের একটি অংশ সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হলো।
গ্রামের মানুষও বুঝতে পারল, তাদের কাছে যে “ভূতের ঘণ্টা” ছিল, সেটি আসলে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।
কয়েক সপ্তাহ পর ইরা আবার সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে ছিল।
সন্ধ্যার আলোয় ঢেউ ধীরে ধীরে তীরে এসে ভাঙছিল।
হরিপদ পাশে দাঁড়িয়ে বললেন,
— এবার কি বুঝলে, ঘণ্টাটা রাতে কেন বাজত?
ইরা হেসে বলল,
— হয়তো ঢেউয়ের ধাক্কায়।
হরিপদ মাথা নাড়লেন।
— হয়তো। তবে আমার মনে হয়, কিছু জিনিস হারিয়ে গেলেও নিজের গল্প বলার জন্য অপেক্ষা করে।
ইরা সমুদ্রের দিকে তাকাল।
দূরে সূর্য ডুবে যাচ্ছিল।
হঠাৎ খুব ক্ষীণ একটা শব্দ ভেসে এল—
ঢং…
একবারই।
তারপর সব চুপ।
ইরা আর কিছু বলল না।
শুধু মনে হলো, একশো বছর ধরে সমুদ্রের গভীরে ঘুমিয়ে থাকা সেই ঘণ্টা যেন শেষবারের মতো জানিয়ে গেল—
ইতিহাসকে যত গভীরেই চাপা দেওয়া হোক, সত্য একদিন না একদিন জেগে ওঠে।












Leave a Reply