
নদীঘেরা একটি গ্রাম—শান্তিপুরডাঙা। গ্রামের বেশিরভাগ বাড়িই ছিল মাটির বা পুরনো ইটের। উঠোনে তুলসী গাছ, বারান্দায় ধান শুকোনো, আর বিকেল হলেই পুকুরঘাটে মানুষের ভিড়।
এই গ্রামের একটি পুরনো বাড়িতে থাকতেন কমলা।
বয়স পঁয়তাল্লিশ। স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই সন্তানকে নিয়ে তাঁর সংসার।
কমলার হাতে ছিল এক বিশেষ দক্ষতা—তাঁত বোনা।
ছোটবেলা থেকেই মায়ের কাছ থেকে তাঁত শেখা। একসময় তাঁর বোনা শাড়ির বেশ নাম ছিল আশেপাশের গ্রামে।
কিন্তু বাজার বদলে গেল।
মেশিনে তৈরি সস্তা কাপড় বাজার দখল করল।
একটার পর একটা তাঁত বন্ধ হতে লাগল।
কমলার বাড়ির পুরনো তাঁতটিও একদিন থেমে গেল।
সেই দিন কমলা অনেকক্ষণ তাঁতের সামনে বসে ছিলেন।
ছেলে অর্ণব এসে বলল,
—“মা, এটা বিক্রি করে দাও।”
কমলা চমকে তাকালেন।
—“কেন?”
—“পুরনো হয়ে গেছে। টাকা পেলে আমার পড়াশোনার খরচ হবে।”
কমলা তাঁতের কাঠে হাত রাখলেন।
—“এটা শুধু কাঠ নয় রে।”
অর্ণব বুঝল না।
কমলা বললেন,
—“এই তাঁতে তোর দিদিমা কাজ করত। তারপর আমি। এই তাঁতের শব্দ শুনেই তোরা বড় হয়েছিস।”
অর্ণব বলল,
—“কিন্তু এখন তো কেউ কিনতে চায় না।”
কমলা চুপ করে গেলেন।
সত্যিই তো।
দক্ষতা আছে, কিন্তু বাজার নেই।
কয়েক মাস কমলা অন্যের বাড়িতে কাজ করলেন।
কিন্তু তাঁর মন পড়ে থাকল সেই বন্ধ তাঁতের কাছে।
একদিন গ্রামের স্কুলের শিক্ষিকা মধুমিতা কমলার বাড়িতে এলেন।
তাঁতের পাশে বসে বললেন,
—“আপনি আবার কাজ শুরু করছেন না কেন?”
কমলা হেসে বললেন,
—“কাজ করব কার জন্য? কাপড় কিনবে কে?”
মধুমিতা বললেন,
—“আগের মতো শাড়ি না বানিয়ে অন্য কিছু বানান।”
—“কী?”
—“ব্যাগ, টেবিল রানার, কুশন কভার, ছোট কাপড়ের পুতুল—যা মানুষ এখন কিনতে চায়।”
কমলা কিছুক্ষণ ভাবলেন।
তারপর বললেন,
—“তাঁতে শাড়ি ছাড়া আর কিছু করা যায়?”
—“কেন যাবে না?”
পরদিন থেকেই কমলা পরীক্ষা শুরু করলেন।
পুরনো নকশা বদলে ছোট কাপড়ের ব্যাগ বানালেন।
প্রথম ব্যাগটি খুব সুন্দর হল না।
দ্বিতীয়টিও নয়।
তৃতীয়বার কিছুটা ভালো হল।
মধুমিতা সেটি নিয়ে স্কুলে গেলেন।
সেখানে কয়েকজন শিক্ষক কিনলেন।
কমলা প্রথমবার বুঝলেন—সমস্যা তাঁতের নয়, হয়তো তাঁর পুরনো পদ্ধতিতে।
তিনি নতুন নকশা শেখার জন্য শহরে একটি প্রশিক্ষণ নিলেন।
বাড়ি ফিরে নতুন করে কাজ শুরু করলেন।
এবার তিনি গ্রামের দৃশ্য, নদী, পাখি, ধানের শিষ—এসব নকশায় ফুটিয়ে তুললেন।
কাপড়গুলো যেন গ্রামের গল্প বলতে শুরু করল।
একদিন অর্ণব একটি ব্যাগ হাতে নিয়ে বলল,
—“মা, এটা তো খুব সুন্দর!”
কমলা হাসলেন।
—“তোর ভালো লাগছে?”
—“খুব।”
সেই ব্যাগের ছবি অর্ণব মোবাইলে তুলে ইন্টারনেটে পোস্ট করল।
কয়েকদিন পর একটি শহুরে দোকান থেকে ফোন এল।
তারা পঞ্চাশটি ব্যাগ চাইছে।
কমলা ভয় পেয়ে গেলেন।
—“পঞ্চাশটা?”
অর্ণব বলল,
—“আমরা পারব মা।”
কিন্তু সমস্যা ছিল—কমলা একা এতগুলো বানাতে পারবেন না।
অর্ণব গ্রামের আরও চারজন তাঁতশিল্পীকে ডাকল।
তাঁরা সবাই একসময় কাজ ছেড়ে দিয়েছিলেন।
অর্ণব বলল,
—“চলুন আবার শুরু করি।”
একজন বৃদ্ধ তাঁতশিল্পী বললেন,
—“বাজার না থাকলে আবার বন্ধ হয়ে যাবে।”
অর্ণব বলল,
—“এবার বাজার খুঁজে নেওয়ার কাজটাও আমরা করব।”
কাজ শুরু হল।
পুরনো তাঁতগুলো পরিষ্কার করা হল।
কেউ সুতো প্রস্তুত করল।
কেউ নকশা করল।
কেউ বুনল।
কেউ সেলাই করল।
পঞ্চাশটি ব্যাগ সময়মতো তৈরি হল।
শহরের দোকান থেকে আবার অর্ডার এল।
এবার একশোটি।
তারপর দুইশো।
ধীরে ধীরে শান্তিপুরডাঙার বন্ধ হয়ে যাওয়া তাঁতগুলোতে আবার শব্দ ফিরতে লাগল।
সকাল হলেই শোনা যেত—
ঠক… ঠক… ঠক…
তাঁতের সেই পুরনো শব্দ।
কমলার চোখে জল এসে যেত।
একদিন তিনি ছেলেকে বললেন,
—“ভাবিনি এই শব্দ আবার শুনব।”
অর্ণব বলল,
—“তুমি তো বলেছিলে, তাঁত শুধু কাঠ নয়।”
কমলা হেসে বললেন,
—“হ্যাঁ। আজ বুঝলাম, একটা তাঁত থেমে গেলে শুধু একটা কাজ থামে না। একটা পরিবারের স্মৃতিও থেমে যায়।”
কয়েক মাস পর গ্রামের মহিলারা মিলে একটি সমিতি তৈরি করলেন।
নাম দিলেন—
“সুতোর গল্প”।
তাঁরা ঠিক করলেন, গ্রামের প্রতিটি পরিবারের ঐতিহ্যবাহী নকশা সংরক্ষণ করবেন।
বৃদ্ধ তাঁতশিল্পীরা তরুণদের শেখাতে শুরু করলেন।
যে ছেলেমেয়েরা আগে তাঁতের কাজকে পুরনো পেশা বলে ভাবত, তারাও আগ্রহী হল।
একদিন শহর থেকে একটি দল গ্রামে এল।
তারা কমলার কাজ দেখে বলল,
—“আপনাদের তৈরি কাপড়ের মধ্যে গ্রামের নিজস্ব গল্প আছে। আমরা এগুলো নিয়ে প্রদর্শনী করতে চাই।”
কমলা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।
কয়েক বছর আগে যে তাঁত বিক্রি করার কথা ভাবা হয়েছিল, আজ সেই তাঁতের তৈরি জিনিস শহরে প্রদর্শিত হবে!
প্রদর্শনীর দিন কমলা নিজের হাতে বোনা একটি কাপড়ের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
একজন দর্শক কাপড়টির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
—“এই নকশাটার নাম কী?”
কমলা মৃদু হেসে বললেন,
—“ভোরের মাঠ।”
—“কেন?”
—“কারণ ভোরে আমাদের গ্রামের মাঠে যে আলো পড়ে, সেটা আমি ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি।”
দর্শকটি কাপড়টি কিনে নিলেন।
কমলা অনেকক্ষণ তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বুঝলেন—
তিনি শুধু কাপড় বিক্রি করছেন না।
তিনি নিজের গ্রামের গল্প অন্য মানুষের ঘরে পৌঁছে দিচ্ছেন।
বছর দুয়েক পর কমলার মেয়ে মেঘা কলেজ শেষ করে গ্রামে ফিরে এল।
সে বলল,
—“মা, আমিও কাজ শিখব।”
কমলা অবাক হয়ে বললেন,
—“তুই তো শহরে চাকরি করতে পারিস।”
মেঘা হেসে বলল,
—“চাকরি করব। কিন্তু এই কাজটাও ছাড়ব না।”
কমলা মেয়েকে তাঁতের সামনে বসালেন।
মেঘার আঙুলে সুতো ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
—“ধীরে। সুতো টান বেশি হলে ছিঁড়ে যাবে, কম হলে নকশা ঠিক হবে না।”
মেঘা বলল,
—“জীবনের মতো?”
কমলা হেসে ফেললেন।
—“ঠিক তাই।”
সন্ধ্যায় গ্রামের প্রতিটি বাড়ি থেকে তাঁতের শব্দ ভেসে আসছিল।
ঠক… ঠক… ঠক…
সেই শব্দের মধ্যে ছিল রোজগারের আশা।
ছিল পুরনো ঐতিহ্য।
ছিল নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন।
আর ছিল এক মায়ের জেদ—
যে জেদ প্রমাণ করেছিল, পুরনো জিনিস সবসময় ফেলে দেওয়ার জন্য নয়।
কখনও কখনও তাকে নতুন করে ব্যবহার করতে শেখাতে হয়।
কারণ ঐতিহ্য তখনই বেঁচে থাকে, যখন নতুন প্রজন্ম তাকে নিজের মতো করে এগিয়ে নিয়ে যায়।












Leave a Reply