গল্প : শেষ ট্রেনের আলো।

শীতের সন্ধ্যা। ছোট্ট স্টেশনটির নাম শালবনি রোড। স্টেশন বলতে একটি মাত্র প্ল্যাটফর্ম, একটি টিনের ছাউনি, ছোট্ট টিকিটঘর আর পাশে পুরোনো একটি চায়ের দোকান।

সন্ধ্যা নামলেই স্টেশনটা কেমন যেন নিস্তব্ধ হয়ে যেত। দিনের বেলা দু-একটি লোকাল ট্রেন, কিছু যাত্রী আর হকারদের হাঁকডাকে জায়গাটা সরগরম থাকলেও রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সব শব্দ যেন হারিয়ে যেত দূরের অন্ধকারে।

এই স্টেশনেরই এক কোণে প্রতিদিন বসত সতেরো বছরের ছেলে অর্ক

অর্কের হাতে থাকত একটা পুরোনো বই।

কখনও বিজ্ঞান, কখনও ইতিহাস, কখনও গল্পের বই।

কিন্তু বই পড়ার জন্য সে স্টেশনে আসত না।

তার আসার একটা অন্য কারণ ছিল।

সে অপেক্ষা করত শেষ ট্রেনটির জন্য।

শালবনি রোড স্টেশনে প্রতিদিন রাত সাড়ে দশটায় একটি লোকাল ট্রেন থামত। মাত্র দুই মিনিট।

অর্ক প্রতিদিন সেই ট্রেনের আলো দেখত।

ট্রেনটা আসত, কয়েকজন যাত্রী নামত, কয়েকজন উঠত, তারপর বাঁশির শব্দ তুলে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে যেত।

ট্রেন চলে যাওয়ার পর অর্ক অনেকক্ষণ সেই রেললাইনের দিকে তাকিয়ে থাকত।

একদিন চায়ের দোকানের মালিক হরিপদ কাকা তাকে জিজ্ঞেস করলেন,

—“রোজ এখানে বসে থাকিস কেন রে?”

অর্ক বই থেকে চোখ না তুলে বলল,

—“ট্রেন দেখি।”

—“ট্রেন তো রোজই আসে।”

—“জানি।”

—“তাহলে?”

অর্ক একটু হেসে বলল,

—“ট্রেনটা আমাকে মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীটা এই গ্রামের চেয়ে অনেক বড়।”

হরিপদ কাকা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

—“তুই কি এই গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে চাস?”

অর্ক বই বন্ধ করল।

—“চাই। কিন্তু শুধু নিজের জন্য নয়।”

হরিপদ কাকা অবাক হয়ে তাকালেন।

—“তাহলে?”

অর্ক বলল,

—“আমি পড়াশোনা করে ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই। তারপর এই গ্রামের জন্য কিছু করতে চাই।”

হরিপদ কাকা হেসে বললেন,

—“সবাই তো এই কথাই বলে। বড় হয়ে সবাই বড় শহরে চলে যায়।”

অর্ক কিছু বলল না।

সে আবার বই খুলে পড়তে শুরু করল।


অর্কের বাবা ছিলেন দিনমজুর।

মা বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ করতেন।

সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু অর্কের পড়াশোনার ব্যাপারে বাবা-মা কখনও আপস করেননি।

বাবা প্রায়ই বলতেন,

—“আমরা পড়তে পারিনি। তুই পড়বি। আমাদের মতো জীবন যেন তোর না হয়।”

অর্কও চেষ্টা করত।

কিন্তু একটা সমস্যা ছিল।

তাদের বাড়িতে বিদ্যুৎ থাকলেও প্রায়ই লোডশেডিং হতো। বিশেষ করে পরীক্ষার সময় রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকত না।

মোমবাতির আলোয় পড়তে পড়তে অর্কের চোখ জ্বালা করত।

এক রাতে সে বিরক্ত হয়ে বই বন্ধ করে ফেলল।

মা বললেন,

—“কী হল?”

—“এভাবে পড়া যায়?”

মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—“তুই যদি সত্যিই পড়তে চাস, একটা উপায় বের কর।”

সেই কথাটাই অর্কের মাথায় ঘুরতে লাগল।

পরদিন সে স্কুলের পদার্থবিদ্যার শিক্ষক সৌমেনবাবুর কাছে গেল।

সব শুনে শিক্ষক বললেন,

—“আলো না থাকলে আলো তৈরি করতে হয়।”

অর্ক অবাক হয়ে বলল,

—“কীভাবে?”

সৌমেনবাবু তাকে সৌরবিদ্যুৎ সম্পর্কে বুঝিয়ে দিলেন।

ছোট সোলার প্যানেল, ব্যাটারি আর এলইডি আলো দিয়ে কীভাবে বিদ্যুৎ তৈরি করা যায়, তার একটা সহজ মডেলও দেখালেন।

অর্কের চোখ জ্বলে উঠল।

সে বলল,

—“স্যার, এটা কি আমি বানাতে পারি?”

—“অবশ্যই পারিস।”

সেই দিন থেকেই শুরু হল অর্কের নতুন স্বপ্ন।


পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ অর্ক পুরোনো জিনিস জোগাড় করতে লাগল।

কেউ দিল পুরোনো ব্যাটারি, কেউ ভাঙা টর্চ, কেউ পুরোনো তার।

স্কুলের ল্যাব থেকে সৌমেনবাবু তাকে কিছু ছোট যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে দিলেন।

অনেকবার সার্কিট পুড়ে গেল।

কখনও ব্যাটারি নষ্ট হল।

কখনও আলো জ্বলল না।

বন্ধুরা হাসত।

—“তুই কি সত্যিই বিজ্ঞানী হবি?”

অর্ক হাসত।

—“চেষ্টা করছি।”

একদিন গভীর রাতে অবশেষে তার তৈরি ছোট্ট বাতিটা জ্বলে উঠল।

মাত্র কয়েক ওয়াটের আলো।

কিন্তু অর্কের কাছে সেটাই যেন সূর্যের আলো।

সে ছুটে মায়ের কাছে গেল।

—“মা! জ্বলেছে!”

মা ঘুম থেকে উঠে আলোটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন,

—“তোর আলো একদিন অনেক দূর যাবে।”


কয়েক মাস পর অর্কের মাধ্যমিক পরীক্ষা।

পরীক্ষার আগের রাতে আবার বিদ্যুৎ চলে গেল।

বাবা বললেন,

—“আজ স্টেশনে গিয়ে পড়বি?”

অর্ক অবাক হয়ে তাকাল।

বাবা বললেন,

—“হরিপদ কাকা বলেছে, স্টেশনের ঘরের পাশে বসলে আলো আছে।”

সেদিন অর্ক বই নিয়ে স্টেশনে গেল।

রাত বাড়ল।

হরিপদ কাকা দোকান গুটিয়ে বাড়ি চলে গেলেন।

স্টেশন প্রায় ফাঁকা।

অর্ক একা বসে পড়তে লাগল।

হঠাৎ দূর থেকে ট্রেনের আলো দেখা গেল।

প্রথমে ছোট্ট একটা বিন্দু।

তারপর ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল।

অর্ক বই বন্ধ করে তাকিয়ে রইল।

ট্রেনটা প্ল্যাটফর্মে ঢুকল।

দুই মিনিট পর আবার চলে গেল।

শেষ কামরার লাল আলোটা অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত অর্ক তাকিয়ে থাকল।

তারপর নিজের মনে বলল,

—“আমাকেও একদিন যেতে হবে। কিন্তু ফিরে আসব।”


পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন অর্ক স্কুলে প্রথম হল।

শুধু স্কুলে নয়, পুরো ব্লকের মধ্যে সে অন্যতম সেরা ফল করল।

সৌমেনবাবু তাকে বললেন,

—“এবার শহরে পড়তে যেতে হবে।”

অর্ক মাথা নাড়ল।

—“যাব স্যার।”

—“ভয় করছে?”

অর্ক একটু হেসে বলল,

—“ট্রেন তো প্রতিদিনই যায় স্যার। এতদিন শুধু দেখেছি। এবার উঠব।”

সেদিন রাতে সে আবার স্টেশনে এল।

হরিপদ কাকা তাকে দেখে বললেন,

—“কী রে, এবার সত্যিই চলে যাবি?”

—“হ্যাঁ।”

—“আমাদের ভুলে যাবি না তো?”

অর্ক হেসে বলল,

—“শেষ ট্রেনের আলো আমাকে সবসময় মনে করিয়ে দেবে।”

হরিপদ কাকা চুপ করে রইলেন।

কিছুক্ষণ পর বললেন,

—“যা। বড় হ। কিন্তু মনে রাখিস, বড় হওয়া মানে শুধু নিজের জীবন বদলানো নয়।”

অর্ক মাথা নাড়ল।

—“জানি কাকা।”


বছর পাঁচেক পর।

শালবনি রোড স্টেশনে অনেক পরিবর্তন হয়েছে।

প্ল্যাটফর্মে নতুন আলো বসেছে।

স্টেশনের পাশে একটি ছোট্ট পাঠাগার হয়েছে।

আর তার ছাদে বসেছে সোলার প্যানেল।

পাঠাগারের নাম—

“শেষ ট্রেনের আলো পাঠাগার”।

সন্ধ্যার পর গ্রামের ছেলে-মেয়েরা সেখানে পড়তে আসে।

কেউ বই পড়ে, কেউ কম্পিউটারে পড়াশোনা করে, কেউ পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়।

আর এই সমস্ত কিছুর পিছনে যে মানুষটি, সে অর্ক।

শহরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে চাকরি করার সুযোগ পেয়েও অর্ক শেষ পর্যন্ত নিজের গ্রামে ফিরে এসেছিল।

সে বলেছিল,

“যে আলো আমাকে পথ দেখিয়েছিল, সেই আলো আমি অন্যদের হাতে তুলে দিতে চাই।”

এক সন্ধ্যায় হরিপদ কাকা পাঠাগারের সামনে বসে ছিলেন।

দূর থেকে অর্ক এসে পাশে বসল।

হরিপদ কাকা বললেন,

—“তুই তো সত্যিই ফিরে এলি!”

অর্ক হাসল।

—“বলেছিলাম তো।”

ঠিক তখনই দূর থেকে ট্রেনের আলো দেখা গেল।

হরিপদ কাকা আর অর্ক দুজনেই রেললাইনের দিকে তাকালেন।

ট্রেনটা ধীরে ধীরে স্টেশনে ঢুকল।

জানালাগুলো থেকে বেরিয়ে এল অসংখ্য আলো।

কয়েক মুহূর্তের জন্য পুরো স্টেশনটা আলোকিত হয়ে উঠল।

তারপর ট্রেন চলে গেল।

আবার অন্ধকার।

কিন্তু এবার অন্ধকারটা আর আগের মতো ছিল না।

কারণ প্ল্যাটফর্মে আলো জ্বলছিল।

পাঠাগারে আলো জ্বলছিল।

আর গ্রামের একদল ছেলেমেয়ের চোখেও জ্বলছিল নতুন স্বপ্ন।

হরিপদ কাকা ধীরে ধীরে বললেন,

—“দেখলি অর্ক? ট্রেন চলে গেছে, কিন্তু আলোটা রেখে গেছে।”

অর্ক মৃদু হেসে বলল,

—“আলো কখনও ট্রেনে থাকে না কাকা। আলো থাকে মানুষের স্বপ্নে।”

দূরে শেষ ট্রেনের শব্দ মিলিয়ে গেল।

শালবনি রোডের রাত আবার নীরব হয়ে এল।

কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেও কোথাও যেন নতুন দিনের শব্দ শোনা যাচ্ছিল।

সমাপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *