ফাতমা বেগম: ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথমদিকের এক নারী পরিচালক ও স্বপ্নদ্রষ্টা।

ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাস বলতে আমরা সাধারণত বড় বড় অভিনেতা, পরিচালক কিংবা প্রযোজকদের নাম মনে করি। কিন্তু সিনেমার একেবারে শুরুর দিনগুলিতে, যখন চলচ্চিত্রের ভাষাই তখনও তৈরি হচ্ছে, সেই সময়ে একজন নারী নিজের হাতে তৈরি করেছিলেন অভিনয়, পরিচালনা, প্রযোজনা ও চিত্রনাট্যের এক সম্পূর্ণ জগৎ। তিনি ফাতমা বেগম।

আজকের চলচ্চিত্র শিল্পে একজন নারী পরিচালক হওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু একশো বছর আগে, যখন অভিনয়কেই অনেক পরিবার নারীদের জন্য অনুপযুক্ত পেশা বলে মনে করত, তখন একজন নারী নিজের প্রযোজনা সংস্থা তৈরি করে সিনেমা পরিচালনা করছেন—ঘটনাটি ছিল অসাধারণ সাহসের। ফাতমা বেগম সেই সাহসী পথিকৃৎদের অন্যতম।

থিয়েটার থেকে সিনেমার জগতে

ফাতমা বেগমের জন্ম ১৮৯২ সালে। তাঁর শৈশব ও কৈশোর সম্পর্কে খুব বেশি নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। তবে জানা যায়, তিনি উর্দু থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই সময় মঞ্চনাটক ছিল অভিনয়প্রতিভা প্রকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম।

বিশ শতকের গোড়ার দিকে ভারতীয় সমাজে নারীদের অভিনয়জীবন এখনও যথেষ্ট বিতর্কিত ছিল। চলচ্চিত্রের পরিস্থিতি আরও কঠিন ছিল, কারণ ভারতীয় সিনেমা তখন সদ্য জন্ম নিচ্ছে। প্রথম দিকের বহু ছবিতে নারী চরিত্রেও পুরুষ অভিনেতারা অভিনয় করতেন।

এই পরিবেশেই ফাতমা বেগম অভিনয়কে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন।

১৯২২ সালে আরদেশির ইরানির নির্বাক চলচ্চিত্র Veer Abhimanyu-তে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের সূচনা হয়। তখনও ভারতীয় চলচ্চিত্র মূলত নির্বাক ছবি এবং থিয়েটারের অভিনয়ধারা থেকেই তার ভাষা তৈরি করছিল।

ফাতমা সেই পরিবর্তনের সময়ের একজন প্রত্যক্ষ অংশীদার হয়ে ওঠেন।

শুধু অভিনেত্রী হয়ে থেমে থাকেননি

ফাতমা বেগমের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি শুধুমাত্র ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে সন্তুষ্ট হননি।

তিনি বুঝেছিলেন, চলচ্চিত্রে নিজের গল্প বলার ক্ষমতা অর্জন করতে হলে ক্যামেরার পিছনের জগতেও প্রবেশ করতে হবে। তাই অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি চিত্রনাট্য লেখা, প্রযোজনা এবং পরিচালনার কাজ শুরু করেন।

১৯২৬ সালে তিনি নিজের চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থা Fatma Films প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে সংস্থাটির নাম পরিবর্তিত হয়ে Victoria-Fatma Films হয়।

একজন নারী নিজের প্রযোজনা সংস্থা তৈরি করছেন—আজকের দিনে বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু ১৯২০-এর দশকের ভারতীয় চলচ্চিত্রে এটি ছিল এক বিরল ঘটনা।

ফাতমা নিজের জন্য অপেক্ষা করেননি যে কেউ তাঁকে সুযোগ দেবেন। বরং তিনি নিজেই সুযোগ তৈরির চেষ্টা করেছিলেন।

‘Bulbul-e-Paristan’: ইতিহাস তৈরি করা ছবি

১৯২৬ সাল ফাতমা বেগমের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলির একটি।

সেই বছর মুক্তি পায় Bulbul-e-Paristan—একটি ফ্যান্টাসি বা রূপকথাধর্মী নির্বাক চলচ্চিত্র। এই ছবির পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ফাতমা বেগম এবং ছবিটি তাঁর নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থার অধীনে তৈরি হয়। ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এটিকে প্রথমদিকের কোনো নারী পরিচালিত ফিচার ফিল্ম হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

ছবিটির বিষয় ছিল ‘পরিস্তান’ বা রূপকথার জগত। সেই সময়ের সীমিত প্রযুক্তির মধ্যেও ছবিটিতে বিশেষ দৃশ্য ও ট্রিক ফটোগ্রাফির ব্যবহার করা হয়েছিল। ফলে Bulbul-e-Paristan শুধু একটি সাধারণ নির্বাক ছবি ছিল না; এটি ছিল কল্পনাশক্তি ও প্রযুক্তিগত পরীক্ষারও একটি উদাহরণ।

ফিল্মের বিশ্বে তখন বিশেষ প্রভাব বা ‘স্পেশাল ইফেক্টস’ আজকের মতো উন্নত ছিল না। তবু ফাতমা সেই সময়ের প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে দর্শকদের সামনে একটি কল্পনার জগৎ তৈরি করতে চেয়েছিলেন।

ভারতীয় চলচ্চিত্রের শুরুর ইতিহাস নিয়ে সংরক্ষিত তথ্যের বড় অংশই অসম্পূর্ণ। বহু নির্বাক ছবির প্রিন্ট আজ আর পাওয়া যায় না। Bulbul-e-Paristan-এর ক্ষেত্রেও সম্পূর্ণ চলচ্চিত্রের সংরক্ষিত কপি পাওয়া যায় না বলে চলচ্চিত্র গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে।

তবু ছবিটির নাম ইতিহাসে রয়ে গেছে।

পরিচালনার পাশাপাশি চিত্রনাট্য ও প্রযোজনা

ফাতমা বেগমের অবদানকে শুধু ‘প্রথম নারী পরিচালক’ পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে তাঁর কাজের পরিধি ছোট করে দেখা হবে।

তিনি ছিলেন অভিনেত্রী, পরিচালক, প্রযোজক এবং চিত্রনাট্যকার—একসঙ্গে একাধিক ভূমিকা পালন করেছিলেন।

Bulbul-e-Paristan-এর পর তিনি আরও বেশ কিছু ছবি পরিচালনা করেন। এর মধ্যে ছিল Goddess of Love, Heer Ranjha, Chandravali, Kanaktara, Milan Dinar, Naseeb Ni Devi এবং Shakuntala

বিশেষ করে Heer Ranjha তাঁর বহুমুখী সৃষ্টিশীলতার একটি উদাহরণ। পরিচালক হওয়ার পাশাপাশি তিনি চিত্রনাট্য ও প্রযোজনার ক্ষেত্রেও সক্রিয় ছিলেন।

অর্থাৎ, ফাতমা শুধু চলচ্চিত্রের একটি অংশে কাজ করেননি। একটি ছবি কীভাবে ভাবা হবে, কীভাবে তৈরি হবে এবং কীভাবে দর্শকের সামনে পৌঁছবে—সেই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন।

নারীদের জন্য নতুন দরজা

ফাতমা বেগমের সময়ে চলচ্চিত্রে নারীদের উপস্থিতি ছিল সীমিত এবং সামাজিক বাধায় ঘেরা।

তবু তিনি নিজে কাজ করার পাশাপাশি তাঁর তিন কন্যাকেও চলচ্চিত্রের জগতে নিয়ে আসেন—সুলতানা, জুবেইদা ও শাহজাদি।

তাঁদের মধ্যে জুবেইদা পরবর্তীকালে ভারতীয় চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ অভিনেত্রী হয়ে ওঠেন এবং ১৯৩১ সালের Alam Ara-তে অভিনয় করেন। Alam Ara ভারতীয় প্রথম সবাক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে পরিচিত।

এই দিক থেকে ফাতমা বেগমের ভূমিকা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি শুধু নিজের জন্য একটি পথ তৈরি করেননি; তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের নারীরাও সেই পথ ধরে চলচ্চিত্রে এগিয়ে যেতে পেরেছিলেন।

সমাজের প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে এক নীরব উত্তর

ফাতমা বেগমের জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় সম্ভবত তাঁর কাজের ধরন।

তিনি কোনো বড় রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেননি। কোনো মঞ্চে দাঁড়িয়ে নারীমুক্তির দীর্ঘ বক্তৃতাও দেননি। তাঁর প্রতিবাদ ছিল কাজের মাধ্যমে।

যে সময়ে নারীকে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতেই নানা সামাজিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতো, সেই সময়ে তিনি ক্যামেরার পেছনে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও অর্জন করেছিলেন।

তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন, নারী শুধু চলচ্চিত্রের চরিত্র হতে পারে না—নারী গল্পও তৈরি করতে পারে, গল্পের ভাষাও নির্ধারণ করতে পারে।

হারিয়ে যাওয়া এক ইতিহাস

ফাতমা বেগমের জীবনের অনেক তথ্য আজও অস্পষ্ট। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে বিভিন্ন দাবি পাওয়া যায়। ফলে তাঁর ব্যক্তিজীবন নিয়ে নিশ্চিত তথ্যের চেয়ে তাঁর চলচ্চিত্র-জীবনের নথিভুক্ত কাজগুলিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এটি আসলে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসের একটি বড় সমস্যার কথাও মনে করিয়ে দেয়।

প্রথম যুগের বহু শিল্পীর কাজ যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়নি। বিশেষ করে নারী শিল্পীদের অবদান বহু সময়ে পুরুষ-প্রধান চলচ্চিত্র ইতিহাসের আড়ালে চলে গেছে।

ফাতমা বেগমের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন তাঁর নাম সাধারণ দর্শকের কাছে অপরিচিত ছিল।

অথচ তিনি এমন একটি সময়ে কাজ করেছিলেন, যখন ভারতীয় সিনেমা নিজেই নিজের পরিচয় খুঁজছিল।

১৯২৯: একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি

১৯২০-এর দশকের শেষ দিকে ফাতমা বেগমের প্রযোজনা সংস্থার কার্যক্রম ধীরে ধীরে থেমে যায়। গবেষণামূলক সূত্রে জানা যায়, ১৯২৯ সালেই তাঁর স্টুডিওর সবচেয়ে বেশি সংখ্যক কাজ তৈরি হয়েছিল, কিন্তু সেই সময়ের পর নানা আইনি জটিলতার কারণে তিনি পরিচালনা ও প্রযোজনা থেকে সরে আসেন। পরবর্তী দশকে তিনি কিছু অভিনয়ের কাজ করেন।

অর্থাৎ, তাঁর সক্রিয় পরিচালকজীবন খুব দীর্ঘ ছিল না।

কিন্তু ইতিহাসে কোনো ব্যক্তির গুরুত্ব সবসময় তাঁর কর্মজীবনের দৈর্ঘ্য দিয়ে বিচার করা যায় না।

কখনও কখনও কয়েক বছরের কাজই একটি শিল্পের ভবিষ্যৎকে অন্যভাবে ভাবতে বাধ্য করে।

কেন আজও ফাতমা বেগমকে মনে রাখা জরুরি?

আজ ভারতীয় চলচ্চিত্রে অসংখ্য নারী পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, সম্পাদক, ক্যামেরাপারসন ও প্রযুক্তিবিদ কাজ করছেন।

তাঁদের প্রত্যেকের পথ এক নয়। কিন্তু সেই পথের বহু আগেই কেউ একজন দেখিয়েছিলেন যে একজন ভারতীয় নারীও নিজের হাতে একটি চলচ্চিত্র সংস্থা চালাতে পারেন, গল্প লিখতে পারেন, সিনেমা তৈরি করতে পারেন এবং পরিচালকের আসনে বসতে পারেন।

ফাতমা বেগম সেই প্রাথমিক সাহসের নাম।

তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হয়তো কোনো নির্দিষ্ট ছবির সাফল্য নয়। তাঁর বড় কৃতিত্ব ছিল—তিনি এমন একটি দরজা খুলেছিলেন, যে দরজার ওপারে ভবিষ্যতের বহু নারী দাঁড়াতে পেরেছেন।

উপসংহার

ফাতমা বেগমের জীবন ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক হারিয়ে যেতে বসা অধ্যায়কে সামনে নিয়ে আসে।

তিনি ছিলেন এমন এক সময়ের নারী, যখন সিনেমা নিজেই ছিল নতুন, আর চলচ্চিত্রে নারীর স্বাধীন সৃজনশীল ভূমিকা ছিল আরও নতুন। সেই সময়ে তিনি অভিনয় করেছেন, নিজের প্রযোজনা সংস্থা তৈরি করেছেন, চিত্রনাট্য লিখেছেন, ছবি প্রযোজনা করেছেন এবং পরিচালনা করেছেন।

তাঁর Bulbul-e-Paristan আজ আমাদের হাতে সম্পূর্ণভাবে নেই। কিন্তু সেই ছবির সঙ্গে যুক্ত ইতিহাস এখনও আছে। আর সেই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সৃষ্টিশীলতার কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গ নেই।

ফাতমা বেগমের নাম তাই শুধু ‘প্রথম নারী পরিচালক’ হিসেবে মনে রাখার নয়। তিনি ছিলেন ভারতীয় সিনেমার শৈশবকালের একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, উদ্যোক্তা ও নির্মাতা—যিনি প্রমাণ করেছিলেন, সুযোগের অপেক্ষা না করে কখনও কখনও নিজের হাতেই নিজের মঞ্চ তৈরি করতে হয়।

সেই কারণেই ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ফাতমা বেগমের নাম একটি বিশেষ সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত হওয়ার যোগ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *