কুস্তি: মাটির আখড়ায় শক্তি ও কৌশলের হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য।

ভূমিকা

একসময় গ্রামের মেলা, উৎসব কিংবা বিশেষ অনুষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকত নানা ধরনের লোকজ ক্রীড়া। তার মধ্যে অন্যতম ছিল কুস্তি। মাটির তৈরি আখড়ায় দুই প্রতিযোগী মুখোমুখি দাঁড়াতেন। শুরু হতো শক্তি, ভারসাম্য, কৌশল এবং ধৈর্যের পরীক্ষা।

আজকের দিনে পেশাদার কুস্তি টেলিভিশন বা বড় মঞ্চে দেখা গেলেও পুরনো দিনের মাটির আখড়ার কুস্তির পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে ছিল না ঝলমলে আলো, বিশাল মঞ্চ কিংবা বিনোদনমূলক প্রদর্শনীর আয়োজন। ছিল মাটি, শরীরচর্চা, গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক এবং প্রতিযোগিতার প্রতি গভীর সম্মান।

গ্রামবাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে কুস্তির নিজস্ব চর্চা ছিল। কোথাও মেলা উপলক্ষে প্রতিযোগিতা হতো, কোথাও স্থানীয় আখড়ায় নিয়মিত অনুশীলন চলত। অঞ্চলভেদে নিয়ম, কৌশল ও আয়োজনের ধরনও ভিন্ন হতে পারত।

আখড়া ছিল কুস্তির প্রাণকেন্দ্র

পুরনো দিনের কুস্তির সঙ্গে ‘আখড়া’ শব্দটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

আখড়া বলতে সাধারণত এমন একটি নির্দিষ্ট স্থানকে বোঝানো হতো যেখানে কুস্তিগিররা শরীরচর্চা ও কুস্তির অনুশীলন করতেন।

মাটিকে বিশেষভাবে প্রস্তুত করা হতো। শক্ত বা পাথুরে জমির বদলে নরম মাটির ব্যবস্থা করা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যাতে পড়ে গেলে আঘাতের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম থাকে।

অনেক আখড়ায় প্রবীণ বা অভিজ্ঞ একজন প্রশিক্ষক নতুনদের কৌশল শেখাতেন।

তাই আখড়া শুধু খেলার জায়গা ছিল না।

এটি ছিল শরীরচর্চা, শৃঙ্খলা এবং পারস্পরিক শিক্ষার একটি কেন্দ্র।

কুস্তির আগে চলত শরীরচর্চা

কুস্তিগিররা শুধু প্রতিযোগিতার সময় শরীরচর্চা করতেন না।

নিয়মিত অনুশীলন ছিল এই খেলাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

দৌড়, শরীরের বিভিন্ন অংশের ব্যায়াম, ওঠাবসা, নমনীয়তা বাড়ানোর অনুশীলনসহ নানা ধরনের শারীরিক প্রশিক্ষণ প্রচলিত ছিল।

ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় কুস্তির বিভিন্ন ধারায় দণ্ড ও বৈঠকের মতো ব্যায়ামও পরিচিত ছিল।

এর ফলে কুস্তি শুধুমাত্র একজন প্রতিপক্ষকে মাটিতে ফেলার খেলা হয়ে থাকেনি। এটি হয়ে উঠেছিল দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক প্রস্তুতির একটি পদ্ধতি।

শুরু হতো কীভাবে?

অঞ্চল ও কুস্তির ধরন অনুযায়ী নিয়ম আলাদা হতে পারে। তবে সাধারণভাবে দুই প্রতিযোগী নির্দিষ্ট জায়গায় মুখোমুখি দাঁড়াতেন।

শুরু হওয়ার পর দুজনেই প্রতিপক্ষের ভারসাম্য নষ্ট করার চেষ্টা করতেন।

শুধু শক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা সবসময় সম্ভব নয়।

শরীরের অবস্থান, ভারসাম্য, সময়জ্ঞান এবং কৌশলও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একজন অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী প্রতিযোগীও সঠিক কৌশল ব্যবহার করে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে সমস্যায় ফেলতে পারতেন।

এই কারণেই কুস্তি ছিল শক্তির পাশাপাশি বুদ্ধিরও খেলা।

মাটিতে পড়ে যাওয়াই সব নয়

কুস্তি সম্পর্কে অনেকের ধারণা—যে প্রতিযোগী আগে পড়ে যাবে, সে-ই হেরে যাবে।

কিন্তু বাস্তবে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী কুস্তির নিয়ম এক নয়।

কোনো ধারায় নির্দিষ্টভাবে প্রতিপক্ষের কাঁধ মাটিতে ঠেকিয়ে রাখা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, আবার অন্য নিয়মে ভিন্ন পদ্ধতিতে জয় নির্ধারিত হতে পারে।

তাই পুরনো দিনের কুস্তিকে একটি মাত্র নিয়ম দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়।

অঞ্চল, আখড়া ও প্রতিযোগিতার ধরন অনুযায়ী নিয়মের পার্থক্য ছিল।

মেলা মানেই কুস্তির আসর

গ্রামীণ মেলার সঙ্গে কুস্তির সম্পর্ক ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

মেলার মাঠে দোকান, নাগরদোলা, লোকসংগীত ও নানা বিনোদনের পাশাপাশি কোথাও কোথাও কুস্তির আসর বসত।

দূরদূরান্ত থেকে কুস্তিগিররা আসতেন।

স্থানীয় মানুষ উৎসাহ নিয়ে সেই প্রতিযোগিতা দেখতেন।

কখনো একজন বিখ্যাত কুস্তিগিরের নাম শুনেই দর্শকেরা মাঠে ভিড় করতেন।

এই ধরনের আয়োজন গ্রামের সামাজিক জীবনেরও একটি অংশ ছিল।

কুস্তি ছিল সম্মানের বিষয়

পুরনো দিনের কুস্তিতে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ ছিল প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান দেখানো।

প্রতিযোগিতার আগে ও পরে সৌজন্য প্রদর্শনের সংস্কৃতি ছিল অনেক ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া পরিবেশের অংশ।

একজন কুস্তিগিরের পরিচয় শুধু তার শক্তি দিয়ে তৈরি হতো না।

তার নিয়মানুবর্তিতা, প্রশিক্ষণ, আচরণ এবং আখড়ার প্রতি নিষ্ঠাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

এই কারণেই কুস্তির সঙ্গে ‘গুরু’ ও ‘শিষ্য’-এর সম্পর্কের কথাও পুরনো ক্রীড়া সংস্কৃতির আলোচনায় আসে।

খাবার ও জীবনযাপন

ঐতিহ্যবাহী কুস্তিগিরদের জীবনযাপন নিয়েও নানা আঞ্চলিক রীতি ছিল।

শরীরচর্চার পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতো। দুধ, দই, ডাল, শস্য, বাদামসহ বিভিন্ন খাবার অনেক কুস্তিগিরের খাদ্যাভ্যাসের অংশ ছিল।

তবে সব অঞ্চলের কুস্তিগির একই ধরনের খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করতেন—এমন ধারণা ঠিক নয়।

স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতি, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং প্রশিক্ষণ পদ্ধতির ওপর খাবারের ধরন নির্ভর করত।

কেন কমে গেল আখড়ার কুস্তি?

আধুনিক ক্রীড়া ব্যবস্থা গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কুস্তিও নতুন রূপ পেয়েছে।

নিয়ম, প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম, প্রতিযোগিতার কাঠামো—সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তন এসেছে।

অন্যদিকে অনেক গ্রামীণ আখড়া হারিয়ে গেছে।

খোলা মাঠের জায়গায় তৈরি হয়েছে বাড়ি, রাস্তা বা অন্যান্য স্থাপনা।

নতুন প্রজন্মের বিনোদনের ধরনও বদলেছে।

ফলে অনেক পুরনো স্থানীয় কুস্তি-সংস্কৃতি আগের মতো সক্রিয় নেই।

তবে কুস্তি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনও ঐতিহ্যবাহী আখড়া এবং কুস্তির চর্চা রয়েছে।

তাই একে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত খেলা না বলে হারিয়ে যেতে বসা বা পরিবর্তিত হওয়া ঐতিহ্য হিসেবে দেখা বেশি যথাযথ।

কুস্তির সামাজিক ভূমিকা

পুরনো দিনে কুস্তি শুধু প্রতিযোগিতা ছিল না।

এটি তরুণদের শরীরচর্চার প্রতি আগ্রহী করত। একই সঙ্গে আখড়া ছিল সামাজিক যোগাযোগের একটি জায়গা।

বিভিন্ন বয়সের মানুষ সেখানে একসঙ্গে আসতেন।

অভিজ্ঞরা নতুনদের শেখাতেন।

একজনের সাফল্য অন্যদের অনুপ্রাণিত করত।

এভাবে কুস্তি একটি ছোট সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কও তৈরি করত।

শিশুদের ক্ষেত্রে সতর্কতা অত্যন্ত জরুরি

কুস্তি দেখতে সহজ মনে হলেও এটি একটি শারীরিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ খেলা হতে পারে।

বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ ছাড়া কুস্তির কৌশল অনুকরণ করা উচিত নয়।

বন্ধুর সঙ্গে মজা করে ধাক্কাধাক্কি, ঘাড় ধরে টানাটানি বা মাটিতে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা থেকে আঘাত লাগতে পারে।

শিশু বা কিশোরদের কুস্তি শেখাতে হলে প্রশিক্ষিত কোচের তত্ত্বাবধান, উপযুক্ত নিরাপদ মেঝে বা ম্যাট, বয়স অনুযায়ী প্রশিক্ষণ এবং যথাযথ ওয়ার্ম-আপ থাকা জরুরি।

ঘাড়, মাথা বা মেরুদণ্ডে চাপ পড়ে এমন কৌশল নিজেরা চেষ্টা করা উচিত নয়।

ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার পাশাপাশি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়াই প্রয়োজন।

আধুনিক সময়ে পুরনো আখড়ার নতুন অর্থ

পুরনো আখড়ার সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে ফিরিয়ে আনার অর্থ পুরনো নিয়ম হুবহু অনুসরণ করা নয়।

বরং ঐতিহ্যবাহী শরীরচর্চা, শৃঙ্খলা এবং ক্রীড়াসংস্কৃতির ইতিবাচক দিকগুলো সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

স্কুল, ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সংগঠনগুলো নিরাপদ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে ঐতিহ্যবাহী কুস্তির ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সম্ভব।

একই সঙ্গে আধুনিক ক্রীড়া-নিরাপত্তার নিয়ম মেনে প্রশিক্ষণ দেওয়াও জরুরি।

স্মৃতির মাটিতে আখড়া

একসময় গ্রামের কোনো মেলার পাশে মাটি প্রস্তুত করে তৈরি হতো আখড়া। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন উৎসাহী দর্শক। মাঝখানে দুই কুস্তিগিরের লড়াই।

সেই দৃশ্য আজ অনেক জায়গায় বিরল।

তবু কুস্তির গল্প এখনও বেঁচে আছে প্রবীণ মানুষের স্মৃতিতে, পুরনো মেলার কথায় এবং বিভিন্ন অঞ্চলের ক্রীড়া ঐতিহ্যে।

মাটির সেই আখড়া হয়তো আগের মতো নেই, কিন্তু তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শরীরচর্চা, শৃঙ্খলা, সাহস ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার গল্প এখনও আমাদের লোকজ ক্রীড়া ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

উপসংহার

কুস্তি শুধু দুই মানুষের শক্তির পরীক্ষা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পুরনো ক্রীড়া-সংস্কৃতি—আখড়া, গুরু-শিষ্য সম্পর্ক, নিয়মিত শরীরচর্চা, মেলা, সামাজিক যোগাযোগ এবং প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান।

আধুনিক ক্রীড়ার যুগে কুস্তির ধরন অনেক বদলেছে। তবু মাটির আখড়ায় অনুশীলন করা সেই পুরনো কুস্তিগিরদের স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—খেলা কখনো শুধু জয়-পরাজয়ের বিষয় নয়।

একটি খেলা একটি সমাজের জীবনযাপন, সংস্কৃতি এবং সময়ের গল্পও বহন করতে পারে।

মাটির আখড়ার সেই গল্প তাই হারিয়ে যেতে দেওয়া নয়; ইতিহাস হিসেবে সংরক্ষণ করাও আমাদের দায়িত্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *