
একসময় সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের কোনও বাড়ির বারান্দা, উঠোন কিংবা বৈঠকখানায় বসে যেত নানা ধরনের খেলার আসর। কারও হাতে থাকত কড়ি, কারও সামনে থাকত গুটি, আবার কোথাও ছক কেটে শুরু হতো পাশা খেলা।
আজকের প্রজন্মের কাছে পাশা শব্দটি অনেকটাই পরিচিত হলেও পুরনো দিনের পাশা খেলার সামাজিক পরিবেশ অনেকটাই হারিয়ে গেছে। একসময় এই ধরনের খেলা ছিল অবসর কাটানো, গল্প করা এবং বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর একটি মাধ্যম।
পাশা খেলার সঙ্গে ভাগ্যের বিষয়টি জড়িত থাকলেও শুধু ভাগ্যই সবকিছু নির্ধারণ করত না। কোন সময় কোন গুটি সরানো হবে, কীভাবে এগোনো হবে এবং প্রতিপক্ষের অবস্থান কী—এসব নিয়েও খেলোয়াড়দের ভাবতে হতো।
তবে পাশা খেলার বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও আঞ্চলিক রূপের নিয়ম এক নয়। তাই এক অঞ্চলের পাশা খেলার নিয়ম অন্য অঞ্চলের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যাবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
পাশা কী?
পাশা বলতে সাধারণত এমন ছোট বস্তু বোঝায়, যার বিভিন্ন পৃষ্ঠে সংখ্যা বা চিহ্ন থাকে এবং নিক্ষেপের পর নির্দিষ্ট ফল পাওয়া যায়।
আধুনিক ছয়-পৃষ্ঠের পাশা আজ সর্বত্র পরিচিত। কিন্তু পুরনো যুগে বিভিন্ন ধরনের পাশা ব্যবহারের ঐতিহ্য ছিল।
কখনও হাড়, কাঠ, পাথর বা অন্য উপকরণ দিয়ে পাশা তৈরি করা হয়েছে। স্থান ও সময়ের সঙ্গে এর আকার ও গঠন বদলেছে।
এই ছোট্ট বস্তুটিই হয়ে উঠত পুরো খেলার ফল নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কীভাবে খেলা হতো?
পাশা-নির্ভর বিভিন্ন খেলায় সাধারণত একটি ছক, গুটি এবং পাশার প্রয়োজন হতো।
খেলোয়াড়রা পালা করে পাশা নিক্ষেপ করতেন। পাশায় যে ফল আসত, তার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী গুটি এগিয়ে নেওয়া হতো।
কোনও খেলায় নির্দিষ্ট ঘর অতিক্রম করে গন্তব্যে পৌঁছানো ছিল লক্ষ্য। আবার কোনও খেলায় প্রতিপক্ষের গুটিকে সরিয়ে দেওয়া বা নিজের গুটিকে নিরাপদ অবস্থানে রাখা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
অর্থাৎ পাশা ফলাফল তৈরি করলেও সেই ফল কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তার ওপর খেলোয়াড়ের সিদ্ধান্তেরও গুরুত্ব ছিল।
ভাগ্য আর কৌশলের মিশেল
পাশা খেলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় ছিল ভাগ্য ও সিদ্ধান্তের মিশ্রণ।
পাশা নিক্ষেপ করার পর কী ফল আসবে, তা খেলোয়াড় আগে থেকে জানতেন না।
কিন্তু ফল পাওয়ার পর সেই ফল দিয়ে কোন চাল দেওয়া হবে, তা অনেক সময় খেলোয়াড়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করত।
এই অনিশ্চয়তাই খেলাটিকে উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলত।
একবার মনে হতে পারে একজন খেলোয়াড় জিতে যাচ্ছেন, পরের কয়েকটি চালে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে।
সন্ধ্যার আড্ডায় পাশার আসর
গ্রামীণ জীবনে খেলা ও আড্ডার মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য ছিল না।
কেউ খেলছেন, অন্যরা পাশে বসে দেখছেন। খেলার ফাঁকে গল্প হচ্ছে, হাসি-ঠাট্টা চলছে, আবার কোনও চাল নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
ফলে পাশার আসর অনেক সময় শুধু খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত না।
এটি হয়ে উঠত সামাজিক যোগাযোগের একটি উপলক্ষ।
পরিবারের মধ্যেও খেলা হতো
পাশা বা পাশা-নির্ভর বোর্ড গেমের কিছু রূপ পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও খেলা হতো।
বড়রা ছোটদের নিয়ম শেখাতেন। শিশুরা প্রথমে অন্যদের খেলা দেখত, পরে নিজেরাও অংশ নেওয়ার সুযোগ পেত।
এভাবে একটি খেলার সঙ্গে সঙ্গে প্রজন্মের মধ্যে যোগাযোগও তৈরি হতো।
পুরনো পাশার উপকরণ
বর্তমান সময়ে পাশা সাধারণত প্লাস্টিকের তৈরি। কিন্তু পুরনো দিনের পাশার উপকরণ ছিল অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়।
কাঠ, হাড়, পাথর কিংবা অন্যান্য শক্ত উপাদান দিয়ে পাশা তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে।
গুটিও সবসময় একই ধরনের ছিল না। কাঠের ছোট টুকরো, পাথর, বীজ বা অন্যান্য ছোট বস্তু গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারত।
এই সরল উপকরণই পুরনো দিনের খেলাকে সহজলভ্য করে তুলেছিল।
ছক আঁকার নিজস্ব কৌশল
কিছু পাশা-নির্ভর খেলায় বোর্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পুরনো দিনে সব বাড়িতে তৈরি বোর্ড থাকত না। ফলে মাটিতে বা কাপড়ের ওপর ছক আঁকা হতো।
কখনও কাঠের পাটাতনেও নকশা তৈরি করা হতো।
একটি সাধারণ ছককে কেন্দ্র করে কয়েকজন মানুষ বসে পড়তেন এবং শুরু হতো খেলা।
অপেক্ষার মধ্যেও ছিল আনন্দ
পাশা খেলার একটি বিশেষ আকর্ষণ ছিল অপেক্ষা।
পাশা হাতে নিয়ে খেলোয়াড় নিক্ষেপ করার আগে কয়েক মুহূর্তের জন্য চারপাশে যেন এক ধরনের উত্তেজনা তৈরি হতো।
তারপর পাশা পড়ল।
সবাই তাকিয়ে দেখল ফল কী হয়েছে।
এই ছোট্ট মুহূর্তটি বারবার ঘটত এবং প্রতিটি নিক্ষেপ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করত।
হার-জিতের উত্তেজনা
যে কোনও প্রতিযোগিতামূলক খেলার মতো পাশা খেলাতেও জেতার আনন্দ ছিল।
তবে পুরনো দিনের সামাজিক খেলায় হারলেও অনেক সময় খেলোয়াড় পরের দফায় আবার চেষ্টা করতেন।
একটি চাল নিয়ে ভুল হলে বন্ধুরা মজা করত। ভালো চাল হলে প্রশংসা করত।
ফলে প্রতিযোগিতা থাকলেও সামাজিক আনন্দটাই অনেক সময় বড় হয়ে উঠত।
কেন পুরনো পাশার আসর কমে গেল?
সময়ের সঙ্গে মানুষের অবসর কাটানোর পদ্ধতি বদলে গেছে।
আগে যেখানে কয়েকজন মানুষ মুখোমুখি বসে একটি বোর্ড ঘিরে সময় কাটাতেন, এখন সেখানে টেলিভিশন, স্মার্টফোন ও অনলাইন বিনোদন জায়গা নিয়েছে।
পাশা-ভিত্তিক অনেক পুরনো খেলাও তাই দৈনন্দিন জীবন থেকে সরে গেছে।
আর একটি বিষয় হলো—পাশা খেলার কিছু রূপকে অনেকে অর্থ বা জুয়ার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। কিন্তু সাধারণ বিনোদনমূলক বোর্ড গেম এবং অর্থের বিনিময়ে জুয়া এক বিষয় নয়।
লোকজ ঐতিহ্য হিসেবে খেলার আলোচনা করতে হলে এই পার্থক্যটি পরিষ্কার রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুদের জন্য কীভাবে শেখানো যায়?
পাশা-ভিত্তিক একটি নিরাপদ বোর্ড গেম শিশুদের জন্য তৈরি করা যেতে পারে।
এক্ষেত্রে কোনও অর্থ বা বাজি না রেখে শুধুমাত্র পয়েন্ট বা গন্তব্যে পৌঁছানোর নিয়ম রাখা যায়।
রঙিন কাঠের বা প্লাস্টিকের গুটি ব্যবহার করলে শিশুদের কাছে খেলাটি আরও আকর্ষণীয় হবে।
একই সঙ্গে তাদের বোঝানো যেতে পারে যে খেলাটির উদ্দেশ্য বিনোদন ও কৌশল শেখা, অর্থ জেতা নয়।
কী কী দক্ষতা তৈরি হতে পারে?
পাশা-ভিত্তিক বোর্ড গেমে শিশুদের পালা মেনে চলা, নিয়ম অনুসরণ করা এবং নিজের চালের ফলাফল বোঝার অভ্যাস তৈরি হতে পারে।
কিছু সংস্করণে গুটি কোথায় সরানো হবে তা বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাসও তৈরি হয়।
জয়-পরাজয় মেনে নেওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দক্ষতা।
তবে খেলার ধরন অনুযায়ী এসব দক্ষতার গুরুত্ব ভিন্ন হতে পারে।
লোকজ ইতিহাসের একটি অংশ
পাশা খেলার ইতিহাস শুধুমাত্র একটি খেলায় সীমাবদ্ধ নয়। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও পাশা-নির্ভর খেলার উল্লেখ পাওয়া যায়।
তবে বিভিন্ন সময়ের পাশা খেলার নিয়ম, উপকরণ ও সামাজিক ব্যবহার এক ছিল না।
এই কারণেই পুরনো পাশা খেলা নিয়ে আলোচনা করার সময় কোনও একটি নিয়মকে সব যুগ ও অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
আজকের দিনে ফিরিয়ে আনা যায়
পুরনো পাশা খেলার ঐতিহ্যকে আধুনিক বোর্ড গেমের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
স্কুলের লোকজ সংস্কৃতি প্রদর্শনীতে একটি ঐতিহ্যবাহী ছক তৈরি করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই কাঠ বা কাগজ দিয়ে গুটি বানাতে পারে।
তারপর শিক্ষক বা প্রবীণ ব্যক্তিরা পুরনো দিনের খেলার গল্প বলতে পারেন।
এতে খেলা যেমন হবে, তেমনই ইতিহাস শেখার সুযোগও তৈরি হবে।
নিরাপদ ও দায়িত্বশীল খেলা
শিশুদের সঙ্গে পাশা-নির্ভর খেলা হলে ছোট পাশা মুখে দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে কি না, সেদিকে নজর রাখা দরকার।
খেলার পরিবেশও হওয়া উচিত শান্ত ও নিরাপদ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—খেলাটিকে বিনোদন হিসেবে রাখা। অর্থ, বাজি বা আর্থিক লাভের সঙ্গে যুক্ত না করে শিশুদের জন্য পয়েন্টভিত্তিক খেলা তৈরি করা যেতে পারে।
হারিয়ে যাওয়া আসরের স্মৃতি
একসময় একটি ছোট ছককে ঘিরে কয়েকজন মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে পারতেন।
কেউ পাশা ছুড়ছেন, কেউ গুটি সরাচ্ছেন, কেউ পরের চাল নিয়ে ভাবছেন।
আজ সেই দৃশ্য অনেক জায়গায় আর দেখা যায় না।
কিন্তু পুরনো বাড়ির স্মৃতি, প্রবীণদের গল্প এবং লোকজ সংস্কৃতির নানা উপকরণের মধ্যে সেই পাশার আসরের ছায়া এখনও রয়ে গেছে।
উপসংহার
পাশা খেলা শুধুমাত্র একটি পুরনো বিনোদনের নাম নয়। এটি বহু সময় ও অঞ্চলে বিভিন্ন রূপে প্রচলিত থাকা এক ধরনের খেলা-সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে।
পাশার নিক্ষেপে অনিশ্চয়তা, গুটির চালে কৌশল এবং খেলোয়াড়দের মুখোমুখি বসে থাকার সামাজিকতা—সব মিলিয়ে এর নিজস্ব আকর্ষণ ছিল।
আজকের দিনে পাশা-নির্ভর ঐতিহ্যবাহী খেলাকে ফিরিয়ে আনতে হলে তাকে নিরাপদ, বিনোদনমূলক এবং বাজিমুক্ত পরিবেশে উপস্থাপন করা যেতে পারে।
একটি ছোট পাশা মাটিতে বা বোর্ডে গড়িয়ে পড়ে থেমে যাচ্ছে—আর তার চারপাশে কয়েকজন মানুষ অপেক্ষা করছেন পরবর্তী চালের জন্য। দৃশ্যটি হয়তো আজ পুরনো হয়ে গেছে, কিন্তু একসময় এমন একটি মুহূর্তই একটি সন্ধ্যাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য আনন্দময় করে তুলত।












Leave a Reply