নদীর ওপারে যে অপেক্ষা।

প্রতিদিন ভোরে গঙ্গার ঘাটে এসে নৌকা নিয়ে বসতেন হরিপদ মাঝি।

বয়স তাঁর প্রায় সত্তর। শরীর আগের মতো শক্তিশালী নেই। হাতের শিরা বেরিয়ে এসেছে, চোখের দৃষ্টি একটু ঝাপসা হয়েছে। তবুও নৌকার বৈঠা হাতে নিলে তাঁর মধ্যে যেন অন্যরকম শক্তি ফিরে আসত।

লোকজন তাঁকে বলত,

“হরিদা, এবার নৌকা চালানো ছেড়ে দিন।”

হরিপদ শুধু হাসতেন।

“নদী আমাকে ছাড়েনি, আমি নদীকে ছাড়ব কী করে?”

তবে হরিপদ প্রতিদিন একটা বিশেষ কাজ করতেন।

সন্ধ্যা নামার ঠিক আগে তিনি নৌকাটা নিয়ে নদীর মাঝখানে যেতেন।

তারপর ওপারের দিকে তাকিয়ে প্রায় দশ মিনিট চুপ করে বসে থাকতেন।

কেউ জানত না কেন।

একদিন গ্রামের নতুন স্কুলশিক্ষক অর্ণব তাঁকে জিজ্ঞেস করল,

“হরিদা, আপনি প্রতিদিন ওপারের দিকে তাকিয়ে কী দেখেন?”

হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

“একজন মানুষকে।”

“কে?”

“যে একদিন বলেছিল, সে ফিরে আসবে।”

অর্ণব অবাক হয়ে বলল,

“কতদিন আগে?”

হরিপদ নদীর দিকে তাকিয়ে বললেন,

“বাহান্ন বছর।”

অর্ণব ভেবেছিল, বৃদ্ধ বয়সে হয়তো পুরনো স্মৃতি নিয়ে কথা বলছেন।

কিন্তু পরদিন আবার একই প্রশ্ন তার মাথায় এল।

শেষ পর্যন্ত একদিন হরিপদ নিজেই গল্প শুরু করলেন।

বাহান্ন বছর আগে হরিপদ তখন তরুণ মাঝি।

প্রতিদিন নৌকায় মানুষ পারাপার করতেন।

একদিন বর্ষার বিকেলে নদীর ঘাটে এসেছিল একটি মেয়ে।

নাম—কমলা।

মেয়েটি ওপারের গ্রামে থাকত।

প্রতিদিন বিকেলে সে নদী পার হয়ে এপারের বাজারে আসত।

হরিপদ আর কমলার মধ্যে ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব হয়।

তারপর ভালোবাসা।

কিন্তু কমলার পরিবার এই সম্পর্ক মেনে নেয়নি।

একদিন কমলাকে শহরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

যাওয়ার আগে সে হরিপদকে বলেছিল,

“আমি ফিরে আসব।”

হরিপদ বলেছিলেন,

“আমি নদীর এই ঘাটেই থাকব।”

কমলা চলে গেল।

তারপর আর ফেরেনি।

হরিপদ বিয়ে করেননি।

বছরের পর বছর একই ঘাটে নৌকা চালিয়েছেন।

অনেকেই তাঁকে বলেছে,

“কমলা আর আসবে না।”

হরিপদ কখনও উত্তর দেননি।

অর্ণব বলল,

“আপনি কি জানেন না, উনি কোথায়?”

হরিপদ মাথা নাড়লেন।

“না।”

“কখনও খোঁজ করেননি?”

“করেছিলাম। অনেক বছর।”

“তারপর?”

“একদিন খবর পেলাম, কমলা নাকি বিদেশে চলে গেছে।”

অর্ণব বলল,

“তাহলে এত বছর পরও অপেক্ষা করছেন?”

হরিপদ মৃদু হেসে বললেন,

“অপেক্ষা করার জন্য সবসময় মানুষকে ফিরে আসতে হয় না।”

অর্ণব কথাটার অর্থ বুঝতে পারল না।

কয়েক মাস পর হরিপদ অসুস্থ হয়ে পড়লেন।

নৌকা চালানো বন্ধ করতে হলো।

অর্ণব প্রায়ই তাঁকে দেখতে যেত।

একদিন হরিপদ বললেন,

“অর্ণব, আমার একটা কাজ করে দেবে?”

“বলুন।”

“নদীর ওপারে একটা পুরনো বাড়ি আছে। বাড়িটার নাম কেউ জানে না। ওখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করবে, কমলা নামে কেউ থাকতেন কি না।”

অর্ণব পরদিনই ওপারে গেল।

অনেক খোঁজার পর সে একটি পুরনো বাড়ি পেল।

বাড়ির দরজায় একজন বৃদ্ধা বসে ছিলেন।

অর্ণব জিজ্ঞেস করল,

“এখানে কি কমলা নামে কেউ থাকতেন?”

বৃদ্ধা মাথা তুললেন।

“কমলা?”

তারপর কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকলেন।

“আপনি কে?”

অর্ণব বলল,

“আমি হরিপদ মাঝির পরিচিত।”

বৃদ্ধার হাত কেঁপে উঠল।

“হরিপদ?”

“হ্যাঁ।”

বৃদ্ধা ধীরে ধীরে ঘরের ভেতর গেলেন।

কিছুক্ষণ পর একটি পুরনো কাপড়ের বাক্স নিয়ে ফিরে এলেন।

বাক্স খুলে বের করলেন একটি হলুদ হয়ে যাওয়া চিঠি।

“এটা ওর জন্য ছিল।”

অর্ণব চিঠিটা খুলল।

লেখা—

“হরি,

আমি ফিরতে চেয়েছিলাম।

কিন্তু পারিনি।

বাবা আমাকে দূরে নিয়ে যাওয়ার পর জানতে পারলাম, আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। আমি অনেক চেষ্টা করেছিলাম ফিরে আসার।

পারিনি।

তবু তোমার কথা ভুলিনি।

যদি কোনওদিন আমার ছেলে নদীর ওপারে যায়, তাকে বলব—তোমার কাছে যেন আমার একটি কথা পৌঁছে দেয়।

আমি ফিরতে পারিনি বলে ভাবো না, আমি তোমাকে ভুলে গিয়েছিলাম।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আমি নদীর দিকে তাকিয়েছি।

হয়তো তুমি এখনও ওপারে আছ।

—কমলা”

অর্ণব চিঠিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর জানতে পারল, কমলা কয়েক বছর আগেই মারা গেছেন।

তাঁর ছেলে এখনও ওই বাড়িতে থাকেন।

অর্ণব ফিরে এসে সব কথা হরিপদকে বলল।

বৃদ্ধ অনেকক্ষণ চোখ বন্ধ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

“সে জানত আমি অপেক্ষা করছি?”

“হ্যাঁ।”

হরিপদের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“তাহলে আমার অপেক্ষা বৃথা যায়নি।”

পরদিন সন্ধ্যায় অর্ণব হরিপদকে নৌকায় তুলে নদীর মাঝখানে নিয়ে গেল।

বৃদ্ধের শরীর খুব দুর্বল।

তবুও তিনি ওপারের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছে।

নদীর জলে লাল আভা।

হরিপদ ধীরে ধীরে বললেন,

“কমলা, আমি এখনও এখানেই আছি।”

অর্ণব কিছু বলল না।

কিছুক্ষণ পর হরিপদ চোখ বন্ধ করলেন।

তাঁর মুখে শান্তির হাসি।

সেদিনের পর আর তাঁকে নদীর ঘাটে দেখা যায়নি।

কয়েকদিন পর অর্ণব নদীর ওপারে গেল।

কমলার বাড়ির বৃদ্ধ ছেলে তাকে একটি ছোট্ট কাপড়ের পুঁটলি দিলেন।

ভেতরে ছিল একটি পুরনো শাঁখা আর একটি কাগজ।

কাগজে লেখা—

“কিছু মানুষ জীবনে আসে থাকার জন্য নয়, অপেক্ষা করতে শেখানোর জন্য।”

অর্ণব কাগজটা বুকের কাছে চেপে ধরল।

ফিরে এসে সে হরিপদের নৌকাটা নদীর ঘাটে রেখে দিল।

তারপর থেকে সন্ধ্যায় নৌকাটা আর কেউ চালায় না।

তবুও নদীর মাঝখানে দাঁড়ালে অর্ণবের মাঝে মাঝে মনে হয়—

ওপারের দিকে তাকিয়ে দুটি মানুষ এখনও কথা বলছে।

একজন বলছে,

“তুমি ফিরেছ?”

অন্যজন উত্তর দিচ্ছে,

“আমি তো কখনও যাইনি।”

সমাপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *