ওপেনটি বাইস্কোপ: ছড়া, দল আর শৈশবের আনন্দে হারিয়ে যাওয়া এক লোকজ খেলা।

একটা সময় ছিল, যখন বিকেল নামলেই গ্রামের উঠোন, পাড়ার রাস্তার ধারে কিংবা বাড়ির সামনের খোলা জায়গায় ছোটদের জমায়েত দেখা যেত। হাতে দামি খেলনা ছিল না, মোবাইল ফোন ছিল না, কম্পিউটার গেমের কথাও কেউ জানত না। অথচ আনন্দের কোনো অভাব ছিল না। কয়েকজন বন্ধু একসঙ্গে হলেই শুরু হয়ে যেত নানা ধরনের লোকজ খেলা।

এই পুরনো খেলাগুলোর মধ্যে কিছু খেলা ছিল দৌড়ঝাঁপের, কিছু ছিল বুদ্ধির, আবার কিছু খেলা ছিল ছড়া, গান ও দলবদ্ধতার ওপর নির্ভরশীল। ওপেনটি বাইস্কোপ ছিল তেমনই একটি খেলা। খেলাটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকত একটি বিশেষ ছড়া এবং সেই ছড়াকে কেন্দ্র করে তৈরি হতো খেলাটির পরিবেশ।

বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে এই খেলার নাম ও ছড়ার শব্দে কিছুটা পরিবর্তন দেখা যায়। কোথাও বলা হতো “ওপেনটি বাইস্কোপ”, কোথাও “ওপেন্টি বাইস্কোপ” বা কাছাকাছি উচ্চারণ। লোকখেলা হিসেবে এর উল্লেখ বাংলা ও বৃহত্তর বাংলার বিভিন্ন নথি ও স্মৃতিচর্চায় পাওয়া যায়।

কীভাবে খেলা হতো?

ওপেনটি বাইস্কোপ সাধারণত একদল শিশু মিলে খেলত। খেলাটির অন্যতম আকর্ষণ ছিল দুইজন খেলোয়াড়কে নিয়ে একটি মানব-তোরণ তৈরি করা।

দুজন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুহাত ওপরে তুলে হাত মিলিয়ে একটি তোরণের মতো আকৃতি তৈরি করত। অন্য খেলোয়াড়রা একে অপরের কাঁধে হাত রেখে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াত। দেখতে অনেকটা ছোট্ট রেলগাড়ির মতো লাগত।

এরপর শুরু হতো ছড়া।

সারি করে দাঁড়ানো খেলোয়াড়রা ছড়া বলতে বলতে সেই মানব-তোরণের নিচ দিয়ে একের পর এক চলে যেত। ছড়ার শেষ মুহূর্তে তোরণ তৈরি করে দাঁড়ানো দুই খেলোয়াড় হাত নামিয়ে মাঝখানে থাকা একজনকে ধরে ফেলত। বিভিন্ন অঞ্চলে এরপর ধরা পড়া খেলোয়াড়কে দুটির মধ্যে একটি দল বেছে নিতে বলা হতো। এইভাবে ধীরে ধীরে খেলোয়াড়রা দুই দলে ভাগ হয়ে যেত।

অর্থাৎ, খেলাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল দল তৈরি করা। আজকের ভাষায় বললে, খেলাটি যেন মূল প্রতিযোগিতার আগে খেলোয়াড় বাছাইয়ের একটি আনন্দময় পদ্ধতি।

ছড়াই ছিল খেলার প্রাণ

ওপেনটি বাইস্কোপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় ছিল এর ছড়া। বিভিন্ন এলাকায় ছড়ার ভাষা ও শব্দের পরিবর্তন হয়েছে। লোকমুখে প্রচলিত একটি সংস্করণে “ওপেনটি বাইস্কোপ”, “নাইন টেন টেইস্কোপ”, “সুলতানা বিবিয়ানা”, “সাহেব বাবুর বৈঠকখানা”—এরকম নানা শব্দ শোনা যায়।

আবার অন্য অঞ্চলের স্মৃতিচারণে ছড়াটির কিছু অংশে “চুলটানা বিবিয়ানা”, “ছাতুবাবুর বৈঠকখানা”, “লাট বলেছে যেতে”—এর মতো ভিন্ন শব্দও পাওয়া যায়।

এই পরিবর্তন আসলে লোকসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। গ্রাম থেকে গ্রাম, জেলা থেকে জেলা কিংবা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মুখে মুখে ছড়া বদলে যেত। ফলে একই খেলার একাধিক সংস্করণ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

খেলায় ছিল দল গঠনের আনন্দ

ওপেনটি বাইস্কোপের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল দল ভাগ করা।

দুজন দলপতি আগে নিজেদের দলের নাম ঠিক করত। কিছু বর্ণনায় ফুল বা ফলের নামে দলের নাম রাখার কথাও পাওয়া যায়। এরপর একজন একজন করে খেলোয়াড় তোরণের নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় ধরা পড়লে তাকে জিজ্ঞেস করা হতো—সে কোন দলে যেতে চায়।

কেউ হয়তো একটি ফুলের নামের দল বেছে নিল, কেউ অন্য দলের নাম। এভাবে খেলতে খেলতে দুই দলের সদস্যসংখ্যা বাড়তে থাকত।

এই দলভাগের মধ্যে কোনো জটিল নিয়ম ছিল না। ছিল বন্ধুত্ব, হাসি, মজা আর নিজেদের পছন্দের দলের প্রতি ছোট্ট এক ধরনের আবেগ।

শুধু খেলা নয়, ছিল সামাজিক শিক্ষাও

আজকের দৃষ্টিতে ওপেনটি বাইস্কোপকে শুধুমাত্র শিশুদের একটি খেলা মনে হতে পারে। কিন্তু এর মধ্যে শিশুদের সামাজিক বিকাশের বেশ কিছু স্বাভাবিক সুযোগ ছিল।

একসঙ্গে দাঁড়ানো, অন্যের কাঁধে হাত রাখা, নিজের পালার জন্য অপেক্ষা করা, ছড়া মনে রাখা, দল নির্বাচন করা এবং অন্যদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া—এসবের মধ্য দিয়ে শিশুরা অজান্তেই সামাজিক আচরণের নানা দিক শিখত।

কোনো একজন একা খেলত না। প্রত্যেককে অন্যদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হতো। ফলে খেলাটির মধ্যে সহযোগিতা এবং দলগত অংশগ্রহণের একটি স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরি হতো।

লোকজ খেলার গবেষণা ও নথিবদ্ধকরণে এই ধরনের খেলাকে বাংলার লোকসংস্কৃতির অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক একটি বই-সমালোচনাতেও বৃহত্তর বাংলার ৮৮টি লোকজ খেলা নথিবদ্ধ করার কাজের উল্লেখ রয়েছে, যেখানে “এলাটিং বেলাটিং” ও “ওপেনটি বাইস্কোপ”-এর মতো ছড়াভিত্তিক খেলাকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ছড়ার মধ্যে লুকিয়ে আছে পুরনো সময়ের ছাপ

ওপেনটি বাইস্কোপের ছড়াগুলো ভালোভাবে শুনলে বোঝা যায়, এর শব্দভাণ্ডারে পুরনো বাংলার সামাজিক জীবনের নানা চিহ্ন রয়েছে।

“সাহেব”, “বাবুর বৈঠকখানা”, “পান-সুপারি”, “বিবিয়ানা”—এই ধরনের শব্দ এক সময়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের স্মৃতি বহন করে। বিভিন্ন স্মৃতিচারণে ছড়াটিকে পুরনো কলকাতা ও ঔপনিবেশিক সময়ের সাংস্কৃতিক আবহের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়েছে। তবে ছড়ার সঠিক উৎপত্তি বা প্রতিটি শব্দের নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক অর্থ নিয়ে একক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।

লোকছড়ার স্বভাবই এমন—এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে যাওয়ার সময় শব্দ বদলে যায়, নতুন শব্দ ঢোকে, আবার কোনো কোনো অংশ হারিয়েও যায়।

তাই ওপেনটি বাইস্কোপের প্রতিটি ছড়া আসলে একটি নির্দিষ্ট ‘মূল সংস্করণ’-এর বদলে লোকমুখে বেঁচে থাকা বহু সংস্করণের সমষ্টি হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

মেয়েদের খেলাতেও ছিল জনপ্রিয়তা

বিভিন্ন নথিতে ওপেনটি বাইস্কোপকে বিশেষভাবে গ্রামীণ মেয়েদের খেলাগুলোর মধ্যেও উল্লেখ করা হয়েছে। একটি গবেষণামূলক লেখায় বাংলার গ্রামীণ মেয়েদের খেলার উদাহরণ হিসেবে ওপেনটি বাইস্কোপের কথা বলা হয়েছে এবং মানব-তোরণ তৈরি করে ছড়া বলতে বলতে সারিবদ্ধভাবে যাওয়ার নিয়ম বর্ণনা করা হয়েছে।

এতে বোঝা যায়, পুরনো দিনের খেলাধুলার জগৎ শুধু মাঠের দৌড়ঝাঁপে সীমাবদ্ধ ছিল না। বাড়ির উঠোনেও শিশু-কিশোরীদের জন্য নানা ধরনের দলগত খেলার নিজস্ব জগৎ ছিল।

কেন হারিয়ে গেল ওপেনটি বাইস্কোপ?

সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে। শহর বেড়েছে, খোলা জায়গা কমেছে, শিশুদের পড়াশোনার চাপ বেড়েছে। পাশাপাশি টেলিভিশন, স্মার্টফোন, ভিডিও গেম এবং নানা ধরনের ডিজিটাল বিনোদন শিশুদের অবসর কাটানোর পদ্ধতিও বদলে দিয়েছে।

ফলে মুখে মুখে শেখা ছড়া এবং কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে খেলার মতো লোকজ খেলার প্রচলন অনেক জায়গায় কমেছে। বাংলাদেশের সরকারি জেলা-তথ্যেও ওপেন্টি বাইস্কোপকে প্রচলিত লোকখেলার তালিকায় রাখা হয়েছে, যা দেখায় যে কিছু অঞ্চলে এর স্মৃতি ও চর্চা এখনও সাংস্কৃতিকভাবে পরিচিত।

তবে কোনো একটি খেলা কমে যাওয়া মানে শুধু একটি বিনোদনের পদ্ধতি হারিয়ে যাওয়া নয়। এর সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে ছড়া, স্থানীয় ভাষার শব্দ, খেলার নিয়ম এবং এক প্রজন্মের সঙ্গে আরেক প্রজন্মের স্মৃতির যোগাযোগও।

আবার ফিরতে পারে পুরনো খেলা

ওপেনটি বাইস্কোপের মতো খেলা ফিরিয়ে আনতে খুব বেশি সরঞ্জামের প্রয়োজন নেই। স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পাড়ার শিশুদের অনুষ্ঠান বা লোকসংস্কৃতি বিষয়ক কর্মশালায় নিরাপদ পরিবেশে এই খেলা পরিচয় করিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

শিশুদের পুরনো ছড়া শেখানো যেতে পারে। তবে একই সঙ্গে তাদের বোঝানো দরকার যে লোকখেলার ছড়া অঞ্চলভেদে বদলাতে পারে এবং একটি সংস্করণকেই একমাত্র সঠিক সংস্করণ হিসেবে ধরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

এভাবে পুরনো খেলা শুধু স্মৃতির পাতায় আটকে থাকবে না; নতুন প্রজন্মও তার সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে।

নিরাপত্তার বিষয়টি জরুরি

পুরনো দিনের খেলাগুলো পুনরায় আয়োজন করার সময় বর্তমান সময়ের নিরাপত্তা অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে।

খেলার জায়গাটি সমতল ও পরিষ্কার হওয়া উচিত। তোরণ তৈরি করার সময় শিশুদের হাত বা কাঁধে অতিরিক্ত চাপ দেওয়া উচিত নয়। ধাক্কাধাক্কি, জোর করে কাউকে ধরে রাখা বা পড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা যাবে না।

ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে বড়দের নজরদারি থাকা ভালো। খেলাটিকে আনন্দের মধ্যে রাখাই উদ্দেশ্য—জয়-পরাজয় বা কাউকে বিব্রত করা নয়।

স্মৃতির পাতায় ফিরে আসুক ছড়ার সেই সুর

“ওপেনটি বাইস্কোপ”—এই নামটি শুনলেই হয়তো আজকের প্রজন্মের অনেকেই অবাক হবে। কিন্তু একসময় এই নামের সঙ্গেই জড়িয়ে ছিল একদল শিশুর হাসি, ছড়ার সুর, সারিবদ্ধভাবে চলার আনন্দ এবং দল ভাগ হওয়ার উত্তেজনা।

খেলাটির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ছিল তার সরলতায়। কোনো দামি সরঞ্জাম লাগত না, বড় মাঠেরও প্রয়োজন ছিল না। কয়েকজন বন্ধু, একটি ছড়া আর সামান্য জায়গা হলেই তৈরি হয়ে যেত খেলার আসর।

সময়ের স্রোতে সেই দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে। কিন্তু লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে ওপেনটি বাইস্কোপ এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি—যে স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একসময় একটি ছড়াও ছিল খেলা, একটি উঠোনও ছিল মাঠ, আর একদল বন্ধুই ছিল একটি শিশুর সম্পূর্ণ আনন্দের পৃথিবী।

পুরনো খেলাগুলোকে মনে রাখা তাই শুধু অতীতকে স্মরণ করা নয়; এর মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের লোকজ সংস্কৃতি, ছড়া এবং শৈশবের সামাজিক ইতিহাসকেও মনে রাখি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *