মা, একদিন বুঝবে—মায়ের অভাব পৃথিবীর কোনো কিছু দিয়েই পূরণ হয় না।

মা, জীবনে এমন কিছু অনুভূতি আছে, যা হাজারো শব্দ দিয়েও প্রকাশ করা যায় না। তোমার প্রতি আমার ভালোবাসাও ঠিক তেমনই। তোমাকে কতটা ভালোবাসি, তা হয়তো কোনো দিন মুখ ফুটে বলতে পারব না। কিন্তু দিনের শেষে যখন একা বসে জীবনের হিসাব মেলাই, তখন বুঝতে পারি, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ তুমি।

ছোটবেলায় ভাবতাম, বড় হলেই বুঝি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। নিজের পায়ে দাঁড়াব, নিজের মতো করে জীবন সাজাব, অনেক স্বপ্ন পূরণ করব। কিন্তু বড় হতে হতে বুঝলাম, বয়স বাড়ে, দায়িত্ব বাড়ে, মানুষের ভিড় বাড়ে—শুধু মনের শান্তিটুকু যেন কোথায় হারিয়ে যায়। আর তখনই বারবার মনে পড়ে তোমার কথা।

মনে পড়ে, ছোটবেলায় একটু অসুস্থ হলেই তুমি কীভাবে সারারাত আমার পাশে বসে থাকতে। আমার কপালে হাত রেখে বারবার দেখতে, জ্বর কমেছে কি না। নিজের চোখে ঘুম থাকলেও তুমি চোখ বন্ধ করতে পারতে না। আমি একটু কেঁদে উঠলেই তোমার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠত। অথচ আজ আমি বড় হয়েছি বলে কত কষ্ট যে একা একা সহ্য করো তুমি, তা জানতেও পারি না।

মা, তোমার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। তুমি নিজের কষ্ট লুকিয়ে অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে পারো। তোমার মন খারাপ থাকলেও পরিবারের সামনে হাসিমুখে থাকো। শরীর খারাপ হলেও বলো, “আমি ঠিক আছি।” অথচ তোমার সেই ছোট্ট কথাটার আড়ালে কতটা যন্ত্রণা লুকিয়ে থাকে, আমরা অনেক সময় বুঝতেই পারি না।

আমরা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কাজ, সংসার, দায়িত্ব, ভবিষ্যতের চিন্তা—সবকিছুর মাঝে মায়ের সঙ্গে দুটো কথা বলার সময়টুকুও কখনো কখনো বের করতে পারি না। ভাবি, মা তো আছেন, পরে কথা বলব। আজ সময় নেই, কাল কথা বলব। কিন্তু মা, সময় যে সব সময় আমাদের ইচ্ছেমতো চলে না!

কখনো কি ভেবে দেখেছি, যে মানুষটা আমাদের ছোটবেলায় প্রতিটি মুহূর্ত আগলে রেখেছিলেন, তাঁরও তো ইচ্ছে করে সন্তানের সঙ্গে একটু গল্প করতে? তাঁরও তো মন চায়, সন্তানটি পাশে বসে জিজ্ঞেস করুক, “মা, তোমার শরীর কেমন? আজ তোমার মন খারাপ কেন? কিছু হয়েছে?”

মায়ের কাছে হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে দামি উপহারও ততটা মূল্যবান নয়, যতটা মূল্যবান সন্তানের একটু সময়, একটু যত্ন আর ভালোবাসার দুটো কথা।

মা, তুমি কখনো আমার কাছে কিছু দাবি করোনি। নিজের জন্য কত কিছু চাওনি, কত ইচ্ছা বিসর্জন দিয়েছ, তার হিসাবও রাখোনি। শুধু চেয়েছ, তোমার সন্তান ভালো থাকুক, সুস্থ থাকুক, জীবনে নিজের জায়গা তৈরি করুক। তোমার এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কাছে পৃথিবীর সব সম্পদই যেন তুচ্ছ।

আজ যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে, জীবনে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা কোথায়, আমি বলব—মায়ের কাছে। কারণ পৃথিবীর অন্য কোথাও হয়তো আমার ভুলের বিচার হবে, আমার ব্যর্থতার হিসাব নেওয়া হবে, কিন্তু মায়ের কাছে ফিরে এলে আমি আবার নতুন করে বাঁচার সাহস পাই।

মা, তোমার কাছে আমি কোনো দিন নিখুঁত মানুষ হতে চাই না। আমি শুধু তোমার সেই সন্তান হয়ে থাকতে চাই, যে নিজের সব ব্যর্থতা নিয়েও তোমার কাছে নির্দ্বিধায় ফিরে আসতে পারে। যে জানে, পৃথিবী মুখ ফিরিয়ে নিলেও মায়ের বুকের দরজা তার জন্য বন্ধ হবে না।

কিন্তু একটা ভয় আমাকে মাঝে মাঝে ভীষণ কষ্ট দেয়। সময়ের সঙ্গে তুমি আরও বয়স্ক হবে। একদিন তোমার হাতের শক্তি কমে আসবে, হাঁটতে কষ্ট হবে, চোখে আগের মতো দেখতে পাবে না। তখন তোমার পাশে দাঁড়ানো, তোমার হাত ধরে রাস্তা পার করানো, তোমাকে সময়মতো ওষুধ খেতে মনে করিয়ে দেওয়া—এসবই হবে আমার ভালোবাসা প্রকাশের সবচেয়ে বড় উপায়।

আমি চাই না, কোনো একদিন তোমার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে চোখের জল ফেলে বলতে হোক, “মা, তোমাকে আরও একটু সময় দেওয়া উচিত ছিল। তোমার সঙ্গে আরও একটু কথা বলা উচিত ছিল। তোমার হাতটা আরও একটু শক্ত করে ধরে রাখা উচিত ছিল।”

আমি চাই, তুমি বেঁচে থাকতেই তোমাকে বুঝিয়ে দিতে—তুমি আমার কাছে কতটা মূল্যবান। তোমার চোখের জল মুছে দিতে চাই, তোমার ক্লান্তির দিনে পাশে বসতে চাই, তোমার মুখে হাসি দেখতে চাই। কারণ ভালোবাসা শুধু মনে রাখলে হয় না, ভালোবাসাকে যত্ন দিয়ে প্রকাশও করতে হয়।

মা, তুমি আমার জীবনের সেই অধ্যায়, যা কোনো দিন শেষ করতে চাই না। তুমি আমার শৈশবের স্মৃতি, আমার বর্তমানের শক্তি, আর আমার ভবিষ্যতের প্রার্থনা।

ঈশ্বরের কাছে আমার একটাই চাওয়া—আমার জীবনের সব সুখ যদি তোমার সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি, আর তোমার সব দুঃখের দিনে যদি তোমার পাশে দাঁড়াতে পারি, তাহলেই আমার জীবন সার্থক।

তুমি ভালো থেকো মা। তোমার মুখের হাসিটুকু আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য। তোমার কণ্ঠের ডাক আমার কাছে সবচেয়ে মধুর সুর। আর তোমার আশীর্বাদ আমার কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

পৃথিবী আমাকে কী দিল, তার হিসাব একদিন হয়তো ভুলে যাব। কিন্তু আমার জন্য তুমি কী কী ত্যাগ করেছ, সেই ঋণ কোনো দিন ভুলতে পারব না।

মা, তোমাকে ভালোবাসি—শুধু আজ নয়, প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্তে। হয়তো সব সময় বলতে পারি না, হয়তো সব সময় তোমার পাশে থাকতে পারি না, কিন্তু আমার হৃদয়ের গভীরে তোমার জন্য যে জায়গা আছে, সেখানে আর কারও প্রবেশাধিকার নেই।

মা, তুমি থেকো। আমার জীবনের আকাশে আশীর্বাদের চাঁদ হয়ে থেকো। কারণ তোমাকে পাশে পেলে আজও মনে হয়, পৃথিবীটা যত কঠিনই হোক, আমার হারিয়ে যাওয়ার কোনো ভয় নেই। ❤️

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *