মা, তোমার জন্য আজও আমার মনটা শিশুর মতো কাঁদে।

মা, জানো, পৃথিবীর কাছে আমি যতই শক্ত মানুষ হয়ে উঠি না কেন, তোমার কথা মনে পড়লেই আমার ভিতরের সেই ছোট্ট শিশুটি জেগে ওঠে। যে শিশুটি একসময় তোমার আঁচল ধরে হাঁটত, তোমার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ত, আর সামান্য কষ্ট পেলেই কাঁদতে কাঁদতে তোমার কাছে ছুটে আসত।

আজ আমি বড় হয়েছি। জীবনের অনেক দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছি। কত মানুষের সঙ্গে কথা বলি, কত সমস্যার সমাধান করি, কত দুঃখ নিজের মধ্যে চেপে রেখে হাসিমুখে দিন কাটাই। কিন্তু মা, একটা কথা সত্যি—আজও মন ভেঙে গেলে তোমার কাছে ছুটে যেতে ইচ্ছে করে। তোমার কোলে মাথা রেখে সব কষ্ট ভুলে যেতে ইচ্ছে করে।

তোমার কাছে এলে যে শান্তিটুকু পেতাম, পৃথিবীর আর কোথাও তা খুঁজে পাই না।

মা, তুমি কি মনে করতে পারো, ছোটবেলায় আমি যখন অসুস্থ হয়ে পড়তাম, তখন তুমি কীভাবে আমার পাশে বসে থাকতে? নিজের ঘুম, নিজের খাওয়া, নিজের শরীরের কথা ভুলে গিয়ে শুধু আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে। আমার সামান্য কষ্টে তোমার চোখ ভিজে উঠত। অথচ আজ তোমার চোখে জল এলে হয়তো আমি সব সময় তা দেখতে পাই না। তোমার মন খারাপ হলে হয়তো বুঝতে পারি না। তোমার শরীর খারাপ হলেও হয়তো কাজের ব্যস্ততায় ঠিকমতো খোঁজ নিতে পারি না।

এই কথাগুলো ভাবলে নিজের কাছেই নিজেকে অপরাধী মনে হয়।

যে মানুষটি আমার মুখে হাসি ফোটানোর জন্য নিজের সমস্ত হাসি বিসর্জন দিয়েছেন, সেই মানুষটির মুখে হাসি ফোটানোর জন্য আমি কি যথেষ্ট সময় দিতে পেরেছি?

মা, তুমি তো কখনো আমার কাছে বড় কিছু চাওনি। তোমার চাওয়া ছিল খুব সামান্য—আমি যেন ভালো থাকি, সুস্থ থাকি, জীবনে মাথা উঁচু করে চলতে পারি। আমার সাফল্যে তুমি গর্বিত হতে, আমার ব্যর্থতায় তুমি আমাকে সাহস দিতে। আমি হেরে গেলে তুমি বলতে, আবার চেষ্টা কর, সব ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু তোমাকে কি কখনো বলেছি, তোমার সেই কথাগুলোই আমাকে কতবার নতুন করে বাঁচার শক্তি দিয়েছে?

পৃথিবীর মানুষ যখন আমার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, তুমি তখনও আমার পাশে দাঁড়িয়েছ। অন্যরা যখন আমার ভুল দেখেছে, তুমি তখনও আমার ভিতরের ভালো মানুষটাকে খুঁজে পেয়েছ। আমি যখন নিজের উপর বিশ্বাস হারিয়েছি, তুমি তখনও আমার উপর বিশ্বাস রেখেছ।

মা, পৃথিবীর কাছে আমি যা-ই হই না কেন, তোমার ভালোবাসার কাছে আমি চিরকাল তোমার সেই আদরের সন্তান।

সময় বড় নিষ্ঠুর, মা। সে কাউকে থেমে থাকতে দেয় না। যে হাত একদিন আমাকে ধরে হাঁটতে শিখিয়েছিল, সেই হাতেই আজ বয়সের ছাপ পড়ছে। যে চোখ সারারাত জেগে আমার পাহারা দিয়েছে, সেই চোখে আজ ক্লান্তি জমছে। যে পা আমার জন্য হাজার পথ হেঁটেছে, সেই পায়ে আজ হয়তো ব্যথা হয়।

অথচ আমরা কত সহজেই বলে ফেলি, “মা, এখন সময় নেই, পরে কথা বলব।”

আমরা ভুলে যাই, মায়ের জীবনেও সময় সীমিত। তাঁরও ইচ্ছে করে সন্তানের সঙ্গে কথা বলতে, নিজের মনের কথা বলতে, পুরোনো দিনের স্মৃতি ভাগ করে নিতে। তিনি হয়তো মুখে কিছু বলেন না, কিন্তু সন্তানের একটু সময়ের জন্য অপেক্ষা করেন।

তাই আজ তোমাকে বলতে চাই, মা—তোমার সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত আমার কাছে অমূল্য। তোমার পাশে বসে গল্প করা, তোমার হাত ধরে হাঁটা, তোমার পছন্দের খাবার এনে দেওয়া, তোমার ওষুধের খোঁজ রাখা—এসবই আমার ভালোবাসার ছোট ছোট প্রকাশ।

আমি জানি, তোমার সমস্ত ঋণ কোনো দিন শোধ করতে পারব না। তোমার ত্যাগের প্রতিদান দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। তবুও জীবনের বাকি দিনগুলোতে তোমার পাশে থাকতে চাই। তোমার দুঃখের সময় তোমার ভরসা হতে চাই। তোমার একাকিত্বের দিনে তোমার সঙ্গী হতে চাই।

মা, আমি চাই না, তোমাকে ভালোবাসার কথাগুলো শুধু স্মৃতির পাতায় লেখা থাকুক। আমি চাই, তুমি বেঁচে থাকতেই আমার ভালোবাসা অনুভব করো। আমি চাই, তোমার মুখে হাসি ফুটুক, তোমার চোখে নিশ্চিন্তির আলো থাকুক।

ঈশ্বরের কাছে আমার একটাই প্রার্থনা—আমার জীবনে যত ঝড়ই আসুক, তুমি যেন সুস্থ থাকো। আমি যত দূরেই যাই, তোমার আশীর্বাদ যেন আমার সঙ্গে থাকে। জীবনের প্রতিটি কঠিন সময়ে যেন তোমার কণ্ঠে শুনতে পাই, “ভয় পাস না, আমি আছি।”

মা, তোমাকে হারানোর ভয় আমার কাছে পৃথিবীর সব ভয়ের চেয়ে বড়। কারণ তুমি শুধু আমার জন্মদাত্রী নও, তুমি আমার সাহস, আমার শান্তি, আমার আশ্রয়, আমার জীবনের সবচেয়ে আপন মানুষ।

একদিন হয়তো আমার চুলেও পাক ধরবে, আমার শরীরেও বয়সের ছাপ পড়বে। কিন্তু তোমার কাছে আমি চিরকাল সেই ছোট্ট শিশুটিই থাকতে চাই, যে তোমার হাত ধরে নিশ্চিন্তে পৃথিবীর পথে হাঁটতে পারে।

তাই আজ শুধু তোমার হাতটা ধরে বলতে ইচ্ছে করে—

“মা, তুমি আমার পাশে থেকো। তোমার সঙ্গে আরও অনেক গল্প করতে চাই, তোমার সঙ্গে আরও অনেক সকাল দেখতে চাই, তোমার হাতের রান্না খেতে চাই, তোমার বকুনি শুনতে চাই। জীবনের সমস্ত ব্যস্ততার শেষে তোমার কাছে ফিরে এসে বলতে চাই, মা, আমি বাড়ি ফিরেছি।”

মা, তোমাকে ভালোবাসি—এই কথাটা হয়তো খুব ছোট, কিন্তু এই ছোট্ট কথার মধ্যে আমার গোটা পৃথিবীটা লুকিয়ে আছে।

তুমি ভালো থেকো, মা। তোমার মুখের হাসিটুকু যেন কোনো দিন মলিন না হয়। আর যদি কোনো দিন আমার আচরণে তোমার মন খারাপ হয়ে থাকে, তবে তোমার এই সন্তানকে ক্ষমা করে দিয়ো।

কারণ পৃথিবীর সমস্ত সম্পর্কের ভিড়ে আমি আজও তোমার কাছেই সবচেয়ে বেশি অসহায়, সবচেয়ে বেশি আদরের, আর সবচেয়ে বেশি ভালোবাসায় বাঁধা।

মা, তুমি আছ বলেই আমার পৃথিবীটা আজও এত সুন্দর। তোমার আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে যেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তোমার সন্তান হয়ে থাকতে পারি। ❤️

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *