
শহরের পুরোনো নাট্যশালাটির নাম ছিল ‘অরুণোদয়’। একসময় সেখানে সন্ধ্যা হলেই দর্শকদের ভিড় জমত। নাটকের সংলাপ, করতালির শব্দ আর পর্দা ওঠার উত্তেজনায় মুখর থাকত চারপাশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মানুষের বিনোদনের অভ্যাস বদলে গেল। নতুন প্রেক্ষাগৃহ তৈরি হলো, মোবাইলের পর্দায় বিনোদন পৌঁছে গেল ঘরে ঘরে। অরুণোদয়ের আসনগুলো ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে লাগল।
নাট্যশালাটির দেখাশোনা করতেন বাহান্ন বছরের অমলেন্দু। তিনি একসময় মঞ্চের আলোকসম্পাতের কাজ করতেন। এখন নাটক খুব কমই হয়। তবু প্রতিদিন সকালে তিনি এসে মঞ্চের ধুলো পরিষ্কার করতেন, আলোর সুইচ পরীক্ষা করতেন এবং পর্দাগুলো গুছিয়ে রাখতেন।
একদিন পৌরসভার একটি নোটিশ এল। ভবনটির রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় সেটি অন্য কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। নাট্যশালাটি বন্ধ হয়ে গেলে অমলেন্দুর কাজও থাকবে না।
নোটিশটি পড়ে তিনি চুপ করে বসে রইলেন। তাঁর কাছে অরুণোদয় শুধু একটি চাকরির জায়গা ছিল না। এই মঞ্চেই তিনি প্রথম আলো জ্বালিয়েছিলেন, প্রথমবার দর্শকের উল্লাস শুনেছিলেন, আবার বহু নাটকের শেষ দৃশ্যে নিভে যাওয়া আলোও দেখেছিলেন।
কিন্তু পুরোনো স্মৃতি দিয়ে তো ভবন চালানো যায় না। আয় না থাকলে রক্ষণাবেক্ষণের খরচ আসবে কোথা থেকে?
সেই সময় নাট্যশালায় এল কলেজের ছাত্রী নন্দিতা। সে নাটক দেখতে আসেনি; কলেজের একটি অনুষ্ঠানের জন্য সস্তায় ঘর ভাড়া পাওয়া যায় কি না, তা জানতে এসেছিল।
অমলেন্দু তাকে খালি আসনগুলোর দিকে তাকাতে দেখে বললেন, “একসময় এখানে টিকিট পাওয়া যেত না। এখন কেউ খোঁজও করে না।”
নন্দিতা মঞ্চের দিকে তাকিয়ে বলল, “এখানে কি শুধু নাটকই করা যায়?”
অমলেন্দু একটু অবাক হলেন। “কেন, আর কী করা যাবে?”
“আলো আর শব্দের প্রশিক্ষণ, আবৃত্তি, নাটক লেখার কর্মশালা, এমনকি স্কুলের অনুষ্ঠানও তো হতে পারে। তবে আগে দেখতে হবে, ঘরটা নিরাপদ কি না, আর খরচ কত।”
প্রস্তাবটি অমলেন্দুর মনে দাগ কাটল।
পরদিন নন্দিতা কয়েকজন সহপাঠীকে নিয়ে আবার এল। তারা নাট্যশালার ব্যবস্থাপনার খাতা দেখল, সম্ভাব্য খরচের তালিকা তৈরি করল এবং আশপাশের স্কুল ও কলেজে ছোট একটি সমীক্ষা চালাল। অনেকেই জানালেন, অনুষ্ঠান করার জায়গা পেলে তাঁরা ব্যবহার করতে আগ্রহী। কেউ মঞ্চে কথা বলার অনুশীলন করতে চান, কেউ নাটক লিখতে চান, আবার কেউ প্রযুক্তিগত কাজ শিখতে চান।
তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন সহজ ছিল না। ভবনের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা পরীক্ষা করা দরকার, অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা ঠিক করতে হবে, আসন মেরামত করতে হবে। এসবের জন্য অর্থ লাগবে।
নন্দিতা পৌরসভার কাছে একটি প্রস্তাব জমা দিল। সেখানে নাট্যশালাটিকে লাভজনক ব্যবসা হিসেবে নয়, বরং আয়ের সঙ্গে জনসাধারণের সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের ভারসাম্য রেখে চালানোর পরিকল্পনা ছিল। নির্দিষ্ট দিনে স্কুলের অনুষ্ঠান ও প্রশিক্ষণের জন্য কম ভাড়া, অন্য দিনে বাণিজ্যিক অনুষ্ঠান থেকে স্বাভাবিক ভাড়া এবং আয়ের একটি অংশ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সংরক্ষণের প্রস্তাব দেওয়া হলো।
প্রথম বৈঠকে প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলো না।
একজন আধিকারিক বললেন, “এত পুরোনো ভবন চালাতে গেলে দায়িত্ব অনেক। কয়েকজন ছাত্রছাত্রী আগ্রহ দেখালেই তো হবে না।”
নন্দিতা প্রতিবাদ না করে জানতে চাইল, “কোন কোন শর্ত পূরণ করলে প্রস্তাবটি বিবেচনা করা সম্ভব?”
সেই প্রশ্নের উত্তরে তারা একটি তালিকা পেল—নিরাপত্তা পরীক্ষা, সম্ভাব্য আয়ের হিসাব, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নাম এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের পরিকল্পনা।
পরবর্তী এক মাস তারা সেই কাজগুলো করল। স্থানীয় প্রযুক্তিবিদদের সাহায্যে ভবনের অবস্থা পরীক্ষা করা হলো। কিছু মেরামতির কাজ করাতে হলো, আর বিপজ্জনক বৈদ্যুতিক সংযোগ বদলে দেওয়া হলো। প্রশিক্ষণের জন্য স্বেচ্ছাসেবী পাওয়া গেলেও নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নির্দিষ্ট কর্মীদের হাতেই রাখা হলো।
অবশেষে তিন মাসের পরীক্ষামূলক ব্যবহারের অনুমতি মিলল।
প্রথম দিন নাট্যশালায় দর্শক হিসেবে এসেছিল মাত্র আঠারোজন। কলেজের ছাত্রছাত্রীরা একটি ছোট নাটক পরিবেশন করল। নাটকের বিষয় ছিল শহরের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন। বড় কোনও সাজসজ্জা ছিল না, চমকপ্রদ আলোও ছিল না। তবু শেষ দৃশ্যের পরে দর্শকেরা হাততালি দিলেন।
অমলেন্দু বহুদিন পরে মঞ্চের আলো জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর মনে হলো, এই ছোট্ট করতালির শব্দ যেন বহু বছর ধরে বন্ধ হয়ে থাকা দরজার ওপাশ থেকে ফিরে এসেছে।
তারপর ধীরে ধীরে কাজ বাড়তে লাগল। সপ্তাহে একদিন আবৃত্তির প্রশিক্ষণ, মাসে দুবার নাটক লেখার কর্মশালা এবং নির্দিষ্ট দিনে স্কুলের অনুষ্ঠান শুরু হলো। কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত শিল্পী বিনা পারিশ্রমিকে প্রশিক্ষণ দিতে রাজি হলেন। অন্যদিকে, ভাড়ার আয় থেকে মঞ্চের মেরামতি ও বিদ্যুতের খরচ মেটানো হতে লাগল।
তবে নন্দিতা একটি নিয়মে জোর দিল—কোনও অনুষ্ঠানই নিরাপত্তার শর্ত ভেঙে করা যাবে না। একবার একটি আয়োজক বেশি দর্শক ঢোকাতে চাইলে তাকে নির্ধারিত আসনসংখ্যার বাইরে অনুমতি দেওয়া হলো না। এতে কিছু টাকা কম এল, কিন্তু ভবনের নিরাপত্তা বজায় রইল।
তিন মাস শেষে পৌরসভার পর্যালোচনা বৈঠক বসল। হিসাব দেখিয়ে নন্দিতা জানাল, নাট্যশালাটি এখনও বড় মুনাফা করছে না, কিন্তু নিজস্ব আয়ের একটি অংশ দিয়ে খরচ মেটাতে পারছে। পাশাপাশি বহু ছাত্রছাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দা সাংস্কৃতিক কাজের সুযোগ পাচ্ছেন।
অনুমতি বাড়ানো হলো।
সেদিন রাতে অমলেন্দু মঞ্চের সব আলো নিভিয়ে বেরিয়ে আসছিলেন। নন্দিতা পেছন থেকে বলল, “কাকা, আজ আবার দর্শক কম ছিল। পরের সপ্তাহে আরও মানুষ আনতে হবে।”
অমলেন্দু হাসলেন। “দর্শক বাড়বে। কিন্তু মনে রেখো, মঞ্চের কাজ শুধু ভরা আসনের জন্য নয়। কখনও কখনও আঠারোজন মানুষের সামনে বলা একটি সত্য কথাও অনেক দূর পৌঁছে যায়।”
নন্দিতা মাথা নাড়ল।
বছর ঘুরতে অরুণোদয় শহরের সবচেয়ে বড় নাট্যশালা হয়ে ওঠেনি। সেখানে প্রতিদিন ভিড়ও হতো না। কিন্তু এখন তার দরজা নিয়মিত খুলত, মঞ্চে আলো জ্বলত, নতুন শিল্পীরা নিজেদের কাজ দেখানোর সুযোগ পেতেন। আর অমলেন্দু প্রতিদিন সকালে এসে ধুলো পরিষ্কার করার সময় জানতেন, আজও এই জায়গাটির প্রয়োজন আছে।
কারণ, একটি মঞ্চের জীবন শুধু তার পর্দা বা আলোয় নয়; মানুষের অংশগ্রহণে, শেখার সুযোগে এবং একে অন্যের কথা শোনার ইচ্ছায় টিকে থাকে।
শিক্ষা: কোনও প্রতিষ্ঠান পুরোনো হয়ে গেলেই তার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় না। বাস্তব সমস্যা বুঝে, নিরাপত্তা ও আর্থিক দায়িত্ব বজায় রেখে নতুনভাবে ব্যবহার করতে পারলে পুরোনো সম্পদও সমাজের কাজে ফিরে আসতে পারে।












Leave a Reply