
ওল্ড ইংলিশ গেম (Old English Game) মুরগি ব্রিটিশ ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত একটি পুরোনো মুরগির ধরন। এর পরিচিতি মূলত দেহের গঠন, সতর্ক স্বভাব, বৈচিত্র্যময় পালকের রং এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বের জন্য। বর্তমানে বিভিন্ন পালনকারী এই মুরগি শৌখিন পোলট্রি পালন, প্রদর্শনী এবং ঐতিহ্যবাহী জাত সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে পালন করেন।
এই মুরগি সাধারণ বাণিজ্যিক ব্রয়লার বা উচ্চ ডিম উৎপাদনকারী লেয়ার জাতের মতো নয়। তাই পালন শুরু করার আগে এর স্বভাব, উপযুক্ত আবাসন, খাদ্য, স্বাস্থ্য পরিচর্যা এবং সম্ভাব্য বাজার সম্পর্কে বাস্তব ধারণা থাকা জরুরি।
উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক পরিচয়
ওল্ড ইংলিশ গেম মুরগির ইতিহাস ব্রিটেনের পুরোনো গেমফাউল ধরনের মুরগির সঙ্গে সম্পর্কিত। অতীতে এই ধরনের মুরগিকে মোরগের লড়াইয়ের জন্যও ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে প্রাণীর কল্যাণের দৃষ্টিকোণ থেকে মোরগের লড়াই ক্ষতিকর; অনেক জায়গায় এটি আইনত নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত।
আধুনিক সময়ে এই জাতের পালনকে শৌখিন পোলট্রি, প্রদর্শনী এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের মতো নিরাপদ উদ্দেশ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। পাখির স্বাভাবিক আচরণ, সুস্থতা এবং উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাই দায়িত্বশীল পালনকারীর প্রধান কর্তব্য।
শারীরিক বৈশিষ্ট্য
ওল্ড ইংলিশ গেম মুরগির বিভিন্ন রঙের পালক দেখা যায়। বংশ ও স্বীকৃত জাতের মান অনুযায়ী বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হতে পারে।
প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হলো—
- দেহের গঠন: সাধারণত সক্রিয়, দৃঢ় এবং পেশিবহুল দেহ।
- পালকের রং: লাল-কালো, সোনালি, রুপালি ও অন্যান্য রঙের ধরন দেখা যায়।
- মোরগের চেহারা: ঘাড় ও লেজের পালক অনেক ক্ষেত্রে আকর্ষণীয় ও উজ্জ্বল।
- স্বভাব: সতর্ক, চঞ্চল এবং কিছু ক্ষেত্রে আক্রমণাত্মক হতে পারে।
- বৈচিত্র্য: বড় আকারের পাখি এবং বামন বা ব্যান্টাম ধরনের পাখির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
শুধু পালকের রং দেখে কোনো পাখির বিশুদ্ধ জাত নিশ্চিত করা যায় না। নির্ভরযোগ্য প্রজননকারী, বংশের তথ্য এবং স্বীকৃত জাতের বৈশিষ্ট্য যাচাই করে পাখি সংগ্রহ করা উচিত।
ডিম উৎপাদন ও মাংসের ব্যবহার
ওল্ড ইংলিশ গেম মুরগি প্রধানত শৌখিন ও ঐতিহ্যবাহী জাত হিসেবে পরিচিত। আধুনিক লেয়ার মুরগির মতো বেশি ডিম উৎপাদন অথবা ব্রয়লারের মতো দ্রুত মাংস উৎপাদন এর প্রধান বৈশিষ্ট্য নয়।
ডিম উৎপাদন বয়স, বংশ, খাদ্য, আবহাওয়া ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার উপর নির্ভর করে। ডিমের জন্য পালন করলে উপযুক্ত পুষ্টি, পরিষ্কার বাসা এবং পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা করতে হবে।
মাংস উৎপাদনের উদ্দেশ্যে বড় খামার করার আগে এই জাতের বৃদ্ধি, খাদ্য ব্যয় এবং স্থানীয় বাজারের চাহিদা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা উচিত।
বাসস্থান ও খামার ব্যবস্থাপনা
ওল্ড ইংলিশ গেম মুরগির জন্য নিরাপদ, শুকনো ও বাতাস চলাচলকারী আবাসন দরকার। পূর্ণবয়স্ক মোরগের মধ্যে সংঘর্ষের সম্ভাবনা থাকায় পাখির সংখ্যা ও স্বভাব অনুযায়ী পৃথক ঘেরের ব্যবস্থা করা গুরুত্বপূর্ণ।
ঘর তৈরির নিয়ম
১. পর্যাপ্ত জায়গা: অতিরিক্ত ভিড় হলে চাপ, ঠোকরাঠুকরি এবং রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ে।
২. মজবুত বেড়া: পাখি যাতে পালিয়ে না যায় এবং শিকারি প্রাণী যাতে প্রবেশ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. শুকনো লিটার: ভেজা বা নোংরা বিছানা দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে।
৪. বাতাস চলাচল: ঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল থাকতে হবে, তবে বাচ্চাদের সরাসরি ঠান্ডা বাতাসের ধাক্কা থেকে রক্ষা করতে হবে।
৫. বসার ডাণ্ডা: পাখির আকার অনুযায়ী উপযুক্ত উচ্চতায় বসার ডাণ্ডা রাখা যেতে পারে।
৬. নিরাপদ চলাচল: সম্ভব হলে বেড়া দেওয়া খোলা জায়গায় চলাফেরা ও মাটি আঁচড়ে খাবার খোঁজার সুযোগ দিন।
নতুন পাখিকে পুরোনো দলের সঙ্গে মেশানোর আগে আলাদা পর্যবেক্ষণে রাখা উচিত। সংঘর্ষ শুরু হলে দ্রুত পাখিগুলিকে আলাদা করতে হবে।
খাদ্য ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা
সুষম খাদ্য মুরগির বৃদ্ধি, পালকের গুণমান, হাড়ের স্বাস্থ্য এবং রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। শুধু ভাত বা ভাঙা চাল দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সব পুষ্টির চাহিদা পূরণ করা যায় না।
খাদ্যে থাকা দরকার—
- প্রোটিন: দেহের বৃদ্ধি ও পালক গঠনের জন্য।
- শক্তিদায়ক উপাদান: দৈনন্দিন চলাফেরার জন্য।
- ভিটামিন: স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রমের জন্য।
- খনিজ: হাড় ও অন্যান্য শারীরিক গঠনের জন্য।
- পরিষ্কার জল: সব সময় সহজে পান করার মতো জল সরবরাহ করতে হবে।
বয়স অনুযায়ী উপযুক্ত স্টার্টার, গ্রোয়ার বা প্রজননকারী পাখির খাদ্য নির্বাচন করা উচিত। ডিম পাড়া মুরগির জন্য ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ উপযুক্ত লেয়ার ফিড দরকার হতে পারে।
খাদ্য শুকনো স্থানে রাখতে হবে এবং ছত্রাকযুক্ত, পচা বা দুর্গন্ধযুক্ত খাদ্য খাওয়ানো যাবে না।
প্রজনন ও বাচ্চা পালন
প্রজননের উদ্দেশ্যে সুস্থ, সক্রিয় এবং স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে সক্ষম পাখি নির্বাচন করা উচিত। বংশের পরিচয় ও প্রজননের তথ্য লিখে রাখলে জাত সংরক্ষণ এবং আত্মীয়তার মধ্যে বারবার প্রজনন এড়ানো সহজ হয়।
প্রজনন ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ দিক:
১. অসুস্থ বা দুর্বল পাখিকে প্রজনন দলে রাখবেন না।
২. মোরগ-মুরগির বয়স ও স্বাস্থ্য বিবেচনা করে প্রজননের ব্যবস্থা করুন।
৩. ফাটা বা অস্বাভাবিক ডিম আলাদা করুন।
৪. ইনকিউবেটর ব্যবহার করলে প্রস্তুতকারকের নির্দেশিকা অনুযায়ী তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, ডিম ঘোরানো ও বায়ু চলাচল নিয়ন্ত্রণ করুন।
৫. বাচ্চা ফোটার পর উপযুক্ত তাপ, পরিষ্কার জল এবং বয়স অনুযায়ী স্টার্টার ফিড দিন।
বাচ্চাদের পর্যাপ্ত জায়গা দিতে হবে এবং দুর্বল বাচ্চাকে অন্যদের ঠোকর থেকে রক্ষা করতে হবে।
রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য পরিচর্যা
সুস্থ পোলট্রি পালনের জন্য প্রতিদিন পাখির আচরণ ও স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
- খাবার ও জল গ্রহণের পরিবর্তন লক্ষ করুন।
- চোখ, পালক, পা এবং পায়খানার অবস্থা দেখুন।
- অসুস্থ পাখিকে আলাদা রাখুন।
- নতুন পাখিকে সরাসরি পুরোনো দলের সঙ্গে মেশাবেন না।
- স্থানীয় রোগের ঝুঁকি অনুযায়ী পশুচিকিৎসকের পরামর্শে টিকা দিন।
- খাবার ও জলপাত্র নিয়মিত পরিষ্কার করুন।
- শ্বাসকষ্ট, রক্তমিশ্রিত পায়খানা, তীব্র দুর্বলতা বা আকস্মিক মৃত্যু দেখা দিলে দ্রুত পশুচিকিৎসকের সাহায্য নিন।
অপ্রয়োজনীয়ভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করে রোগের কারণ নির্ণয় করে চিকিৎসা করানো উচিত।
পশ্চিমবঙ্গের আবহাওয়ায় পালন
পশ্চিমবঙ্গের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় মুরগির জন্য ছায়াযুক্ত, পরিষ্কার ও বাতাস চলাচলকারী ঘর প্রয়োজন।
গ্রীষ্মকালে সরাসরি রোদ থেকে পাখিকে রক্ষা করতে হবে এবং সব সময় পরিষ্কার জল দিতে হবে। অতিরিক্ত গরমে হাঁপানো, ডানা ছড়িয়ে রাখা বা খাবার কম খাওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
বর্ষাকালে ছাদ দিয়ে জল পড়া বন্ধ করা, মেঝে শুকনো রাখা এবং ঘরের চারপাশে জল জমতে না দেওয়া জরুরি। শীতকালে বিশেষত বাচ্চাদের উপযুক্ত উষ্ণতা দিতে হবে, তবে বায়ু চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করা উচিত নয়।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
ওল্ড ইংলিশ গেম মুরগি পালনের সম্ভাব্য বাজার মূলত শৌখিন পালনকারী, প্রজননকারী এবং ঐতিহ্যবাহী জাত সংরক্ষণে আগ্রহী মানুষের মধ্যে সীমিত থাকতে পারে। স্থানীয় চাহিদা যাচাই না করে বড় খামার শুরু করা উচিত নয়।
সম্ভাব্য ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে পাখি কেনা, ঘর নির্মাণ, খাদ্য, স্বাস্থ্য পরিচর্যা, শ্রম ও পরিবহণ। আয়ের উৎস হিসেবে ডিম, বাচ্চা বা প্রজননযোগ্য পাখি বিক্রির কথা বিবেচনা করা যেতে পারে, তবে এসব আয় নিশ্চিত নয়।
খামারের লাভ নির্ণয়ের সময় মোট বিক্রির টাকা থেকে খাদ্য, চিকিৎসা, শ্রম, পরিবহণ এবং অন্যান্য খরচ বাদ দিতে হবে। পাখির মৃত্যু বা অসুস্থতার কারণে সম্ভাব্য ক্ষতির হিসাবও রাখা দরকার।
উপসংহার
ওল্ড ইংলিশ গেম মুরগি একটি ঐতিহ্যবাহী ও বৈচিত্র্যময় পালকের ধরনসম্পন্ন মুরগির জাত। এর আকর্ষণ মূলত বাহ্যিক সৌন্দর্য, সক্রিয় স্বভাব এবং ঐতিহাসিক পরিচয়ে। এটি সাধারণ বাণিজ্যিক ব্রয়লার বা উচ্চ উৎপাদনশীল লেয়ারের বিকল্প নয়।
এই মুরগি পালন করতে হলে নিরাপদ আবাসন, সুষম খাদ্য, পরিষ্কার জল এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে। পূর্ণবয়স্ক মোরগের মধ্যে সংঘর্ষের ঝুঁকি বিবেচনা করে প্রয়োজনে পৃথক ঘের রাখতে হবে। প্রাণীর কল্যাণ ও দায়িত্বশীল পালনকে অগ্রাধিকার দিলে এই ঐতিহ্যবাহী মুরগি শৌখিন পোলট্রি পালনের একটি আকর্ষণীয় অংশ হতে পারে।












Leave a Reply