
একটা খোলা উঠোন, মাটির ওপর আঁকা কয়েকটি ঘর, আর একটি ছোট পাথর বা টুকরো—এই সামান্য উপকরণ দিয়েই একসময় শিশুদের জমজমাট খেলা শুরু হয়ে যেত। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এক পায়ে লাফিয়ে ঘর পার হওয়ার এই ধরনের খেলা নানা নামে পরিচিত। উত্তর ভারতের কিছু অঞ্চলে এর একটি প্রচলিত নাম কিত-কিত। বাংলায় একে অনেকেই এক্কা-দোক্কা বা ঘর-লাফের খেলার সঙ্গে মিলিয়ে চিনতে পারেন।
এই খেলায় দামি খেলনা বা বড় মাঠের প্রয়োজন হয় না। মাটিতে কয়েকটি ঘর এঁকে, পালা করে একটি ছোট বস্তু নির্দিষ্ট ঘরে ফেলে এবং ভারসাম্য বজায় রেখে লাফিয়ে এগিয়ে গিয়েই খেলা যায়। তবে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এর নাম, ঘরের বিন্যাস এবং নিয়ম আলাদা হতে পারে। তাই কিত-কিতের প্রতিটি সংস্করণকে একই নিয়মের খেলা বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
কিত-কিত নামের পরিচয়
কিত-কিত নামটি বিশেষত উত্তর ভারতীয় অঞ্চলে হপস্কচ ধরনের খেলার পরিচিত নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই ধরনের খেলা বিশ্বের নানা দেশেও দেখা যায়। কোথাও মাটিতে আঁকা ঘরগুলির মধ্যে এক পায়ে লাফিয়ে চলতে হয়, কোথাও আবার নির্দিষ্ট ঘরে ছোট পাথর বা অন্য বস্তু ছুড়ে ফেলা হয়।
বাংলার এক্কা-দোক্কা, উত্তর ভারতের কিত-কিত এবং বিশ্বের অন্যান্য হপস্কচ-জাতীয় খেলার মধ্যে মূল ধারণাগত মিল রয়েছে। কিন্তু স্থানীয় নাম ও নিয়মের বৈচিত্র্যও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অঞ্চলে ঘরগুলি এক সারিতে আঁকা হয়, আবার কোথাও পাশাপাশি দুটি ঘর থাকে। কিছু সংস্করণে নির্দিষ্ট ঘরে বস্তু ফেলার পর সেটি এড়িয়ে যেতে হয়।
এই বৈচিত্র্যই খেলাটিকে ভারতের লোকজ সংস্কৃতির একটি আকর্ষণীয় অংশ করে তুলেছে।
খেলার জন্য কী কী প্রয়োজন?
কিত-কিত খেলতে সাধারণত খুব অল্প উপকরণ লাগে।
- খোলা ও সমতল জায়গা: উঠোন, খেলার মাঠ বা নিরাপদ মেঝে।
- ঘর আঁকার উপকরণ: চক, কাঠি বা মাটিতে দাগ দেওয়ার মতো উপকরণ।
- ছোট পাথর বা গুটি: নির্দিষ্ট ঘর চিহ্নিত করার জন্য।
- খেলোয়াড়: একা অনুশীলন করা যায়, তবে একাধিক খেলোয়াড় থাকলে প্রতিযোগিতা আরও জমে ওঠে।
মাটিতে খেলার সময় কাঠি দিয়ে ঘর আঁকা যায়। পাকা মেঝেতে চক ব্যবহার করা সুবিধাজনক। খেলার জায়গাটি যেন পিচ্ছিল না হয় এবং আশপাশে ধারালো বস্তু না থাকে, সেদিকে নজর রাখা দরকার।
কীভাবে কিত-কিত খেলা হয়?
কিত-কিতের নিয়ম অঞ্চলভেদে বদলাতে পারে। নিচে হপস্কচ-জাতীয় খেলার একটি সাধারণ পদ্ধতি তুলে ধরা হলো।
১. ঘর আঁকা
প্রথমে মাটিতে কয়েকটি ঘর ধারাবাহিকভাবে আঁকা হয়। কোনো ঘর একক হতে পারে, আবার কোনো ধাপে পাশাপাশি দুটি ঘরও থাকতে পারে। ঘরের সংখ্যা ও বিন্যাস খেলোয়াড়েরা নিজেদের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ঠিক করতে পারেন।
২. ছোট বস্তু ছুড়ে দেওয়া
প্রথম খেলোয়াড় একটি ছোট পাথর বা গুটি নির্দিষ্ট ঘরে ছুড়ে দেন। বস্তুটি ঘরের দাগের বাইরে পড়লে বা ভুল ঘরে গেলে নিয়ম অনুযায়ী তার পালা শেষ হতে পারে।
৩. এক পায়ে লাফিয়ে এগোনো
খেলোয়াড়কে ঘরগুলির মধ্যে এক পায়ে লাফিয়ে এগোতে হয়। পাশাপাশি দুটি ঘর থাকলে কিছু সংস্করণে দুই পা ব্যবহার করা যায়। যে ঘরে পাথর পড়েছে, সেই ঘর এড়িয়ে যেতে হতে পারে।
৪. ভারসাম্য বজায় রাখা
ঘরের দাগে পা পড়ে গেলে, ভারসাম্য হারালে বা নিয়ম ভাঙলে পালা শেষ হতে পারে। খেলোয়াড়ের লক্ষ্য হলো নির্ধারিত পথ সম্পূর্ণ করা এবং ফিরে আসার সময়ও নিয়ম মেনে চলা।
৫. পরবর্তী ঘরে অগ্রসর হওয়া
প্রথম ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হলে পরবর্তী পালায় পাথর অন্য ঘরে ফেলা হয়। এভাবে খেলোয়াড় একের পর এক ঘর পার করার চেষ্টা করেন।
৬. বিজয়ী নির্ধারণ
কোনো সংস্করণে সব ঘর সফলভাবে সম্পন্ন করাই জয়ের শর্ত। অন্য সংস্করণে ঘর দখল করা বা নির্দিষ্ট পর্যায় শেষ করার নিয়ম থাকতে পারে। খেলা শুরু করার আগে সবাই মিলে নিয়ম ঠিক করে নিলে ভুল বোঝাবুঝি হয় না।
খেলাটির আসল আকর্ষণ কোথায়?
কিত-কিতের সরল উপকরণের আড়ালে রয়েছে শরীরের ভারসাম্য, মনোযোগ এবং নিয়ন্ত্রণের অনুশীলন। দেখতে সহজ মনে হলেও এক পায়ে লাফিয়ে নির্দিষ্ট ঘরে নামা এবং পাথরটি সঠিক জায়গায় ফেলা সব সময় সহজ নয়।
ভারসাম্য: এক পায়ে দাঁড়িয়ে বা লাফিয়ে চলার সময় শরীরের ভারসাম্য রাখতে হয়।
মনোযোগ: কোন ঘরে পাথর পড়েছে এবং কোন ঘর এড়িয়ে যেতে হবে, তা মনে রাখতে হয়।
নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত জোরে লাফালে দাগের বাইরে পা পড়তে পারে। তাই নিজের গতি নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
পরিকল্পনা: পরের লাফ কোথায় পড়বে, কীভাবে ফিরে আসতে হবে এবং কোন জায়গায় সাবধান থাকা দরকার, তা আগে থেকে ভাবতে হয়।
পালা মেনে চলা: একাধিক খেলোয়াড় অংশ নিলে প্রত্যেককে অন্যের পালার জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
শরীরচর্চায় সম্ভাব্য ভূমিকা
কিত-কিতের মতো লাফিয়ে খেলার মাধ্যমে শিশুরা শরীর নাড়াচাড়া করার সুযোগ পায়। এতে পায়ের পেশি ব্যবহার, শরীরের অবস্থান নিয়ন্ত্রণ এবং চোখ ও শরীরের মধ্যে সমন্বয়ের অনুশীলন হতে পারে।
তবে সব শিশুর শারীরিক সক্ষমতা এক রকম নয়। কেউ সহজে এক পায়ে লাফাতে পারে, আবার কারও বেশি সময় লাগে। তাই খেলাটিকে এমনভাবে সাজানো উচিত যাতে প্রত্যেকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অংশ নিতে পারে।
ছোট শিশুদের জন্য ঘরগুলি বড় করে আঁকা যেতে পারে এবং প্রথমে পাথর ছোড়ার নিয়ম বাদ দিয়ে শুধু ঘর ধরে লাফানোর অনুশীলন করানো যায়। পরে দক্ষতা বাড়লে ধীরে ধীরে কঠিন নিয়ম যোগ করা সম্ভব।
সামাজিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্ব
কিত-কিত শুধু শরীরচর্চার খেলা নয়; এটি শিশুদের একসঙ্গে সময় কাটানোরও একটি মাধ্যম।
খেলার সময় কেউ সফল হলে অন্যরা তাকে অভিনন্দন জানাতে পারে। কেউ ভুল করলে পরের পালায় আবার চেষ্টা করার সুযোগ পায়। এর মাধ্যমে জয়-পরাজয় মেনে নেওয়া, ধৈর্য রাখা এবং অন্যের প্রতি সম্মান দেখানোর অভ্যাস তৈরি হতে পারে।
অনেক সময় শিশুরাই নিজেরা ঘরের নকশা তৈরি করে, নিয়ম ঠিক করে এবং খেলার পালা বণ্টন করে। এতে দলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া ও নিয়ম মেনে চলার অভিজ্ঞতা হয়।
তবে প্রতিযোগিতা যেন অতিরিক্ত চাপের কারণ না হয়। ছোটদের খেলায় আনন্দ, নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণকে জয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে হপস্কচের বৈচিত্র্য
ভারতের বিভিন্ন ভাষা ও অঞ্চলে এক পায়ে লাফিয়ে ঘর পার হওয়ার খেলার বিভিন্ন নাম প্রচলিত। বাংলায় এক্কা-দোক্কা, উত্তর ভারতের কিছু অঞ্চলে কিত-কিত এবং অন্যান্য এলাকায় ভিন্ন স্থানীয় নাম শোনা যায়।
কোনো অঞ্চলে ঘরের নকশা লম্বা ও সরল, কোথাও আবার পাশাপাশি ঘরের বিন্যাস থাকে। কিছু সংস্করণে পাথর ছুড়ে নির্দিষ্ট ঘর চিহ্নিত করা হয়, অন্য সংস্করণে শুধু ঘর ধরে লাফানোই প্রধান নিয়ম।
এ ধরনের খেলার ইতিহাস নিয়ে লিখতে গেলে স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতি, স্কুলের খেলার অভিজ্ঞতা এবং অঞ্চলভিত্তিক নথি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ লোকজ খেলার অনেক নিয়ম লিখিত বইয়ে সংরক্ষিত হয়নি; মুখে মুখেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছেছে।
নিরাপদে খেলার নিয়ম
কিত-কিত খেলতে কয়েকটি সাধারণ সতর্কতা মেনে চলা উচিত।
১. সমতল ও শুকনো জায়গা বেছে নিতে হবে।
২. পিচ্ছিল মেঝে, কাদা বা পাথরে ভরা জায়গায় খেলা উচিত নয়।
৩. ঘরের দাগ স্পষ্ট হতে হবে, যাতে ভুল করে পা পিছলে না যায়।
৪. ছোট পাথর ব্যবহার করলে সেটি যেন ধারালো না হয়।
৫. খেলোয়াড়দের মধ্যে পর্যাপ্ত দূরত্ব রাখতে হবে।
৬. ব্যথা, মাথা ঘোরা বা অতিরিক্ত ক্লান্তি দেখা দিলে খেলা বন্ধ করতে হবে।
৭. ছোট শিশুদের খেলার সময় বড়দের নজরদারি থাকা ভালো।
আধুনিক সময়ে কিত-কিতকে ফিরিয়ে আনা
আজ অনেক শিশু মোবাইল গেম ও টেলিভিশনের সামনে দীর্ঘ সময় কাটায়। এই পরিস্থিতিতে কিত-কিতের মতো সহজ বহিরাঙ্গন খেলা শিশুদের সক্রিয়ভাবে সময় কাটানোর একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে।
স্কুলের ক্রীড়া দিবস, পাড়ার অনুষ্ঠান বা গ্রীষ্মের ছুটিতে এই খেলার আয়োজন করা যায়। শিক্ষকরা শিশুদের দিয়ে নিজেরাই ঘর আঁকিয়ে খেলাটি শেখাতে পারেন। এতে খেলার পাশাপাশি মাপজোক, সংখ্যা গণনা এবং নকশা তৈরির অনুশীলনও হবে।
বিভিন্ন বয়সের শিশুদের জন্য আলাদা কঠিনতার স্তর রাখা যেতে পারে। ছোটদের জন্য কম ঘর ও বড় দাগ, আর বড়দের জন্য বেশি ঘর ও নির্দিষ্ট পাথর ফেলার নিয়ম রাখা যায়।
স্থানীয় খেলার নাম ও নিয়ম লিখে রাখা, ছবি সংগ্রহ করা এবং প্রবীণদের স্মৃতি নথিভুক্ত করাও ঐতিহ্য সংরক্ষণের একটি কার্যকর উপায়।
উপসংহার
কিত-কিত ভারতের হপস্কচ-জাতীয় ঐতিহ্যবাহী খেলার একটি পরিচিত নাম। এর সরল নিয়ম, অল্প উপকরণ এবং শরীরের ভারসাম্য ও মনোযোগের প্রয়োজনীয়তা খেলাটিকে শিশুদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলে।
অঞ্চলভেদে এর নাম ও নিয়ম আলাদা হলেও মূল আনন্দটি একই—নিজের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে ঘর পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়া। এই খেলায় দামি সরঞ্জামের প্রয়োজন নেই; দরকার শুধু নিরাপদ জায়গা, কয়েকটি দাগ এবং খেলার ইচ্ছা।
পুরোনো দিনের এই খেলাকে নতুন প্রজন্মের কাছে ফিরিয়ে আনা মানে শুধু শৈশবের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখা নয়; শিশুদের একসঙ্গে খেলতে শেখানো, শরীরচর্চার সুযোগ তৈরি করা এবং ভারতের বৈচিত্র্যময় লোকজ সংস্কৃতিকে সম্মান জানানোও।












Leave a Reply