
দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক ছোট্ট গ্রাম—শিউলিবাড়ি। গ্রামের এক প্রান্তে ছিল একটি পুরোনো, টালির ছাউনি দেওয়া বাড়ি। সেই বাড়িতে একা থাকতেন কমলা দেবী।
বয়স তাঁর প্রায় সত্তর।
স্বামী মারা গেছেন বহু বছর আগে। একমাত্র ছেলে অভিষেক চাকরির জন্য বিদেশে চলে গিয়েছিল। প্রথমদিকে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই ফোন করত, ভিডিও কল করত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ কমতে শুরু করল।
কমলা দেবী অবশ্য ছেলের ওপর অভিমান করতেন না।
তিনি বলতেন,
— “ওরও তো সংসার হয়েছে। ব্যস্ত থাকবে।”
তবু প্রতি সন্ধ্যায় দরজার সামনে বসে তিনি রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতেন।
হয়তো আজ ছেলে আসবে।
পুরোনো চিঠির বাক্স
কমলা দেবীর ঘরে একটি কাঠের বাক্স ছিল।
সেখানে যত্ন করে রাখা ছিল ছেলের ছোটবেলার চিঠি, স্কুলের রিপোর্ট কার্ড, প্রথম আঁকা ছবি আর কিছু শুকিয়ে যাওয়া ফুল।
প্রতিমাসে তিনি নিজের হাতে ছেলেকে একটি চিঠি লিখতেন।
চিঠির শেষে একই কথা থাকত—
“ভালো থাকিস বাবা। সময় পেলে একদিন বাড়ি আয়।”
কিন্তু অনেক চিঠির উত্তর আসত না।
তবুও তিনি লেখা বন্ধ করতেন না।
একদিন ডাকপিয়ন এল
এক বিকেলে ডাকপিয়ন একটি খাম নিয়ে এল।
কমলা দেবীর নামে।
তিনি অবাক হয়ে খামটি হাতে নিলেন।
লেখাটি চিনতে তাঁর এক মুহূর্তও লাগল না।
অভিষেক।
কাঁপা হাতে খাম খুললেন।
ভেতরে মাত্র কয়েকটি লাইন—
“মা,
আমি জানি, অনেকদিন তোমার কাছে আসিনি। অনেক কথা বলতে চাই। আগামী মাসে আসব।
তোমার ছেলে।”
চিঠিটি বুকে চেপে ধরে কমলা দেবী কাঁদতে লাগলেন।
এবার অপেক্ষার শেষ হবে।
অপেক্ষার প্রস্তুতি
সেদিন থেকেই তিনি বাড়ি গোছাতে শুরু করলেন।
ছেলের ছোটবেলার ঘর পরিষ্কার করলেন।
পুরোনো খাটে নতুন চাদর পেতে দিলেন।
ছেলের পছন্দের নারকেল নাড়ু বানালেন।
বাগানের শুকনো গাছ ছেঁটে নতুন ফুল লাগালেন।
পাশের বাড়ির রেণুদি জিজ্ঞেস করলেন,
— “এত আয়োজন কেন?”
কমলা দেবী হাসলেন,
— “আমার ছেলে আসবে।”
দিন গড়ায়
এক মাস কেটে গেল।
অভিষেক এল না।
কমলা দেবী ভাবলেন, হয়তো কাজের সমস্যা হয়েছে।
আরও এক সপ্তাহ গেল।
তারপর আরেক সপ্তাহ।
ফোনও বন্ধ।
তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন।
কিন্তু কারও কাছে অভিযোগ করলেন না।
শুধু প্রতিদিন সন্ধ্যায় দরজার সামনে বসতেন।
একটি অপ্রত্যাশিত মানুষ
একদিন দুপুরে একজন অপরিচিত যুবক বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল।
— “আপনি কি কমলা দেবী?”
— “হ্যাঁ।”
— “আমি অমিত। অভিষেকদার সঙ্গে কাজ করতাম।”
কমলা দেবীর বুক ধড়ফড় করে উঠল।
— “আমার ছেলে কোথায়?”
অমিত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— “অভিষেকদা… আর নেই।”
চারপাশ যেন হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
কমলা দেবী কিছুই বললেন না।
শুধু চেয়ারে বসে পড়লেন।
অমিত জানাল, অভিষেক কয়েক মাস আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছিল।
মৃত্যুর আগে সে একটি চিঠি লিখেছিল।
কিন্তু চিঠিটি সময়মতো পাঠানো হয়নি।
যে চিঠি কমলা দেবী পেয়েছিলেন, সেটি আসলে তাঁর মৃত্যুর কয়েকদিন আগের লেখা।
অভিষেক সত্যিই আসতে চেয়েছিল।
কিন্তু পারেনি।
শেষ চিঠি
অমিত তাঁর হাতে আরেকটি খাম দিল।
— “দিদিমা, এটা অভিষেকদা আমাকে দিয়ে বলেছিল, সুযোগ পেলে আপনার হাতে দিতে।”
কমলা দেবী কাঁপতে কাঁপতে খাম খুললেন।
চিঠিতে লেখা—
“মা,
আমি জানি, আমি তোমার কাছে অনেক দেরি করেছি। তুমি হয়তো ভাবো, আমি তোমাকে ভুলে গেছি। কখনও না।
ছোটবেলায় তুমি বলেছিলে, মানুষ যত দূরেই যাক, বাড়ির পথ যেন ভুলে না যায়। আমি সেই পথ কখনও ভুলিনি।
যদি কোনোদিন আমি ফিরতে না পারি, তাহলে আমার ঘরটা বন্ধ করে রেখো না। সেখানে যে কেউ থাকতে পারবে, যে মানুষের নিজের কোনো ঘর নেই।
তাহলেই মনে হবে, আমি বাড়িতে ফিরে এসেছি।
তোমার অভাগা ছেলে, অভিষেক।”
চিঠির শেষ লাইনটি ছিল—
“মা, আমাকে অপেক্ষা করে রেখো না। অন্য কারও জন্য দরজা খুলে দিও।”
কমলা দেবী চিঠিটি বুকে চেপে ধরলেন।
একটি বাড়ির নতুন জীবন
পরদিন তিনি ছেলের ঘরটি খুলে দিলেন।
গ্রামের দরিদ্র এক বিধবা ও তাঁর দুই সন্তান সেখানে থাকতে শুরু করল।
তারপর আরও কয়েকজন অসহায় মানুষকে সাহায্য করতে লাগলেন।
বাড়িটির নাম দিলেন—
“অভিষেকের বাড়ি”।
গ্রামের মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে পারল, কমলা দেবী নিজের শোককে অন্যের আশ্রয়ে পরিণত করেছেন।
বছরখানেক পর সেই বাড়িতে একটি ছোট পাঠাগারও তৈরি হলো।
শিশুরা পড়তে আসত।
বৃদ্ধরা বসে গল্প করতেন।
কেউ অসুস্থ হলে সেখানেই সাহায্য পেত।
শেষ উত্তর
একদিন কমলা দেবী নিজের ছেলের উদ্দেশে একটি চিঠি লিখলেন।
খামের ওপর ঠিকানা লিখলেন—
“যেখানে আমার ছেলে আছে।”
চিঠির ভেতরে লিখলেন—
“অভি,
তুই বলেছিলি, আমাকে অপেক্ষা করতে নেই। আমি আর অপেক্ষা করি না।
তোর ঘরে এখন অনেক মানুষ থাকে। তারা আমাকে মা বলে ডাকে।
তোর বইগুলো এখন গ্রামের ছেলেমেয়েরা পড়ে। তোর বিছানায় শুয়ে কেউ নিরাপদে রাত কাটায়।
তুই আসতে পারিসনি, কিন্তু তোর ভালোবাসা ফিরে এসেছে।
তাই আজ আমি উত্তর দিচ্ছি—
তুই দেরি করিসনি বাবা। তুই ঠিক সময়েই ফিরে এসেছিস।
—তোর মা।”
চিঠিটি তিনি ডাকবাক্সে ফেললেন না।
বাড়ির উঠোনে একটি শিউলি গাছের নিচে রেখে দিলেন।
সেদিন সন্ধ্যায় আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছিল।
কমলা দেবী দরজার সামনে বসে ছিলেন।
একটি ছোট্ট ছেলে দৌড়ে এসে বলল,
— “ঠাকুমা, কাল গল্প বলবে?”
কমলা দেবী হাসলেন।
— “অবশ্যই।”
ছেলেটি জিজ্ঞেস করল,
— “কোন গল্প?”
তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “একজন ছেলের গল্প, যে অনেক দূরে গিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের বাড়ির পথ খুঁজে পেয়েছিল।”
বাতাসে শিউলি ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।
কমলা দেবীর মনে হলো, দূর কোথাও থেকে অভিষেক যেন বলছে—
“মা, এবার দরজাটা খোলা রেখো।”
তিনি মৃদু হেসে উত্তর দিলেন,
— “সবসময় বাবা।”
সমাপ্ত। ❤️
গল্প : শেষ চিঠির উত্তর।












Leave a Reply