
মালদার এক ছোট্ট গ্রাম মাধবপুর। গ্রামের মাঝখানে ছিল একটি পুরোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্কুলটির বয়স প্রায় পঞ্চাশ বছর।
স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল বিশাল এক বটগাছ।
গাছটির নিচে ছিল একটি কাঠের বেঞ্চ।
গ্রামের সবাই সেটিকে বলত—
“শেষ বেঞ্চ।”
কারণ স্কুলের যে ছাত্রটি সবচেয়ে পিছনে বসত, তাকে সাধারণত ওই বেঞ্চেই বসানো হতো।
সেই বেঞ্চেই বসত নীল।
নীল ছিল শান্ত স্বভাবের ছেলে। পড়াশোনায় খুব একটা ভালো নয়। অঙ্কে বারবার ভুল করত, ইংরেজি পড়তে গেলে আটকে যেত।
তাই শিক্ষকরা তাকে নিয়ে খুব একটা আশা করতেন না।
শেষ বেঞ্চের ছেলে
ক্লাসে যখন সবাই পড়া বলত, নীল চুপ করে থাকত।
একদিন শিক্ষক জিজ্ঞেস করলেন,
— “নীল, সাত গুণ আট কত?”
নীল মাথা নিচু করে বলল,
— “জানি না স্যার।”
ক্লাসের সবাই হেসে উঠল।
শিক্ষক বিরক্ত হয়ে বললেন,
— “তুই কি কোনোদিন কিছু শিখবি?”
নীল কিছু বলল না।
কিন্তু স্কুল ছুটির পর সে বটগাছের নিচে বসে মাটিতে কাঠি দিয়ে অঙ্ক করতে থাকল।
একজন নতুন শিক্ষক
সেই বছর স্কুলে নতুন শিক্ষক এলেন—সুবীর স্যার।
প্রথম দিনই তিনি লক্ষ্য করলেন, নীল সবসময় একা থাকে।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
— “তুই এখানে বসে কী করিস?”
নীল বলল,
— “অঙ্ক করি।”
স্যার মাটিতে আঁকা অঙ্কগুলো দেখলেন।
ভুলে ভরা।
কিন্তু একটা জিনিস দেখে তিনি অবাক হলেন।
নীল একই অঙ্ক বারবার করছে।
স্যার বললেন,
— “ভুল হচ্ছে, তবুও আবার করছিস?”
নীল মাথা নেড়ে বলল,
— “একদিন ঠিক হয়ে যাবে।”
সুবীর স্যার মৃদু হেসে বললেন,
— “এই কথাটাই তোকে অনেক দূর নিয়ে যাবে।”
অন্যরকম শিক্ষা
সুবীর স্যার নীলকে অন্যভাবে পড়াতে শুরু করলেন।
অঙ্ক শেখাতে তিনি পাথর ব্যবহার করলেন।
বিজ্ঞান শেখাতে মাঠে নিয়ে গেলেন।
বাংলা শেখাতে গল্প বলতে বললেন।
ইংরেজি শেখাতে গ্রামের দোকানের সাইনবোর্ড পড়তে বললেন।
নীল ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করল।
তারপর একদিন সে নিজেই বলল,
— “স্যার, আমি পারছি!”
সুবীর স্যার বললেন,
— “আমি তো জানতাম তুই পারবি।”
একটি দুর্ঘটনা
এক বর্ষার দিনে স্কুল ছুটির পর নীল দেখল, বটগাছের পাশে একটি ছোট্ট ছেলে পড়ে গেছে।
ছেলেটি ছিল পাশের গ্রামের।
বৃষ্টির জলে রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে সে পড়ে মাথায় আঘাত পেয়েছে।
নীল তাকে কোলে তুলে স্কুলের ঘরে নিয়ে গেল।
তারপর দৌড়ে শিক্ষকের কাছে খবর দিল।
সুবীর স্যার দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন।
ডাক্তার বললেন,
— “আর একটু দেরি হলে বিপদ হতে পারত।”
সেদিন প্রথমবার নীল বুঝল—
কাউকে সাহায্য করার জন্য বড় ডিগ্রি লাগে না। শুধু মানুষের প্রতি মন থাকতে হয়।
বছর পেরিয়ে যায়
মাধ্যমিকের পর নীল নার্সিং পড়তে চাইল।
কিন্তু পরিবারের সামর্থ্য ছিল না।
সুবীর স্যার গ্রামের মানুষের সাহায্যে তার পড়াশোনার ব্যবস্থা করলেন।
নীল নার্সিং পড়তে গেল।
বহু বছর পর সে একজন প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী হয়ে গ্রামে ফিরে এল।
গ্রামের মানুষ অবাক।
যে ছেলেকে সবাই “শেষ বেঞ্চের ছেলে” বলত, আজ সে গ্রামের অসুস্থ মানুষদের চিকিৎসায় সাহায্য করছে।
বটগাছের নিচে ফিরে আসা
একদিন নীল স্কুলে গেল।
বটগাছটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু সেই পুরোনো বেঞ্চটি ভেঙে গেছে।
নীল কাঠের টুকরোগুলো দেখে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
সুবীর স্যার তখন বৃদ্ধ।
তিনি পাশে এসে দাঁড়ালেন।
— “কী দেখছিস?”
নীল বলল,
— “আমার স্কুলজীবন।”
স্যার হেসে বললেন,
— “তুই তো তখন কিছুই পারতিস না।”
নীলও হেসে বলল,
— “আপনি না থাকলে হয়তো এখনও পারতাম না।”
নতুন বেঞ্চ
পরদিন নীল নিজের টাকায় একটি নতুন বেঞ্চ বানিয়ে দিল।
বেঞ্চটির সামনে একটি ছোট ফলক লাগানো হলো—
“শেষ বেঞ্চ বলে কোনো বেঞ্চ নেই। যে শিশু আজ পিছনে বসে, সে-ই হয়তো কাল সামনে দাঁড়াবে।”
স্কুলের শিক্ষকরা সিদ্ধান্ত নিলেন, প্রতি বছর পিছিয়ে থাকা ছাত্রদের জন্য আলাদা সহায়তা ক্লাস হবে।
নীল নিজেও সপ্তাহে একদিন এসে তাদের পড়াতে শুরু করল।
একদিন একটি ছেলে এসে বলল,
— “দাদা, আমি অঙ্কে খুব খারাপ।”
নীল হাসল।
— “আমিও ছিলাম।”
ছেলেটি অবাক।
— “তুমি?”
নীল বটগাছের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “হ্যাঁ। আমি ছিলাম এই স্কুলের সবচেয়ে শেষ বেঞ্চের ছাত্র।”
সন্ধ্যায় সবাই চলে গেলে নীল একা বটগাছের নিচে বসে রইল।
তার সামনে নতুন বেঞ্চ।
চারপাশে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ।
দূরে গ্রামের আলো।
সে মনে মনে ভাবল—
জীবনে কেউ পিছনে পড়ে গেলে তাকে ঠেলে আরও পিছনে পাঠানো সহজ।
কিন্তু তার পাশে দাঁড়িয়ে বলা—
“চেষ্টা কর, তুই পারবি”
—এই ছোট্ট কথাটাই হয়তো একটি মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।
বটগাছের পাতায় হাওয়া লাগল।
মনে হলো, সুবীর স্যারের সেই পুরোনো কণ্ঠ আবার ভেসে এল—
“শেষ বেঞ্চ থেকে শুরু করলেও শেষটা কোথায় হবে, সেটা তুই নিজেই ঠিক করবি।”
নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসল।
তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
বটগাছের নিচে বেঞ্চটি আর “শেষ বেঞ্চ” ছিল না।
সেটি হয়ে উঠেছিল—
অসংখ্য নতুন স্বপ্নের প্রথম বেঞ্চ।
সমাপ্ত। ❤️
গল্প : বটগাছের নিচে শেষ বেঞ্চ।।












Leave a Reply