“লোকসংগীত শুধু গান নয়, এটি আমাদের মাটির স্মৃতি”—হারিয়ে যাওয়া লোকসংস্কৃতি নিয়ে শিল্পী মাধবী রায়ের মুখোমুখি।

কাল্পনিক বিশেষ সাক্ষাৎকার

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: বিশেষ প্রতিনিধি
স্থান: কলকাতা
ধরন: কাল্পনিক সাক্ষাৎকার

ভূমিকা

একটি অঞ্চলের ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না। মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া গান, গল্প, প্রবাদ, ছড়া, পালাগান, বাদ্যযন্ত্র, উৎসব, লোকনৃত্য এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে সেই ইতিহাস।

বাংলার লোকসংগীতের ক্ষেত্রেও কথাটি অত্যন্ত সত্য। ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, বাউল, ঝুমুর, গম্ভীরা, কবিগান, টুসু, ভাদু, পালাগান—বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের জীবন, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, শ্রম, প্রকৃতি, সামাজিক সম্পর্ক এবং বিশ্বাসের সঙ্গে এই গানগুলির গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

কিন্তু সময় বদলেছে। মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে। বিনোদনের মাধ্যম বদলেছে। মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আজ মানুষের অবসর বিনোদনের প্রধান মাধ্যমগুলির অন্যতম। ফলে একসময় যে লোকগান গ্রামের উঠোন, মাঠ, নদীর ঘাট কিংবা উৎসবের আসরে স্বাভাবিকভাবে শোনা যেত, তার অনেকগুলিই আজ সীমিত হয়ে পড়েছে নির্দিষ্ট কিছু শিল্পী ও সাংস্কৃতিক পরিসরের মধ্যে।

তাহলে কি লোকসংগীত ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে?

নাকি আধুনিক প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেই লোকসংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতেই আমাদের মুখোমুখি হয়েছেন কাল্পনিক লোকসংগীত শিল্পী, গবেষক ও লোকসংস্কৃতি সংগ্রাহক মাধবী রায়। দীর্ঘ এই কথোপকথনে তিনি বলেছেন লোকসংগীতের বর্তমান অবস্থা, শিল্পীদের সমস্যা, নতুন প্রজন্মের আগ্রহ, ডিজিটাল মাধ্যমের ভূমিকা এবং লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণের ভবিষ্যৎ নিয়ে।


প্রশ্ন: লোকসংগীতকে আপনি কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন?

মাধবী রায়: লোকসংগীতকে শুধু “গ্রামের গান” বললে তার গুরুত্ব অনেকটাই কমিয়ে দেখা হবে।

লোকসংগীত আসলে একটি সমাজের জীবনযাত্রার দলিল। মানুষ কীভাবে ভালোবাসত, কী নিয়ে কষ্ট পেত, কীভাবে উৎসব পালন করত, কীভাবে প্রকৃতিকে দেখত, কীভাবে জীবিকার সঙ্গে লড়াই করত—এসবের অনেক কিছুই লোকগানের মধ্যে পাওয়া যায়।

একজন মানুষ হয়তো নিজের জীবনের ইতিহাস লিখে যেতে পারেননি। কিন্তু তিনি যে গানটি গেয়েছেন, সেই গানটি তার সময়ের কথা বলে গেছে।

এই কারণে লোকগান শুধু বিনোদন নয়, এটি আমাদের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ।


প্রশ্ন: লোকসংগীতের প্রতি আপনার নিজের আগ্রহ কীভাবে তৈরি হয়েছিল?

মাধবী রায়: ছোটবেলায় বাড়ির আশপাশে বিভিন্ন লোকগান শুনতাম। তখন অবশ্য বুঝতাম না যে এগুলি এত গুরুত্বপূর্ণ।

গ্রামের প্রবীণ মানুষদের কাছ থেকে গান শুনতাম। কোনো গান ছিল প্রেমের, কোনো গান ছিল বিচ্ছেদের, কোনো গান ছিল কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত, আবার কোনো গান উৎসবকে কেন্দ্র করে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে শুরু করি—একই গান একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষের জীবন সম্পর্কে কত কিছু বলতে পারে।

তারপর আমি পুরনো গান সংগ্রহ করতে শুরু করি। অনেক সময় এমন গান পেয়েছি, যা সেই গ্রামের কয়েকজন প্রবীণ মানুষ ছাড়া আর কেউ জানেন না।

তখন মনে হয়েছে, এগুলি যদি এখন সংগ্রহ না করি, কয়েক বছর পরে হয়তো গানগুলির সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিটাও হারিয়ে যাবে।


প্রশ্ন: লোকসংগীত হারিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ কী?

মাধবী রায়: একক কোনো কারণ নেই।

প্রথমত, মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে। আগে গ্রামীণ সমাজে সম্মিলিতভাবে গান গাওয়ার সুযোগ বেশি ছিল। এখন মানুষের কাজের ধরন বদলেছে।

দ্বিতীয়ত, বিনোদনের মাধ্যম বদলেছে। আগে একটি গ্রামে গান বা যাত্রার আসর বসলে বহু মানুষ সেখানে জড়ো হতেন। এখন মোবাইল ফোনেই মানুষ নানা ধরনের বিনোদন পেয়ে যাচ্ছেন।

তৃতীয়ত, অনেক লোকশিল্পী তাঁদের শিল্পের যথাযথ আর্থিক মূল্য পান না।

চতুর্থত, নতুন প্রজন্মের কাছে অনেক লোকগান পৌঁছানোর ব্যবস্থা আমরা তৈরি করতে পারিনি।

তাই শুধু তরুণ প্রজন্মকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমাদেরও ভাবতে হবে—আমরা লোকসংগীতকে নতুন প্রজন্মের কাছে কতটা আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরতে পেরেছি?


প্রশ্ন: অনেকেই বলেন, তরুণ প্রজন্ম লোকসংগীত শুনতে চায় না। আপনি কি একমত?

মাধবী রায়: পুরোপুরি একমত নই।

তরুণরা নতুন কিছু পছন্দ করে, এটা সত্যি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তারা নিজেদের সংস্কৃতি শুনতে চায় না।

সমস্যা হলো, আমরা অনেক সময় লোকসংগীতকে এমনভাবে উপস্থাপন করি যেন এটি শুধুই অতীতের বিষয়।

একজন তরুণ যদি একটি পুরনো গানকে সুন্দর সুর, ভালো শব্দ, আকর্ষণীয় ভিডিও এবং আধুনিক উপস্থাপনার মাধ্যমে শুনতে পান, তাহলে তিনি আগ্রহী হতে পারেন।

সংস্কৃতি সংরক্ষণ মানে তাকে কাচের বাক্সে রেখে দেওয়া নয়। তাকে জীবন্ত রাখতে হবে।


প্রশ্ন: তাহলে আধুনিক সংগীতের সঙ্গে লোকসংগীতের মিশ্রণ কি গ্রহণযোগ্য?

মাধবী রায়: অবশ্যই, তবে সতর্কতার সঙ্গে।

ফিউশন করা যেতে পারে। নতুন বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে। নতুন প্রজন্মের ভাষায় উপস্থাপন করা যেতে পারে।

কিন্তু মূল লোকসুর, গানের ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট যেন বিকৃত না হয়।

আমরা যদি একটি পুরনো লোকগানের সুর নিয়ে সম্পূর্ণ অন্যরকম কিছু বানাই এবং সেটিকে লোকগান বলে চালিয়ে দিই, তাহলে সমস্যা হবে।

পরিবর্তন হতেই পারে, কিন্তু পরিবর্তনের সঙ্গে শিকড়ের সম্পর্কটাও থাকতে হবে।


প্রশ্ন: লোকশিল্পীরা আর্থিকভাবে কতটা সমস্যায় থাকেন?

মাধবী রায়: অনেক শিল্পীই আর্থিক সমস্যার মধ্যে থাকেন।

একজন শিল্পী বছরের পর বছর গান শিখেছেন। কিন্তু সারা বছর নিয়মিত অনুষ্ঠান পাওয়া যায় না। অনেক সময় অনুষ্ঠানের পারিশ্রমিকও খুব বেশি নয়।

আর একটি বড় সমস্যা হলো—শিল্পীর শিল্পের মূল্য এবং তার জনপ্রিয়তার মধ্যে সবসময় সম্পর্ক থাকে না।

অনেক প্রবীণ শিল্পী অসাধারণ গান জানেন, কিন্তু ডিজিটাল মাধ্যমে তাঁদের পরিচিতি নেই। ফলে তাঁরা নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছাতে পারেন না।


প্রশ্ন: ডিজিটাল মাধ্যম কি এই সমস্যার সমাধান করতে পারে?

মাধবী রায়: অনেকটাই পারে।

একজন শিল্পী আজ একটি ভালো মানের ভিডিও তৈরি করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারেন।

আগে একটি গ্রামের শিল্পীর গান শোনার জন্য সেই গ্রামে যেতে হতো। এখন সেই গান মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অন্য রাজ্য, এমনকি অন্য দেশেও পৌঁছাতে পারে।

তবে শুধু ভিডিও তৈরি করলেই হবে না। তথ্যও দিতে হবে।

গানটি কোথাকার? কে গেয়েছেন? গানের অর্থ কী? এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট কী? কোন বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার হয়েছে?

এসব তথ্য যুক্ত হলে দর্শক শুধু গান শুনবেন না, গানটিকে বুঝতেও পারবেন।


প্রশ্ন: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম লোকসংগীতের জন্য আশীর্বাদ না অভিশাপ?

মাধবী রায়: দুটোই হতে পারে।

সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি আশীর্বাদ।

কিন্তু জনপ্রিয়তার জন্য যদি গানের মূল চরিত্র বদলে দেওয়া হয়, ভুল তথ্য দেওয়া হয় কিংবা অন্যের গান নিজের নামে প্রচার করা হয়, তাহলে তা ক্ষতিকর।

ডিজিটাল মাধ্যমে একটি ভুল তথ্যও খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

তাই লোকসংস্কৃতির ক্ষেত্রে ডিজিটাল কাজের সঙ্গে গবেষণার দায়িত্বও থাকা দরকার।


প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন স্কুলে লোকসংগীত সম্পর্কে আরও পড়ানো উচিত?

মাধবী রায়: অবশ্যই।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের পরিচয় আরও বাড়ানো দরকার।

একজন ছাত্র নিজের জেলার লোকগান সম্পর্কে জানলে সে শুধু একটি গান শেখে না; সে নিজের অঞ্চলের ইতিহাস, ভাষা ও মানুষের জীবন সম্পর্কে জানতে পারে।

স্কুলে স্থানীয় শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে অনুষ্ঠান করা যেতে পারে। ছাত্রছাত্রীরা তাঁদের কাছ থেকে সরাসরি গান শিখতে পারে।

শুধু বই পড়িয়ে লোকসংস্কৃতি শেখানো সম্ভব নয়। সরাসরি অভিজ্ঞতা দরকার।


প্রশ্ন: পরিবারও কি এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে?

মাধবী রায়: অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

একটি শিশুর সাংস্কৃতিক শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু হয়।

বাড়ির প্রবীণ মানুষ যদি পুরনো গান জানেন, তাহলে নাতি-নাতনিদের সেই গান শেখাতে পারেন।

অনেক পরিবারে দাদু-ঠাকুমার কাছে অসংখ্য লোককথা, ছড়া ও গান রয়েছে। কিন্তু সেগুলি লিখে বা রেকর্ড করে রাখা হয় না।

আমার পরামর্শ হবে—পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের গল্প ও গান রেকর্ড করুন। তাঁদের অনুমতি নিয়ে সংরক্ষণ করুন।

এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অমূল্য সম্পদ হতে পারে।


প্রশ্ন: লোকসংগীত সংরক্ষণের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির আর কী ভূমিকা থাকতে পারে?

মাধবী রায়: প্রযুক্তি এখানে বিপ্লব ঘটাতে পারে।

ধরুন কোনো অঞ্চলের একজন প্রবীণ শিল্পী একটি বিশেষ গান জানেন। তাঁর কণ্ঠ রেকর্ড করা হলো। গানের কথা লেখা হলো। গানের অর্থ, শিল্পীর পরিচয়, অঞ্চল এবং পরিবেশনের সময়কাল নথিভুক্ত করা হলো।

এভাবে একটি ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করা সম্ভব।

আগামী প্রজন্ম সেই আর্কাইভ থেকে গান শুনতে পারবে, গবেষকরা তথ্য ব্যবহার করতে পারবেন এবং শিল্পীরাও নতুন শ্রোতা পাবেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শুধু গান নয়, গানের সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্যও সংরক্ষণ করতে হবে।


প্রশ্ন: অনেক লোকগানের নির্দিষ্ট লেখক নেই। তাহলে সেগুলির মালিকানা কার?

মাধবী রায়: এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল বিষয়।

লোকগান অনেক সময় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের মুখে মুখে এসেছে। ফলে নির্দিষ্ট একজন লেখকের নাম পাওয়া যায় না।

কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে কেউ ইচ্ছেমতো সেই গান নিজের নামে চালিয়ে দিতে পারেন।

লোকগানের ক্ষেত্রে উৎস, অঞ্চল এবং প্রচলিত ধারার প্রতি সম্মান থাকা দরকার।

কোনো শিল্পী যদি পুরনো গান নতুনভাবে পরিবেশন করেন, তাহলে তিনি সেটিকে নিজের সৃষ্টির বদলে প্রচলিত লোকধারার গান হিসেবে উল্লেখ করতে পারেন, যদি তার প্রকৃত উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য না থাকে।


প্রশ্ন: লোকসংগীতের সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক কতটা গভীর?

মাধবী রায়: অত্যন্ত গভীর।

একটি অঞ্চলের ভাষা ও উপভাষা লোকগানের মধ্যে জীবন্ত থাকে।

অনেক শব্দ আছে যা সাধারণ ব্যবহারে আজ কমে গেছে। কিন্তু পুরনো লোকগানের মধ্যে সেই শব্দ এখনও পাওয়া যায়।

তাই লোকগান হারিয়ে গেলে শুধু একটি সুর হারায় না—একটি ভাষাগত সম্পদও হারিয়ে যেতে পারে।

লোকসংগীত সংরক্ষণ মানে আঞ্চলিক ভাষার একটি অংশকেও সংরক্ষণ করা।


প্রশ্ন: শহুরে মানুষ কি লোকসংগীত থেকে দূরে সরে যাচ্ছে?

মাধবী রায়: শহুরে মানুষও আগ্রহী। কিন্তু তাদের কাছে পৌঁছানোর পদ্ধতি আলাদা হতে পারে।

শহরে লোকসংগীত উৎসব, ছোট কনসার্ট, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক কর্মশালা করা যেতে পারে।

এছাড়া ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে শহরের মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব।

আমি অনেক তরুণ-তরুণীকে দেখেছি, যারা শহরে বড় হয়েছে কিন্তু নিজেদের শিকড়ের গান শুনতে খুব আগ্রহী।

তাদের সামনে সুযোগ তৈরি করতে হবে।


প্রশ্ন: লোকসংগীত শিল্পী হতে চাইলে একজন তরুণকে কী করতে হবে?

মাধবী রায়: প্রথমে গান শুনতে হবে।

অনেক বেশি শুনতে হবে।

তারপর গানের ইতিহাস জানতে হবে। কোন অঞ্চলের গান, কীভাবে গাওয়া হয়, কোন ভাষা বা উপভাষা ব্যবহার করা হয়, কী ধরনের বাদ্যযন্ত্র লাগে—এসব বুঝতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কোনো প্রবীণ শিল্পীর কাছে শেখার সুযোগ পেলে সেটিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

ইন্টারনেট থেকে গান শেখা সম্ভব, কিন্তু সরাসরি গুরু বা অভিজ্ঞ শিল্পীর কাছ থেকে শেখার অভিজ্ঞতা আলাদা।


প্রশ্ন: বর্তমানে লোকসংগীতের সবচেয়ে বড় সংকট কী বলে আপনি মনে করেন?

মাধবী রায়: আমার কাছে সবচেয়ে বড় সংকট হলো ধারাবাহিকতা ভেঙে যাওয়া।

এক প্রজন্মের শিল্পী গান জানেন। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম সেটি শেখেনি।

ফলে শিল্পীর সঙ্গে সঙ্গে গানটিও হারিয়ে যায়।

আমাদের এমন ব্যবস্থা করতে হবে যাতে একজন প্রবীণ শিল্পীর জ্ঞান একজন তরুণ শিল্পীর কাছে পৌঁছায়।

এটি শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়। সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম, পরিবার এবং সাধারণ মানুষ—সবাই ভূমিকা রাখতে পারে।


প্রশ্ন: সংবাদমাধ্যম কীভাবে লোকসংস্কৃতিকে সাহায্য করতে পারে?

মাধবী রায়: সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অসাধারণ হতে পারে।

শুধু বড় শহরের অনুষ্ঠান বা জনপ্রিয় শিল্পীদের নিয়ে প্রতিবেদন করলে হবে না।

গ্রামের এমন শিল্পীদের সামনে আনতে হবে, যাঁরা বহু বছর ধরে নিভৃতে কাজ করছেন।

একটি ছোট সাক্ষাৎকারও একজন শিল্পীর জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

সংবাদমাধ্যম যদি নিয়মিতভাবে লোকশিল্পীদের গল্প তুলে ধরে, তাহলে সাধারণ মানুষ তাঁদের সম্পর্কে জানতে পারবেন এবং নতুন প্রজন্মও আগ্রহী হবে।


প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন লোকসংস্কৃতি নিয়ে আরও গবেষণা হওয়া দরকার?

মাধবী রায়: অবশ্যই।

আমাদের দেশে এখনও বহু লোকগান, লোককথা, বাদ্যযন্ত্র এবং আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে, যেগুলি যথেষ্টভাবে নথিভুক্ত হয়নি।

একজন গবেষক যখন একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে প্রবীণ মানুষের কাছ থেকে গান সংগ্রহ করেন, তখন তিনি শুধু গান সংগ্রহ করছেন না—তিনি একটি সময়কে নথিভুক্ত করছেন।

এই কাজ এখনই করতে হবে।

কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পীরা চলে যাচ্ছেন, ভাষা বদলাচ্ছে এবং সামাজিক পরিবেশ পরিবর্তিত হচ্ছে।


প্রশ্ন: লোকসংস্কৃতিকে বাঁচাতে সরকারের কী করা উচিত?

মাধবী রায়: কয়েকটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, প্রকৃত লোকশিল্পীদের চিহ্নিত করা।

দ্বিতীয়ত, তাঁদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তার সুযোগ তৈরি করা।

তৃতীয়ত, জেলা ও ব্লক স্তরে লোকসংগীতের আর্কাইভ তৈরি করা।

চতুর্থত, স্কুল ও কলেজে স্থানীয় সংস্কৃতি নিয়ে কর্মশালা বাড়ানো।

পঞ্চমত, তরুণ শিল্পীদের জন্য মঞ্চ তৈরি করা।

আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শুধু পুরস্কার দিলে হবে না। শিল্পী যেন তাঁর শিল্পের মাধ্যমে সম্মানজনক জীবিকা অর্জন করতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।


প্রশ্ন: লোকসংগীতকে কি পেশা হিসেবে নেওয়া সম্ভব?

মাধবী রায়: সম্ভব, তবে আমাদের সাংস্কৃতিক বাজারকে আরও সংগঠিত করতে হবে।

একজন শিল্পী শুধু অনুষ্ঠানে গান গেয়ে উপার্জন করবেন—এই ধারণা বদলাতে হবে।

তিনি রেকর্ডিং করতে পারেন, কর্মশালা নিতে পারেন, শিক্ষার্থীদের শেখাতে পারেন, সাংস্কৃতিক প্রকল্পে কাজ করতে পারেন, ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করতে পারেন।

অর্থাৎ লোকসংগীতকে একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক পেশা হিসেবে ভাবতে হবে।


প্রশ্ন: আপনি ব্যক্তিগতভাবে কোন মুহূর্তকে আপনার সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে মনে করেন?

মাধবী রায়: একবার একটি প্রত্যন্ত গ্রামের একজন প্রবীণ শিল্পীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল।

তিনি বলেছিলেন, “আমার গান আমার সঙ্গে শেষ হয়ে যাবে।”

কথাটি আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছিল।

আমি তাঁর গান রেকর্ড করি এবং কয়েকজন তরুণ শিল্পীকে তাঁর কাছে নিয়ে যাই।

কয়েক মাস পরে সেই তরুণরা তাঁর গান গাইতে শুরু করে।

সেদিন তিনি বলেছিলেন, “এখন বুঝলাম, আমার গান বেঁচে থাকবে।”

আমার কাছে সেটাই সবচেয়ে বড় সাফল্য।

কোনো পুরস্কারের চেয়ে একটি গানকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া অনেক বড় বিষয়।


প্রশ্ন: আপনার মতে লোকসংগীতের ভবিষ্যৎ কেমন?

মাধবী রায়: আমি আশাবাদী।

কারণ মানুষের শিকড়ের প্রতি আকর্ষণ কখনও পুরোপুরি শেষ হয় না।

হয়তো লোকগান শোনার মাধ্যম বদলাবে। আগে মানুষ মাঠে বসে শুনত, এখন মোবাইল ফোনে শুনবে। আগে হারমোনিয়াম, দোতারা বা ঢোলের সঙ্গে শুনত, এখন নতুন বাদ্যযন্ত্রও যুক্ত হতে পারে।

কিন্তু মূল অনুভূতিটা থাকবে।

আমাদের কাজ হলো সেই অনুভূতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।


প্রশ্ন: শেষ প্রশ্ন। নতুন প্রজন্মের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?

মাধবী রায়: আমি তরুণদের বলব—নিজের শিকড়কে কখনও লজ্জার বিষয় মনে করবেন না।

আপনি আধুনিক গান শুনুন, আন্তর্জাতিক সংগীত শুনুন, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করুন—সবই করুন।

কিন্তু নিজের এলাকার একটি লোকগান অন্তত জানুন।

আপনার বাড়ির প্রবীণ মানুষদের কাছে গল্প শুনুন। তাঁদের জানা গান রেকর্ড করুন। তাঁদের ভাষা ও স্মৃতিকে সম্মান করুন।

কারণ আমরা যে পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে আছি, সেটি শুধু আমাদের তৈরি নয়। আমাদের আগে বহু প্রজন্ম এই সমাজ, ভাষা ও সংস্কৃতিকে তৈরি করেছে।

আমরা যদি সেই স্মৃতি হারিয়ে ফেলি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শুধু উন্নত প্রযুক্তি দিতে পারব—কিন্তু নিজেদের পরিচয়ের একটি অংশ দিতে পারব না।

লোকসংগীত তাই অতীতের বিষয় নয়।

লোকসংগীত হলো অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে যাওয়ার একটি সেতু।

সেতুটি ভেঙে ফেললে আমরা হয়তো দ্রুত এগোব, কিন্তু কোথা থেকে এসেছি তা ভুলে যাব।


সাক্ষাৎকারের শেষ কথা

লোকসংগীতের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শুধু গানকে কেন্দ্র করে ভাবলে চলবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভাষা, ইতিহাস, সামাজিক জীবন, মানুষের স্মৃতি এবং একটি অঞ্চলের নিজস্ব পরিচয়।

সময়ের সঙ্গে লোকসংগীতের পরিবেশন পদ্ধতি বদলাবে—এটাই স্বাভাবিক। নতুন বাদ্যযন্ত্র আসবে, নতুন শিল্পী আসবেন, নতুন শ্রোতা তৈরি হবে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের মধ্যেও মূল ঐতিহ্যকে সম্মান করা জরুরি।

প্রযুক্তি এখানে বড় ভূমিকা নিতে পারে। একটি মোবাইল ফোনের ক্যামেরা দিয়ে আজ এমন একজন শিল্পীর গান সংরক্ষণ করা সম্ভব, যাঁর কণ্ঠ হয়তো কয়েক দশক পরে আর শোনা যেত না।

প্রশ্ন তাই শুধু—লোকসংগীত হারিয়ে যাচ্ছে কি না।

প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমরা কি তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করছি?

কারণ একটি গান হারিয়ে যাওয়া মানে কখনও কখনও একটি মানুষের স্মৃতি হারিয়ে যাওয়া। আর একটি মানুষের স্মৃতি হারিয়ে যাওয়া মানে একটি সময়ের ইতিহাসের একটি ছোট অংশ হারিয়ে যাওয়া।

নোট: এই সাক্ষাৎকারটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। সাক্ষাৎকারদাতা “মাধবী রায়” এবং তাঁর বক্তব্য এই ফিচারের জন্য সৃজনশীলভাবে নির্মিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *