গল্প: যে ঘরে কেউ ছায়া ফেলত না।

শহর থেকে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে একটি পুরোনো অতিথিশালা। পাহাড়ের পাদদেশে নির্জন জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটিতে পর্যটক খুব কমই আসত।

সাংবাদিক রণিত সেখানে গিয়েছিল একটি পুরোনো নিখোঁজের ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন করতে।

অতিথিশালার মালিক তাকে বললেন, “এক রাত থাকতে পারবেন। তবে দোতলার ৭ নম্বর ঘরে যাবেন না।”

রণিত হেসে বলল, “কেন?”

“ও ঘরটা বহু বছর বন্ধ।”

“কেউ থাকে না?”

“কেউ থাকতে পারে না।”

কথাটা শুনে রণিতের কৌতূহল আরও বেড়ে গেল।

রাত এগারোটার দিকে নিজের ঘরে বসে সে নোট লিখছিল। হঠাৎ করিডোরে পায়ের শব্দ শুনতে পেল।

ধীরে ধীরে শব্দটা ৭ নম্বর ঘরের সামনে গিয়ে থামল।

তারপর দরজা খোলার শব্দ।

রণিত বাইরে বেরিয়ে এল।

৭ নম্বর ঘরের দরজা সত্যিই খোলা।

সে টর্চ জ্বালিয়ে ভেতরে ঢুকল।

ঘরে একটি খাট, কাঠের টেবিল এবং দেওয়ালে পুরোনো একটি বড় ছবি।

কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার—রণিত টর্চের আলো ফেললেও তার নিজের ছায়া দেখা যাচ্ছে না।

সে একবার হাত নাড়ল।

দেয়ালে কোনো ছায়া নেই।

হঠাৎ ছবিটির দিকে তাকিয়ে তার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

ছবিতে দাঁড়িয়ে থাকা পাঁচজন মানুষের মধ্যে একজনের মুখ কেটে ফেলা হয়েছে।

ছবির নিচে লেখা—

“১৯৮৯ সালের পাহাড়ি উদ্ধারদল।”

রণিত তার নোটবুক বের করল।

নিখোঁজের পুরোনো ঘটনার সঙ্গে এই বাড়ির কোনো সম্পর্ক আছে কি না, সে খুঁজতে শুরু করল।

ঠিক তখনই ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

সে ছুটে গিয়ে হাতল ঘোরাল।

দরজা খুলছে না।

পেছন থেকে খুব আস্তে একটি কণ্ঠস্বর শোনা গেল—

“আমার নামটা খুঁজে বের করুন।”

রণিত ঘুরে দাঁড়াল।

ঘরে কেউ নেই।

কিন্তু দেওয়ালের ছবিতে এখন সেই কাটা মুখটির জায়গায় একটি অস্পষ্ট মুখ দেখা যাচ্ছে।

রণিত ভয়ে পিছিয়ে গেল।

হঠাৎ তার মোবাইলের ক্যামেরা নিজে থেকেই চালু হয়ে গেল।

স্ক্রিনে দেখা গেল—ঘরের এক কোণে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।

রণিত চোখে কাউকে দেখছে না।

কিন্তু মোবাইলের স্ক্রিনে স্পষ্ট একজন মানুষ।

তার হাতে একটি লাল ফাইল।

লোকটি বলল,

“নিচের কাঠের মেঝে।”

তারপর স্ক্রিন কালো হয়ে গেল।

রণিত দরজা খুলতে সক্ষম হল।

সে দৌড়ে মালিকের কাছে গেল।

সব শুনে বৃদ্ধ মালিক দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।

অবশেষে বললেন,

“তুমি যা দেখেছ, সেটা বহু বছর আগে আমিও দেখেছিলাম।”

“লোকটা কে?”

“তার নাম ছিল অনিরুদ্ধ সেন। পাহাড়ি উদ্ধারদলের সদস্য।”

বৃদ্ধ জানালেন, ১৯৮৯ সালে পাহাড়ে ভূমিধসে কয়েকজন মানুষ আটকে পড়েছিল। উদ্ধারদল তাদের খুঁজতে গিয়েছিল। কিন্তু সরকারি রিপোর্টে লেখা হয়েছিল, উদ্ধারদলের একজন সদস্য নিখোঁজ হয়ে মারা যান।

তার নাম ছিল অনিরুদ্ধ।

কিন্তু গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করত, তার মৃত্যুর ঘটনা স্বাভাবিক ছিল না।

পরদিন সকালে রণিত ৭ নম্বর ঘরের কাঠের মেঝে পরীক্ষা করল।

একটি তক্তা আলগা ছিল।

তক্তা সরাতেই নিচে একটি লোহার বাক্স পাওয়া গেল।

ভেতরে লাল ফাইল।

ফাইলে ছিল পুরোনো নথি, ছবি এবং একটি হাতে লেখা বিবৃতি।

অনিরুদ্ধ লিখেছিল, উদ্ধার অভিযানের সময় পাহাড়ের ধসে আটকে থাকা মানুষদের মধ্যে কয়েকজনকে ইচ্ছাকৃতভাবে ফেলে রেখে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, কারণ এলাকাটি খালি করে সেখানে একটি বড় প্রকল্প করার পরিকল্পনা ছিল।

অনিরুদ্ধ সেই ঘটনার প্রতিবাদ করেছিলেন।

তারপরই তিনি নিখোঁজ হন।

রণিত সমস্ত নথি নিয়ে প্রশাসনের কাছে গেল।

পুরোনো মামলাটি নতুন করে তদন্তের আওতায় এল।

কয়েক সপ্তাহ পর অতিথিশালার সংস্কারের সময় বাড়ির পেছনের একটি গর্ত থেকে মানুষের কিছু হাড় উদ্ধার হয়।

পরীক্ষায় প্রমাণিত হল—সেগুলো অনিরুদ্ধের দেহাবশেষ।

বহু বছর পর তার পরিবার অন্তত সত্যিটা জানতে পারল।

রণিত শেষবার অতিথিশালায় গিয়েছিল এক মাস পরে।

৭ নম্বর ঘরের দরজা তখনও খোলা।

সে ঘরে ঢুকে দেওয়ালের ছবিটির দিকে তাকাল।

এবার ছবিতে পাঁচজন নয়, ছয়জন মানুষ।

অনিরুদ্ধও সেখানে দাঁড়িয়ে আছে।

রণিত অবাক হয়ে দেখল, ছবির নিচে নতুন করে একটি লাইন লেখা—

“এবার আমার ছায়া ফিরেছে।”

রণিত ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

সেদিন বিকেলে পাহাড়ের ওপর সূর্য ডুবছিল।

করিডোরের শেষ জানালা দিয়ে আলো এসে মেঝেতে পড়েছিল।

রণিত নিজের ছায়া দেখল।

তার পাশে আরও একটি ছায়া।

একজন মানুষের।

সে ফিরে তাকাল।

কেউ নেই।

কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর সেই ছায়াটিও ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।

রণিত বুঝল, সব আত্মা প্রতিশোধ নিতে ফিরে আসে না।

কেউ কেউ শুধু সত্যিটা প্রকাশ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকে।

সত্যি প্রকাশ পেলে, হয়তো তারাও অবশেষে নিজের ছায়া ফিরে পায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *