
রাত তখন ২টা ১৩ মিনিট।
অভিজিৎ কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করছিল। হঠাৎ তার ঘরের সমস্ত আলো নিভে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পর কম্পিউটারের পর্দা নিজে থেকেই জ্বলে উঠল।
সেখানে একটি মাত্র বাক্য—
“আগামীকাল সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে পুরোনো ঘড়িঘরের সামনে দাঁড়িও।”
অভিজিৎ ভেবেছিল কেউ মজা করছে।
সে কম্পিউটার বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ল।
পরদিন সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে কৌতূহলবশত সে সত্যিই পুরোনো ঘড়িঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
৯টা ৪০ মিনিটে রাস্তার ওপাশ থেকে একজন লোক এগিয়ে এল।
লোকটির মুখ দেখে অভিজিৎ স্তব্ধ।
কারণ লোকটি দেখতে হুবহু তার মতো।
শুধু বয়স প্রায় পঁয়তাল্লিশ।
“আপনি কে?”
লোকটি বলল, “আমি তুমি।”
অভিজিৎ পিছিয়ে গেল।
“অসম্ভব।”
“আমি তেইশ বছর পরের তুমি।”
“প্রমাণ?”
লোকটি তার শৈশবের একটি ঘটনা বলল, যা পৃথিবীতে আর কেউ জানত না।
অভিজিৎ বিশ্বাস করতে বাধ্য হল।
লোকটি বলল,
“আমার কাছে সময় খুব কম।”
“কেন?”
“কারণ আগামীকাল রাতে শহরের পুরোনো গবেষণাগারে বিস্ফোরণ ঘটবে।”
অভিজিৎ চমকে উঠল।
“কীভাবে?”
“একটি পরীক্ষামূলক শক্তি-যন্ত্র নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।”
“তাহলে পুলিশকে বলুন।”
“বলেছি। কেউ বিশ্বাস করেনি।”
“তাহলে আমাকে কেন?”
ভবিষ্যতের অভিজিৎ বলল,
“কারণ ঘটনাটা থামাতে পারবে শুধু তুমি।”
সে একটি ছোট যন্ত্র বের করল।
“এটা কী?”
“সময়ের সংকেত ধরার যন্ত্র। কিন্তু এটা একবারের বেশি ব্যবহার করা যাবে না।”
অভিজিৎ যন্ত্রটি নিল।
“আমাকে কী করতে হবে?”
“আজ রাত বারোটায় গবেষণাগারের মূল নিয়ন্ত্রণ কক্ষে যাবে। সেখানে লাল রঙের একটি সুইচ আছে। সেটি বন্ধ করবে।”
“আর তুমি?”
ভবিষ্যতের মানুষটি মৃদু হাসল।
“আমি তখন আর থাকব না।”
“মানে?”
“এই সাক্ষাৎটাই ভবিষ্যৎ বদলানোর জন্য যথেষ্ট।”
কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লোকটি যেন বাতাসের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
অভিজিৎ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
সেই রাতে সে গবেষণাগারে ঢুকল।
ভেতরে যন্ত্রের গুঞ্জন।
চারদিকে অন্ধকার।
হঠাৎ অ্যালার্ম বেজে উঠল।
স্ক্রিনে সতর্কবার্তা—
“শক্তির মাত্রা বিপজ্জনক।”
অভিজিৎ নিয়ন্ত্রণ কক্ষে দৌড়ে গেল।
সেখানে সত্যিই একটি লাল সুইচ।
সে হাত বাড়াতেই পিছন থেকে একজন বিজ্ঞানী চিৎকার করে বললেন,
“থামুন! সেটা বন্ধ করলে পুরো সিস্টেম বিস্ফোরিত হতে পারে!”
অভিজিৎ থেমে গেল।
তার মনে পড়ল ভবিষ্যতের নিজের কথা।
“লাল সুইচ বন্ধ করলেই সব শেষ হবে।”
বিজ্ঞানী বললেন, “আপনি কে?”
অভিজিৎ উত্তর দিল না।
ঠিক তখনই যন্ত্রের শক্তির মাত্রা আরও বেড়ে গেল।
সময় নেই।
সে সুইচটি বন্ধ করে দিল।
এক মুহূর্তের জন্য পুরো ঘর কেঁপে উঠল।
তারপর—
নিস্তব্ধতা।
সব যন্ত্র বন্ধ।
বিস্ফোরণ ঘটল না।
পরদিন সকালে অভিজিৎ আবার সেই ঘড়িঘরের সামনে দাঁড়াল।
৯টা ৪০ মিনিট।
সে অপেক্ষা করল।
কেউ এল না।
সে বুঝল, ভবিষ্যৎ বদলে গেছে।
তারপর তার মোবাইলে একটি অজানা নম্বর থেকে বার্তা এল।
মাত্র একটি লাইন—
“ধন্যবাদ। এবার তোমার ভবিষ্যৎটা নিজের মতো করে তৈরি করো।”
অভিজিৎ অনেকক্ষণ ফোনটির দিকে তাকিয়ে রইল।
কয়েক মাস পর গবেষণাগারে সেই ঘটনার ওপর তদন্ত শুরু হল। জানা গেল, অভিজিৎ সময়মতো সিস্টেম বন্ধ না করলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।
কেউ জানল না সে কীভাবে বিপদটি আগে থেকে বুঝেছিল।
আর অভিজিৎ কাউকে বললও না।
তবে মাঝে মাঝে সে রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবত—
সত্যিই কি ভবিষ্যৎ থেকে কেউ এসেছিল?
নাকি তার নিজের বিবেকই তাকে সতর্ক করেছিল?
উত্তর সে কোনোদিন পায়নি।
কিন্তু একটি বিষয় সে বুঝেছিল—
ভবিষ্যৎ কোথাও পাথরে খোদাই করা থাকে না।
মানুষের একটি সিদ্ধান্ত, একটি সাহসী পদক্ষেপ, কখনও কখনও বদলে দিতে পারে পুরো আগামীকাল।












Leave a Reply