
চিকেনের ঝোল, কষা কিংবা গ্রেভির পাশাপাশি বাঙালি ও ভারতীয় রান্নায় চিকেন ভুনা একটি পরিচিত এবং জনপ্রিয় পদ। এই রান্নার বিশেষত্ব হলো এতে বেশি জল ব্যবহার করা হয় না। পেঁয়াজ, টমেটো, আদা-রসুন এবং বিভিন্ন মশলা ধীরে ধীরে কষিয়ে তেলের সঙ্গে মিশিয়ে নেওয়া হয়। তারপর সেই ঘন মশলার মধ্যে চিকেন রান্না করা হয়।
ফলে তৈরি হয় গাঢ় রঙের, মশলাদার এবং সুগন্ধি একটি পদ। রুটি, পরোটা, নান কিংবা সাদা ভাত—সবকিছুর সঙ্গেই এটি মানিয়ে যায়।
রান্নার সময়
প্রস্তুতি: ১৫ মিনিট
মেরিনেট: ৩০ মিনিট
রান্না: ৪০–৪৫ মিনিট
পরিবেশন: ৪ জন
উপকরণ
- চিকেন – ৮০০ গ্রাম
- পেঁয়াজ – ৪টি বড়, পাতলা করে কাটা
- টমেটো – ২টি, কুচি
- আদা বাটা – ১ টেবিল চামচ
- রসুন বাটা – ১ টেবিল চামচ
- কাঁচালঙ্কা – ৩টি
- টক দই – ½ কাপ
- লঙ্কাগুঁড়ো – ১ চা চামচ
- কাশ্মীরি লঙ্কাগুঁড়ো – ১ চা চামচ
- হলুদ – ½ চা চামচ
- ধনেগুঁড়ো – ১½ চা চামচ
- জিরাগুঁড়ো – ১ চা চামচ
- গোলমরিচগুঁড়ো – ½ চা চামচ
- গরম মশলা – ½ চা চামচ
- তেজপাতা – ১টি
- দারুচিনি – ১ টুকরো
- এলাচ – ৩টি
- লবঙ্গ – ৩টি
- শুকনো লঙ্কা – ২টি
- সরিষার তেল – ৪ টেবিল চামচ
- ঘি – ১ চা চামচ
- লবণ – স্বাদমতো
- চিনি – ½ চা চামচ
- জল – প্রয়োজনমতো
- ধনেপাতা – সাজানোর জন্য
চিকেন মেরিনেট
একটি বড় পাত্রে চিকেন নিয়ে তাতে দই, অল্প লবণ, হলুদ, কাশ্মীরি লঙ্কাগুঁড়ো এবং সামান্য আদা-রসুন বাটা দিন।
সবকিছু ভালোভাবে মাখিয়ে ৩০ মিনিট ঢেকে রাখুন। এতে চিকেন নরম হবে এবং রান্নার সময় মশলার সঙ্গে ভালোভাবে মিশবে।
ভুনার আসল প্রস্তুতি
একটি ভারী কড়াই গরম করে সরিষার তেল দিন। তেল ভালোভাবে গরম হলে আঁচ কিছুটা কমিয়ে তেজপাতা, দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ ও শুকনো লঙ্কা দিয়ে দিন।
মশলা থেকে গন্ধ বের হলে পাতলা করে কাটা পেঁয়াজ যোগ করুন।
এবার ধৈর্য ধরে পেঁয়াজ ভাজতে হবে। মাঝারি আঁচে পেঁয়াজ নরম হয়ে ধীরে ধীরে বাদামি রং ধারণ করবে। পেঁয়াজ পুড়িয়ে ফেলবেন না; ভুনার স্বাদের জন্য সুন্দরভাবে ক্যারামেলাইজ হওয়া জরুরি।
পেঁয়াজ সোনালি-বাদামি হলে আদা বাটা, রসুন বাটা ও কাঁচালঙ্কা দিয়ে ২–৩ মিনিট কষিয়ে নিন।
মশলা কষানোর পদ্ধতি
এবার কুচি করা টমেটো দিয়ে দিন। টমেটো নরম হয়ে মিশ্রণটি ঘন হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন।
এরপর ধনেগুঁড়ো, জিরাগুঁড়ো, লঙ্কাগুঁড়ো, কাশ্মীরি লঙ্কাগুঁড়ো এবং গোলমরিচগুঁড়ো যোগ করুন।
মশলা শুকিয়ে গেলে অল্প অল্প করে জল দিয়ে কষাতে থাকুন। একসঙ্গে বেশি জল দেবেন না।
মশলা যখন ঘন হয়ে তেল ছাড়তে শুরু করবে, তখন বুঝতে হবে ভুনার মূল ধাপটি ঠিকভাবে হয়েছে।
চিকেন যোগ করুন
এবার মেরিনেট করা চিকেন কড়াইয়ে দিয়ে দিন।
প্রথমে মাঝারি থেকে বেশি আঁচে ৮–১০ মিনিট চিকেন কষিয়ে নিন। প্রতিটি টুকরোর গায়ে মশলা ভালোভাবে লেগে যাওয়া পর্যন্ত নাড়তে থাকুন।
চিকেন থেকে জল বের হলে সেটি মশলার সঙ্গে মিশে যাবে। ঢাকনা দিয়ে কম আঁচে আরও ১০ মিনিট রান্না করুন।
মাঝে ঢাকনা খুলে চিকেন নেড়ে দিন।
চিকেন অর্ধেকের বেশি সেদ্ধ হয়ে গেলে প্রয়োজনমতো অল্প গরম জল দিন। মনে রাখবেন, চিকেন ভুনায় ঝোল বেশি থাকবে না। তাই সামান্য জলই যথেষ্ট।
ঢেকে আরও ১০–১২ মিনিট রান্না করুন।
শেষ ধাপ
চিকেন পুরোপুরি সেদ্ধ হয়ে গেলে গরম মশলা ও অল্প ঘি দিয়ে দিন। সঙ্গে ½ চা চামচ চিনি যোগ করতে পারেন। এতে টমেটো ও মশলার স্বাদে সুন্দর ভারসাম্য তৈরি হবে।
সবকিছু ভালোভাবে মিশিয়ে আরও ২–৩ মিনিট কম আঁচে রান্না করুন।
গ্রেভি যখন ঘন হয়ে চিকেনের গায়ে মশলা সুন্দরভাবে লেগে থাকবে এবং কড়াইয়ের চারপাশে তেল দেখা যাবে, তখন চুলা বন্ধ করে দিন।
উপর থেকে কুচি করা ধনেপাতা ছড়িয়ে ৫ মিনিট ঢেকে রাখুন।
কীসের সঙ্গে পরিবেশন করবেন?
চিকেন ভুনা সাধারণত রুটি, পরোটা, নান বা লাচ্ছা পরোটার সঙ্গে অসাধারণ লাগে। তবে গরম সাদা ভাত কিংবা জিরা রাইসের সঙ্গেও পরিবেশন করা যায়।
বিশেষ করে ঘন মশলার সঙ্গে ভাত মিশিয়ে খেলে এই রান্নার স্বাদ আরও ভালোভাবে উপভোগ করা যায়।
রান্নার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ টিপস
পেঁয়াজের দিকে নজর দিন: পেঁয়াজ পুড়ে গেলে পুরো রান্নায় তেতো স্বাদ আসবে।
মশলা কষাতে সময় দিন: ভুনার আসল স্বাদ তৈরি হয় ধীরে ধীরে মশলা কষানোর মাধ্যমে।
জল কম ব্যবহার করুন: এটি পাতলা ঝোলের রান্না নয়। ঘন মশলাই এর প্রধান বৈশিষ্ট্য।
চিকেন বেশি নাড়াচাড়া করবেন না: অতিরিক্ত নাড়লে টুকরো ভেঙে যেতে পারে।
সরিষার তেল ভালোভাবে গরম করুন: এতে তেলের কাঁচা গন্ধ চলে যায় এবং রান্নায় সুন্দর সুবাস আসে।
স্বাস্থ্যকরভাবে বানাতে চাইলে
তেল ও ঘির পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে রান্না করা যায়। চামড়া ছাড়া চিকেন ব্যবহার করলে খাবারে অতিরিক্ত চর্বির পরিমাণও কমানো সম্ভব।
তবে তেল একেবারে বাদ দিলে ভুনার স্বাভাবিক স্বাদ ও মশলার টেক্সচার কিছুটা বদলে যেতে পারে। তাই পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে ব্যবহার করাই ভালো।
শেষকথা
চিকেন ভুনার বিশেষত্ব কোনো জটিল উপকরণে নয়, বরং রান্নার পদ্ধতিতে। পেঁয়াজ ধীরে ভাজা, মশলা ভালোভাবে কষানো এবং অল্প আঁচে চিকেন রান্না করা—এই তিনটি ধাপ ঠিকভাবে করতে পারলেই ঘরেই তৈরি করা যায় গাঢ় রঙের, সুগন্ধি ও মশলাদার চিকেন ভুনা।
সাধারণ দুপুরের ভাত থেকে শুরু করে ছুটির দিনের বিশেষ খাবার—সব ক্ষেত্রেই এই পদটি হতে পারে পরিবারের পছন্দের একটি মেনু।












Leave a Reply