গল্প : ডাকপিয়নের শেষ চিঠি।

ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি।

ছোট্ট শহরের শেষ প্রান্তে একটি পুরোনো সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন হরিপদ ডাকপিয়ন

বয়স তাঁর প্রায় বাষট্টি।

চুলে পাক ধরেছে। হাঁটতে একটু কষ্ট হয়। তবু প্রতিদিন সকাল হলেই তিনি ডাকঘরে হাজির হন।

গত পঁয়ত্রিশ বছর ধরে তাঁর কাজ—চিঠি পৌঁছে দেওয়া।

এখন অবশ্য চিঠি খুব কম আসে।

মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, ভিডিও কল—সবকিছু মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে।

কিন্তু হরিপদবাবু এখনও বিশ্বাস করেন,

একটি চিঠির মূল্য কখনও শুধু কাগজের দামে মাপা যায় না।

কারণ একটি চিঠির মধ্যে কখনও কখনও একজন মানুষের অপেক্ষা, ভালোবাসা কিংবা আশ্রয় লুকিয়ে থাকে।


সেদিন ডাকঘরে মাত্র পাঁচটি চিঠি এসেছিল।

হরিপদবাবু চিঠিগুলো হাতে নিয়ে ঠিকানাগুলো দেখছিলেন।

একটি চিঠির ঠিকানা পড়ে তিনি থমকে গেলেন।

“সাবিত্রী দেবী, শালবন পাড়া, পুরোনো বটগাছের পাশের বাড়ি।”

হরিপদবাবু ঠিকানাটা চিনতেন।

সাবিত্রী দেবী একা থাকেন।

বয়স প্রায় আশি।

তাঁর একমাত্র ছেলে বহু বছর আগে কাজের জন্য শহরে চলে গিয়েছিল।

তারপর আর ফেরেনি।

মাঝে মাঝে ফোন করত।

কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ফোনও কমে গেছে।

হরিপদবাবু বহুবার সাবিত্রী দেবীকে বলতে শুনেছেন,

—“একদিন ও আসবেই।”

হরিপদবাবু কখনও বলেননি,

“আসবে তো?”

তিনি শুধু বলতেন,

—“চিঠি এলে আমি নিজে দিয়ে যাব।”


সেদিন তিনি সাইকেলে চেপে সাবিত্রী দেবীর বাড়ির দিকে গেলেন।

বটগাছের নিচে পৌঁছে দেখলেন, বৃদ্ধা বারান্দায় বসে আছেন।

হরিপদবাবুকে দেখেই উঠে দাঁড়ালেন।

—“চিঠি?”

হরিপদবাবু হাসলেন।

—“হ্যাঁ।”

চিঠিটা হাতে দিতেই বৃদ্ধার হাত কেঁপে উঠল।

খামটার ওপর ছেলের নাম লেখা।

তিনি চিঠিটা বুকে চেপে ধরলেন।

—“আমার ছেলে লিখেছে?”

—“হ্যাঁ।”

বৃদ্ধার চোখে জল এসে গেল।

—“পড়ে শোনাবি?”

হরিপদবাবু চুপচাপ বসে পড়লেন।

চিঠিটা খুললেন।

কয়েক লাইন পড়েই তাঁর গলা থেমে গেল।

সেখানে লেখা—

“মা, অনেকদিন তোমার কাছে যেতে পারিনি। জানি, তুমি অপেক্ষা করছ। এবার আমি আসছি…”

সাবিত্রী দেবী চোখ বন্ধ করলেন।

—“বলেছিলাম না? ও আসবে।”

হরিপদবাবু মাথা নাড়লেন।

—“হ্যাঁ। আপনি ঠিকই বলেছিলেন।”


কয়েক সপ্তাহ পর ছেলেটি সত্যিই এল।

মা-ছেলের দেখা হওয়ার মুহূর্তটি হরিপদবাবু নিজের চোখে দেখলেন।

ছেলেটি মায়ের পায়ে হাত রাখতেই সাবিত্রী দেবী তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন।

হরিপদবাবু দূর থেকে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

ছেলেটি এসে বলল,

—“কাকা, আপনি না থাকলে হয়তো মায়ের সঙ্গে আমার যোগাযোগই থাকত না।”

হরিপদবাবু হেসে বললেন,

—“আমি শুধু চিঠি পৌঁছে দিয়েছি।”

ছেলেটি বলল,

—“না কাকা। আপনি অপেক্ষাটাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।”

কথাটা হরিপদবাবুর মনে গেঁথে গেল।


কয়েক মাস পর হরিপদবাবুর অবসর নেওয়ার সময় হয়ে এল।

ডাকঘরের সবাই তাঁকে বিদায় সংবর্ধনা দিল।

সহকর্মী বললেন,

—“আপনি এত বছর ধরে কত চিঠি পৌঁছে দিয়েছেন, তার হিসেব নেই।”

হরিপদবাবু হেসে বললেন,

—“চিঠির হিসেব রাখিনি। মানুষের মুখগুলো মনে রেখেছি।”

সবাই হাততালি দিল।

পরদিন ছিল তাঁর শেষ কর্মদিবস।

সকালে তিনি ডাকঘরে এসে নিজের পুরোনো ব্যাগটা টেবিলে রাখলেন।

ডাকঘরের কর্মচারী বলল,

—“আজ আর বেরোতে হবে না।”

হরিপদবাবু বললেন,

—“একটা কাজ বাকি আছে।”

—“কী?”

তিনি ব্যাগ থেকে একটি চিঠি বের করলেন।

ঠিকানা—

“অনির্বাণ, শালবন পাড়া।”

অনির্বাণ?

নামটা তাঁর পরিচিত মনে হল।

কিন্তু ঠিকানাটা অসম্পূর্ণ।

কোনও বাড়ির নম্বর নেই।

শুধু পাড়া।

তিনি বললেন,

—“চিঠিটা পৌঁছে দিয়ে আসি।”


সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন হরিপদবাবু।

অনেক বাড়িতে জিজ্ঞেস করলেন।

কেউ অনির্বাণকে চেনে না।

শেষ পর্যন্ত এক বৃদ্ধ বললেন,

—“অনির্বাণ? ও তো বছর দশেক আগে শহরে চলে গেছে।”

হরিপদবাবু অবাক হলেন।

—“ঠিকানা?”

—“জানি না।”

চিঠিটা ফেরত নিয়ে তিনি ডাকঘরে ফিরে আসতে পারতেন।

কিন্তু তাঁর মন বলল,

শেষ চিঠিটা এভাবে ফেরত দেওয়া যায় না।

তিনি শহরের পুরোনো পরিচিতদের কাছে খোঁজ নিতে শুরু করলেন।

কেউ বলল অনির্বাণ রেলওয়েতে কাজ করে।

কেউ বলল অন্য শহরে গেছে।

শেষ পর্যন্ত একজন পুরোনো স্কুলশিক্ষক জানালেন,

—“অনির্বাণের বাড়িতে একসময় একটি মেয়ে থাকত। নাম ছিল মেঘলা। হয়তো তার কাছ থেকে কিছু জানা যেতে পারে।”

হরিপদবাবু মেঘলাকে খুঁজে বের করলেন।

মেঘলা বলল,

—“অনির্বাণ আমার দাদা। কিন্তু বহু বছর ধরে তার সঙ্গে যোগাযোগ নেই।”

—“তোমার কাছে তার কোনো ঠিকানা আছে?”

মেঘলা পুরোনো একটি খাতা বের করল।

পাতা উল্টাতে উল্টাতে একটি ঠিকানা পেল।

একটি দূরের শহরের।


হরিপদবাবু অবসর নেওয়ার পরও সেই চিঠিটা তাঁর কাছে রয়ে গেল।

কিন্তু এবার তিনি বুঝলেন, নিজে চিঠি নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

তিনি ডাকঘরে গিয়ে নতুন ঠিকানায় চিঠিটি পাঠিয়ে দিলেন।

তারপর বাড়ি ফিরে এলেন।

ভাবলেন, এখানেই শেষ।

কিন্তু এক সপ্তাহ পর তাঁর বাড়িতে একটি চিঠি এল।

প্রেরকের নাম—

অনির্বাণ।

চিঠিতে লেখা ছিল—

“হরিপদ কাকা,

আপনি আমাকে মনে রাখবেন, ভাবিনি।

এই চিঠিটি আমার বাবার লেখা। তিনি মারা যাওয়ার আগে আমাকে একটি কথা বলেছিলেন—‘তোর সঙ্গে আমার যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে, তার জন্য আমি দুঃখিত।’

কিন্তু সেই চিঠি কখনও আমার হাতে পৌঁছায়নি।

আপনি না থাকলে আমি হয়তো কোনোদিন জানতে পারতাম না।

আমার বাবা মারা যাওয়ার আগে আমাকে ক্ষমা করতে চেয়েছিলেন।

আজ এত বছর পর তাঁর শেষ কথাটা পেলাম।

আপনাকে ধন্যবাদ।”

হরিপদবাবু চিঠিটা পড়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন।

তারপর চোখ মুছলেন।


পরদিন বিকেলে তাঁর দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হল।

দরজা খুলে তিনি অবাক।

সামনে দাঁড়িয়ে অনির্বাণ।

হাতে একটি ছোট প্যাকেট।

—“কাকা।”

হরিপদবাবু কিছু বলতে পারলেন না।

অনির্বাণ তাঁর পায়ে হাত রাখল।

—“আপনি শুধু চিঠি দেননি। আমার বাবার শেষ কথাটাও আমার কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।”

হরিপদবাবু বললেন,

—“এটা আমার কাজ ছিল।”

অনির্বাণ মাথা নাড়ল।

—“না কাকা। কাজ শেষ হয়ে যায় অবসরের সঙ্গে। কিন্তু আপনি কাজের বাইরে গিয়েও মানুষকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।”

হরিপদবাবুর চোখ আবার ভিজে উঠল।


কয়েকদিন পর হরিপদবাবু তাঁর পুরোনো ডাকের ব্যাগটা খুললেন।

ভেতরে ছিল বহু বছরের কিছু স্মৃতি।

পুরোনো পোস্টকার্ড।

ছেঁড়া খাম।

কিছু নাম।

কিছু ঠিকানা।

আর কিছু মানুষের মুখ।

তিনি সবকিছু একটা কাঠের বাক্সে রেখে দিলেন।

নাতি জিজ্ঞেস করল,

—“দাদু, এগুলো কী?”

হরিপদবাবু বললেন,

—“চিঠি।”

—“এগুলো দিয়ে কী হয়?”

হরিপদবাবু মৃদু হেসে বললেন,

—“মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, দূরত্ব যতই হোক, কারও কাছে পৌঁছনোর একটা পথ সবসময় থাকে।”

নাতি আবার জিজ্ঞেস করল,

—“এখন তো সবাই ফোন করে।”

হরিপদবাবু জানালার বাইরে তাকালেন।

—“হ্যাঁ। কিন্তু ফোনের শব্দ থেমে যায়। কিছু চিঠি থেকে যায়।”

বাইরে সন্ধ্যা নেমে এসেছে।

দূরে পুরোনো ডাকঘরের লাল বাক্সটি দেখা যাচ্ছে।

হরিপদবাবু জানেন, তাঁর ডাকপিয়নের জীবন শেষ হয়েছে।

কিন্তু তিনি এটাও জানেন—

মানুষের কাছে মানুষের খবর পৌঁছে দেওয়ার কাজ কখনও শেষ হয় না।

কারণ পৃথিবীতে এখনও এমন অনেক কথা আছে,

যেগুলো ফোনে বলা যায় না।

শুধু একটি চিঠির অপেক্ষায় থাকতে হয়।

আর কখনও কখনও—

সেই চিঠি পৌঁছে দিতে একজন হরিপদ ডাকপিয়নের দরকার হয়।

সমাপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *