মানব জীবনে “সহিষ্ণুতা” আনয়নে শিক্ষা ও আধ্যাত্মিকতার প্রভাব – একটি সমীক্ষা ::: দিলীপ রায় (৯৪৩৩৪৬২৮৫৪)।।

“সহিষ্ণুতা” মানুষের অন্তরের একটি মূল্যবান সম্পদ । এটি এমন একটি মানসিক ও নৈতিক শক্তি, যার মাধ্যমে ব্যক্তি অন্যের মতামত, বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও জীবনধারাকে সম্মান করতে শেখে । পরিবেশ, পারিবারিক মূল্যবোধ, শিক্ষা এবং আধ্যাত্মিক চর্চার প্রভাবে সহিষ্ণুতা বিকশিত হয় এবং ক্রমে মানুষের চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয় ।
সহিষ্ণুতাʼর অভাব মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে । যখন মানুষ অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে, তখন তার মন অস্থির ও বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। বিক্ষিপ্ত মন ধীরে ধীরে বিচারশক্তিকে ক্রমশ দুর্বল করে দেয় । ফলে ভাল-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় এবং কর্তব্য-অকর্তব্যের বোধ ক্ষীণ হতে থাকে । একসময় ব্যক্তি হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে এমন কাজও করতে পারে, যা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর । এই কারণেই সহিষ্ণুতা মানবজীবনের একটি অপরিহার্য গুণ । বলা চলে মূল্যবান সম্পদ ।
বর্তমান বিশ্বে আমরা জাতি, ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতিগত বিভেদের নানা উদাহরণ দেখতে পাই । সামান্য মতভেদ থেকেও অনেক সময় বিরোধ ও সংঘাতের সৃষ্টি হয় । আমরা জানি সহিষ্ণুতার বিপরীত হলো অসহিষ্ণুতা, যা মানুষকে বিভক্ত করে । অপরদিকে সহিষ্ণুতা মানুষকে একত্রিত করে এবং সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করে । তাই সহিষ্ণুতা বিকাশের জন্য সুশিক্ষার বিকল্প নেই ।
( ২ )
প্রকৃত শিক্ষা কেবল তথ্য ও জ্ঞান প্রদান করে না । এটি মানুষের চরিত্র গঠনে সাহায্য করে, নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করে এবং সহমর্মিতা, সহানুভূতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের শিক্ষা দেয় । একজন শিক্ষিত ব্যক্তি সাধারণত ভিন্ন মত বা বিশ্বাসকে গ্রহণ করার মানসিকতা অর্জন করেন । সুতরাং সহিষ্ণু সমাজ গঠনে শিক্ষার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । বলা চলে একটা অপরিহার্য মাধ্যম ।
তবে শিক্ষার পাশাপাশি আধ্যাত্মিকতার গুরুত্বও অনস্বীকার্য । আধ্যাত্মিকতা মানুষের অন্তর্জগতকে শুদ্ধ করে এবং আত্মজ্ঞান লাভের পথ দেখায় । এর মাধ্যমে মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করতে শেখে এবং অন্যের প্রতি সহমর্মী ও শ্রদ্ধাশীল হয় । আধ্যাত্মিক চর্চা অহংকার, ক্রোধ, হিংসা ও বিদ্বেষ কমিয়ে প্রেম, দয়া, ক্ষমাশীলতা ও মানবিকতা বৃদ্ধি করে । ফলে ব্যক্তি সহজেই ভিন্নতাকে মেনে নিতে পারে ।
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব আধ্যাত্মিক জীবনের বিকাশে নির্জনবাস ও সাধুসঙ্গের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন । তাঁর মতে, “মনে-বনে-কোণে” ঈশ্বরচিন্তা করা উচিত । এখানে ‘বন’ বলতে নির্জন পরিবেশ, ‘কোণে’ বলতে গৃহের শান্ত স্থান এবং ‘মনে’ বলতে অন্তরের একাগ্রতাকে বোঝানো হয়েছে । তিনি মনে করতেন, মানুষের মনই বন্ধন ও মুক্তির প্রধান কারণ । সংস্কৃত শাস্ত্রে বলা হয়েছে— “মন এব মনুষ্যাণাং কারণং বন্ধমোক্ষয়োঃ” — অর্থাৎ মনই মানুষের বন্ধন ও মুক্তির কারণ । বিষয়াসক্ত মন মানুষকে বন্ধনের দিকে নিয়ে যায়, আর সংযত ও শুদ্ধ মন মুক্তির পথে পরিচালিত করে ।
বর্তমান দ্রুতগতির জীবনে আধ্যাত্মিক চর্চা অনেকের কাছে কঠিন বলে মনে হতে পারে । কিন্তু ব্যস্ততার মধ্যেও আত্মসমালোচনা, প্রার্থনা, ধ্যান, সৎচিন্তা এবং নৈতিক জীবনযাপনের মাধ্যমে আধ্যাত্মিকতার বিকাশ সম্ভব । এই চর্চা মানুষকে মানসিক স্থিতি প্রদান করে এবং সহিষ্ণুতার ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে ।
( ৩ )

পরিশেষে বলা যায়, মানবজীবনে সহিষ্ণুতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শিক্ষা ও আধ্যাত্মিকতা পরস্পরের পরিপূরক । শিক্ষা মানুষকে জ্ঞান ও যুক্তিবোধ প্রদান করে, আর আধ্যাত্মিকতা তাকে মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করে । শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য মানুষকে মানুষ করে তোলা । আর আধ্যাত্মিকতা সেই মানবিকতার গভীরতর বিকাশ ঘটায় । তাই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য শিক্ষা ও আধ্যাত্মিকতার সমন্বিত বিকাশ অপরিহার্য । (তথ্যসূত্রঃ সংগৃহীত ও উদ্বোধন (আশ্বিন ১৪২৩) ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *