ডিমের নারকেল-পোস্ত ভাপা।

Oplus_131072

ভূমিকা

বাঙালি রান্নায় ভাপা পদ্ধতির একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কম তেলে মশলার সঙ্গে খাবারকে ধীরে ধীরে ভাপে রান্না করলে উপকরণের স্বাভাবিক স্বাদ ও সুগন্ধ অনেকটাই বজায় থাকে। মাছের ভাপা বহুল পরিচিত হলেও ডিম দিয়ে তৈরি ভাপা পদও বেশ আকর্ষণীয়।

আজকের রেসিপি ডিমের নারকেল-পোস্ত ভাপা। এখানে সেদ্ধ ডিমের সঙ্গে পোস্ত, নারকেল, সর্ষে, কাঁচা লঙ্কা এবং সামান্য সর্ষের তেল ব্যবহার করা হবে। সমস্ত উপকরণ একসঙ্গে মিশিয়ে ভাপে রান্না করার ফলে ডিমের সঙ্গে মশলার স্বাদ ভালোভাবে মিশে যায়।

গরম ভাতের সঙ্গে দুপুরের খাবারে এই পদ পরিবেশন করা যায়। রান্নাটিও খুব বেশি ঝামেলার নয়।

প্রস্তুতির সময়

  • প্রস্তুতি: ১৫ মিনিট
  • রান্না: ২০ মিনিট
  • মোট সময়: প্রায় ৩৫ মিনিট
  • পরিবেশন: ৩–৪ জন

উপকরণ

প্রধান উপকরণ

  • ডিম — ৬টি
  • পোস্ত — ৩ টেবিল চামচ
  • নারকেল কোরানো — ৪ টেবিল চামচ
  • সর্ষে — ১ টেবিল চামচ
  • কাঁচা লঙ্কা — ৪–৫টি
  • সর্ষের তেল — ৩ টেবিল চামচ
  • হলুদ গুঁড়ো — ¼ চা চামচ
  • নুন — স্বাদমতো
  • চিনি — ½ চা চামচ
  • জল — প্রয়োজনমতো

সাজানোর জন্য

  • কাঁচা লঙ্কা — ২টি
  • সামান্য কোরানো নারকেল
  • ১ চা চামচ সর্ষের তেল

ডিম সেদ্ধ করা

প্রথমে একটি পাত্রে ডিম নিয়ে পর্যাপ্ত জল দিন।

মাঝারি আঁচে ডিম ভালোভাবে সেদ্ধ করে নিন। সেদ্ধ হয়ে গেলে গরম জল ফেলে ঠান্ডা জল দিয়ে ডিম ঠান্ডা করে নিন।

এরপর ডিমের খোসা ছাড়িয়ে প্রতিটি ডিমকে অর্ধেক করে কেটে রাখুন।

চাইলে ডিম পুরো রেখেও রান্না করতে পারেন। তবে অর্ধেক করে রাখলে মশলার স্বাদ ডিমের মধ্যে ভালোভাবে ঢোকে।

পোস্ত বাটা তৈরি

পোস্ত পরিষ্কার করে কিছুক্ষণ জলে ভিজিয়ে রাখুন।

এরপর পোস্ত, সর্ষে এবং ২টি কাঁচা লঙ্কা একসঙ্গে বেটে নিন।

মিহি করে বাটলে ভাপা রান্নার মশলা মসৃণ হবে।

সর্ষে বেশি তেতো হলে সর্ষের পরিমাণ সামান্য কমিয়ে দিতে পারেন।

নারকেলের মিশ্রণ তৈরি

এবার একটি বাটিতে কোরানো নারকেল নিন।

এর সঙ্গে তৈরি করা পোস্ত-সর্ষের বাটা মিশিয়ে দিন।

এরপর নুন, হলুদ, সামান্য চিনি এবং সর্ষের তেল দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নিন।

প্রয়োজন হলে ২–৩ টেবিল চামচ জল দিয়ে মশলাটি একটু পাতলা করে নিন।

মিশ্রণটি খুব বেশি পাতলা করবেন না। মশলা যেন ডিমের গায়ে ভালোভাবে লেগে থাকে।

ডিম মেশানো

এবার অর্ধেক করে রাখা সেদ্ধ ডিমগুলো মশলার মধ্যে দিন।

হাত বা চামচ দিয়ে খুব সাবধানে মশলা ডিমের গায়ে মাখিয়ে দিন।

ডিম যেন ভেঙে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখবেন।

প্রতিটি ডিমের ওপর সামান্য কাঁচা লঙ্কা দিয়ে দিন।

ভাপে রান্না করার প্রস্তুতি

একটি স্টিলের টিফিন বক্স বা ঢাকনাযুক্ত তাপসহনীয় পাত্র নিন।

পাত্রটির ভেতরে সামান্য সর্ষের তেল মাখিয়ে নিন।

এবার ডিম ও মশলার মিশ্রণটি পাত্রে সাজিয়ে দিন।

উপর থেকে আরও ১ টেবিল চামচ সর্ষের তেল ছড়িয়ে দিন।

চাইলে কয়েকটি কাঁচা লঙ্কা এবং সামান্য কোরানো নারকেলও ছড়িয়ে দিতে পারেন।

পাত্রটি ভালোভাবে ঢেকে দিন।

ভাপে রান্না

একটি বড় হাঁড়ি বা কড়াইয়ে জল দিন।

তার মধ্যে একটি স্ট্যান্ড বা ছোট বাটি উল্টে বসিয়ে তার ওপর ডিমের পাত্রটি রাখুন।

এভাবে রান্না করলে পাত্রটি সরাসরি জলের সংস্পর্শে থাকবে না।

এবার বড় হাঁড়ির ঢাকনা দিয়ে ঢেকে মাঝারি আঁচে প্রথমে জল গরম করুন।

জল ফুটতে শুরু করলে আঁচ কমিয়ে প্রায় ১৫–২০ মিনিট ভাপে রান্না করুন।

ভাপের তাপে পোস্ত, সর্ষে, নারকেল ও ডিমের মিশ্রণ ধীরে ধীরে রান্না হবে।

রান্না হয়েছে কি না বুঝবেন কীভাবে?

১৫ মিনিট পর সাবধানে ঢাকনা খুলে দেখুন।

মশলার মিশ্রণ জমাট বেঁধে এলে এবং কাঁচা পোস্ত বা সর্ষের গন্ধ না থাকলে বুঝতে হবে রান্না হয়ে গেছে।

প্রয়োজনে আরও ৫ মিনিট ভাপে রাখতে পারেন।

রান্না হয়ে গেলে পাত্রটি নামিয়ে ৩–৪ মিনিট ঢেকে রাখুন।

এরপর ঢাকনা খুলে পরিবেশন করুন।

স্বাদ আরও বাড়ানোর কৌশল

এই রান্নায় সর্ষের তেলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রান্নার শুরুতে এবং শেষে অল্প সর্ষের তেল ব্যবহার করলে সুন্দর ঝাঁঝালো সুগন্ধ পাওয়া যায়।

তবে সর্ষের তেল অতিরিক্ত ব্যবহার করলে পোস্ত ও নারকেলের স্বাদ চাপা পড়ে যেতে পারে।

কাঁচা লঙ্কার পরিমাণ নিজের পছন্দ অনুযায়ী বাড়ানো বা কমানো যায়।

কী দিয়ে পরিবেশন করবেন?

ডিমের নারকেল-পোস্ত ভাপা সবচেয়ে ভালো লাগে গরম ভাতের সঙ্গে।

সঙ্গে রাখতে পারেন—

  • মুসুর ডাল
  • আলু ভাজা
  • বেগুন ভাজা
  • শাক ভাজা
  • টমেটোর চাটনি
  • কাঁচা পেঁয়াজ ও লঙ্কা

গরম ভাতের সঙ্গে মশলা মিশিয়ে খেলে পোস্ত, নারকেল ও সর্ষের স্বাদ খুব ভালোভাবে অনুভূত হয়।

ঝাল কমিয়ে শিশুদের জন্য

শিশুদের জন্য রান্না করলে সর্ষে ও কাঁচা লঙ্কার পরিমাণ কমিয়ে দিন।

চাইলে সর্ষে বাদ দিয়ে শুধু পোস্ত ও নারকেল দিয়ে তৈরি করতে পারেন।

এক্ষেত্রে মশলার স্বাদ অনেকটাই মৃদু হবে।

আরও স্বাস্থ্যকর সংস্করণ

এই রান্নায় আলাদা করে ডিম ভাজার প্রয়োজন নেই। সেদ্ধ ডিম সরাসরি মশলার সঙ্গে ভাপে রান্না করা হয়।

ফলে তেলের ব্যবহারও তুলনামূলকভাবে কম রাখা যায়।

যারা কম তেলে রান্না করতে চান, তারা মোট ১–১½ টেবিল চামচ সর্ষের তেল ব্যবহার করেও রান্নাটি তৈরি করতে পারেন।

গুরুত্বপূর্ণ টিপস

১. পোস্ত রান্নার আগে ভালোভাবে ভিজিয়ে নিলে বাটা মসৃণ হয়।

২. সর্ষে বেশি দিলে মশলা তেতো হতে পারে।

৩. সেদ্ধ ডিম অর্ধেক করে দিলে মশলার স্বাদ ভালোভাবে লাগে।

৪. ভাপ দেওয়ার সময় পাত্র অবশ্যই ভালোভাবে ঢেকে রাখুন।

৫. ডিমের পাত্র সরাসরি ফুটন্ত জলে বসাবেন না।

৬. রান্নার সময় আঁচ খুব বেশি রাখবেন না।

৭. ভাপা রান্নায় অতিরিক্ত জল ব্যবহার করবেন না।

৮. রান্না হয়ে যাওয়ার পর কয়েক মিনিট রেখে দিলে মশলা আরও ভালোভাবে সেট হয়।

৯. পরিবেশনের ঠিক আগে সামান্য কাঁচা সর্ষের তেল ছড়ালে সুগন্ধ অনেক বেড়ে যায়।

উপসংহার

ডিমের নারকেল-পোস্ত ভাপা বাঙালি রান্নার পরিচিত উপকরণকে একটু নতুন পদ্ধতিতে ব্যবহার করার একটি চমৎকার উদাহরণ। পোস্তের মৃদু স্বাদ, সর্ষের ঝাঁঝ, নারকেলের মিষ্টি গন্ধ এবং ডিমের স্বাদ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় একটি ব্যতিক্রমী পদ।

যারা ডিমের একই ধরনের ঝোল বা কষা খেতে খেতে বিরক্ত, তারা এই ভাপা পদ্ধতিটি একবার চেষ্টা করে দেখতে পারেন। খুব বেশি উপকরণ বা দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয় না, অথচ পরিবেশন করলে পদটি বেশ আকর্ষণীয় দেখায়।

গরম ভাতের সঙ্গে দুপুরের খাবারে কিংবা বিশেষ কোনো বাঙালি খাবারের আয়োজনে এই ডিমের নারকেল-পোস্ত ভাপা রাখা যেতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *