
কাঁকনডাঙা গ্রামের মানুষ বরাবরই নদী আর পুকুরের ওপর নির্ভরশীল ছিল। গ্রামের মাঝখানে ছিল একটি বড় পুকুর—নাম ছিল শীতলপুকুর।
একসময় সারাবছর পুকুরে জল থাকত। গ্রামের মানুষ স্নান করত, গবাদি পশুকে জল খাওয়াত, চাষের কাজে ব্যবহার করত।
কিন্তু কয়েক বছর ধরে বর্ষা কমে যাওয়ায় পুকুরটি ধীরে ধীরে শুকিয়ে যেতে শুরু করেছিল।
গ্রীষ্ম এলেই পুকুরের তলায় ফাটল ধরত।
গ্রামের মানুষ দূরের টিউবওয়েল থেকে জল আনত।
সেই গ্রামেই থাকত তেরো বছরের মেয়ে মিতালি।
মিতালি খুব সাধারণ পরিবারের মেয়ে। বাবা চাষ করতেন, মা বাড়ির কাজ সামলাতেন।
প্রতিদিন সকালে মিতালির প্রথম কাজ ছিল দুটো কলসি নিয়ে জল আনতে যাওয়া।
একদিন সে দেখল, টিউবওয়েলের সামনে লম্বা লাইন।
এক বৃদ্ধা ক্লান্ত হয়ে বসে পড়েছেন।
মিতালি জিজ্ঞেস করল,
—“ঠাকুমা, কী হয়েছে?”
বৃদ্ধা বললেন,
—“আজ তিনবার এসেছি। জল পাইনি।”
মিতালির খারাপ লাগল।
সে বাড়ি ফিরে বাবাকে বলল,
—“আমাদের পুকুরটা আবার ভরানো যায় না?”
বাবা হেসে বললেন,
—“বৃষ্টি না হলে পুকুর ভরবে কী করে?”
মিতালি বলল,
—“বৃষ্টি হলে জল ধরে রাখা যায় না?”
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
—“আগে আমাদের পুকুরে জল ধরে রাখার ব্যবস্থা ছিল। এখন পাড় ভেঙে গেছে, নালা বন্ধ।”
মিতালি কথাটা মনে রাখল।
পরদিন স্কুলে বিজ্ঞান শিক্ষককে সব বলল।
শিক্ষক বললেন,
—“তোমরা চাইলে পুকুরটা পরিষ্কার করার একটা উদ্যোগ নিতে পারো।”
মিতালি জিজ্ঞেস করল,
—“আমরা পারব?”
শিক্ষক বললেন,
—“কেউ শুরু না করলে কিছুই হয় না।”
সেদিনই মিতালি তার কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে গ্রামের পুকুরের চারপাশ ঘুরে দেখল।
তারা দেখল, পুকুরে আবর্জনা জমেছে।
পাড়ের জল নামার নালা মাটিতে ভরে গেছে।
কোথাও প্লাস্টিক, কোথাও শুকনো ডালপালা।
মিতালি একটা খাতা বের করে সব লিখে রাখল।
তারপর গ্রামের পঞ্চায়েত অফিসে গেল।
কর্তব্যরত কর্মী বললেন,
—“এটা বড় কাজ।”
মিতালি বলল,
—“আমরা ছোট কাজ দিয়ে শুরু করব।”
পরের রবিবার স্কুলের শিক্ষক, গ্রামের কয়েকজন যুবক এবং মিতালির বন্ধুরা পুকুর পরিষ্কার করতে নামল।
প্রথম দিন মাত্র বারোজন মানুষ এসেছিল।
কেউ আবর্জনা তুলল।
কেউ নালা পরিষ্কার করল।
কেউ পুকুরের পাড় মেরামত করল।
গ্রামের কিছু মানুষ দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিল।
একজন বললেন,
—“দুদিন পর সব আগের মতো হয়ে যাবে।”
মিতালি শুনেও কিছু বলল না।
দ্বিতীয় রবিবার মানুষ বেড়ে হল পঁচিশজন।
তৃতীয় রবিবার পঞ্চাশজন।
একদিন গ্রামের বৃদ্ধ হরিপদ মশাইও লাঠি হাতে এসে দাঁড়ালেন।
মিতালি বলল,
—“আপনি কাজ করবেন?”
তিনি হেসে বললেন,
—“কাজ করতে পারব না। কিন্তু তোমাদের সঙ্গে বসে গল্প করতে পারি।”
মিতালি বলল,
—“সেটাও দরকার।”
হরিপদ মশাই পুকুরটির পুরনো ইতিহাস বলতে শুরু করলেন।
তিনি বললেন,
—“এই পুকুর একসময় এত গভীর ছিল যে বর্ষার জল ধরে রাখত পুরো বছর। গ্রামের মানুষ নিজেরাই পুকুর কাটিয়েছিল।”
মিতালি অবাক হয়ে বলল,
—“তাহলে আমরা আবার পারব।”
এক মাসের মধ্যে পুকুরের চারপাশ অনেকটা পরিষ্কার হয়ে গেল।
এরপর তারা পুকুরের পাশে বৃষ্টির জল নামার নালা তৈরি করল।
স্কুলের শিক্ষক পরামর্শ দিলেন, গ্রামের কয়েকটি বাড়ির ছাদ থেকে পাইপের মাধ্যমে বৃষ্টির জল পুকুরে নামানোর ব্যবস্থা করা যায়।
কাজ শুরু হল।
কেউ বাঁশ দিল।
কেউ পাইপ।
কেউ শ্রম দিল।
মিতালির মা নিজের সঞ্চয় থেকে কিছু টাকা দিলেন।
মিতালি বলল,
—“মা, তুমি টাকা দিলে?”
মা হাসলেন।
—“জলের জন্য টাকা খরচ করলে সেটা খরচ নয়।”
বর্ষা এল।
প্রথম দিন তেমন বৃষ্টি হল না।
দ্বিতীয় দিনও না।
তারপর এক রাতে প্রবল বৃষ্টি শুরু হল।
মিতালি ঘুম থেকে উঠে বাইরে এল।
বৃষ্টির জল ছাদ থেকে পাইপ দিয়ে নেমে পুকুরের দিকে যাচ্ছে।
সে আনন্দে বাবাকে ডাকল,
—“বাবা! জল যাচ্ছে!”
বাবা ঘুমচোখে বাইরে এসে দাঁড়ালেন।
দেখলেন, নালা দিয়ে জল পুকুরে ঢুকছে।
সকাল হলে গ্রামের মানুষ পুকুরের দিকে ছুটে গেল।
পুকুরের তলায় যেখানে এতদিন ফাটল দেখা যেত, সেখানে জল জমতে শুরু করেছে।
মিতালির চোখে জল এসে গেল।
হরিপদ মশাই বললেন,
—“দেখলি? জলকে ধরে রাখতে পারলে জলও আমাদের ধরে রাখে।”
কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পুকুর অর্ধেক ভরে গেল।
তারপর আরও বৃষ্টি হল।
শীতলপুকুর আবার জল পেল।
গ্রামের মানুষ দূরের টিউবওয়েলের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমাতে পারল।
কিন্তু মিতালি এখানেই থামল না।
সে স্কুলে “এক ফোঁটা জল” নামে একটি দল তৈরি করল।
দলের সদস্যরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে বোঝাতে লাগল—
কল খোলা রেখে জল নষ্ট না করতে।
পুকুরে আবর্জনা না ফেলতে।
বৃষ্টির জল সংগ্রহ করতে।
গাছ লাগাতে।
কয়েক মাস পর গ্রামের চেহারা বদলাতে শুরু করল।
পুকুরের চারপাশে নতুন গাছ লাগানো হল।
জলের পাশে একটি ছোট বসার জায়গা তৈরি হল।
শিশুরা সেখানে খেলতে শুরু করল।
পাখিরা আবার ফিরে এল।
একদিন মিতালির স্কুলে জেলা থেকে একজন কর্মকর্তা এলেন।
তিনি পুকুরটি দেখে বললেন,
—“এই কাজটা কে শুরু করেছিল?”
সবাই মিতালির দিকে তাকাল।
মিতালি লজ্জায় মাথা নিচু করল।
কর্মকর্তা বললেন,
—“তুমি কী শিখেছ?”
মিতালি একটু ভেবে বলল,
—“জল কমে গেলে শুধু বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করলে হয় না। যে জল আসে, তাকে ধরে রাখতেও জানতে হয়।”
শিক্ষক দূর থেকে হাসলেন।
বহু বছর পর মিতালি বড় হয়ে জলসম্পদ নিয়ে পড়াশোনা করল।
শহরে চাকরির সুযোগ পেলেও সে নিজের গ্রামের জন্য কাজ করা শুরু করল।
কাঁকনডাঙার শীতলপুকুর তখন শুধু একটি পুকুর নয়—গ্রামের গর্ব।
পুকুরের পাশে একটি পাথরের ফলক বসানো হয়েছিল।
তাতে লেখা ছিল—
“জলকে সম্মান করো। কারণ এক ফোঁটা জল বাঁচানো মানে একটি ভবিষ্যৎ বাঁচানো।”
একদিন বিকেলে মিতালি সেই ফলকের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
একটি ছোট মেয়ে এসে তাকে জিজ্ঞেস করল,
—“দিদি, তুমি কি এই পুকুর বানিয়েছ?”
মিতালি হেসে বলল,
—“না। পুকুর আমাদের গ্রামের মানুষ বানিয়েছিল অনেক বছর আগে।”
—“তাহলে তুমি কী করেছ?”
মিতালি পুকুরের জলের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“শুধু সবাইকে মনে করিয়ে দিয়েছি—যেটা আমাদের আছে, সেটার যত্ন নিতে হয়।”
সূর্যের আলো তখন পুকুরের জলে ঝিলমিল করছিল।
এক ফোঁটা জল বাতাসে ছিটকে উঠে আবার পুকুরেই পড়ল।
মিতালি মনে মনে বলল—
“জল কখনও শুধু জল নয়। তার মধ্যে থাকে জীবন, মানুষের পরিশ্রম আর আগামী দিনের আশা।”












Leave a Reply