গল্প : মাটির ঘ্রাণে ফিরে আসা মানুষ।

শহরের ব্যস্ত রাস্তায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ছুটে চলত। কেউ অফিসে, কেউ স্কুলে, কেউ ব্যবসার কাজে। সেই ভিড়ের মাঝেই প্রতিদিন সকাল আটটায় একটি বড় বহুতলের সামনে এসে দাঁড়াত ঋতম

বয়স ছাব্বিশ।

ভালো চাকরি ছিল। মাসের শেষে নিয়মিত বেতন। নিজের ঘর, মোটরবাইক, শহুরে জীবন—সবই ছিল।

তবু কোথাও একটা শূন্যতা ছিল।

ঋতম নিজেও বুঝতে পারত না, কীসের অভাব তার।

অফিস থেকে ফেরার পথে একদিন হঠাৎ তার ফোনে মায়ের কল এল।

—“কী করছিস?”

—“অফিস থেকে বেরোলাম।”

—“পুজোর ছুটিতে বাড়ি আসবি তো?”

ঋতম একটু চুপ করে বলল,

—“দেখি মা। কাজ আছে।”

মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—“কাজ তো সবসময়ই থাকবে। তুই কবে আসবি?”

ঋতম উত্তর দিল না।

কল কেটে গেল।

সেদিন রাতে অনেকক্ষণ ঘুম এল না।

তার মনে পড়তে লাগল নিজের গ্রামের কথা।

পুকুরের ধারে বসা।

শীতের সকালে কুয়াশা।

বাড়ির উঠোনে মায়ের হাঁক।

আর তার বাবা।

বাবার হাতে সবসময় মাটির গন্ধ লেগে থাকত।


ঋতমের বাবা নিতাই পাল ছিলেন গ্রামের কুমোর।

সারা জীবন মাটি দিয়ে হাঁড়ি, কলসি, প্রদীপ, ফুলদানি বানিয়েছেন।

ছোটবেলায় ঋতম বাবাকে বলত,

—“বাবা, তুমি অন্য কাজ করো না কেন?”

নিতাই হেসে বলতেন,

—“এই মাটিই তো আমার কাজ।”

ঋতম তখন বুঝত না।

সে পড়াশোনা করে শহরে চলে গিয়েছিল।

কলেজ শেষ করে চাকরি পেয়েছিল।

ধীরে ধীরে গ্রামের সঙ্গে তার যোগাযোগ কমে গিয়েছিল।

বাবা অবশ্য কখনও কিছু বলেননি।

শুধু মাঝে মাঝে ফোন করে বলতেন,

—“সময় পেলে একবার বাড়ি আয়।”

ঋতম বলত,

—“আসব।”

কিন্তু আসা হয়ে উঠত না।


একদিন দুপুরে অফিসে কাজ করার সময় আবার মায়ের ফোন এল।

এইবার গলাটা কেমন যেন কাঁপছিল।

—“তোর বাবা অসুস্থ।”

ঋতমের বুক ধক করে উঠল।

—“কী হয়েছে?”

—“কয়েকদিন ধরে শরীর খারাপ। আজ ডাক্তার দেখিয়েছি।”

ঋতম আর কিছু না ভেবে অফিস থেকে ছুটি নিল।

সেদিন রাতের ট্রেনেই গ্রামের উদ্দেশে রওনা দিল।

অনেক বছর পর সেই পুরোনো স্টেশনে নামল সে।

চারপাশটা যেন একই রকম, অথচ সবকিছু বদলে গেছে।

স্টেশন থেকে বাড়ি যেতে যেতে তার মনে হচ্ছিল, সে যেন নিজের অতীতের মধ্যে হাঁটছে।

বাড়িতে পৌঁছে দেখল বাবা খাটে শুয়ে আছেন।

মুখটা শুকিয়ে গেছে।

ঋতম বাবার পাশে বসে হাত ধরল।

—“কেমন আছো?”

নিতাই চোখ খুলে ছেলের দিকে তাকিয়ে হাসলেন।

—“তুই এসেছিস?”

—“হ্যাঁ।”

—“কাজের ক্ষতি হল না?”

ঋতম বাবার হাতটা শক্ত করে ধরল।

—“তোমার কাছে আসার চেয়ে বড় কাজ আর কী আছে?”

নিতাই কিছু বললেন না।

শুধু চোখ বন্ধ করলেন।


পরদিন সকালে ঋতম উঠোনে বেরিয়ে এল।

এক কোণে পড়ে ছিল বাবার পুরোনো চাকা।

চাকার পাশে শুকিয়ে যাওয়া মাটি।

কতদিন যে সে এই জিনিসগুলো দেখেনি!

ছোটবেলায় সে বাবার পাশে বসে মাটি কাটত।

বাবা মাটিকে জল দিয়ে নরম করতেন।

তারপর চাকার ওপর রেখে ধীরে ধীরে ঘোরাতেন।

ঋতম অবাক হয়ে দেখত—

একটা নিরাকার মাটির দলা কীভাবে ধীরে ধীরে একটি সুন্দর পাত্র হয়ে উঠছে।

সেদিন হঠাৎ তার মনে হল,

মানুষও কি এমন নয়?

সময় আর অভিজ্ঞতা তাকে ধীরে ধীরে অন্য একজন মানুষ বানিয়ে দিয়েছে।


দুপুরে বাবা বললেন,

—“আমাদের কাজটা আর হয় না রে।”

ঋতম বলল,

—“কেন?”

—“এখন সবাই প্লাস্টিকের জিনিস কেনে। মাটির হাঁড়ি কে কিনবে?”

ঋতম চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—“তুমি যদি ভালো জিনিস বানাও, মানুষ কিনবে।”

নিতাই হেসে বললেন,

—“তুই শহরে থেকে বড় বড় কথা শিখেছিস।”

ঋতমও হাসল।

কিন্তু কথাটা তার মাথায় থেকে গেল।


পরদিন ঋতম বাবার পুরোনো কাজগুলো দেখতে শুরু করল।

মাটির কাপ।

চায়ের ভাঁড়।

ফুলদানি।

প্রদীপ।

ছোট ছোট শোপিস।

সবকিছুই সুন্দর।

কিন্তু বাজারে বিক্রি করার ব্যবস্থা নেই।

ঋতম নিজের মোবাইল নিয়ে ছবি তুলতে শুরু করল।

তারপর শহরের বন্ধুদের পাঠাল।

একজন বলল,

“এগুলো অনলাইনে বিক্রি করা যায়।”

আরেকজন বলল,

“তুই চাইলে একটা পেজ খুলে দিতে পারি।”

ঋতমের মাথায় যেন নতুন একটা দরজা খুলে গেল।

সে বাবাকে বলল,

—“বাবা, তোমার মাটির জিনিস এবার শহরে যাবে।”

বাবা হেসে বললেন,

—“কে কিনবে?”

—“আমি ব্যবস্থা করব।”


পরবর্তী এক মাস ঋতম গ্রামেই থেকে গেল।

সে গ্রামের আরও কয়েকজন কুমোরের সঙ্গে কথা বলল।

সবার একই সমস্যা।

তারা জিনিস বানাতে পারে, কিন্তু বাজারে পৌঁছতে পারে না।

ঋতম একটি ছোট উদ্যোগ শুরু করল।

নাম দিল—

“মাটির ঘ্রাণ”।

গ্রামের কুমোরদের তৈরি জিনিসের ছবি তুলে সে অনলাইনে পোস্ট করতে লাগল।

প্রথম সপ্তাহে মাত্র তিনটি অর্ডার এল।

দ্বিতীয় সপ্তাহে সাতটি।

তারপর দশটি।

একদিন হঠাৎ শহরের একটি রেস্তোরাঁ থেকে বড় অর্ডার এল।

তারা মাটির কাপ ব্যবহার করতে চায়।

ঋতম আনন্দে বাবার কাছে ছুটে গেল।

—“বাবা! অনেক কাপ লাগবে।”

নিতাই কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর ধীরে ধীরে উঠে বসলেন।

—“তুই সত্যিই পারলি?”

ঋতম বলল,

—“আমরা পারলাম।”


কাজ বাড়তে লাগল।

গ্রামের আরও মানুষ যুক্ত হল।

কেউ মাটি সংগ্রহ করে।

কেউ মাটি প্রস্তুত করে।

কেউ চাকা চালায়।

কেউ রং করে।

কেউ প্যাকেট তৈরি করে।

মহিলারাও কাজ শুরু করলেন।

যে উঠোনগুলো একসময় নীরব ছিল, সেখানে আবার চাকার ঘূর্ণনের শব্দ শোনা গেল।

নিতাইয়ের চোখে আবার আগের সেই উজ্জ্বলতা ফিরে এল।

একদিন তিনি ছেলেকে বললেন,

—“তুই শহরে ফিরে যা।”

ঋতম অবাক হয়ে বলল,

—“কেন?”

—“তোর চাকরি আছে।”

ঋতম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—“চাকরি করব না, তা নয়। কিন্তু এই কাজটাও ছাড়ব না।”

বাবা বললেন,

—“তাহলে?”

ঋতম মাটির দিকে তাকিয়ে বলল,

—“আগে ভাবতাম, গ্রাম থেকে বেরিয়ে গেলেই মানুষ বড় হয়। এখন বুঝছি, নিজের শিকড়কে সঙ্গে নিয়ে এগোতে পারাটাই বড় হওয়া।”

নিতাই ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন।


এক বছর পর গ্রামের চেহারা বদলে গেল।

পুরোনো কুমোরপাড়া আবার ব্যস্ত।

নতুন কয়েকটি চাকা বসেছে।

কিছু যুবক শহর থেকে ফিরে এসেছে।

মেয়েরা নিজেদের তৈরি মাটির গয়না বানিয়ে বিক্রি করছে।

গ্রামের স্কুলে একটি ছোট প্রদর্শনীও হল।

সেখানে নিতাই পালের হাতে তৈরি একটি মাটির প্রদীপ রাখা ছিল।

প্রদীপটির পাশে একটি ছোট্ট লেখা—

“যে মাটি আমাদের জন্ম দিয়েছে, তাকে ভুলে গেলে উন্নতি পূর্ণ হয় না।”

প্রদর্শনীতে দাঁড়িয়ে ঋতম দেখছিল মানুষ প্রদীপটি কিনছে।

তার পাশে দাঁড়িয়ে বাবা বললেন,

—“মনে আছে? ছোটবেলায় বলতিস, এই কাজ ছেড়ে দিতে।”

ঋতম হেসে ফেলল।

—“হ্যাঁ।”

—“এখন?”

ঋতম বাবার হাতের দিকে তাকাল।

সেই হাত এখনও মাটিতে ঢাকা।

কিন্তু আজ সেই মাটির গন্ধ তার কাছে আর সাধারণ গন্ধ নয়।

সেটা তার শৈশবের গন্ধ।

তার বাড়ির গন্ধ।

তার পরিচয়ের গন্ধ।

ঋতম ধীরে ধীরে বলল,

—“বাবা, আমি অনেক দূরে গিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বুঝলাম, আমার আসল ঠিকানা তো এখানেই।”

নিতাই কিছু বললেন না।

শুধু মাটির একটি প্রদীপ ছেলের হাতে তুলে দিলেন।

সন্ধ্যা নেমে আসছিল।

ঋতম প্রদীপটিতে আগুন জ্বালাল।

ছোট্ট শিখাটি ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

মাটির প্রদীপের আলোয় বাবা-ছেলের মুখ পাশাপাশি দেখা গেল।

ঋতম মনে মনে ভাবল—

কিছু মানুষ জীবনে অনেক দূর যেতে চায়। কিন্তু একদিন তারা বুঝতে পারে, দূরে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল নিজের শিকড়কে নতুন আলোয় দেখা।

আর সেই দিন থেকেই মানুষ সত্যিকারের ফিরে আসে।

সমাপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *