
গ্রামের নাম কুসুমডাঙা।
গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে ছিল একটি ছোট্ট প্রাথমিক বিদ্যালয়। লাল মাটির রাস্তা পেরিয়ে, শিমুল গাছের নিচ দিয়ে গেলে স্কুলটির দেখা মিলত।
স্কুলের নাম—কুসুমডাঙা প্রাথমিক বিদ্যালয়।
একসময় এই স্কুলে প্রায় দেড়শো ছাত্রছাত্রী পড়ত। সকাল হলেই স্কুলের ঘণ্টা বাজত। মাঠে ছুটে আসত ছেলেমেয়েরা। কেউ বই হাতে, কেউ টিফিনের বাক্স হাতে, কেউ আবার খালি পায়ে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব বদলে গেল।
গ্রামের অনেক পরিবার শহরে চলে গেল। কেউ কাজের জন্য, কেউ ভালো স্কুলের আশায়।
স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা কমতে কমতে একসময় দাঁড়াল মাত্র বারো জনে।
স্কুলের পুরোনো ভবনের দেওয়ালে শ্যাওলা ধরল।
জানালার কাচ ভাঙল।
মাঠে আগাছা জন্মাল।
আর সবচেয়ে বড় কথা—
স্কুলের ঘণ্টাটি একদিন হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল।
এই স্কুলের নতুন শিক্ষক ছিলেন অরুণাভবাবু।
বয়স চল্লিশের কাছাকাছি।
শহরের স্কুলে চাকরির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি এই প্রত্যন্ত গ্রামের স্কুলে বদলি নিয়ে এসেছিলেন।
প্রথম দিন স্কুলে এসে তিনি অবাক হয়ে চারদিকে তাকালেন।
প্রধান শিক্ষক বললেন,
—“এখানে বেশি দিন কেউ থাকতে চায় না।”
অরুণাভ জিজ্ঞেস করলেন,
—“কেন?”
—“পড়ুয়া কম। সুযোগ-সুবিধা কম। গ্রামের লোকের আগ্রহও কমে গেছে।”
অরুণাভ কিছু বললেন না।
তিনি স্কুলের মাঠে গিয়ে দাঁড়ালেন।
এক কোণে পড়ে থাকা পুরোনো ঘণ্টাটার দিকে তাকালেন।
ঘণ্টাটায় মরচে পড়েছে।
তিনি হাত দিয়ে ধুলো মুছে দেখলেন।
তারপর বললেন,
—“এটা এখনও বাজবে।”
প্রধান শিক্ষক হেসে বললেন,
—“অনেক দিন বাজেনি।”
অরুণাভ বললেন,
—“তাই তো বাজাতে হবে।”
পরদিন থেকেই তিনি কাজ শুরু করলেন।
প্রথমে তিনি বারো জন ছাত্রছাত্রীকে নিয়ে একটি সভা করলেন।
বললেন,
—“তোমরা কি এই স্কুলটাকে ভালোবাসো?”
সবাই চুপ।
একটি ছোট মেয়ে হাত তুলল।
তার নাম মৌ।
—“ভালোবাসি স্যার।”
—“কেন?”
মৌ বলল,
—“এখানে আমার বন্ধুরা আছে।”
অরুণাভ হাসলেন।
—“তাহলে আমরা স্কুলটাকে আবার সুন্দর করব?”
সবাই এবার একসঙ্গে বলল,
—“হ্যাঁ!”
পরদিন ছাত্রছাত্রীরা ঝাড়ু নিয়ে মাঠে নেমে পড়ল।
কেউ আগাছা তুলল।
কেউ জানালা পরিষ্কার করল।
কেউ পুরোনো দেওয়ালে রং করল।
অরুণাভ নিজেও তাদের সঙ্গে কাজ করলেন।
গ্রামের কয়েকজন মানুষ দূর থেকে দেখছিল।
এক বৃদ্ধ বললেন,
—“শিক্ষক নিজে কাজ করছেন!”
ধীরে ধীরে আরও মানুষ এগিয়ে এল।
কেউ বাঁশ দিল।
কেউ রং দিল।
কেউ পুরোনো বেঞ্চ মেরামত করে দিল।
এক সপ্তাহের মধ্যে স্কুলের চেহারা অনেকটাই বদলে গেল।
কিন্তু অরুণাভ জানতেন, শুধু স্কুল পরিষ্কার করলেই হবে না।
ছাত্রছাত্রী বাড়াতে হবে।
একদিন তিনি বাড়ি বাড়ি যেতে শুরু করলেন।
প্রথম বাড়িতে গিয়ে বললেন,
—“আপনার ছেলে স্কুলে আসে না কেন?”
বাবা বললেন,
—“ওকে শহরে দোকানে কাজে পাঠিয়েছি।”
অরুণাভ বললেন,
—“ওর বয়স তো মাত্র নয় বছর।”
লোকটি বলল,
—“সংসারে টাকা দরকার।”
অরুণাভ চুপ করে কিছুক্ষণ বসে রইলেন।
তারপর বললেন,
—“ও পড়াশোনা শিখলে ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে। আজকের সামান্য আয়ের জন্য ওর আগামীটা নষ্ট করবেন না।”
লোকটি কোনো উত্তর দিল না।
অরুণাভ উঠে চলে এলেন।
পরের দিন সেই ছেলেটি স্কুলে এল।
নাম রাজু।
এভাবেই একজন, দুজন করে স্কুলে নতুন ছাত্রছাত্রী আসতে শুরু করল।
কেউ অনেকদিন স্কুলে আসেনি।
কেউ পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিল।
কেউ কাজ করত।
অরুণাভ প্রত্যেকের বাড়িতে গিয়েছেন।
কাউকে বকেননি।
শুধু বুঝিয়েছেন।
তিন মাস পর স্কুলে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা দাঁড়াল ত্রিশ।
ছয় মাস পর বিয়াল্লিশ।
প্রধান শিক্ষক অবাক হয়ে বললেন,
—“আপনি এটা কীভাবে করলেন?”
অরুণাভ হাসলেন।
—“আমি কিছু করিনি। শুধু ওদের মনে করিয়ে দিয়েছি যে স্কুলটা ওদের।”
কিন্তু একটি সমস্যা তখনও ছিল।
স্কুলে কোনো লাইব্রেরি ছিল না।
অরুণাভ নিজের বাড়ির পুরোনো বইগুলো নিয়ে এলেন।
সহকর্মীরাও বই দিলেন।
গ্রামের মানুষও বই দিতে শুরু করলেন।
একদিন মৌ তার বাবার পুরোনো আলমারি থেকে দশটি বই নিয়ে এল।
—“স্যার, এগুলো রাখবেন?”
অরুণাভ বইগুলো হাতে নিয়ে বললেন,
—“অবশ্যই।”
মৌ বলল,
—“বাবা বলেছে, অন্য বাচ্চারা পড়লে বইগুলোও বাঁচবে।”
সেদিন অরুণাভের চোখ একটু ভিজে উঠেছিল।
শীতের এক সকালে স্কুলে বড় অনুষ্ঠান হল।
অনুষ্ঠানের নাম—
“আমাদের স্কুল, আমাদের স্বপ্ন।”
গ্রামের মানুষ সবাই এলেন।
ছাত্রছাত্রীরা গান গাইল।
কবিতা বলল।
নাটক করল।
রাজু একটি বক্তৃতা দিল।
সে বলল,
—“আগে আমি দোকানে কাজ করতাম। এখন আমি ডাক্তার হতে চাই।”
সবাই হাততালি দিল।
মৌ বলল,
—“আমি শিক্ষক হতে চাই।”
অরুণাভ পেছনে দাঁড়িয়ে শুনছিলেন।
হঠাৎ প্রধান শিক্ষক তাঁর কাঁধে হাত রাখলেন।
—“আপনার কাজ সফল হয়েছে।”
অরুণাভ বললেন,
—“না স্যার। এখনও অনেক কাজ বাকি।”
অনুষ্ঠানের শেষে গ্রামের প্রবীণ মানুষ হরনাথবাবু এগিয়ে এলেন।
তার হাতে একটি পুরোনো কাপড়ে মোড়া জিনিস।
তিনি অরুণাভের হাতে সেটি দিলেন।
কাপড় খুলতেই দেখা গেল—
স্কুলের সেই পুরোনো ঘণ্টা।
হরনাথবাবু বললেন,
—“এটা আমার বাবা এই স্কুলে দান করেছিলেন। অনেক বছর ধরে পড়ে ছিল।”
অরুণাভ বললেন,
—“এটা তো ঠিক করা যায়।”
হরনাথবাবু মাথা নাড়লেন।
—“তাই তো তোমার হাতে দিলাম।”
পরদিন গ্রামের লোহার মিস্ত্রি ঘণ্টাটি মেরামত করলেন।
মরচে পরিষ্কার হল।
দড়ি বদলানো হল।
ঘণ্টাটি আবার স্কুলের বারান্দায় ঝুলল।
সোমবার সকাল।
আকাশ পরিষ্কার।
স্কুলের মাঠে ছাত্রছাত্রীরা দাঁড়িয়ে।
শিক্ষকেরা প্রস্তুত।
অরুণাভ ঘণ্টার দড়িটা হাতে নিলেন।
মৌ, রাজু আর অন্যরা তাঁর চারপাশে দাঁড়িয়ে।
তিনি বললেন,
—“আজ তোমরাই বাজাবে।”
মৌ দড়ি ধরল।
একবার টান দিল।
ঢং…
শব্দটা পুরো স্কুল চত্বর পেরিয়ে গ্রামের দিকে ছড়িয়ে গেল।
মৌ আবার টান দিল।
ঢং… ঢং…
দূরের বাড়িগুলো থেকে মানুষ বেরিয়ে এল।
কেউ থমকে দাঁড়াল।
কেউ হাসল।
কেউ বলল,
—“স্কুলের ঘণ্টা আবার বাজছে!”
সেদিন সেই ঘণ্টার শব্দ শুধু স্কুলের সময় ঘোষণা করেনি।
সে যেন ঘোষণা করেছিল—
একটি স্কুল আবার বেঁচে উঠেছে।
কয়েক বছর পর কুসুমডাঙা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা একশোর কাছাকাছি পৌঁছল।
মৌ সত্যিই শিক্ষক হওয়ার পথে এগোল।
রাজু বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা শুরু করল।
আর অরুণাভবাবু?
তিনি এখনও প্রতিদিন সকালে স্কুলে এসে সেই ঘণ্টাটার দিকে তাকান।
একদিন নতুন এক শিক্ষক তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন,
—“স্যার, এই ঘণ্টাটা এত যত্ন করে রাখেন কেন?”
অরুণাভ মৃদু হেসে বললেন,
—“কারণ এটা একদিন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।”
—“তারপর?”
—“তারপর আমরা বুঝেছিলাম, ঘণ্টা বন্ধ হওয়া আসল সমস্যা নয়। আসল সমস্যা হল—মানুষ যদি ধরে নেয় যে আর বাজানোর দরকার নেই।”
তিনি মাঠের দিকে তাকালেন।
শত শত শিশুর হাসির শব্দ ভেসে আসছিল।
তারপর বললেন,
—“যতদিন একজন মানুষও বিশ্বাস করে যে একটা ভালো জিনিস আবার শুরু করা যায়, ততদিন কোনো ঘণ্টাই সত্যিই চিরদিনের জন্য থেমে যায় না।”
দূরে আবার ঘণ্টা বেজে উঠল।
ঢং…
কুসুমডাঙার আকাশে সেই শব্দ অনেকক্ষণ ভেসে রইল।












Leave a Reply