
পাহাড়ি গ্রামের সকাল অন্যরকম।
সূর্য ওঠার আগেই ঘুম ভেঙে যায় মানুষের। দূরের পাহাড়ের গায়ে যখন প্রথম আলো পড়ে, তখন মনে হয় কেউ যেন সবুজ ক্যানভাসের ওপর সোনালি রং ছড়িয়ে দিয়েছে।
সেই পাহাড়েরই একটি ছোট্ট গ্রাম চন্দ্রশিলা।
গ্রামের শেষ বাড়িটিতে থাকত তৃষা।
বয়স মাত্র কুড়ি।
বাবা ভেড়া চরাতেন। মা উলের সুতো কেটে শীতের পোশাক বানাতেন।
তৃষারও সারাদিন পাহাড়ের ঢালে কাজ করতে হতো।
কিন্তু তার চোখ ছিল অন্য কোথাও।
সে পাহাড়ের ওপারের পৃথিবী দেখতে চাইত।
ছোটবেলা থেকেই তৃষার একটা অভ্যাস ছিল।
সন্ধ্যায় কাজ শেষ করে সে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে বসত।
সেখান থেকে দূরে দেখা যেত একটি সরু রাস্তা।
রাস্তাটা পাহাড় পেরিয়ে চলে গেছে অজানা শহরের দিকে।
তৃষা ভাবত,
“ওই রাস্তা দিয়ে কত মানুষ যায়। তারা কোথায় যায়?”
একদিন সে বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল,
—“বাবা, পাহাড়ের ওপারে কী আছে?”
বাবা হেসে বলেছিলেন,
—“আরও পাহাড়।”
তৃষা বলেছিল,
—“তারপর?”
—“তারপর আবার রাস্তা।”
তৃষা চুপ করে ছিল।
তার মনে হয়েছিল, জীবনেরও বুঝি এমনই।
এক পাহাড় পার হলে আরেক পাহাড়।
কিন্তু পথ থামে না।
তৃষা পড়াশোনা করতে খুব ভালোবাসত।
গ্রামের স্কুলে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার সুযোগ ছিল।
তারপর আর স্কুল নেই।
পরবর্তী পড়াশোনার জন্য শহরে যেতে হয়।
কিন্তু শহরে পড়তে যাওয়ার সামর্থ্য তাদের পরিবারের ছিল না।
তাই দশম শ্রেণির পর তৃষার পড়াশোনা থেমে গেল।
তবু বই পড়া থামেনি।
পুরোনো বই সংগ্রহ করত সে।
কারও বাড়িতে পুরোনো পত্রিকা থাকলে নিয়ে আসত।
একটি পুরোনো অভিধান সে বিশেষ যত্নে রেখে দিয়েছিল।
মা মাঝে মাঝে বলতেন,
—“এত বই পড়ে কী হবে?”
তৃষা হাসত।
—“জানি না।”
মা বলতেন,
—“তাহলে?”
তৃষা বলত,
—“জানার জন্যই তো পড়ি।”
এক শীতের সকালে গ্রামের স্কুলে নতুন শিক্ষক এলেন।
নাম অমিতাভ স্যার।
তিনি শহর থেকে বদলি হয়ে এসেছেন।
প্রথম দিন ক্লাস শেষে তৃষাকে স্কুলের বারান্দায় বই পড়তে দেখে জিজ্ঞেস করলেন,
—“তুমি আর পড়ো না?”
তৃষা মাথা নিচু করল।
—“স্কুলে পড়া শেষ।”
—“তারপর?”
—“তারপর বাড়ির কাজ।”
অমিতাভ স্যার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—“তুমি কী হতে চাও?”
তৃষা একটু ভেবে বলল,
—“আমি জানি না।”
—“তাহলে কী করতে ভালো লাগে?”
তৃষা বলল,
—“শিখতে।”
অমিতাভ স্যার মৃদু হেসে বললেন,
—“তাহলে তোমার পড়া এখনও শেষ হয়নি।”
সেদিন থেকে অমিতাভ স্যার তৃষাকে কিছু বই দিতে শুরু করলেন।
ইতিহাস।
বিজ্ঞান।
গল্প।
ভূগোল।
আর ইংরেজি শেখার বই।
তৃষা প্রতিদিন সন্ধ্যায় পাহাড়ের চূড়ায় বসে বই পড়ত।
ধীরে ধীরে তার মনে নতুন একটা স্বপ্ন জন্ম নিল।
সে গ্রামের শিশুদের পড়াতে চাইল।
কারণ সে বুঝেছিল—
তার মতো আরও অনেক শিশু আছে, যাদের পড়াশোনা অষ্টম বা দশম শ্রেণির পর থেমে যায়।
তৃষা গ্রামের কয়েকটি শিশুকে পড়ানো শুরু করল।
প্রথম দিন এসেছিল তিনজন।
পরের সপ্তাহে পাঁচজন।
এক মাস পর বারো জন।
তারা তৃষার বাড়ির উঠোনে বসে পড়ত।
মাটিতে কাঠি দিয়ে অঙ্ক লিখত।
পুরোনো খবরের কাগজে অক্ষর চিনত।
তৃষা তাদের গল্প শোনাত।
বলত,
—“তোমরা শুধু বই পড়বে না। প্রশ্ন করবে।”
একটি ছেলে জিজ্ঞেস করল,
—“দিদি, প্রশ্ন করলে কী হয়?”
তৃষা বলল,
—“মাথার ভেতর নতুন দরজা খোলে।”
একদিন গ্রামের কয়েকজন মানুষ আপত্তি করল।
—“মেয়েমানুষ হয়ে এত পড়াশোনা শেখাচ্ছে কেন?”
কেউ বলল,
—“এসব করে কী লাভ?”
তৃষা চুপ করে থাকল।
কিন্তু তার বাবা বললেন,
—“লাভ আমি জানি না। তবে আমার মেয়ের চোখে যে আলো দেখছি, সেটা হারাতে দেব না।”
এই প্রথমবার বাবা প্রকাশ্যে মেয়ের পাশে দাঁড়ালেন।
তৃষার চোখে জল এসে গেল।
এরপর একদিন অমিতাভ স্যার তৃষাকে বললেন,
—“তোমার জন্য একটা পরীক্ষার ফর্ম এনেছি।”
তৃষা অবাক।
—“কী পরীক্ষা?”
—“দূরশিক্ষার মাধ্যমে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে পারবে।”
তৃষা ফর্মটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
—“আমি পারব?”
স্যার বললেন,
—“তুমি চেষ্টা করলে পারবে।”
তৃষা ফর্ম পূরণ করল।
দিনের কাজ শেষ করে রাতে পড়াশোনা শুরু করল।
মা ঘুমিয়ে পড়েছেন।
বাবা ঘুমিয়ে পড়েছেন।
কিন্তু ছোট্ট ঘরের কেরোসিন বাতির নিচে তৃষার বই খোলা।
বাইরে ঠান্ডা বাতাস।
দূরে পাহাড়ের অন্ধকার।
তবু তার চোখে ক্লান্তি নেই।
পরীক্ষার দিন ভোরে তুষারপাত শুরু হল।
রাস্তা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা।
তৃষার পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছতে প্রায় চার ঘণ্টা পথ।
বাবা বললেন,
—“আজ না গেলে হয় না?”
তৃষা মাথা নাড়ল।
—“না বাবা।”
—“রাস্তা বিপজ্জনক।”
—“আমার স্বপ্নও তো সহজ ছিল না।”
বাবা কিছু বললেন না।
শেষ পর্যন্ত তিনি মেয়েকে নিয়ে রওনা হলেন।
পাহাড়ি পথ।
বরফ।
পিচ্ছিল রাস্তা।
এক জায়গায় তৃষা পড়েও গেল।
বাবা হাত বাড়িয়ে তুললেন।
বললেন,
—“পারবি?”
তৃষা উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
—“পারব।”
তৃষা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হল।
শুধু উত্তীর্ণ নয়—ভালো ফল করল।
গ্রামের সবাই অবাক।
যে মেয়েটিকে একসময় বলা হয়েছিল, “এত পড়াশোনা করে কী হবে?”, সেই মেয়েই এখন গ্রামের শিশুদের পড়ায় এবং নিজেও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে।
কয়েক মাস পর সে শহরে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিল।
ফিরে এসে গ্রামের পুরোনো স্কুলঘরের একটি অংশ নিয়ে শুরু করল একটি ছোট শিক্ষাকেন্দ্র।
নাম দিল—
“পাহাড়ের ওপারের স্বপ্ন”।
কেন্দ্রটির প্রথম দিন মাত্র আটজন শিশু এল।
তৃষা তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
—“তোমরা জানো, পাহাড়ের ওপারে কী আছে?”
সবাই চুপ।
তৃষা হাসল।
—“শুধু আরেকটা পাহাড় নয়। আছে অনেক সম্ভাবনা।”
একটি মেয়ে হাত তুলে বলল,
—“দিদি, আমরা কি পাহাড়ের ওপারে যেতে পারব?”
তৃষা বলল,
—“অবশ্যই পারবে।”
—“কীভাবে?”
তৃষা তার হাতে একটি বই তুলে দিল।
—“প্রথমে এখান থেকে।”
বছর দুয়েক পর চন্দ্রশিলা গ্রামের সেই ছোট শিক্ষাকেন্দ্রে চল্লিশেরও বেশি শিশু পড়তে শুরু করল।
কেউ ডাক্তার হতে চায়।
কেউ শিক্ষক।
কেউ সেনাবাহিনীতে যেতে চায়।
কেউ বিজ্ঞানী।
আর কেউ শুধু বলে,
“আমি অনেক কিছু শিখতে চাই।”
তৃষা প্রতিবার একই কথা বলে—
“স্বপ্নের আকার বড় হওয়া দরকার নেই। শুধু সেটাকে সত্যি করার সাহস থাকতে হয়।”
এক সন্ধ্যায় তৃষা আবার সেই পুরোনো পাহাড়ের চূড়ায় উঠল।
সূর্য অস্ত যাচ্ছে।
দূরের রাস্তা ধরে কয়েকটি গাড়ি পাহাড় পেরিয়ে যাচ্ছে।
তার পাশে এসে দাঁড়াল অমিতাভ স্যার।
বললেন,
—“এখনও পাহাড়ের ওপারে যেতে ইচ্ছে করে?”
তৃষা মৃদু হেসে বলল,
—“আগে ভাবতাম পাহাড়ের ওপারে গেলেই স্বপ্ন পূরণ হবে।”
—“এখন?”
তৃষা নিচের শিক্ষাকেন্দ্রের দিকে তাকাল।
শিশুরা মাঠে খেলছে।
—“এখন বুঝেছি, সব স্বপ্ন পূরণ করতে পাহাড় পেরোতে হয় না।”
স্যার চুপ করে রইলেন।
তৃষা বলল,
—“কখনও কখনও নিজের পাহাড়ের কাছেই দাঁড়িয়ে অন্যদের পথ দেখাতে হয়।”
দূরের আকাশে শেষ সূর্যের আলো তখন পাহাড়ের চূড়ায় পড়েছে।
তৃষা তাকিয়ে রইল।
তার সামনে এখনও অনেক পাহাড়।
অনেক পথ।
অনেক স্বপ্ন।
কিন্তু এবার সে জানে—
পাহাড় যত উঁচুই হোক, তার ওপারে যাওয়ার প্রথম পথটা শুরু হয় নিজের ভেতর থেকেই।












Leave a Reply