চালের গুঁড়ো, লোকবিশ্বাস, নারীর সৃজনশীলতা এবং আধুনিক সময়ে আলপনার বদলে যাওয়া নিয়ে লোকশিল্প গবেষক মৃণালিনী ভট্টাচার্যের সঙ্গে মুখোমুখি
বিশেষ সাক্ষাৎকার | সম্পূর্ণ কাল্পনিক
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। গ্রামের একটি বাড়ির উঠোন ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করা হয়েছে। তারপর একটি ছোট পাত্রে ভিজিয়ে রাখা চাল বেটে তৈরি হয়েছে সাদা তরল। আঙুলের ডগা সেই তরলে ডুবিয়ে একজন মহিলা মাটির উঠোনে আঁকতে শুরু করলেন গোলাকার নকশা, পদ্মফুল, ধানের শিষ, শঙ্খ, পায়ের ছাপ আর নানা জ্যামিতিক রেখা।
কিছুক্ষণ পর সাধারণ একটি উঠোন বদলে গেল শিল্পের ক্যানভাসে।
এই শিল্পের জন্য কোনো দামি রং লাগে না, বড় ক্যানভাস লাগে না, আঁকার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণও অনেক সময় থাকে না। প্রয়োজন শুধু পরিষ্কার একটি উঠোন, চালের গুঁড়ো বা তার মিশ্রণ, একটি স্থির হাত এবং বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসা নকশার স্মৃতি।
এই শিল্পই আলপনা।
বাংলার ঘরোয়া সংস্কৃতিতে আলপনার স্থান দীর্ঘদিনের। ব্রত, পূজা, বিয়ে, অন্নপ্রাশন, নবান্ন, লক্ষ্মীপূজা কিংবা নানা পারিবারিক অনুষ্ঠানে আলপনা আঁকার রীতি এখনও অনেক পরিবারে রয়েছে। কিন্তু পাকা মেঝে, ফ্ল্যাটবাড়ি, ব্যস্ত জীবন, বাজারি স্টিকার ও রেডিমেড ডিজাইনের যুগে সেই পুরনো আলপনা কি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের কাল্পনিক সাক্ষাৎকারে মুখোমুখি হয়েছেন লোকশিল্প গবেষক ও আলপনা-শিল্প প্রশিক্ষক মৃণালিনী ভট্টাচার্য।
প্রশ্ন: আলপনাকে আপনি কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন?
মৃণালিনী ভট্টাচার্য:
আলপনা আমার কাছে শুধু মাটিতে আঁকা একটি নকশা নয়। এটি একই সঙ্গে লোকশিল্প, পারিবারিক স্মৃতি, আচার এবং মানুষের সৃজনশীল প্রকাশ।
একজন শিল্পী ক্যানভাসে ছবি আঁকেন। কিন্তু গ্রামবাংলার একজন নারী অনেক সময় নিজের বাড়ির উঠোনকে ক্যানভাস বানিয়ে নেন। তাঁর কাছে সেই উঠোনই হয়ে ওঠে শিল্পের জায়গা।
আলপনার বিশেষত্ব হলো, এটি সাধারণত স্থায়ী নয়। কয়েকদিন পর মুছে যাবে, বৃষ্টিতে ধুয়ে যাবে, মানুষের হাঁটাচলায় মিলিয়ে যাবে। কিন্তু যে অনুষ্ঠান বা স্মৃতির সঙ্গে এটি তৈরি হয়েছে, তা মানুষের মনে থেকে যায়।
এই ক্ষণস্থায়িত্বই আলপনার একটি বড় সৌন্দর্য।
প্রশ্ন: আলপনা আঁকার জন্য চালের গুঁড়ো ব্যবহারের ঐতিহ্য কেন তৈরি হলো?
মৃণালিনী:
এর পেছনে ব্যবহারিক এবং সাংস্কৃতিক—দুই ধরনের কারণ রয়েছে।
গ্রামীণ বাংলায় চাল ছিল ঘরের পরিচিত উপকরণ। চাল ভিজিয়ে বেটে তার মিশ্রণ দিয়ে সহজেই সাদা নকশা আঁকা যেত। আলাদা করে দামি রং কেনার প্রয়োজন ছিল না।
এছাড়া চাল খাদ্যশস্য। তাই অনেক আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে চালের ব্যবহার প্রতীকী অর্থও বহন করেছে।
তবে অঞ্চলভেদে আলপনার উপকরণ ও রং বদলেছে। কোথাও সাদা প্রধান, কোথাও ফুল, পাতা বা অন্যান্য প্রাকৃতিক উপকরণ থেকে রং ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রশ্ন: আলপনা কি মূলত নারীদের শিল্প?
মৃণালিনী:
ঐতিহাসিকভাবে গ্রামীণ ঘরোয়া আলপনা আঁকার সঙ্গে নারীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ বাড়ির দৈনন্দিন জীবন, উৎসব, ব্রত, পূজা এবং পারিবারিক আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে নারীদের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল। ফলে তাঁরা নিজেরাই আলপনার নকশা তৈরি করতেন।
তবে “শুধু নারীরাই আলপনা আঁকবেন”—এমন কঠোর নিয়ম সর্বত্র ছিল না। সময়ের সঙ্গে পুরুষ শিল্পী, শিল্পশিক্ষার্থী এবং পেশাদার শিল্পীরাও আলপনাকে নিজেদের কাজে ব্যবহার করেছেন।
আজ আলপনা একটি বৃহত্তর শিল্পরূপে পরিণত হয়েছে।
প্রশ্ন: আলপনার নকশাগুলির কি আলাদা অর্থ থাকে?
মৃণালিনী:
অনেক নকশার পেছনে প্রতীকী অর্থ থাকে। তবে মনে রাখতে হবে, সব অঞ্চলে একই অর্থ প্রযোজ্য নয়।
পদ্ম, ধানের শিষ, সূর্য, মাছ, পাখি, লতা, ফুল, শঙ্খ, পায়ের ছাপ—এসব বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অর্থ বহন করতে পারে।
কোনো নকশা সমৃদ্ধি বা শুভতার প্রতীক হতে পারে, কোনোটি প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত, কোনোটি আবার শুধু সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—একটি নকশা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে কীভাবে অর্থ পেয়েছে।
প্রশ্ন: আলপনার নকশা কি বই দেখে শেখা হতো?
মৃণালিনী:
আগে অনেকটাই মুখে মুখে ও দেখে দেখে শেখা হতো।
একজন মা বা ঠাকুমা আলপনা আঁকছেন, পাশে বসে শিশু দেখছে। পরের বছর সেই শিশু নিজে চেষ্টা করছে। এভাবেই হাতের স্মৃতি তৈরি হয়েছে।
এখানে একটা মজার বিষয় আছে। অনেক নারী হয়তো কখনও কোনো আঁকার বই পড়েননি, কিন্তু চোখ বন্ধ করে নির্দিষ্ট একটি নকশা আঁকতে পারেন।
এটি আসলে দৃশ্যমান স্মৃতি।
প্রশ্ন: আলপনা কি শুধুই ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত?
মৃণালিনী:
না। ধর্মীয় আচার আলপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলেও আলপনার ব্যবহার অনেক বিস্তৃত।
বিয়ে, বাড়ির শুভ অনুষ্ঠান, নবান্ন, সামাজিক অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই আলপনা দেখা যায়।
আধুনিক সময়ে তো আলপনা স্কুল, কলেজ, সাংস্কৃতিক মঞ্চ, রাস্তার অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক কর্মসূচিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
অর্থাৎ আলপনা ঘরের উঠোন থেকে বেরিয়ে জনপরিসরেও এসেছে।
প্রশ্ন: কিন্তু আগে তো মাটির উঠোন বেশি ছিল। এখন পাকা বাড়ি বেড়েছে। এতে কি আলপনা কমেছে?
মৃণালিনী:
এটি একটি বড় পরিবর্তন।
মাটির উঠোনে আলপনা আঁকার একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক ছিল। মাটি পরিষ্কার করে, জল ছিটিয়ে, তারপর চালের মিশ্রণ দিয়ে নকশা আঁকা হতো।
এখন অধিকাংশ বাড়ির মেঝে সিমেন্ট, টাইলস বা মার্বেলের। সেখানে ঐতিহ্যগত পদ্ধতিতে আলপনা আঁকার অভ্যাস কিছুটা কমেছে।
তবে আশার বিষয় হলো—আলপনা নতুন পৃষ্ঠ খুঁজে নিয়েছে।
কাগজ, কাপড়, কাঠ, ক্যানভাস, দেওয়াল, অনুষ্ঠানস্থলের মেঝে—সব জায়গাতেই এখন আলপনার ব্যবহার দেখা যাচ্ছে।
প্রশ্ন: রেডিমেড আলপনা স্টিকার কি ঐতিহ্যের জন্য হুমকি?
মৃণালিনী:
হুমকি এবং সুযোগ—দুটোই আছে।
স্টিকার বা রেডিমেড নকশার সুবিধা হলো সময় লাগে কম। শহুরে ব্যস্ত পরিবার সহজেই ব্যবহার করতে পারে।
কিন্তু সমস্যা হলো, মানুষ যদি নিজে আঁকার অভ্যাস পুরোপুরি ছেড়ে দেয়, তাহলে হাতের কাজটি হারিয়ে যেতে পারে।
তাই আমি স্টিকার নিষিদ্ধ করার কথা বলব না। বরং বলব—বছরে অন্তত কয়েকবার নিজের হাতে আলপনা আঁকা হোক।
কারণ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো সেটি নিজে করা।
প্রশ্ন: আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি কি আলপনার ক্ষতি করছে, নাকি উপকার করছে?
মৃণালিনী:
দুই-ই করছে।
একদিকে মোবাইল ও ডিজিটাল ডিজাইনের কারণে মানুষ রেডিমেড নকশার ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে। ফলে নিজের নকশা তৈরি করার প্রবণতা কমতে পারে।
অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে আলপনা আগের চেয়ে অনেক বেশি মানুষের সামনে পৌঁছাচ্ছে।
একজন গ্রামের শিল্পী নিজের আঁকা আলপনার ছবি তুলে প্রকাশ করতে পারেন। শহরের মানুষ সেই নকশা দেখে শিখতে পারেন। এমনকি বিদেশেও বাংলার আলপনা সম্পর্কে মানুষ জানতে পারেন।
তাই প্রযুক্তি শত্রু নয়। কীভাবে ব্যবহার করছি, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন: আলপনা শেখানোর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ কতটা দরকার?
মৃণালিনী:
প্রশিক্ষণ অবশ্যই উপকারী। তবে আলপনাকে শুধু একাডেমিক নিয়মের মধ্যে আটকে দিলে চলবে না।
লোকশিল্পের শক্তি হলো তার স্বাধীনতা।
একজন শিল্পীকে প্রথমে ঐতিহ্যবাহী নকশা শেখানো যেতে পারে। এরপর তাকে নিজের নকশা তৈরি করতে উৎসাহিত করা দরকার।
যেমন ধানের শিষের পুরনো নকশা থেকে নতুন জ্যামিতিক নকশা তৈরি হতে পারে। মাছের পুরনো প্রতীক থেকে জলজ পরিবেশ নিয়ে আধুনিক আলপনা তৈরি হতে পারে।
ঐতিহ্য তখনই বাঁচে, যখন তার মধ্যে নতুন সৃষ্টির সুযোগ থাকে।
প্রশ্ন: গ্রামের মেয়েদের অর্থনৈতিকভাবে আলপনার মাধ্যমে স্বনির্ভর করা সম্ভব?
মৃণালিনী:
অবশ্যই।
আলপনা যদি শুধু বাড়ির উঠোনে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সীমিত। কিন্তু আলপনার নকশা যদি বিভিন্ন পণ্যে ব্যবহার করা যায়, তাহলে বাজার তৈরি হতে পারে।
যেমন শাড়ি, ওড়না, ব্যাগ, নোটবুকের প্রচ্ছদ, দেওয়ালসজ্জা, কাঠের সামগ্রী, মাটির পাত্র, শুভেচ্ছা কার্ড—বিভিন্ন পণ্যে আলপনার নকশা ব্যবহার করা যায়।
এখানে গ্রামের মহিলারা দল গঠন করে কাজ করতে পারেন।
তাঁদের শুধু আঁকা শেখালেই হবে না; ডিজাইন, প্যাকেজিং, মূল্য নির্ধারণ এবং বাজারজাতকরণও শেখাতে হবে।
প্রশ্ন: আলপনার সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ক কী?
মৃণালিনী:
খুব সুন্দর সম্পর্ক রয়েছে।
ঐতিহ্যগত আলপনায় প্রকৃতির অনেক উপাদান এসেছে—ফুল, পাতা, ধান, পাখি, মাছ, সূর্য, চাঁদ, লতা ইত্যাদি।
এগুলো আসলে গ্রামীণ মানুষের চারপাশের পরিবেশের প্রতিফলন।
একজন শহুরে ডিজাইনার হয়তো বই থেকে পদ্মফুল আঁকছেন। কিন্তু গ্রামের একজন মহিলা পদ্মফুল দেখেই তার নকশা তৈরি করেছেন।
এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন: আলপনার মাধ্যমে পরিবেশ সচেতনতা তৈরি করা যায়?
মৃণালিনী:
অবশ্যই।
ধরা যাক, একটি গ্রামের স্কুলে জল সংরক্ষণ নিয়ে অনুষ্ঠান হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা যদি উঠোনে আলপনা আঁকে, যেখানে পুকুর, বৃষ্টি, গাছ এবং জল সংরক্ষণের প্রতীক থাকবে, তাহলে সেই শিল্প একটি বার্তা বহন করবে।
আবার বন সংরক্ষণ নিয়ে আলপনা হতে পারে। পাখি সংরক্ষণ নিয়ে আলপনা হতে পারে।
শিল্পের মাধ্যমে যে বার্তা মানুষের মনে সহজে পৌঁছায়, অনেক সময় বক্তৃতা দিয়ে তা সম্ভব হয় না।
প্রশ্ন: আলপনা কি শিশুদের সৃজনশীলতা বাড়াতে পারে?
মৃণালিনী:
খুবই পারে।
শিশুকে যদি শুধু বলে দেওয়া হয়, “এটা ঠিকভাবে আঁকো,” তাহলে তার সৃজনশীলতা সীমিত হতে পারে।
কিন্তু তাকে যদি বলা হয়, “তুমি নিজের মতো একটি ফুলের নকশা তৈরি করো,” তখন সে ভাবতে শুরু করবে।
আলপনা বিশেষভাবে ভালো কারণ এখানে ভুল করার ভয় কম। এটি মুছে আবার আঁকা যায়।
শিশু গোল আঁকতে শিখবে, রেখা তৈরি করবে, পুনরাবৃত্ত নকশা বানাবে, আকারের ভারসাম্য বুঝবে।
অর্থাৎ খেলতে খেলতেই জ্যামিতি শেখা যায়।
প্রশ্ন: আলপনার মধ্যে কি গণিতের ব্যবহার আছে?
মৃণালিনী:
অবশ্যই। যদিও ঐতিহ্যবাহী শিল্পীরা গণিতের ভাষায় বিষয়টি ভাবতেন না।
সমতা, পুনরাবৃত্তি, বৃত্ত, ত্রিভুজ, সরলরেখা, অনুপাত—এসব আলপনার নকশায় স্বাভাবিকভাবেই আসে।
একটি কেন্দ্রীয় নকশাকে ঘিরে চারদিকে একই ধরনের মোটিফ বসানো হচ্ছে—এটি এক ধরনের symmetry।
তাই আলপনা শিল্প এবং গণিতের মধ্যে একটি সুন্দর সম্পর্ক তৈরি করে।
স্কুলে এই সম্পর্ক ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের জ্যামিতি শেখানো যেতে পারে।
প্রশ্ন: শহরে আলপনার জনপ্রিয়তা কি গ্রাম থেকে আলপনাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে?
মৃণালিনী:
কখনও কখনও এমন ঝুঁকি থাকে।
যখন কোনো লোকশিল্প শহুরে বাজারে জনপ্রিয় হয়, তখন তার মূল সম্প্রদায়ের শিল্পীরা পিছিয়ে পড়তে পারেন। শহরের ডিজাইনাররা সেই নকশা ব্যবহার করে অর্থ উপার্জন করছেন, কিন্তু গ্রামের আসল শিল্পীরা যথাযথ মূল্য পাচ্ছেন না—এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তাই শিল্পের উৎসের প্রতি সম্মান দরকার।
যদি কোনো নকশা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের লোকশিল্প থেকে আসে, তাহলে সেই ঐতিহ্যের উল্লেখ করা উচিত এবং শিল্পীদের ন্যায্য পারিশ্রমিক দেওয়া উচিত।
প্রশ্ন: আলপনার নকশা সংরক্ষণ করার প্রয়োজন আছে কি?
মৃণালিনী:
খুব বেশি।
কারণ আলপনার বড় সমস্যা হলো—এটি স্থায়ী নয়।
আজ একটি অসাধারণ নকশা আঁকা হলো। কয়েকদিন পরে সেটি মুছে গেল। যদি তার ছবি বা নকশা সংরক্ষণ না করা হয়, তাহলে সেই সৃষ্টিও হারিয়ে যেতে পারে।
আমার মতে প্রতিটি অঞ্চলের আলপনা নকশা নিয়ে ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করা দরকার।
শুধু নকশার ছবি নয়—কে এঁকেছেন, কোন অঞ্চলের, কোন অনুষ্ঠানে আঁকা হয়েছে, কী উপকরণ ব্যবহার হয়েছে এবং নকশাটির স্থানীয় নাম কী—এসবও নথিভুক্ত করা উচিত।
প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন আলপনা ভবিষ্যতে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে?
মৃণালিনী:
অবশ্যই পারে।
আজ মানুষ ঘর সাজাতে শিল্পকর্ম কিনছেন। হোটেল, রেস্তোরাঁ, অনুষ্ঠানস্থল, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র—সব জায়গাতেই স্থানীয় শিল্পের চাহিদা বাড়ছে।
আলপনার আধুনিক রূপ ব্যবহার করে বড় দেওয়ালচিত্র, মেঝের নকশা, কাপড়ের ডিজাইন, হস্তশিল্প এবং ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন তৈরি করা যায়।
তবে শিল্পীদের প্রশিক্ষণ এবং কপিরাইটের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন: আলপনার সঙ্গে কপিরাইটের সম্পর্ক কী?
মৃণালিনী:
এটি ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
একটি ঐতিহ্যবাহী লোকনকশা হয়তো কোনো একজনের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। কিন্তু একজন শিল্পী যদি নিজের নতুন ডিজাইন তৈরি করেন, সেটি তার সৃজনশীল কাজ।
কেউ সেই ডিজাইন নিয়ে ব্যবসা করলে শিল্পীর অনুমতি বা যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়ার প্রশ্ন উঠতেই পারে।
লোকশিল্পকে আধুনিক বাজারে আনতে গেলে শিল্পীর অধিকার নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
প্রশ্ন: আপনার প্রশিক্ষণে সবচেয়ে বেশি কী শেখাতে হয়?
মৃণালিনী:
প্রথমে হাতকে স্বাধীন করতে হয়।
অনেকেই ভাবেন, আলপনা মানেই খুব নিখুঁত নকশা। আমি বলি, প্রথমে রেখা তৈরি করুন। তারপর বৃত্ত, পাতা, ফুল, পাখি।
তারপর একই নকশা বারবার আঁকুন।
আলপনায় সৌন্দর্যের বড় অংশ আসে ছন্দ থেকে। একটি মোটিফ একবার আঁকার পর সেটি আবার ফিরে আসে। সেই পুনরাবৃত্তি একটি সংগীতের মতো।
প্রশ্ন: আপনি কি কোনো নির্দিষ্ট নকশাকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন?
মৃণালিনী:
আমি পদ্ম ও ধানের শিষের নকশা খুব পছন্দ করি।
কারণ দুটির মধ্যে বাংলার জীবনকে একসঙ্গে দেখা যায়।
পদ্ম আমাদের জলাভূমি, প্রকৃতি ও সৌন্দর্যের কথা মনে করায়। আর ধান আমাদের কৃষিজীবনের কথা বলে।
তবে আমার প্রিয় আলপনা আসলে সেই আলপনা, যেখানে শিল্পীর নিজের কল্পনা আছে।
একজন বৃদ্ধা হয়তো এমন একটি নকশা আঁকলেন যা কোনো বইয়ে নেই। সেটিই আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান।
প্রশ্ন: আপনার কাছে আলপনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?
মৃণালিনী:
আলপনা আমাদের শেখায়—সৌন্দর্য তৈরি করার জন্য সবসময় অনেক সম্পদ দরকার হয় না।
একটু চালের গুঁড়ো, একটি পরিষ্কার উঠোন এবং একজন মানুষের সৃজনশীল মন—এই তিনটি দিয়েও একটি অসাধারণ শিল্প তৈরি হতে পারে।
আরেকটি বিষয় শেখায়—সব শিল্প স্থায়ী হতে হবে এমন নয়।
কিছু শিল্প মুছে যাবে, কিন্তু তার স্মৃতি থাকবে।
আজকের পৃথিবীতে আমরা সবকিছু সংরক্ষণ করতে চাই—ছবি, ভিডিও, নথি। কিন্তু আলপনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্যেরও মূল্য আছে।
প্রশ্ন: শেষ প্রশ্ন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আপনার বার্তা কী?
মৃণালিনী:
আমি বলব, আলপনাকে শুধু পূজার দিনের সাজসজ্জা হিসেবে দেখবেন না।
এর মধ্যে বাংলার গ্রামীণ জীবনের ইতিহাস রয়েছে। নারীদের সৃজনশীলতা রয়েছে। কৃষির স্মৃতি রয়েছে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক রয়েছে।
আপনার বাড়িতে যদি পাকা মেঝে হয়, তবুও বছরে একদিন নিজের হাতে আলপনা আঁকুন।
আপনার শিশুদের পাশে বসান।
তাকে বলুন—“তুমি নিজের নকশা তৈরি করো।”
হয়তো সে এমন কিছু আঁকবে যা আপনি কখনও দেখেননি।
সেই মুহূর্তেই ঐতিহ্য নতুন জীবন পাবে।
আমরা যদি শুধু পুরনো নকশা সংরক্ষণ করি, তাহলে আলপনা জাদুঘরের বিষয় হয়ে যাবে। কিন্তু যদি নতুন প্রজন্মকে নতুন আলপনা আঁকার সুযোগ দিই, তাহলে এটি জীবন্ত শিল্প হিসেবেই থাকবে।
সাক্ষাৎকারের শেষে
গ্রামের উঠোনে আঁকা একটি আলপনা কয়েকদিন পর হয়তো আর থাকবে না। বৃষ্টি এসে তার রেখা মুছে দেবে, মানুষের পায়ের চাপে নকশা হারিয়ে যাবে। কিন্তু একটি বিষয় থেকে যাবে—সৃষ্টির স্মৃতি।
আলপনার সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই। এটি স্থায়ী না হয়েও একটি প্রজন্মকে আরেক প্রজন্মের সঙ্গে যুক্ত করে।
আজ যখন পাকা বাড়ি, টাইলসের মেঝে, ব্যস্ত জীবন এবং রেডিমেড সজ্জা গ্রামবাংলার পুরনো অভ্যাসকে বদলে দিচ্ছে, তখন আলপনার সামনে নতুন প্রশ্নও তৈরি হয়েছে। এটি কি শুধু অতীতের একটি স্মৃতি হয়ে থাকবে, নাকি নতুন রূপে আবার মানুষের জীবনে ফিরে আসবে?
সম্ভবত উত্তরটি আমাদের হাতেই।
কারণ আলপনা আঁকার জন্য এখনও খুব বেশি কিছু দরকার নেই—একটি খোলা জায়গা, কিছু সহজ উপকরণ এবং নিজের কল্পনাকে প্রকাশ করার সাহস।
মাটির উঠোনে আঁকা সেই সাদা রেখাগুলো তাই শুধু নকশা নয়। সেগুলো বাংলার ঘরের ভেতর থেকে উঠে আসা এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক স্মৃতির ভাষা।
—সমাপ্ত—
নোট: এই সাক্ষাৎকারটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও সম্পাদকীয়/সৃজনধর্মী উদ্দেশ্যে রচিত। সাক্ষাৎকারের ব্যক্তি, বক্তব্য ও ঘটনাগুলি বাস্তব কোনো ব্যক্তির সঙ্গে মিললে তা অনিচ্ছাকৃত।













Leave a Reply