মোবাইলের বাইরে বইয়ের জগৎ: ব্যস্ত জীবনে পড়ার অভ্যাস ফিরিয়ে আনার সহজ উপায়।

একসময় সন্ধ্যা নামলেই অনেক বাড়িতে বইয়ের পাতা ওলটানোর শব্দ শোনা যেত। গল্পের বই, উপন্যাস, পত্রিকা, জীবনী কিংবা নানা ধরনের জ্ঞানমূলক বই ছিল অবসর কাটানোর অন্যতম সঙ্গী। এখন সেই জায়গার অনেকটাই দখল করেছে মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং নানা ধরনের ডিজিটাল বিনোদন।

প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, তথ্য পাওয়ার সুযোগও বাড়িয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকার অভ্যাসের কারণে অনেকের হাতে বই নিয়ে বসার অভ্যাস কমে গেছে।

আবার অনেকেই বই পড়তে চান, কিন্তু বলেন—“সময় পাই না।” আসলে বই পড়ার জন্য প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময়ের প্রয়োজন নেই। নিয়মিত অল্প সময় দিয়েও ধীরে ধীরে পড়ার অভ্যাস তৈরি করা যায়।

বই পড়ার জন্য বড় লাইব্রেরি দরকার নেই

বই পড়ার জন্য বাড়িতে বিশাল লাইব্রেরি থাকা জরুরি নয়।

একটি ছোট তাক, আলমারির একটি অংশ কিংবা বিছানার পাশে কয়েকটি বই রাখার জায়গাই যথেষ্ট। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বইগুলো যেন চোখের সামনে থাকে এবং সহজে হাতে নেওয়া যায়।

যে বই চোখের সামনে থাকে, সেটি পড়ার সম্ভাবনাও বেশি।

তাই বইগুলো এমন জায়গায় রাখুন যেখানে প্রতিদিন আপনার চোখ পড়ে।

নিজের পছন্দ দিয়ে শুরু করুন

অনেকে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করতে গিয়ে প্রথমেই খুব কঠিন বা বড় বই বেছে নেন। কয়েক পৃষ্ঠা পড়ার পর আগ্রহ চলে যায়।

তার বদলে নিজের পছন্দের বিষয় দিয়ে শুরু করা ভালো।

গল্প, ভ্রমণ, রহস্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, জীবনী, প্রকৃতি, রান্না, খেলাধুলা—যে বিষয়টি আপনার আগ্রহ তৈরি করে, সেই ধরনের বই বেছে নিন।

বই পড়া আনন্দের অভ্যাস হওয়ার আগে এটিকে কঠিন কাজ বানিয়ে ফেলা ঠিক নয়।

প্রতিদিন কয়েক পৃষ্ঠা পড়ুন

প্রতিদিন ১০-১৫ মিনিট দিয়েও শুরু করা যায়।

একদিন দশ পৃষ্ঠা পড়লেন, অন্যদিন পাঁচ পৃষ্ঠা—এতে কোনো সমস্যা নেই। মূল বিষয় হলো ধারাবাহিকতা।

প্রথম দিকে বড় লক্ষ্য নেওয়ার দরকার নেই। প্রতিদিন কয়েক পৃষ্ঠা পড়ার অভ্যাস তৈরি হলে ধীরে ধীরে পড়ার সময় নিজেই বাড়তে পারে।

ঘুমের আগে বই পড়ার অভ্যাস

অনেকের দিনের শেষে মোবাইল ফোন দেখার অভ্যাস থাকে। বিছানায় যাওয়ার পরও দীর্ঘ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও বা নানা ধরনের কনটেন্ট দেখতে দেখতে রাত বেড়ে যায়।

তার পরিবর্তে ঘুমের আগে কিছুটা সময় বই পড়ার অভ্যাস করা যেতে পারে।

মোবাইল পাশে রেখেই বই পড়তে গেলে বারবার ফোন দেখার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। তাই সম্ভব হলে পড়ার সময় ফোনটি কিছুটা দূরে রাখা ভালো।

বই কেনার আগে নিজের পছন্দ বুঝুন

বইয়ের দোকানে গিয়ে সুন্দর প্রচ্ছদ দেখে বই কিনে ফেলা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু শুধু প্রচ্ছদ দেখে বই কেনার পরে সেটি না পড়ে পড়ে থাকতে পারে।

তাই বই কেনার আগে বিষয়বস্তু, লেখক এবং বইটির ধরন সম্পর্কে সামান্য ধারণা নেওয়া ভালো।

কোনো বন্ধুর পরামর্শ, বইয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি বা কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে দেখেও সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।

সব বই শেষ করতেই হবে—এমন নিয়ম নেই

কোনো বই শুরু করে ভালো না লাগলে অনেকেই মনে করেন, যেভাবেই হোক বইটি শেষ করতে হবে।

আসলে সব বই সবার জন্য নয়।

কোনো বই আপনার আগ্রহের সঙ্গে মানিয়ে না নিলে অন্য বই শুরু করা যেতে পারে। বই পড়ার উদ্দেশ্য নিজেকে আনন্দ ও জ্ঞান দেওয়া, পরীক্ষার মতো প্রতিটি বই শেষ করা নয়।

তবে খুব দ্রুত বই বদলানোর অভ্যাসও যেন না হয়। কিছুটা সময় দিয়ে বইটির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া ভালো।

কাগজের বই নাকি ডিজিটাল বই?

দুই ধরনের বইয়েরই নিজস্ব সুবিধা রয়েছে।

কাগজের বই পড়ার সময় হাতে বই রাখার আলাদা অনুভূতি রয়েছে। আবার ডিজিটাল বই সহজে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া যায় এবং এক ডিভাইসে অনেক বই রাখা সম্ভব।

যে মাধ্যম আপনার জন্য সুবিধাজনক, সেটিই বেছে নিতে পারেন।

তবে ডিজিটাল বই পড়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকার বিষয়টি মাথায় রাখা দরকার।

পরিবারে পড়ার পরিবেশ তৈরি করুন

বাড়িতে একজন বই পড়লে অন্যদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হতে পারে।

সপ্তাহের কোনো একটি সন্ধ্যায় পরিবারের সদস্যরা কিছুক্ষণ নিজেদের পছন্দের বই পড়তে পারেন। শিশুরা গল্পের বই পড়তে পারে, বড়রা পত্রিকা বা উপন্যাস পড়তে পারেন।

সবাইকে একই বই পড়তে হবে না। শুধু কিছু সময় বইয়ের সঙ্গে কাটানোর অভ্যাসটাই গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুদের বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করান

শিশুদের বই পড়ানোর ক্ষেত্রে জোর করার চেয়ে আগ্রহ তৈরি করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

রঙিন ছবি, ছোট গল্প, প্রাণী, মহাকাশ, বিজ্ঞান, অভিযান বা শিশুর পছন্দের বিষয় নিয়ে বই দিয়ে শুরু করা যায়।

শিশু যদি বই হাতে নিয়ে প্রশ্ন করে, তাহলে তার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করুন। বইকে শুধুমাত্র পড়াশোনার অংশ না বানিয়ে আনন্দের সঙ্গী করে তুললে পড়ার অভ্যাস সহজে তৈরি হতে পারে।

পড়ার সময় নোট রাখুন

যাঁরা তথ্যভিত্তিক বা জ্ঞানমূলক বই পড়েন, তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছোট নোটে লিখে রাখতে পারেন।

কোনো ভালো উক্তি, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা নিজের মনে তৈরি হওয়া প্রশ্নও লিখে রাখা যায়।

এতে বই পড়ার সঙ্গে নিজের চিন্তাভাবনারও একটি সম্পর্ক তৈরি হয়।

বই নিয়ে আলোচনা করুন

একটি বই পড়ে কারও সঙ্গে সেটি নিয়ে আলোচনা করলে পড়ার অভিজ্ঞতা আরও আকর্ষণীয় হতে পারে।

বন্ধু, পরিবারের সদস্য বা বই পড়তে ভালোবাসেন এমন কারও সঙ্গে গল্পের চরিত্র, বিষয়বস্তু কিংবা নিজের ভালো লাগা-না লাগা নিয়ে কথা বলা যায়।

একই বই পড়েও দুজন মানুষের উপলব্ধি ভিন্ন হতে পারে। এই পার্থক্য থেকেই নতুন চিন্তার জন্ম হয়।

বইয়ের সঙ্গে ভ্রমণের সম্পর্ক

ভ্রমণের আগে কোনো জায়গার ইতিহাস বা সংস্কৃতি সম্পর্কে বই পড়লে সেই জায়গাকে অন্যভাবে দেখা যায়।

কোনো ঐতিহাসিক স্থানে গিয়ে শুধু ছবি তোলার পরিবর্তে তার ইতিহাস জানা থাকলে অভিজ্ঞতা আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।

আবার ভ্রমণকাহিনি পড়তে পড়তে ভবিষ্যতের ভ্রমণের জন্য নতুন জায়গার ধারণাও পাওয়া যেতে পারে।

বই উপহার দেওয়ার অভ্যাস ফিরিয়ে আনুন

জন্মদিন বা বিশেষ দিনে সব সময় দামি উপহার দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

কোনো মানুষের আগ্রহ অনুযায়ী একটি বইও সুন্দর উপহার হতে পারে।

শিশুর জন্য গল্পের বই, তরুণের জন্য জীবনী বা বিজ্ঞানভিত্তিক বই, বয়স্ক মানুষের জন্য পছন্দের লেখকের বই—ব্যক্তির আগ্রহ বুঝে বই বেছে নেওয়া যায়।

বই পড়াকে পরীক্ষার মতো করবেন না

এক মাসে কতটি বই পড়লাম—এই হিসাব নিয়ে অতিরিক্ত চাপ নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

কেউ মাসে একটি বই পড়েন, কেউ কয়েকটি বই পড়েন। পড়ার গতি মানুষের সময় ও আগ্রহ অনুযায়ী আলাদা।

মূল বিষয় হলো বই পড়ে কী পেলাম এবং পড়ার অভ্যাসটি আমার জীবনে কী আনন্দ বা নতুন চিন্তা নিয়ে এল।

পুরনো বই আবার পড়ুন

কিছু বই একবার পড়ার পরেও বারবার পড়তে ভালো লাগে।

বয়স ও জীবনের অভিজ্ঞতা বদলানোর সঙ্গে একই বইয়ের অর্থও কখনও কখনও নতুনভাবে মনে হতে পারে।

ছোটবেলায় পড়া কোনো বই বহু বছর পরে আবার হাতে নিলে পুরনো স্মৃতিও ফিরে আসতে পারে।

বই পড়ার জন্য নিজের একটি সময় তৈরি করুন

যাঁদের প্রতিদিনের জীবন খুব ব্যস্ত, তাঁরা নিজের জন্য একটি নির্দিষ্ট পড়ার সময় ঠিক করতে পারেন।

সকালে কিছুক্ষণ, দুপুরের বিরতিতে কিংবা রাতে—যে সময়টি সবচেয়ে সুবিধাজনক, সেটি বেছে নিন।

সময়টি খুব বড় হওয়ার দরকার নেই। প্রতিদিনের ধারাবাহিকতাই আসল।

উপসংহার

মোবাইল, কম্পিউটার ও ডিজিটাল বিনোদনের যুগেও বইয়ের গুরুত্ব কমে যায়নি। বরং তথ্যের ভিড়ে কোন বিষয় নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি করতে বই এখনও গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম।

বই পড়া মানে শুধু গল্প জানা নয়। কখনও এটি নতুন পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করায়, কখনও ইতিহাসের দরজা খুলে দেয়, কখনও অন্য মানুষের জীবন বুঝতে সাহায্য করে, আবার কখনও নিঃশব্দে নিজের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেয়।

তাই প্রতিদিনের ব্যস্ততার মধ্যে নিজের জন্য একটু সময় রাখুন। মোবাইলটি কিছুক্ষণের জন্য পাশে রাখুন, পছন্দের একটি বই হাতে নিন এবং কয়েক পৃষ্ঠা পড়ুন।

হয়তো প্রথম দিনেই বড় কোনো পরিবর্তন অনুভব করবেন না। কিন্তু প্রতিদিনের সেই কয়েক পৃষ্ঠা একসময় আপনার জীবনযাপনের একটি সুন্দর অভ্যাস হয়ে উঠতে পারে।

কারণ একটি ভালো বই শুধু সময় কাটায় না—কখনও কখনও সময়কে অর্থপূর্ণ করে তোলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *