“ইকির মিকির চাম চিকির, চামের কাঁটা মজুমদার…”
বাংলার বহু মানুষের শৈশবের স্মৃতিতে এই ছড়ার শব্দ আজও স্পষ্ট। একসময় বাড়ির উঠোনে, স্কুলের অবসরে কিংবা পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে বসে এই ছড়া বলতে বলতে খেলা হতো। দামি খেলনা বা বড় মাঠের প্রয়োজন ছিল না। কয়েকজন বন্ধু, হাতের আঙুল আর মুখে মুখে প্রচলিত একটি ছড়াই যথেষ্ট ছিল।
ইকির মিকির শুধু একটি ছড়া নয়; বিভিন্ন অঞ্চলে এটি শিশুদের আঙুল গুনে বা ছুঁয়ে পালা নির্ধারণের খেলাতেও ব্যবহৃত হতো। ছড়ার প্রতিটি শব্দের সঙ্গে হাত বা আঙুলে স্পর্শ করা হতো, আর ছড়া শেষ হলে যার আঙুলে শেষ শব্দটি পড়ত, তার জন্য নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো।
বাংলার লোকছড়া ও লোকখেলার জগতে ইকির মিকিরের বিশেষ স্থান রয়েছে। তবে অঞ্চলভেদে ছড়ার শব্দ, উচ্চারণ এবং খেলার নিয়মে পার্থক্য দেখা যায়।
কীভাবে খেলা হতো?
ইকির মিকিরের একটি প্রচলিত রূপে কয়েকজন শিশু গোল হয়ে বসত। তারা নিজেদের হাত সামনে মেলে ধরত। এরপর একজন খেলোয়াড় ছড়াটি বলতে বলতে একের পর এক হাত বা আঙুল স্পর্শ করত।
ছড়ার শেষ শব্দটি যে খেলোয়াড়ের হাতে বা আঙুলে পড়ত, তাকে নিয়ে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। কোনো ক্ষেত্রে সেই খেলোয়াড়কে প্রথম পালা নিতে হতো, কোনো ক্ষেত্রে তাকে দল বাছাই করতে বা পরবর্তী খেলার জন্য নির্দিষ্ট ভূমিকা নিতে হতো।
এভাবে ছড়ার সাহায্যে ঠিক করা যেত কে প্রথম খেলবে, কে কাউকে খুঁজবে, কিংবা কোন খেলোয়াড় প্রথমে কোনো কাজ করবে। অবশ্য সব অঞ্চলে একই নিয়ম প্রচলিত ছিল না।
এই খেলাটির সৌন্দর্য ছিল এর সরলতায়। একজন ছড়া বলতে জানলেই অন্যদের শেখাতে পারত। নতুন শিশুদেরও খেলায় যোগ দিতে অসুবিধা হতো না।
ছড়ার বিভিন্ন রূপ
ইকির মিকিরের ছড়া মুখে মুখে প্রচলিত হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় এর শব্দ বদলে গেছে। একটি পরিচিত সংস্করণ হলো—
“ইকির মিকির চাম চিকির,
চাম কাটা মজুমদার,
ধেয়ে এল দামোদর।
দামোদরের হাঁড়িকুড়ি,
দুয়ারে বসে চাল কুড়ি।
চাল কুড়তে হল বেলা,
ভাত খাওসে দুপুর বেলা।
ভাতে পড়ল মাছি,
কোদাল দিয়ে চাঁচি,
কোদাল হল ভোঁতা…”
ছড়াটির শেষাংশও বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্নভাবে বলা হয়। কোথাও শেষের শব্দে পরিবর্তন দেখা যায়, কোথাও কিছু পঙ্ক্তি বাদ পড়ে বা নতুন পঙ্ক্তি যুক্ত হয়।
লোকছড়ার এই পরিবর্তন অস্বাভাবিক নয়। শিশুরা বড়দের মুখে শুনে ছড়া শেখে, পরে নিজেদের মতো করে বলে। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাওয়ার সময়ও ছড়ার শব্দ বদলে যেতে পারে। ফলে একই ছড়ার একাধিক রূপ তৈরি হয়।
খেলার মধ্যে ছড়ার ভূমিকা
ইকির মিকিরের ক্ষেত্রে ছড়াই ছিল খেলার প্রধান উপকরণ। ছড়ার শব্দগুলি নির্দিষ্ট ছন্দে উচ্চারণ করা হতো এবং প্রতিটি শব্দের সঙ্গে হাত বা আঙুল স্পর্শ করার কাজ চলত।
এতে খেলার মধ্যে একটি তাল তৈরি হতো। শিশুরা ছড়ার ছন্দ অনুসরণ করত, অন্যদের সঙ্গে তাল মেলাত এবং শেষ শব্দটি কার হাতে পড়বে, তা নিয়ে অপেক্ষা করত।
এই অপেক্ষার মধ্যেই তৈরি হতো ছোট্ট উত্তেজনা। ছড়া যত এগোত, খেলোয়াড়দের কৌতূহলও তত বাড়ত। শেষ শব্দটি কার ভাগ্যে পড়বে, তা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা চলত।
আজকের দিনে শিশুদের কাছে এই ধরনের খেলা পরিচয় করিয়ে দিলে তারা ছড়ার ছন্দ, শব্দ এবং লোকজ ভাষার সঙ্গে সহজভাবে পরিচিত হতে পারে।
শৈশবের সামাজিক জীবনের অংশ
আগের দিনে শিশুদের খেলাধুলা শুধু শারীরিক পরিশ্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বসে বসে খেলা, ছড়া বলা, ধাঁধা দেওয়া এবং পালা ঠিক করার মতো অনেক ছোটখাটো বিনোদনও ছিল।
ইকির মিকির সেই জগতের একটি অংশ। এই খেলায় শিশুদের একসঙ্গে বসতে হতো, অন্যের পালা মেনে নিতে হতো এবং ছড়ার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হতো।
যে শিশু ছড়াটি ভালো জানত, সে অন্যদের শেখাতে পারত। আবার কেউ শব্দ ভুলে গেলে বন্ধুরা তাকে মনে করিয়ে দিত। এই সহজ যোগাযোগের মধ্য দিয়েই শিশুদের মধ্যে বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি হতো।
তবে এই খেলাকে আধুনিক শিক্ষার বিকল্প হিসেবে দেখার দরকার নেই। বরং এটি ছিল অবসর কাটানোর একটি আনন্দময় পদ্ধতি, যেখানে ছড়া ও সামাজিক মেলামেশা একসঙ্গে জড়িয়ে থাকত।
ছড়ায় ধরা পড়ে পুরনো বাংলার জীবন
ইকির মিকিরের ছড়ায় মজুমদার, দামোদর, হাঁড়িকুড়ি, চাল কুড়ানো, দুপুরের খাবার কিংবা কোদালের মতো শব্দ পাওয়া যায়। এগুলি একসময়ের গ্রামীণ জীবন ও দৈনন্দিন কাজের পরিচিত ছবি মনে করিয়ে দেয়।
তবে ছড়ার প্রতিটি শব্দের নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক অর্থ আছে, এমন দাবি করা যায় না। লোকছড়ার অনেক শব্দ দীর্ঘদিনের প্রচলনে টিকে থাকে, অথচ তাদের মূল অর্থ বা উৎপত্তি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এই কারণেই লোকছড়া সংগ্রহ করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রবীণ মানুষদের কাছ থেকে ছড়ার বিভিন্ন রূপ লিখে রাখা গেলে স্থানীয় ভাষা, উচ্চারণ এবং সংস্কৃতির অনেক উপাদান সংরক্ষণ করা সম্ভব।
কেন কমে যাচ্ছে এই ধরনের খেলা?
আজকের শিশুদের বিনোদনের ধরন অনেকটাই বদলে গেছে। স্মার্টফোন, টেলিভিশন, অনলাইন ভিডিও এবং ডিজিটাল গেম তাদের অবসর কাটানোর বড় অংশ দখল করে নিয়েছে। পাশাপাশি পড়াশোনার চাপ এবং বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ কমে যাওয়াও একটি কারণ।
ফলে মুখে মুখে শেখা অনেক ছড়া ও খেলার নিয়ম নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছচ্ছে না। কোনো কোনো পরিবারে এখনও এই ছড়া শোনা যায়, কিন্তু অনেক শিশুই হয়তো এর সঙ্গে পরিচিত নয়।
ইকির মিকিরের মতো ছড়া হারিয়ে গেলে শুধু একটি খেলার স্মৃতিই হারাবে না; হারিয়ে যেতে পারে স্থানীয় উচ্চারণ, পুরনো শব্দ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা মৌখিক ঐতিহ্যের অংশও।
স্কুলে ফিরতে পারে ইকির মিকির
এই খেলার জন্য বড় মাঠ বা বিশেষ সরঞ্জামের প্রয়োজন নেই। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বাংলা ভাষার ক্লাস কিংবা শিশুদের লোকসংস্কৃতি কর্মশালায় ইকির মিকির পরিচয় করিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
শিক্ষক প্রথমে ছড়ার একটি সংস্করণ শোনাতে পারেন। তারপর শিশুদের ছোট ছোট দলে বসিয়ে ছড়া বলতে বলতে পালা নির্ধারণের খেলা শেখানো যেতে পারে।
শিশুরা নিজেদের বাড়ির বড়দের কাছ থেকেও ছড়ার অন্য সংস্করণ সংগ্রহ করতে পারে। এতে একেক পরিবারের বা অঞ্চলের ছড়ার পার্থক্য সম্পর্কে জানা যাবে।
এভাবে খেলার সঙ্গে ভাষা ও সংস্কৃতির পরিচয়ও ঘটবে। তবে শিশুদের শেখাতে গিয়ে একটি সংস্করণকেই একমাত্র সঠিক বলে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সম্মান
ইকির মিকির সাধারণত বসে খেলার একটি সহজ পদ্ধতি। তবু খেলার সময় কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা দরকার।
- কারও হাত বা আঙুল জোরে টানা যাবে না।
- কেউ খেলতে না চাইলে তাকে বাধ্য করা যাবে না।
- ছড়ার ভুল উচ্চারণ নিয়ে কাউকে উপহাস করা উচিত নয়।
- খেলায় পালা নির্ধারণের পর সবাইকে সিদ্ধান্ত মেনে চলতে শেখাতে হবে।
- ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে বড়দের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
খেলার উদ্দেশ্য আনন্দ তৈরি করা এবং সবাইকে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া।
উপসংহার
ইকির মিকির বাংলার শৈশবের এমন এক স্মৃতি, যেখানে ছড়া আর খেলা আলাদা ছিল না। কয়েকটি শব্দ, হাতের আঙুল এবং বন্ধুদের উপস্থিতিতেই তৈরি হয়ে যেত আনন্দের ছোট্ট জগৎ।
আজকের ব্যস্ত জীবনে এই ধরনের খেলা অনেকটাই আড়ালে চলে গেলেও এর সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। লোকছড়ার বিভিন্ন রূপ সংগ্রহ করা, শিশুদের শেখানো এবং পরিবারের প্রবীণদের স্মৃতি নথিবদ্ধ করা গেলে এই ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছেও পৌঁছতে পারে।
সব খেলার জন্য মাঠ বা দামি সরঞ্জাম দরকার হয় না। কখনও কখনও একটি ছড়াই যথেষ্ট—যে ছড়া বন্ধুদের একসঙ্গে বসায়, অপেক্ষার আনন্দ তৈরি করে এবং শৈশবের স্মৃতিকে বহু বছর ধরে বাঁচিয়ে রাখে।
ইকির মিকির তাই শুধু অতীতের একটি খেলার নাম নয়; এটি বাংলার লোকছড়া, শিশুমন এবং একসঙ্গে বড় হয়ে ওঠার ইতিহাসেরও একটি ছোট্ট অংশ।













Leave a Reply