
শহরের একটি বড় ক্রীড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রতি বছর তরুণ খেলোয়াড়দের নিয়ে আয়োজন করা হতো জাতীয় স্তরের একটি তীরন্দাজি প্রতিযোগিতা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিযোগীরা আসত। কারও লক্ষ্য ছিল পদক জেতা, কারও লক্ষ্য নিজের আগের রেকর্ড ভাঙা, আবার কেউ শুধু নিজের দক্ষতা যাচাই করতে চাইত।
সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল উনিশ বছরের ঈশান। ছোটবেলা থেকেই সে তীরন্দাজি শিখেছে। তার বাবা ছিলেন সাধারণ বাসচালক। ছেলের প্রশিক্ষণের খরচ জোগাতে তিনি বহু বছর অতিরিক্ত কাজ করেছেন। ঈশান জানত, এই প্রতিযোগিতায় ভালো ফল করতে পারলে তার সামনে নতুন সুযোগ খুলে যেতে পারে।
প্রতিযোগিতার আগের দিন কোচ অরুণাভ তাকে বলেছিলেন, “লক্ষ্যভেদ করার আগে নিজের মনকে স্থির করবে। অন্যের স্কোর দেখে নিজের সিদ্ধান্ত বদলাবে না।”
ঈশান মাথা নেড়েছিল। কিন্তু প্রতিযোগিতার দিন মাঠে এসে সে বুঝল, চাপ সামলানো কথায় যত সহজ, বাস্তবে তত নয়।
প্রথম কয়েকটি রাউন্ড ভালোই কাটল। ঈশান ধারাবাহিকভাবে পয়েন্ট পেতে লাগল। শেষ রাউন্ডে তার সামনে ছিল অভিজ্ঞ প্রতিযোগী দেবমাল্য। দুজনের স্কোর প্রায় সমান। শেষ তীরের ফলেই নির্ধারিত হতে পারে বিজয়ী কে হবে।
দেবমাল্য প্রথমে তীর ছুড়ল। তীরটি লক্ষ্যবস্তুর কেন্দ্রের খুব কাছে গিয়ে লাগল। দর্শকদের মধ্যে চাপা গুঞ্জন উঠল।
এবার ঈশানের পালা।
সে ধনুক তুলল, নিশানা স্থির করল। কিন্তু তীর ছোড়ার ঠিক আগে তার চোখে পড়ল, পাশের দিকের একটি পতাকা অস্বাভাবিকভাবে দুলছে। বাতাসের গতি বদলে গিয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিযোগীরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিজেদের প্রস্তুতি নিতে পারত। ঈশানের হাতে তখনও কিছুটা সময় ছিল।
সে ভাবল, এখনই তীর ছুড়লে হয়তো ভালো পয়েন্ট পাবে। বেশি দেরি করলে হাত কাঁপতে পারে। দর্শকদের প্রত্যাশা, বাবার পরিশ্রম, নিজের ভবিষ্যৎ—সবকিছু একসঙ্গে তার মাথায় ভিড় করল।
তার আঙুল ধনুকের তারে শক্ত হয়ে উঠল।
ঠিক তখনই কোচের কথা মনে পড়ল—নিজের মনকে স্থির করবে।
ঈশান ধনুক নামিয়ে আনল। সে কয়েকবার ধীরে শ্বাস নিল, বাতাসের গতিবিধি লক্ষ্য করল এবং নিজের অবস্থান নতুন করে ঠিক করল। পাশের দর্শকাসন থেকে কেউ চিৎকার করে উঠল, “এত সময় নষ্ট করলে চলবে?”
ঈশান শুনেও সাড়া দিল না।
কয়েক মুহূর্ত পর বাতাস কিছুটা স্থির হলো। সে আবার ধনুক তুলল। এবার নিশানা স্থির করে তীর ছুড়ে দিল।
তীরটি কেন্দ্র থেকে সামান্য দূরে লাগল।
তার স্কোর ভালো হলো, কিন্তু দেবমাল্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। প্রতিযোগিতার ফল ঘোষণার পর ঈশান দ্বিতীয় স্থান পেল।
মঞ্চ থেকে নামার সময় তার মন খারাপ হচ্ছিল। সে ভাবছিল, বাতাসের জন্য অপেক্ষা না করে যদি একটু আগেই তীর ছুড়ত, হয়তো ফল অন্যরকম হতো। আবার এটাও জানত, তাড়াহুড়ো করলে আরও খারাপ ফল হতে পারত।
কোচ অরুণাভ তার পাশে এসে দাঁড়ালেন।
“কী ভাবছ?” তিনি জিজ্ঞাসা করলেন।
ঈশান বলল, “আমি জিততে পারতাম। শেষ তীরটা আরও ভালো হতে পারত।”
কোচ মাথা নেড়ে বললেন, “হতে পারত। কিন্তু তুমি পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিয়েছ। ফল তোমার পক্ষে যায়নি বলে সিদ্ধান্তটি ভুল হয়ে যায় না।”
ঈশান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
অরুণাভ আবার বললেন, “তবে শুধু নিজের সিদ্ধান্তকে সঠিক ভেবে বসে থাকলেও চলবে না। এবার ভিডিও দেখে বিশ্লেষণ করো—তোমার নিশানা, শরীরের ভারসাম্য, শ্বাস নেওয়ার সময় এবং বাতাসের পরিবর্তন তুমি কতটা ঠিকভাবে বুঝেছিলে। কোথায় উন্নতি করা যায়, তা খুঁজে বের করো।”
সেদিন রাতে ঈশান নিজের পারফরম্যান্সের ভিডিও দেখল। সে বুঝতে পারল, বাতাসের পরিবর্তন সে ঠিকই ধরেছিল, কিন্তু অপেক্ষা করার সময় তার কাঁধের পেশি কিছুটা শক্ত হয়ে গিয়েছিল। ফলে শেষ মুহূর্তে ধনুক স্থির রাখতে তার বাড়তি পরিশ্রম হয়েছে।
পরের কয়েক সপ্তাহ সে সেই সমস্যার ওপর কাজ করল। বাতাসের পরিবর্তনে কীভাবে শরীর শিথিল রাখতে হয়, কীভাবে দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যেও মনোযোগ ধরে রাখতে হয়, তা নিয়মিত অনুশীলন করল।
ছয় মাস পর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ এল। এবারও শেষ রাউন্ডে স্কোরের ব্যবধান খুব কম ছিল। প্রতিপক্ষের শেষ তীর লক্ষ্যবস্তুর কেন্দ্রে লাগল।
ঈশানের পালা এলে বাতাসের গতি আবার বদলে গেল।
কিন্তু এবার সে আতঙ্কিত হলো না। সে নিজের প্রস্তুতি যাচাই করল, শ্বাস স্বাভাবিক রাখল এবং উপযুক্ত মুহূর্তে তীর ছুড়ল।
তীরটি কেন্দ্রে লাগল না, তবে আগের তুলনায় তার নিয়ন্ত্রণ অনেক ভালো ছিল। শেষ পর্যন্ত সে তৃতীয় স্থান পেল।
পদক হাতে নিয়ে সে বুঝল, উন্নতি মানেই প্রতিবার প্রথম হওয়া নয়। কখনও উন্নতি হলো নিজের ভুল বুঝতে পারা, কখনও চাপের মধ্যে স্থির থাকা, আবার কখনও ফল প্রত্যাশামতো না হলেও শেখার মানসিকতা ধরে রাখা।
কয়েক দিন পর বাবা তাকে ফোন করলেন।
“শুনলাম, এবার তৃতীয় হয়েছিস। মন খারাপ?”
ঈশান হেসে বলল, “একটু তো হয়েছিল। কিন্তু এবার জানি, কোথায় কাজ করতে হবে। পরেরবার আরও ভালো করার চেষ্টা করব।”
ওপাশে বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “তাহলে তো তুই শুধু খেলায় নয়, জীবনেও এগোচ্ছিস।”
ঈশান ফোন রেখে প্রশিক্ষণকেন্দ্রের মাঠের দিকে তাকাল। সেখানে নতুন খেলোয়াড়েরা অনুশীলন করছিল। তাদের মধ্যে কেউ প্রথম দিনেই ভালো করছিল, কেউ বারবার লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছিল। সে জানত, প্রতিটি খেলোয়াড়ের পথ আলাদা।
আর সেই পথের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত সব সময় পদক জেতার মুহূর্ত নয়। কখনও তা হলো সেই এক মিনিট, যখন চাপের মধ্যে মানুষকে স্থির হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
শিক্ষা: কঠিন পরিস্থিতিতে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত না নিয়ে পরিস্থিতি বোঝা, নিজের মন স্থির রাখা এবং পরে ফলাফল বিশ্লেষণ করা জরুরি। সাফল্য শুধু জয়ের নাম নয়; নিজের দক্ষতা ও বিচারবোধকে ক্রমাগত উন্নত করার নামও সাফল্য।












Leave a Reply