যে সেতুতে কোনও টোল ছিল না।।

পাহাড় আর সমতলের মাঝখানে ছিল শালবন নামে একটি ছোট্ট জনপদ। জনপদের একদিকে হাসপাতাল, অন্যদিকে স্কুল, বাজার ও বসতবাড়ি। মাঝখান দিয়ে বয়ে গিয়েছিল চওড়া একটি খাল। বর্ষাকালে খালের জল বেড়ে গেলে দুই পাড়ের মানুষের যাতায়াত প্রায় বন্ধ হয়ে যেত।

খালের ওপর আগে একটি কাঠের সাঁকো ছিল। বহু বছর ব্যবহারের পর সেটি ভেঙে পড়ায় মানুষকে ঘুরপথে প্রায় সাত কিলোমিটার যেতে হতো। বিশেষ করে অসুস্থ মানুষ, স্কুলের ছাত্রছাত্রী এবং বাজারে পণ্য নিয়ে যাওয়া ছোট ব্যবসায়ীরা ভীষণ সমস্যায় পড়ত।

সেই জনপদেই থাকত ছাব্বিশ বছরের সৌরভ। সে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে শহরে চাকরি করত। বাবার অসুস্থতার খবর পেয়ে কয়েক মাসের জন্য সে গ্রামে ফিরে এসেছিল। গ্রামে এসে সে বুঝতে পারল, সাঁকো না থাকায় মানুষের প্রতিদিন কতটা সময় ও অর্থ নষ্ট হচ্ছে।

একদিন সকালে সে দেখল, এক বৃদ্ধ কৃষক মাথায় সবজির ঝুড়ি নিয়ে খালের ধারে দাঁড়িয়ে আছেন। ওপারে বাজার বসেছে, কিন্তু ঘুরপথে গেলে সবজি পৌঁছতে দেরি হবে।

সৌরভ এগিয়ে গিয়ে বলল, “কাকা, নৌকায় পার হচ্ছেন না কেন?”

বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “নৌকা সব সময় পাওয়া যায় না বাবা। আর বর্ষায় স্রোত বাড়লে মাঝিরাও নামতে চান না।”

সেদিনই সৌরভ ঠিক করল, সমস্যাটির একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজবে।

সে প্রথমে গ্রামের কয়েকজনকে নিয়ে খালের দুই পাড়ের মাটি, জলের গভীরতা, বর্ষার স্রোত এবং মানুষের যাতায়াতের পরিমাণ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করল। তারপর স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি ছোট পথচারী সেতুর প্রাথমিক পরিকল্পনা তৈরি করল।

কিন্তু সমস্যা দেখা দিল অর্থের জায়গায়। সেতু নির্মাণের জন্য যে টাকা দরকার, তা গ্রামের মানুষের পক্ষে একা জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। কেউ বললেন, বড় ব্যবসায়ীদের কাছে যেতে হবে। কেউ প্রস্তাব দিলেন, সেতু তৈরি হলে পারাপারের জন্য টোল নেওয়া হোক।

একজন ব্যবসায়ী তো সরাসরি বলেই দিলেন, “আমি টাকা দেব, তবে সেতুর ওপর আমার দোকানের নাম থাকবে। আর পারাপারের আয় থেকে আমাকে নির্দিষ্ট অংশ দিতে হবে।”

সৌরভ বুঝতে পারল, সাহায্যের প্রস্তাবটি আকর্ষণীয় হলেও তার সঙ্গে এমন শর্ত জড়িয়ে আছে, যা ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।

সে গ্রামের সভা ডাকল।

সভায় সৌরভ বলল, “সেতু যদি হয়, তা মানুষের প্রয়োজন মেটানোর জন্য হবে। অর্থের ব্যবস্থা অবশ্যই করতে হবে, কিন্তু এমন ব্যবস্থা চাই, যাতে কেউ দরিদ্র বলে পারাপার করতে না পারেন—এমন পরিস্থিতি না তৈরি হয়।”

একজন প্রশ্ন করলেন, “তাহলে টাকা আসবে কোথা থেকে?”

সৌরভ জানাল, প্রকৌশলগত সমীক্ষা ও অনুমোদনের ভিত্তিতে নির্মাণের প্রকৃত ব্যয় নির্ধারণ করতে হবে। তারপর সরকারি প্রকল্প, স্থানীয় উন্নয়ন তহবিল এবং স্বচ্ছভাবে সংগৃহীত অনুদানের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। গ্রামের মানুষ জমি বা শ্রম দিয়ে সাহায্য করতে চাইলে সেটিও আইনসম্মত ও নিরাপদ ব্যবস্থার মধ্যে করতে হবে। তবে নকশা, নির্মাণ এবং নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে হবে যোগ্য পেশাদারদের।

গ্রামের কয়েকজন প্রথমে সন্দেহ প্রকাশ করলেও সৌরভ হাল ছাড়ল না। সে পরিকল্পনার খরচ, সম্ভাব্য সুবিধা এবং রক্ষণাবেক্ষণের হিসাব সহজ ভাষায় লিখে সবার সামনে তুলে ধরল। প্রতিটি অনুদানের হিসাব প্রকাশ করার প্রস্তাবও দিল।

একটি স্থানীয় সমবায় সংস্থা প্রকল্পটির সম্ভাবনা দেখে এগিয়ে এল। প্রশাসনের সহায়তায় প্রয়োজনীয় সমীক্ষা ও অনুমোদনের কাজ শুরু হলো। বিশেষজ্ঞেরা এমন একটি সেতুর নকশা তৈরি করলেন, যা খালের স্রোত, বর্ষার জলস্তর এবং দুই পাড়ের মাটির প্রকৃতি বিবেচনা করে নির্মাণ করা সম্ভব।

নির্মাণের কাজ শুরু হতে কিছুটা সময় লাগল। মাঝপথে বর্ষার কারণে কাজ থামাতেও হলো। তবু সবাই নিয়ম মেনে এগোলেন। গ্রামের মানুষ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করলেন। কেউ নির্মাণস্থলে প্রয়োজনীয় তথ্য পৌঁছে দিলেন, কেউ শ্রমিকদের জন্য পানীয় জলের ব্যবস্থা করলেন, আবার কেউ নিয়মিত অগ্রগতির হিসাব দেখার দায়িত্ব নিলেন।

অবশেষে এক শীতের সকালে সেতুটি ব্যবহারের জন্য খুলে দেওয়া হলো। সেতুটি খুব বড় ছিল না, কিন্তু তার দুই পাশে ছিল নিরাপদ রেলিং এবং প্রবেশপথে স্পষ্ট নির্দেশনা। ভারী যানবাহনের জন্য সেটি তৈরি করা হয়নি; এটি ছিল পথচারী ও নির্ধারিত হালকা ব্যবহারের উপযোগী সেতু। নিয়মিত পরিদর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হলো।

উদ্বোধনের দিন বৃদ্ধ কৃষকটি প্রথম দিকের মানুষদের সঙ্গে সেতু পার হলেন। ওপারে পৌঁছে তিনি থেমে সৌরভকে বললেন, “আজ আমার সবজি সময়মতো বাজারে পৌঁছবে। এই সেতু আমার কাছে শুধু কংক্রিট আর লোহার কাঠামো নয়, আমার পরিশ্রমের মূল্য বাঁচানোর পথ।”

স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা আনন্দে সেতু পেরিয়ে গেল। এক অসুস্থ বৃদ্ধাকে পরিবারের লোকজন নিয়ে গেলেন চিকিৎসকের কাছে, আগের তুলনায় অনেক কম ঘুরপথে। বাজারের ছোট ব্যবসায়ীরাও নতুন করে সময়ের হিসাব সাজাতে পারলেন।

কয়েক দিন পর সৌরভ সেতুর প্রবেশপথে একটি ছোট ফলক বসানোর প্রস্তাব দিল। সেখানে কোনও ব্যক্তিগত ব্যবসার বিজ্ঞাপন বা কোনও একক দাতার বড় নাম রাখা হলো না। লেখা হলো—

“এই সেতু জনসাধারণের চলাচলের জন্য। এর নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ সবার দায়িত্ব।”

একজন গ্রামের প্রবীণ মানুষ সৌরভকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি নিজের নাম লিখলে না কেন? এত পরিশ্রম তো তুমি করেছ!”

সৌরভ হেসে বলল, “আমি পরিকল্পনায় সাহায্য করেছি। কিন্তু এই সেতু সম্ভব হয়েছে অনেক মানুষের সহযোগিতায়। আর সেতুর সবচেয়ে বড় পরিচয় তার নির্মাতার নাম নয়—এটি কত মানুষের কাজে লাগছে।”

বছর ঘুরে আবার বর্ষা এল। খালের জল ফুলে উঠল, স্রোতও বাড়ল। কিন্তু এবার দুই পাড়ের মানুষ নিরাপদে নির্ধারিত পথ দিয়ে যাতায়াত করতে পারলেন। নিয়মিত পরিদর্শনে কোনও সমস্যা ধরা পড়লে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যও গ্রামের কমিটি সক্রিয় ছিল।

সৌরভ পরে শহরে ফিরে গেল। তবে সে যাওয়ার আগে গ্রামের তরুণদের নিয়ে একটি দল গড়ে দিয়েছিল, যারা জনসাধারণের সম্পদ রক্ষা এবং রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করত।

শালবনের মানুষ বুঝেছিলেন, একটি সেতু শুধু দুই পাড়কে যুক্ত করে না। সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং সম্মিলিত দায়িত্ববোধ থাকলে তা মানুষের মধ্যে আস্থার সম্পর্কও গড়ে তুলতে পারে।

আর সেই সেতুর ওপর দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ যাতায়াত করতেন—কেউ স্কুলে, কেউ কাজে, কেউ বাজারে। কারও কাছে এটি ছিল সময় বাঁচানোর পথ, কারও কাছে জীবিকার সুযোগ, আবার কারও কাছে ছিল প্রমাণ যে একটি জনপদের সমস্যা সমাধানে সবাই মিলে এগিয়ে এলে অসম্ভব মনে হওয়া কাজও সম্ভব হতে পারে।

শিক্ষা: জনসাধারণের উপকারে তৈরি কোনও সম্পদ শুধু একজনের কৃতিত্ব নয়; তার সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছ পরিচালনা ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ সবার দায়িত্ব। ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে মানুষের সম্মিলিত প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিলে উন্নয়ন সত্যিকার অর্থে সবার কাজে লাগে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *